নাড়ীর টানে, শিকড়ের বুকে

অনেকদিন ধরে গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয় না। যাওয়ার ইচ্ছে নেই, সেজন্য নয়। যেতে এবং আসতে যে সময় লাগে, সে সময়টা পাওয়া যায় না বলে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয় না। আমার গ্রামের বাড়ি অনেকদূরে, একেবারে বঙ্গোপসাগরের কাছে, এক দ্বীপে – যার নাম হাতিয়া, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর এক দ্বীপ।


চিত্র ১: বাংলাদেশের মানচিত্রে হাতিয়া (লাল কালিতে লেখা)

আমার জন্ম হাতিয়াতে নয়, আমার বেড়ে উঠাও হাতিয়াতে নয়। বাবার আগ্রহে একসময় বছরে দুই-তিনবার হাতিয়া যাওয়া হতো। অনেক, অনেকদিন আগে, যখন বরিশালে ছিলাম, বরিশাল থেকে বড়ো জাহাজে করে হাতিয়া যেতাম, একটা জাহাজের নাম এখনো মনে আছে-এম ভি আলাউদ্দিন। বিকেল বেলা বরিশাল হতে জাহাজ ছাড়তো, পরদিন সকালে হাতিয়াতে পৌছাতো, তাও আবার একেবারে পাড়ে থামতো না। মাঝনদীতে নোঙর করা জাহাজ থেকে আবার সী-ট্রাকে করে তীড়ে আসতে হতো।

বরিশাল থেকে চলে যাবার পর হাতিয়া যাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে উঠলো। তখন ঢাকা থেকে বাসে নোয়াখালীর সোনাপুর, সেখান থেকে ভাঙ্গা বাসে স্টিমার ঘাট পর্যন্ত (যার কোমড় ব্যাথা আছে, তার যাওয়া নিষেধ!) এবং এরপর সী-ট্রাকের জন্য অপেক্ষা আর অপেক্ষা কখন জোয়ার শুরু হবে। সব মিলিয়ে দেড় দিনের ধাক্কা! একদিন শুনলাম, ঢাকা থেকে হাতিয়া সরাসরি লঞ্চ সার্ভিস চালু হয়েছে, যাত্রা আরামদায়ক হলো কিন্তু সময় সংকোচন হলো না।

বাবা মারা যাবার পর গত দুই বছরে আমার চার বার হাতিয়া যাওয়া হয়। গ্রামে গিয়ে কখনোই আমার খারাপ লাগে না, এই চারবারও খারাপ লাগেনি, শুধু প্রতিটি পদক্ষেপেই বাবাকে খুব অনুভব করেছি। আবেগে বিহ্বল হয়েছি যখন বুঝতে পেরেছি, এক সময় যে কাজগুলো বাবা করেছেন, এখন সেগুলো আমাকে করতে হচ্ছে। খুব অবাক হয়েছি, যখন দেখেছি এলাকার মুরুব্বীরা বাবাকে যে আসনে বসিয়েছিলেন, হঠাৎ করে আমাকেও সে আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। নীরবে মেনে নিয়েছি, অফিসিয়াল প্রটোকলের অনুপস্থিতি। আকস্মিকভাবে পরিস্থিতির এই পরিবর্তনের হেতু আমার জন্য খুব কষ্টদায়ক হলেও, পরিবর্তনটা কেনো জানি আমি খুব উপভোগ করছি।

এবার বেশকিছু কারণে অনেক আগেই বাড়ি যাবার খুব প্রয়োজন হলেও, সময় বের করতে না পারায় যাওয়া হচ্ছিল না। অবশেষে কোরবানীর ঈদের পর চারদিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঢাকা থেকে হাতিয়া পর্যন্ত মাত্র দুইটি লঞ্চ চলে, একদিন একটা করে। আমি যেদিন যাবো, সেদিন এম ভি পানামার হাতিয়ার উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা। ঢাকা-বরিশালে যেসব বড়ো এবং বিলাসবহুল লঞ্চ চলে, সেগুলোর তুলনায় এম ভি পানামা বা অপর লঞ্চ এম ভি টিপু খুব নগণ্য। তারপরও এক অদ্ভুত কারণে লঞ্চ দুটিকে খুব আপন মনে হয়।

ঢাকা সদরঘাট থেকে সন্ধ্যাবেলা যখন লঞ্চ ছেড়ে দিলো, দেখা গেলো আশেপাশের কেবিনগুলোতেও আমার পরিচিত লোকেরাই যাচ্ছে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আত্মীয়ও আছে। আড্ডায় আড্ডায় যখন রাতের খাবারের সময় হলো, ডাল চর্চরি আর মুরগীর মাংশ সবাই গোগ্রাসে গিললো। সকাল বেলায় যখন লঞ্চ ঘাটে ভিড়লো, বেশ কিছু মানুষজন, যারা আমাকে নিতে এসেছে, দেখে খুব অবাকই হলাম। মনে পড়ে গেলো, বাবা মারা যাবার পর প্রথমবার যখন বাড়িতে আসি, ঘাটে বাড়ির ম্যানেজার ছাড়া আর কেউ ছিলো না। বুঝতে পারলাম, হয়তোবা আমি তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি, হয়তোবা তারা বুঝতে পেরেছে আমি বাবার দেখানো পথেই চলবো।


চিত্র ২: বুড়িগঙ্গার বুকে


চিত্র ৩ : লঞ্চ থেকে, মেঘনা নদীতে


চিত্র ৪:যাত্রা পথে

গ্রামের বাড়িতে আমি দুই দিন ছিলাম। প্রথম দিন প্রায় পুরোটা দিন ছিলাম উপজেলা সদরে, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং উপজেলা সদরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করতে করতেই সন্ধ্যা হয়ে গেলো। প্রায় সবাই আলাপ শুরু করেছেন বাবাকে সূত্র ধরে, “উনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন, হাতিয়ার জন্য অনেক কিছু করেছেন,” ইত্যাদি ইত্যাদি এবং আলাপ শেষ করেছেন আমাকে নিয়ে, “তুমি গ্রামে আসিও, তোমার বাবার কাজগুলো শেষ করিও, গ্রামের সাথে সম্পর্ক ভুলে যেও না,” ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কিছু বলিনি, আসলে বলার কিছু ছিলো না।


চিত্র ৫ : প্রথম দিন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করতে করতেই সন্ধ্যা হয়ে গেলো

পরের দিন ছিলো এক বিশাল কাজ। বাবা মারা যাবার পর আমাদের বসত ভিটার প্রতিবেশী কিছু ব্যক্তি, যারা সম্পর্কে খুব দূরের আত্মীয় নয়, তারা বাড়ির সীমানা নিয়ে কিছু অযৌক্তিক প্রশ্ন তুলেন। আমাকে সরাসরি কিছু না বলে বাড়ির ম্যানেজারকে বলতে থাকেন। বাড়ির ম্যানেজারের কাছ হতে ফোনে শুনেই আমি এবার বাড়িতে আসি। আসার আগে জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি এসে সরকারী জরিপকারক দিয়ে সীমানা মাপাবো।

গ্রামে এসে বুঝতে পারলাম আমার কাছে সঠিকভাবে খবর পৌঁছায়নি, কিছুটা অতিরঞ্জিত ছিলো। প্রকৃতপক্ষে সীমানা নিয়ে তেমন কিছু ঘটেনি। আমি অনেকখানিই বিব্রত হলাম। তারপরও মুরুব্বীরা বললেন, “তোমার সীমানা মাপা উচিত, নিজের চোখে সবকিছু দেখা দরকার,” উনাদের কথায় সান্তনা পেলাম। বাড়ির ম্যানেজারের সাথে কিছু ব্যক্তির আরো সমস্যা ছিলো, মুরুব্বীরা বললেন, “তুমি যে সিদ্ধান্ত দিবে, সবাই তা মেনে নিবে,” আমি আবারো বিব্রত কিন্তু ভীষণভাবে আবেগাপ্লুত হলাম।


চিত্র ৬ : অনেকের সাথে চায়ের দোকানে


চিত্র ৭ : এখনো শীত আসেনি, কিন্তু প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে! খেজুরের রস আমার খুব প্রিয়।


চিত্র ৮ : সাপ দেখে অবশ্য আমি ভয় পাই নি!


চিত্র ৯ : আমারো ইচ্ছে হয়েছিলো এভাবে গাছে উঠে কামরাঙ্গা পাড়তে


চিত্র ১০ : গ্রামের এই উচ্ছ্বল কিশোরীদের চোখে মুখে কী বিস্ময় লুকিয়ে আছে, তা বোঝার সাধ্য বোধহয় আমার নেই!

হাতিয়া থেকে আসার দিন আমার খুব তাড়া ছিলো, সেদিন সন্ধ্যার মধ্যেই ঢাকা পৌছাতে হবে। তাই লঞ্চে না এসে, সী-ট্রাকে না উঠে, স্পীড বোর্ট ভাড়া করলাম। ত্রিশ মিনিটে মেঘনা নদী পাড় হয়ে যখন দুপুরের দিকে নোয়াখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম, মনে হোল গ্রামে আমি আবার ফিরে যাবো। এটা যে নাড়ীর টান! নাড়ীর টানে যে শিকড়ের বুকে ফিরে আসতেই হবে!


চিত্র ১১ : বিদায় হাতিয়া! আবার আমি ফিরে আসবো আমার এই শিকড়ের কাছে।