গ্রীক মিথলজি ৪ (মানবজাতির সৃষ্টি, প্রমিথিউস এবং পান্ডোরা উপাখ্যান)

টাইটান ক্রোনাসের সময় মানবজাতির সোনালী যুগ ছিলো। টাইটান যুদ্ধে ক্রোনাসের পরাজয়ের সাথে সাথে সেই যুগের সমাপ্তি ঘটে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হোন জিউস। জিউস তখনো তার ক্ষমতাকে পুরোপুরি নিষ্কন্টক করতে পারেননি। তাকে টাইটান যুদ্ধের পর আরো দুটি যুদ্ধে জড়াতে হয়- জায়ান্টদের সাথে এবং টাইফোয়িয়াসের সাথে। সেই দুটি যুদ্ধের আগে জিউসের ক্ষমতায় আসার প্রথম দিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে মানবজাতির সৃষ্টি। আসলে সোনালী যুগের অবসানের পর পৃথিবীতে অনেকদিন যাবত কেউ বসবাস করছিলো না। না কোন মানব, না কোন পশু-পাখি। তাই জিউসের ইচ্ছে হলো মানব তৈরী করার এবং সেইসাথে সূচনা হলো গ্রীক মিথলজির সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক অধ্যায়ের, যে অধ্যায়ের নায়ক হচ্ছেন টাইটান প্রমিথিউস আর পার্শ্বচরিত্ররা হচ্ছেন পান্ডোরা, এপিমেথিয়াস এবং স্বয়ং জিউস।

Prometheus প্রমিথিউস (শিল্প- গুস্তাভ মুরে, ১৮৬৮ সাল)

টাইটানদের সাথে যুদ্ধ জয়ের পর জিউস সিদ্ধান্ত নিলেন পশু পাখি এবং মানুষ তৈরী করার এবং এই কাজে তিনি দায়িত্ব দিলেন দুই টাইটান ভাই  প্রমিথিউস ও এপিমেথিয়াসকে, যারা টাইটান যুদ্ধে জিউসকে সাহায্য করেছিলেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রমিথিউস ছিলেন বুদ্ধিমান, তিনি ভবিষ্যতে কি হবে, সেটা আগেই বুঝতে পারতেন। কিন্তু এপিমেথিয়াস ছিলেন আবেগপ্রবণ, তিনি অতীতে কি হয়েছিলো সেটা নিয়েই ভাবতেন শুধু। মানুষ এবং পশু পাখি তৈরীর জন্য জিউস এই দুই ভাইকে কিছু উপকরণ উপহার দিলেন, যেমন- ধারালো নখ, দাঁত, খোলস, প্রখর দৃষ্টি শক্তি, ঘ্রাণশক্তি, ইত্যাদি। এপিমেথিয়াস দ্রুত অনেক পশু পাখি তৈরী করে ফেললেন যারা বনে বাস করবে, নদীতে ও সাগরে সাঁতার কাটবে, আকাশে উড়বে এবং জিউস যে উপহারগুলো দিয়েছিলেন সেগুলো সব শেষ করে ফেললেন।

যখন তাঁর ভাই বোকার মতো খুব একটা চিন্তা ভাবনা না করেই পশু পাখি তৈরী করছিলেন, তখন প্রমিথিউস অনেক চিন্তা ভাবনা করে, অসম্ভব যত্নে, প্রচন্ড আবেগ দিয়ে  এক দলা মাটি নিয়ে মানুষ তৈরী করতে লাগলেন। প্রমিথিউস মানুষকে দেবতাদের মতো আকৃতি দিলেন, মানুষকে সোজা হয়ে দাঁড়াবার ক্ষমতা দিলেন আর দিলেন আকাশের দিকে তাকানোর সামর্থ্য। দেবী এথেনা দিলেন মানবীয় গুণাবলী। কোনো কোনো মিথে আছে, এপিমেথিয়াস মানুষ তৈরী করেছেন এবং প্রমিথিউস তাকে নির্দেশনা দিয়েছেন। যেই মানুষকে তৈরী করে থাকুক না কেনো, মানুষকে অন্যান্য সৃষ্টি থেকে মহৎ করে তৈরী করা হয়েছিলো এবং দেয়া হয়েছিলো দেবতাদের আদল।

Prometheus প্রমিথিউস দেখছেন এথেনা তাঁর সৃষ্টিকে মানবীয় গুণাবলীতে শোভিত করছেন (ক্রিস্টিয়ান গ্রীপেনকেরল, ১৮৭৭ সাল)

যা হোক, মানুষ তৈরী করার পর প্রমিথিউস দেখলেন, তাঁর ভাই জিউসের দেওয়া সব উপহার অন্যান্য পশু পাখিকে দিয়ে শেষ করে ফেলেছেন, এবং মানুষকে দেবার জন্য অবশিষ্ট আর কিছু নেই। যেখানে, অন্যান্য পশু পাখি শক্তিমত্তা, দ্রুততা, শক্ত খোলস, গরম পালকসহ অনেক কিছুই পেয়েছে, সেখানে মানুষ ছিলো নগ্ন, ছিলো দুর্বল, ছিলো অনিরাপদ।

প্রমিথিউস প্রচন্ড দুখবোধ নিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে দেখতে লাগলেন। তিনি দেখলেন, পৃথিবীতে কতটা অসহায় অবস্থায়, কতটা যন্ত্রনা নিয়ে মানুষ জাতি বসবাস করছিলো। তিনি আবেগপ্রবন হয়ে উঠলেন। তিনি তাঁর সৃষ্টিকে এমন একটি জিনিস উপহার দিতে চাইলেন যা মানুষকে করে তুলবে দুর্দান্ত, সব সৃষ্টির মাঝে অনন্যসাধারণ।

যদি তারা আগুন পেতো!” চিন্তা করলেন প্রমিথিউস, অন্ততপক্ষে তারা নিজেদের উষ্ণ রাখতে পারতো, নিজেদের খাবার রান্না করে খেতে পারতো এবং আগুনের সাহায্যে তারা কিছু জিনিস তৈরী করা শিখে নিজেদের জন্য বাড়ি বানিয়ে সেখানে বসবাস করতে পারতো! আগুন ছাড়া তারা কিছুতেই বাঁচতে পারবে না!”

এই চিন্তা করেই প্রমিথিউস জিউসের কাছে গেলেন এবং মানুষের জন্য স্বর্গ থেকে আগুন চাইলেন। সেই সময়ে আগুন শুধু স্বর্গের দেবতাদেরই বস্তু ছিলো।

এক স্ফুলিঙ্গ কণা আগুনও দেওয়া যাবে না!” বজ্র কন্ঠে জবাব দিলেন জিউস, যদি মানুষকে আগুন দেওয়া হয়, তাহলে সে শক্তিশালী হয়ে উঠবে, হয়ে উঠবে আমাদের মতো জ্ঞানী এবং কিছুদিন পরে দেখা যাবে তারা আমাদের অমান্য করছে। তাদেরকে এই অবস্থাতেই থাকতে দাও, যাতে তারা সবসময়ের জন্য দরিদ্র আর অজ্ঞ থাকে, তাহলেই তারা সবসময় আমাদের মান্য করবে

প্রমিথিউস নিরুত্তর রইলেন, কিন্তু তিনি মনে মনে ঠিক করে ফেললেন তিনি কি করবেন! তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করলেন মানুষ জাতির প্রতি তাঁর মমতা, তিনি আশা ছাড়লেন না। কিন্তু তিনি সর্বশক্তিমান জিউসের সঙ্গ ছাড়লেন চিরদিনের জন্য।

তিনি যখন সমুদ্রের তীর দিয়ে হাঁটছিলেন, তখন এক নলখাগড়া দেখতে পেলেন, কেউ কেউ বলেন, মৌরি গাছের একটি বৃন্ত পেলেন। সেটাকে ভেঙ্গে দেখলেন, এর ভিতরটা সরু ফাঁপা, সেখানে আছে শুকনো, নরম মজ্জা যা ধীরে ধীরে জ্বলবে এবং এতে অনেকক্ষন ধরে আগুন রাখা যাবে। তিনি এরকম একটি নলখাগড়া নিয়ে সূর্য দেবতার বাসস্থানের দিকে হাঁটা শুরু করলেন।

মানবজাতিকেই আগুন পেতে হবে সেই স্বেচ্ছাচারীর পরিবর্তে, যে বাস করে পাহাড় চূড়ায়,” চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন প্রমিথিউস। খুব ভোরবেলায়, যখন সূর্যদেব তাঁর সেই দিনের যাত্রা শুরু করবেন, তখন প্রমিথিউস সূর্যদেবের প্রাসাদে গিয়ে পৌঁছালেন। তিনি সূর্য দেবের রথ থেকে এক স্ফুলিঙ্গ আগুন সেই নলখাগড়ার মধ্যে লুকিয়ে দ্রুত পৃথিবীতে ফিরে আসলেন।

Prometheus কোনো কোনো মিথে দেখা যায়, জিউস যখন তাঁর প্রেমিক গাইনেমেডের সাথে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তখন প্রমিথিউস স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করছিলেন (তুলি- ক্রিস্টিয়ান গ্রীপেনকেরল)

কেউ কেউ বলে থাকেন, দেবী হেরার সাহায্য নিয়ে প্রমিথিউস অলিম্পাস পাহাড়ে দেবতাদের বাসস্থান থেকে আগুন চুরি করে আনেন। আবার কোনো কোনো মিথে দেখা যায়, আগুন আগে পৃথিবীতেই ছিলো, মানুষ আগুনের ব্যবহার জানতো, কিন্তু জিউস সেটা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন এবং প্রমিথিউস আবার তা ফিরিয়ে এনেছেন। এইসব মিথে বর্ণিত আছে, জিউস একবার মানুষকে বললেন দেবতাদের উদ্দেশ্যে খাবারের একটি অংশ উৎসর্গ করতে। মানববন্ধু প্রমিথিউস মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তিনি খাবারের দুটি প্রস্ত তৈরী করেন। একটি ছিলো বাইরের দিকে সাড়ম্বরপূর্ণ, কিন্তু ভিতরে ষাড়ের হাড় এবং চর্বি ছাড়া কিছুই নেই। অন্য খাবারটি দেখতে ছিলো অপছন্দনীয়, কিন্তু ভিতরে ছিলো ষাড়ের মাংশ। জিউস প্রলুদ্ধ হয়ে যেটি দেখতে সুন্দর সেটি নিলেন। সেই থেকে মানবজাতি দেবতাদের উদ্দেশ্যে হাড়সর্বস্ব চর্বি উৎসর্গ করতো, আর নিজেদের জন্য মাংশ রেখে দিতো। জিউস খুবই ক্ষুদ্ধ হলেন, তিনি মানুষের কাছ হতে আগুন কেড়ে নিলেন। প্রমিথিউস সেটা চুরি করে এনে আবার মানুষকে ফিরিয়ে দিলেন।

তিনি শীতে কাবুপ্রায় কিছু মানুষকে গুহা থেকে ডাকলেন, আগুন জ্বালালেন, তাদেরকে শিখালেন কীভাবে আগুনের সাহায্যে নিজেদেরকে উষ্ণ রাখবে, কীভাবে আগুনের সাহায্যে অন্যান্য জিনিস তৈরী করবে। প্রমিথিউস আগুন দিয়ে মানবজাতিকে শেখালেন কীভাবে রান্না করতে হয়, কীভাবে  

পশুর মতো জীবন পরিহার করে ভদ্রভাবে বেঁচে থাকা যায়। তারা গুহা ছেড়ে খোলা জায়গায় থাকা শুরু করলেন, জীবন হয়ে উঠলো আনন্দময় এবং প্রাচুর্যময়।

প্রমিথিউস ধীরে ধীরে মানুষকে অনেক কিছুই শেখালেন। তিনি দেখালেন কীভাবে পাথর এবং কাঠ দিয়ে বাড়ি তৈরী করতে হয়, শেখালেন কীভাবে ভেড়া এবং গরুকে পোষ মানাতে হয়, কীভাবে ভূমিকর্ষণ করে শস্য বুনতে হয়, কীভাবে শীতে, ঝড়ে নিজেকে রক্ষা করতে হয়। মানবজাতির উন্নতি দেখে প্রমিথিউস উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, তিনি আনন্দে চিৎকার করে বলে উঠলেন, এক নতুন সোনালী যুগ অতি শিঘ্রই আসবে, যা হবে আগের চেয়ে উজ্জ্বল এবং সমৃদ্ধশালী

হয়তোবা সবকিছুই প্রমিথিউসের ইচ্ছামতোই ঘটতো, যদি না একদিন অলিম্পাস পাহাড় থেকে জিউস উঁকি দিয়ে নীচে পৃথিবীর দিকে না তাকাতেন! তিনি তাকিয়ে দেখেন, আগুন জ্বলছে, মানুষ বাড়িতে বাস করছে, গোবাদি পশু পাহাড়ে চড়ছে, আর মাঠে অবারিত শস্যক্ষেত। জিউস এসব দেখে চমকে উঠলেন, তিনি হুংকার দিয়ে জানতে চাইলেন, কে মানবজাতিকে আগুন দিয়েছে। কোনো এক দেবতা বলে উঠলেন, প্রমিথিউস

জিউস প্রমিথিউসের উপর দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষুদ্ধ হলেন। তিনি মানবজাতি এবং প্রমিথিউস- দুইকেই শাস্তি দিতে মনস্থির করলেন। তিনি জানেন, প্রমিথিউসকে শস্তি দেওয়া কোনো ব্যাপার নয়। তাই প্রমিথিউসকে শাস্তি দেওয়ার আগে তিনি খুবই অভিনব পন্থায় মানবকে শাস্তি দিতে চাইলেন। জিউস স্বগতোক্তি করলেন, ঠিকাছে, মানুষ আগুন ব্যবহার করুক। কিন্তু আমি মানুষকে এখন যা দিবো, তার জন্য সে দশগুণ কষ্ট ভোগ করবে!”

প্রথমে জিউস তাঁর পুত্র এবং দেবতাদের কামার হেফাস্টাসকে আদেশ দিলেন এমন এক মানুষ তৈরী করতে যা দেখে প্রতিটি মানবের হৃদয় তাকে পাওয়ার আকাঙ্খায় পেয়ে বসবে। মাটির পিন্ড দিয়ে হেফাস্টাস তৈরী করলেন পৃথিবীর প্রথম মানবী। এরপর সেই মানবীকে হেফাস্টাস সকল দেবতা পরিবেষ্টিত জিউসের সামনে উপস্থিত করলেন। হেসিয়ডের থিওগোনীতে এর চেয়ে সেই মানবী সম্পর্কে বেশি কিছু লেখা নেই, এমনকি নামটিও পর্যন্ত নেই। কিন্তু হেসিয়ড তাঁর ‘ওয়ার্কস এন্ড ডেইজ’- এ আবার মানবী সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, মানবীকে জিউসের সামনে নিয়ে এলে জিউস সবাইকে আদেশ দিলেন- এই মানবীর মধ্যে সব ভালো ভালো জিনিস দিতে। জ্ঞানের দেবী এথেনা তাকে সুঁই সুতার ব্যবহার এবং বয়ন করা শেখালেন, সৌন্দর্য্য এবং প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি তাকে দিলেন অতুলনীয় রুপ, হার্মিস দিলেন বিনয়াবনত মন ও কৌতুহলী স্বভাব, আরো দিলেন মিষ্টি কন্ঠস্বর। এথেনা তখন তাকে রুপালী গাউনে আবৃত করলেন, ক্যারিস নামের দেবীরা তাকে অলংকারে সুশোভিত করলেন, আর হোরাই নামের দেবীরা তার মাথায় পরিয়ে দিলেন ফুলের মুকুট। সবশেষে হার্মিস মানবীটির নাম দিলেন ‘পান্ডোরা’- মানে ‘সব উপহার দেওয়া হয়েছে’। পান্ডোরাকে এমনভাবে তৈরী করা হলো, পৃথিবীর কেউ দেখে তাকে ভালো না বেসে থাকতে পারবে না।

Pandora পান্ডোরা (শিল্প- জুলস জোসেফ লেফেভ্রে, ১৮৮২ সাল)

পান্ডোরাকে দেবতারা যা দিয়েছিলেন, তার ভিতরে কৌতুহলী স্বভাবটিই ছিলো মানবজাতির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। দেবতারা পান্ডোরাকে সমস্ত মানবীয় গুণাবলী ছাড়াও আরেকটি জিনিস দিলেন, সেটি হচ্ছে একটি মুখবন্ধ জার, (ষোড়শ শতকে সাহিত্যিকদের লেখনীতে কীভাবে যেনো জার হয়ে গেলো বাক্স! সেই থেকে বলা হতে লাগলো ‘পান্ডোরার বাক্স’, অথচ হেসিয়ড লিখেছিলেন ‘পান্ডোরার পিথস বা জার’!) যার ভিতরে ছিলো দুর্বহ পরিশ্রম ও জরা-ব্যাধিসমূহ যা মানুষের মৃত্যু ডেকে আনে, ছিলো রোগ, অন্যান্য অসংখ্য যন্ত্রনা, ক্লিষ্টসমূহ, লোভ লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, প্লেগ, দুর্ভিক্ষ আর ছিলো আশা! কেউ কেউ বলেন দেবী এথেনা বিদায় মূহূর্তে পান্ডোরাকে নিষেধ করেছিলেন, সে যেনো জারের বন্ধ মুখ কখনো না খুলে!

Pandora পান্ডোরা (শিল্পী- জন উইলিয়াম ওয়াটারহাউজ, ১৮৯৬ সাল)

এরপর পান্ডোরাকে নিয়ে পৃথিবীর যে জায়গায় প্রমিথিউস এবং এপিমেথিয়াস বসবাস করছিলেন, সেদিকে এলেন জিউসের বার্তাবাহক হার্মিস। হার্মিসের সাথে প্রথমে এপিমেথিয়াসের দেখা হলো। হার্মিস বললেন, এপিমেথিয়াস, তোমার জন্য জিউস উপহার পাঠিয়েছেন। তুমি এই মানবীকে বিয়ে করো  প্রমিথিউস পূর্বেই এপিমেথিয়াসকে সাবধান করেছিলেন জিউস থেকে কোন কিছু গ্রহন না করতে, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জিউস এতো সহজে তাদেরকে ছেড়ে দিবেন না! কিন্তু পান্ডোরাকে দেখে এপিমেথিয়াস প্রমিথিউসের নিষেধ বাণী ভুলে গেলেন। পান্ডোরাকে নিয়ে তিনি ঘরে এলেন, এবং বিয়ে করলেন।

Pandora ১৬২৬ সালে শিল্পী নিকোলাস রেগ্নিয়ের জারসহ (বাক্স নয়) পান্ডোরাকে সঠিক ভাবেই চিত্রিত করেছিলেন

নতুন জীবনে পান্ডোরা খুব সুখী ছিলেন। এমনকি প্রমিথিউসও তার সৌন্দর্য্য দেখে এপিমেথিয়াসের বিয়ে করাকে মেনে নিয়েছিলেন। সুখী জীবন পান্ডোরার ভালো লাগলো না! তিনি সারাক্ষণ জারের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, আর চিন্তা করতেন কি আছে এর ভিতরে। ভাবতে লাগলেন, নিশ্চয়ই এর ভিতরে মূল্যবান অলংকার আছে। আর এই জার যদি সে ব্যবহারই করতে না পারে, তাহলে জিউস শুধু শুধু দিলেন কেনো? এথেনা নিশ্চয়ই ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে এই জারের মুখ খুলতে মানা করেছেন! এথেনা তো সুন্দরী নয়, তাই সে অলংকারগুলো পান্ডোরাকে দেখতে দিতে চায় না! কী হবে একবার খুললে! কেউ দেখবে না!

অবশেষে প্রবল কৌতুহলের কাছে সতর্কবাণী পরাস্ত হলো।

পান্ডোরা জারের ঢাকনাটি সামান্য পরিমাণে খুললেন, শুধুমাত্র ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখার জন্য যতটুকু খোলা দরকার। এরই মধ্যে শোঁ শোঁ শব্দ আর খচমচে আওয়াজ শুরু হলো, খুব দ্রুত ঢাকনা বন্ধ করে দেবার আগেই সেখান থেকে অজস্র মৃত্যুরুপ অস্থিচর্মসার ভয়ংকর জীব বের হয়ে গেলো, যেসব আগে কখনো পৃথিবীর কেউ দেখেনি! যা ছিলো আসলে সেইসব লোভ লালসা, প্লেগ, জরা-ব্যাধি, দুর্ভিক্ষ, রোগ ইত্যাদি- এরা বের হয়েই পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়লো আর খুঁজে বেড়াতে লাগলো মানবজাতিকে, দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দেবার জন্য। এভাবেই জিউস মানবজাতির উপর প্রতিশোধ নিলেন।

Pandora পান্ডোরা জারের মুখটি খুলে ফেললেন, পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরলো যত খারাপ জিনিস

জারের ঢাকনাটি দ্রুত বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ভিতরে একটি জিনিস আটকে গেলো, সেটি হলো ‘আশা’। হেসিয়ড অবশ্য তাঁর ‘ওয়ার্কস এন্ড ডেইজ’-এ লিখেননি  ‘আশা’ কেনো জারের ভিতরে থেকে গেলো! তিনি অবশ্য শেষ করেছিলেন এই লিখে যে, “মরণশীলরা বুঝতে পারলো যে জিউসের কাছ থেকে এর চেয়ে ভালো কিছু পাওয়া সম্ভব নয় বা তাঁকে কখনো ধোঁকা দেওয়াও সম্ভব নয়!” (যদিও জিউসকে বেশ ক’বারই ধোঁকা দেওয়া হয়েছে!)

গ্রীক মিথলজি ৩ (প্রথম টাইটান যুদ্ধ এবং জিউসের উত্থান)

ক্রোনাসসহ তাঁর বার ভাই-বোনকে বলা হয় প্রথম যুগের টাইটান। সাধারণ অর্থে তাদের যে সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহন করেছিলেন, তাদেরকে বলা হয় দ্বিতীয় যুগের টাইটান। এই হিসেবে ক্রোনাস এবং রিয়ার ছয় সন্তানকেই দ্বিতীয় যুগের টাইটান বলা উচিত ছিলো, কিন্তু অলিম্পাস পাহাড়ে অবস্থানের কারণে তাদেরকে বলা হয় অলিম্পিয়ান। আবার টাইটান ওসেনাস এবং টেথিসের সন্তান তিন হাজার নদী দেবতা এবং তিন হাজার ওসেনিড নিম্ফকেও টাইটান বলা হয় না। শুধুমাত্র ওসেনিড স্টিক্স এবং তার বোন মেটিস ব্যতিক্রম। এই দুইজন একইসাথে ওসেনিড এবং টাইটান হিসেবে গন্য হয়ে থাকেন। আবার দ্বিতীয় যুগের টাইটান হবার জন্য যে বাবা- মা দুইজনকেই টাইটান হতে হবে, তা কিন্তু নয়। যেমন, টাইটান ইয়াপেতুস এবং ওসেনিড (ওসেনাস এবং টেথিসের সন্তান) ক্লাইমেনে বা এশিয়ার চার সন্তান এটলাস, মিনোউটিয়াস, প্রমিথিউস ও এপিমেথিয়াস হচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ চারজন দ্বিতীয় যুগের টাইটান। দ্বিতীয় যুগের টাইটানদের মধ্যে আরো উল্লেখযোগ্য ছিলেন- টাইটান কয়ওস এবং ফয়বের সন্তান লেটো ও এস্টেরিয়া, টাইটান ক্রিয়াস এবং ইউরাইবিয়ার (গায়া ও পন্টাসের কন্যা) সন্তান পারসেস, পাল্লাস ও এস্ট্রাইস। আবার কেউ কেউ টাইটান হাইপেরিয়ন এবং থেইয়ার সন্তান হেলিয়াস ও তার বোনদেরকেও দ্বিতীয় যুগের টাইটান বলে থাকেন।

যা হোক, অলিম্পিয়ানরা একসাথে সিদ্ধান্ত নিলেন, ক্রোনাসের ক্ষমতা বিনাশ করবেন। তাই ক্রোনাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলেন। শুরু হলো গ্রীক মিথলজির প্রথম যুদ্ধ টাইট্যানোম্যাকি বা টাইটান যুদ্ধ। যুদ্ধে অন্যান্য টাইটানরা ক্রোনাসকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তাদের নেতা হলেন শক্তিমান এটলাস। অলিম্পিয়ানদের জন্য  এই যুদ্ধ যেনো আরো কঠিন হয়ে উঠলো। তারা যুদ্ধ করতে লাগলেন ক্রোনাসকে সরানোর জন্য, একইসাথে তাদের যুদ্ধ করা লাগলো নিজেদের রক্ষা করার জন্য, কারণ সুযোগ পেলেই ক্রোনাসের পক্ষে তখনো সম্ভব ছিলো তাদেরকে পুনরায় গিলে ফেলা।

অলিম্পিয়ানরা যুদ্ধ শুরু করলেন অলিম্পাস পাহাড় থেকে এবং টাইটানরা যুদ্ধ শুরু করলেন অথ্রিস পাহাড় থেকে। দুটি পাহাড়ই অবস্থিত ছিলো থেসালী নামক জায়গায়, অলিম্পাস ছিলো উত্তরে এবং অথ্রিস ছিলো দক্ষিণে।

যুদ্ধ যখন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিলো, এবং অলিম্পিয়ানরা যখন ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে উঠছিলেন, তখন জিউস একটি ঘোষনা দিলেন। হেকাটে নামে একজন আদি দেবী ছিলেন, যিনি ছিলেন দ্বিতীয় যুগের টাইটান পারসেস এবং এস্টেরিয়ার কন্যা। কেউ কেউ হেকাটেকে তৃতীয় যুগের টাইটান বলে থাকেন। তিনি মানবদেরকে (সোনালী যুগের মানব) ধন, বিজয়, জ্ঞান, নাবিক এবং শিকারীদের প্রতি সৌভাগ্য এবং তারুণ্যের উন্নতিও সাধন করতেন, কিন্তু যদি কোনো মানব এই সমস্ত জিনিস না চাইতো, তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা ফিরিয়েও নিতেন। হেসিয়ড তার থিওগোনীতে সবচেয়ে বেশি সম্মান দিয়েছেন হেকাটেকেই। হেকাটে ছিলেন রাতের রানী ও চৌমাথার দেবী। একইসাথে তিনি ছিলেন জাদুবিদ্যা, ডাইনীবিদ্যা, আগুন ও আলোরও দেবী। স্বর্গের, পৃথিবীর এবং পাতালপুরীর সম্পদের উপর হেকাটের ছিলো অংশীদারিত্ব, তাই চন্দ্র-দেবী, উর্বরতা (পৃথিবী) দেবী এবং পাতালপুরীর দেবী হিসেবেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। জিউস ঘোষনা দিলেন, হেকাটের এই বিশেষ সুবিধা তিনি বাতিল করবেন না। তাই ওসেনাস এবং টেথিসের কন্যা স্টিক্স (স্টিক্স নদী), তার সন্তানদের নিয়ে জিউসকে সমর্থন করতে সর্বপ্রথম অলিম্পাসে আসেন। এই কারণে জিউস স্টিক্সের নামেই শপথের প্রচলন করেন (স্টিক্সের নামে কোনো শপথ নেওয়া হলে সেটাকে বলা হয় অলঙ্ঘনীয় শপথ) এবং স্টিক্সের সন্তানদের (নাইক, জেলোস, ক্রাটোস এবং বিয়া) তার নিকটেই বসবাস করার অনুমতি দেন।

কোনো নারী টাইটান এই যুদ্ধে অংশগ্রহন করলেন না। ইউরেনাস এবং গাইয়ার সকল সন্তানদের মধ্যে ওসেনাস নিরপেক্ষ থাকলেন। প্রমিথিউস ছিলেন টাইটান ইয়াপেতুস আর ওসেনিড ক্লাইমেনে (বা এশিয়া)-এর সন্তান। যুদ্ধের শুরুতেই টাইটান দেবী থেমিস জানতেন এই যুদ্ধে নির্বুদ্ধিতা বা হিংস্রতার জয় হবে না, জয় হবে চাতুর্য্যের। প্রমিথিউস এটা শুনেছিলেন, তিনি ছিলেন দূরদর্শী এবং ভবিষ্যত দ্রষ্টা। তাই টাইটান যুদ্ধের প্রথম দিকে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলেও পরবর্তীতে জিউসের পক্ষাবলম্বন করেন এবং বাবা ইয়াপেতুস ও ভাই এটলাসকেও প্ররোচিত করেন জিউসকে সমর্থন করার জন্য। তাদের দুইজনের কেউই তাতে রাজী না হলেও, প্রমিথিউসের আরেক ভাই এপিমেথিউস প্রমিথিউসের সাথে টাইটান যুদ্ধে অলিম্পিয়ান দেবতাদের পক্ষে যোগ দেন।

এরপরও যুদ্ধে কোনো পক্ষই জিততে পারছিলেন না। এভাবে প্রায় দশ বছর পেরিয়ে গেলো। (ট্রয়ের যুদ্ধও দশ বছরব্যাপী হয়েছিলো!) জিউস তখন গায়ার কাছে পরামর্শের জন্য গেলেন। গায়া জিউসকে জানালেন, পাতালপুরীতে বন্দী হেকাটনখিরাস এবং সাইক্লোপসদের মুক্ত করলে, তারা যদি যুদ্ধে জিউসকে সাহায্য করে, তাহলে যুদ্ধে জিউসের জয়ের সম্ভাবনা আছে।  তখন জিউস পাতালপুরীতে যান এবং দ্বার-রক্ষী ড্রাগন কেম্পকে হত্যা করে হেকাটনখিরাস এবং সাইক্লোপসদের মুক্ত করেন, তাদেরকে নেকটার ও এম্ব্রোসিয়া খেতে দেন, ফলে তারা শক্তিপ্রাপ্ত হোন।

জিউস হেকাটনখিরাসদের মুক্ত করে তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, গায়া এবং ইউরেনাসের দুরন্ত সন্তানেরা, আমার হৃদয়ে যা আছে, আমি সেই কথাই তোমাদেরকে বলছি। অনেক বছর ধরে আমরা ক্রোনাস এবং অন্যান্য টাইটানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি, কিন্তু বিজয়ী হতে পারছি না। কিন্তু তোমরা যদি তোমাদের শক্তিমত্তার নিদর্শন আমাদের পক্ষে দেখাও, তাহলে টাইটানদের পরাজিত করা সম্ভব। তোমরা নিশ্চয়ই মনে রাখবে, অন্ধকার পাতালপুরী থেকে আলোর জগতে আমিই তোমাদেরকে নিয়ে এসেছি  জবাবে হেকাটনখিরাসদের মধ্যে অন্যতম কোট্টুস জিউসকে সাহায্য করতে প্রতিশ্রুতবদ্ধ হয়।

Titanomachy শিল্পীর তুলিতে প্রথম টাইটান যুদ্ধ

সাইক্লোপসরা ছিলো এই বিশ্ব-ব্রক্ষন্মান্ডের প্রথম কামার। বন্দীদশা থেকে মুক্ত করার কৃতজ্ঞতাস্বরুপ তারা জিউসকে লাইটনিং বজ্র তৈরী করে দেয়, যেটাতে আর্গেস উজ্জ্বলতা, ব্রন্টেস বজ্রপাত এবং স্টেরোপেস আলো যোগ করে। এছাড়াও সাইক্লোপসরা পসাইডেনের ট্রাইডেন্ট ও হেডসের অন্ধকারের হেলমেট তৈরী করে দেয়, যেটা পরিধান করলে ক্রোনাসসহ অন্যান্য টাইটানরাও অলিম্পিয়ানদের দেখতে পেতেন না। অন্যদিকে হেকাটনখিরাসরা ক্লান্তিহীনভাবে একসাথে একশটি পাহাড়ের সমান পাথর টাইটানদের দিকে ছুড়ে মারতো। এভাবে যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেলো অলিম্পিয়ানদের দিকে।

Titanomachy শিল্পীর তুলিতে প্রথম টাইটান যুদ্ধ

যুদ্ধের পর অধিকাংশ টাইটানকে টারটারাসে বন্দী করে রাখা হয়। হেকাটনখিরাসদের নেতা ছিলো ব্রিয়ারেস, বন্দী টাইটানদের পাহারা দেবার জন্য জিউস ব্রিয়ারেসসহ হেকাটনখিরাসদের নিযুক্ত করলেন। টাইটানদের দলনেতা এটলাসকে দেওয়া হলো অন্যরকম শাস্তি। তিনি কাঁধে করে আকাশকে ধরে রাখলেন অনন্ত সময় ধরে। টারটারাসে বন্দী থাকার চেয়ে এই শাস্তি কঠোরতর মনে হলো এটলাসের কাছে। অন্যদিকে টাইটান যুদ্ধের পর প্রথমদিকে ক্রোনাসকে টারটারাসে  বন্দী করে রাখা হলেও পরবর্তীতে তাকে  মৃতদের দ্বীপে, যেখানে সাহসী এবং সৌভাগ্যবান মানুষদের আত্মা মৃত্যুর পর যায়, সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, সেখানেই ক্রোনাস সবসময়ের জন্য বসবাস করতে লাগলেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি হয়েছিলেন সেই মৃতদের দ্বীপের রাজা।

সব ধরনের শাস্তি দেওয়ার পর, জিউস, পসাইডন এবং হেডস আলোচনা শুরু করলেন- কে কোন জায়গার অধীশ্বর হবেন। যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত অলিম্পিয়ানরা লটারীর মাধ্যমে ঠিক করলেন হেডস হবেন পাতালপুরীর অধীশ্বর, সকল মৃতদের রাজা। পসাইডন ভাগ পেলেন সকল সমুদ্র এবং পৃথিবীর সকল পানির উপর রাজত্ব। আর জিউস হলেন আকাশের রাজা, আর যেহেতু আকাশে স্বর্গ থাকে এবং আকাশ পৃথিবীকে আবৃত করে রাখে, তাই জিউস হলেন সকল দেবতাদের রাজা।  

গ্রীক মিথলজি ২ (টাইটান যুগের সূচনা এবং অলিম্পিয়ানদের জন্ম)

ক্রোনাস বিশ্ব- ব্রক্ষ্মান্ডের রাজা হয়েই মা গায়ার গর্ভাশয় থেকে হেকাটনখিরাস এবং টারটারাস থেকে সাইক্লোপসদের মুক্ত করেন। কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর ক্রোনাসের মনোজগতেও পরিবর্তন ঘটে, এই পরিবর্তন পরবর্তীতে পৃথিবীতে সব সময়েই হয়ে এসেছে। ক্রোনাস যখন দেখলেন হেকাটনখিরাসরা বিশাল শক্তির অধিকারী, প্রায় কাছাকাছি শক্তি সাইক্লোপসদেরও, তখন তিনি ভীত হয়ে পড়েন এবং মুক্ত করার বেশ কিছুদিন পরেই এদেরকে ও ইউরেনাসের রক্ত থেকে জন্ম নেওয়া জায়ান্টদেরকে আবার টারটারাসে বন্দী করেন এবং দ্বার-রক্ষী হিসেবে নিযুক্ত করেন নারীর মতো মাথা ও শরীর এবং  বৃশ্চিকের মতো লেজ বিশিষ্ট ড্রাগন কেম্পকে। ক্রোনাসের এই আচরনে মা গায়া ক্ষুদ্ধ হলেন, তিনি যে উদ্দেশ্যে ক্রোনাসকে সাহায্য করেছিলেন, সেটা সম্পূর্ণরুপে ব্যর্থ হলো। তাই তিনিও ভবিষ্যতবানী করলেন, ক্রোনাস তার বাবা ইউরেনাসের মতোই ক্ষমতা থেকে উৎখাত হবেন এবং সেই কাজটি করবেন ক্রোনাসেরই সন্তান।

ক্রোনাস তার বোনদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী এবং শান্ত রিয়াকে বিয়ে করলেন। অল্প দিনের মধ্যেই রিয়া জন্ম দিলেন তার এবং ক্রোনাসের প্রথম সন্তান হেস্টিয়াকে। ক্রোনাসের তখন মনে পড়ে বাবা ইউরেনাসের দেওয়া অভিশাপের কথা। একই ভবিষ্যতবানী করেছিলেন মা গায়াও। তাই প্রথম থেকেই ক্রোনাস সতর্কতা অবলম্বন করেন। হেস্টিয়া হওয়ামাত্রই ক্রোনাস তাকে গলাধঃকরণ করেন। একই ব্যবস্থা গ্রহন করেন পরবর্তীতে দিমিতার, হেরা, হেডিস এবং পসাইডনের ক্ষেত্রেও। ক্রোনাসের এই উন্মত্ততায় রিয়া খুব কষ্ট পান। প্রতিবার কষ্ট করে গর্ভধারণ করেন, কিন্তু কোনো বারেই মায়ের মমতা দিয়ে কোনো সন্তানকেই লালন পালন করতে পারেন না! কষ্টে, ক্রোধে, যন্ত্রনায় যখন ষষ্ঠ বারের মতো সন্তান জন্ম দেবার সময় হয়, রিয়া মা গায়া আর বাবা ইউরেনাসের কাছে যান পরামর্শের জন্য।

Cronos and his offsprings ক্রোনাস তার শিশু সন্তানকে গলাধঃকরন করছেন (ষষ্ঠদশ শতকে পিটার পল রুবেনসের আঁকা)

গায়া এবং ইউরেনাসের পরামর্শমতো ষষ্ঠ সন্তান জন্মানোর সময় নিকটবর্তী হলে রিয়া প্রথমেই  একটি কাপড়ে আবৃত করা পাথর ক্রোনাসের হাতে দিয়ে বলেন, “এই নাও তোমার সন্তান”। অহংকারী এবং উদ্ধত ক্রোনাস কোনো কিছু অবিশ্বাস না করেই কাপড়ে আবৃত পাথরটিকে তাঁর ষষ্ঠ সন্তান মনে করে গোগ্রাসে গিলে ফেলেন। এরপর রিয়া চলে যান ক্রীট নামের একটি দ্বীপে।

Rhea and Cronos রিয়া ক্রোনাসকে কাপড়ে আবৃত পাথর দিচ্ছেন (আলেকজান্ডার এস মারের ১৮৯৮ সালের আঁকা)

সেই ক্রীট দ্বীপে একটি গুহা ছিলো, যেটার নাম ছিলো ডিক্টে। সেই গুহাতে শিশুটিকে জন্ম দেবার পর রিয়া এক নিম্ফের হাতে লালন পালন করার জন্য তুলে দেন। নিম্ফ হচ্ছে প্রকৃতির নারী আত্মার মতো, যারা অনেক অনেক বছর বাঁচে, কিন্তু তবুও মৃত্যু যেনো পিছু ছাড়ে না। নিম্ফটি আমালথিয়া নামের এক ছাগলের দুধ খাইয়ে শিশুটিকে বড় করতে থাকেন। শিশুটি যখন কেঁদে উঠে, কাঁদার শব্দ যাতে ক্রোনাস শুনতে না পায়, সেজন্য কিউরেটেস নামে পাঁচ থেকে নয়জনের সশস্ত্র প্রহরীরা তাদের বর্শা দিয়ে ঢালে আঘাত করতো। এই শিশুটিই হচ্ছেন জিউস- গ্রীক মিথোলজির অধিকাংশ জায়গা যিনি দখল করে আছেন।

Curetes with Baby Zeus কিউরেটেসরা ঢালে শব্দ করে জিউসকে রক্ষা করছে, পাশে রিয়া

কেউ কেউ বলে থাকেন, আমালথিয়া আসলে কোনো ছাগলের নাম নয়, বরং আমালথিয়াই হচ্ছেন সেই নিম্ফ, যিনি জিউসকে লালন পালন করেন। তিনি জিউসকে একটি গাছ থেকে এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখেন, যাতে ক্রোনাস পৃথিবী, স্বর্গ বা পাতালপুরীর সবকিছু দেখলেও জিউসকে দেখতে না পান। আমালথিয়ার একটি ষাড়ের শিং ছিলো, যেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য ও পানীয় পাওয়া যেতো। আবার কেউ কেউ বলেন, আমালথিয়ার একটি ছাগল ছিলো, যে ছাগলের স্তন্য পান করতেন জিউস। একদিন সেই ছাগলটি আমালথিয়ার সেই ষাড়ের শিংটি ভেঙ্গে ফেললে, আমালথিয়া লতা গুল্ম   দিয়ে শিংটি ঢেকে ফলে পরিপূর্ণ করে শিশু জিউসকে খেতে দেন। বলা হয়ে থাকে, এই কারণেই জিউস যখন দেবতাদের রাজা হোন, তখন আমালথিয়া আর ছাগলটিকে আকাশের তারায় পরিণত করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এভাবেই বড় হতে থাকেন জিউস।

Amalthea and Baby Zeus শিশু জিউসকে আমালথিয়া ষাড়ের শিং থেকে খাবার দিচ্ছেন

 

শিশু জিউস ছাগলের দুধ পান করছেন

ইতোমধ্যে ক্রোনাস বুঝে গিয়েছিলেন তাঁকে প্রতারিত করা হয়েছে। তিনি পৃথিবীর আনাচে কানাচে জিউসকে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন। খুঁজতে খুঁজতে এলেন ফিলাইরা দ্বীপে। এখানে এসে দেখা হলো ফিলাইরার সাথে, ওসেনাস এবং টেথিসের কন্যা। নিজের ভাইয়ের মেয়ের রুপ দেখে ক্রোনাস মুগ্ধ হয়ে গেলেন। কিন্তু ফিলাইরা রাজী হলেন না। ক্রোনাস থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য মাদী ঘোড়ায় রুপান্তরিত হলেন। ক্রোনাসও কম গেলেন না, নিজেকে স্ট্যালিয়নে পরিণত করলেন। ক্রোনাস আর ফিলাইরার মিলনের ফলে জন্ম নিলেন চীরণ- অর্ধেক ঘোড়া এবং অর্ধেক মানব।  চীরণকে বলা হয় এই বিশ্ব- ব্রক্ষ্মান্ডের প্রথম সেন্ট্যুর, কিন্তু সেন্ট্যুরদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য থেকে আলাদা- গভীর জ্ঞানী এবং সৎ। তিনি কখনো তাঁর অস্ত্র কোনো মানবের সাথে ব্যবহার করেন নি। বৃদ্ধ বয়সে তিনি ওষধি নিয়ে গবেষনা করে মানবজাতির অনেক উপকার করেন। সে অবশ্য অনেক পরের কথা। যথাসময়ে চীরণের কথায় আমরা আসবো। ফিলাইরার শেষ কথায় আসি। চীরণের মতো এই রকম অদ্ভুত সন্তান দেখে প্রচন্ড লজ্জা পেলেন ফিলাইরা। কেউ কেউ বলেন, জিউসের কাছে, আবার কেউ কেউ বলেন, ক্রোনাসের কাছে প্রার্থনা করেন (আমার কাছে মনে হচ্ছে, ক্রোনাসই হবে), তাঁকে অন্য কিছুতে পরিণত করার জন্য। সেই থেকে ফিলাইরাকে লিন্ডেন বা এক ধরনের লেবু গাছে পরিণত করা হয়।

Cronos and Philyra ফ্রান্সিসকো মাজ্জোলার তুলিতে ক্রোনাস এবং ফিলাইরা

ক্রোনাসের রাজত্বের সময়েই প্রথম মানব জাতির সৃষ্টি হয়। এই মানবজাতি বসবাস করতেন দেবতাদের মতোই, তাদের না ছিলো কোনো দুঃখ, কষ্ট, না করা লাগতো কোনো কঠোর পরিশ্রম। তারা জানতেন না বৃদ্ধ বয়স বলতে কি বোঝায়! যদিও তারা মৃত্যু বরণ করতেন, এবং সেই মৃত্যুটা হতো ঘুমের মধ্যে। সেই সময়ে পৃথিবী ফলে পরিপূর্ণ, ছিলো চির বসন্ত, সব সময় বয়ে যেতো নেকটার (স্বর্গের পানীয়)  ও দুধের নহর, ওক গাছ পরিপূর্ণ থাকতো মধুতে।

Golden Age of Man মানবদের সোনালী যুগ ( পিয়েট্রো দ্য কোরটোনার তুলিতে আঁকা এই ছবিতে নারীদের দেখা যাচ্ছে, যদিও সোনালী যুগে কোনো নারী ছিলেন না)

মানবজাতির এই যুগটাকে বলা হতো সোনালী যুগ। তারা সবাই এসেছিলেন স্বর্গ থেকে, তাই তাদের ছিলো না কোনো স্ত্রী বা সন্তান-সন্ততি। তারা শাসিত হতেন দেবতাদের মাধ্যমে। তাই এই  যুগে সবাই সঠিক কাজটিই করতেন, একে অপরের উপর বিশ্বাস এবং আস্থা রাখতেন। দেবতারা তাদের খুব পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন। সেই সেময়ে ছিলো না কোনো আইন, ফলে শাস্তিরও কোনো ভয় থাকতো না। না ছিলো কোনো শহর, কোনো তলোয়ার বা হেলমেট, না ছিলো কোনো বিদেশী রাষ্ট্র, ফলে ছিলো না কোনো যুদ্ধের আশংকা। মানুষের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিলো না, কারণ সব কাজই হতো সমষ্টিগতভাবে। খোলা আকাশের নিচে পোশাক পরিধান ছাড়াই তারা বসবাস করতেন। তারা কোনো কৃষিকাজ জানতেন না, অথচ খাবার নিয়ে কখনো চিন্তা করতে হয় নি!

এদিকে জিউস ক্রীট দ্বীপে ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলেন। হেসিয়ড আমাদেরকে জানিয়েছেন, জিউস খুব দ্রুত বড় হয়ে উঠেছিলেন। প্রায় এক বছরের মধ্যেই জিউস শক্তিশালী যুবকে পরিণত হোন। এক পর্যায়ে জিউসের মা রিয়া কৌশল করে জিউসকে ক্রোনাসের দাস হিসেবে নিয়োগ দেন। ক্রোনাস বুঝতেও পারেন নি যে, নতুন এই দাস তার নিজেরই সন্তান। জিউস ধীরে ধীরে তার অপর ভাই-বোনদের পরিণতির কথা জানতে পারলেন এবং তিনি তাদের উদ্ধার করতে বদ্ধপরিকল্প হলেন। ওসেনাস এবং থেটিসের কন্যা মেটিস ছিলেন জ্ঞানের দেবী, একই সাথে প্রচন্ড সুচতুর। জিউস এই ব্যাপারে মেটিসের কাছে সাহায্য চাইলেন। মেটিস একটি বমিকারক উপাদান জিউসকে দেন এবং জিউস এক কাপ ওয়াইনের সাথে সুকৌশলে এটি মিশিয়ে ক্রোনাসকে খাওয়ান। ফলে ক্রোনাস অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বমি করতে করতে প্রথমে সেই পাথরটি এবং পরে বাকী পাঁচ ভাই-বোনকে পেট থেকে উদ্গীরণ করেন। (হেসিয়ডের থিওগোনী অনুযায়ী, গায়াই চালাকী করে ক্রোনাসকে বমি করতে বাধ্য করান।)  জিউসের এই পাঁচ ভাই-বোনই হচ্ছেন হেস্টিয়া, দিমিতার, হেরা, পসাইডন এবং হেডস। তারা প্রত্যেকেই ক্রোনাসের পেটের মধ্যে এতোদিনে পূর্ণবয়স্ক হয়ে উঠেন। ক্রোনাস সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠার আগেই এই জিউসসহ ছয় ভাই-বোনই পালিয়ে চলে আসেন অলিম্পাস পাহাড়ে এবং সেখানে বসতি স্থাপন শুরু করেন। যেহেতু তারা অলিম্পাস পাহাড়ে বসবাস করতে লাগলেন, তাই তাদেরকে বলা হতো অলিম্পিয়ান। 

গ্রীক মিথলজি-১ (বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের সৃষ্টি, ইউরেনাসের পতন)

মিথলজি শব্দটির আকর্ষন যেনো অনতিক্রম্য। ছোট থেকে বড়, বাচ্চা থেকে বয়স্ক সবার মধ্যেই মিথলজির প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষন আছে। মিথলজি মানে কি? বাংলা করলে এই শব্দটির অর্থ হতে পারে পৌরানিক কাহিনীসমূহ। কিন্তু ব্যাপারটি এতো সরলীকরণ নয়। আমাদের যাবতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি, বিশ্বাস, কোনো আচার অনুষ্ঠানের উৎপত্তির কাহিনীসহ অনেক কিছুই মিথলজির মধ্যে হতে পারে, কাহিনী সত্যও হতে পারে, আবার মিথ্যাও হতে পারে। সত্য হোক, কিংবা মিথ্যা- মিথলজি বরাবরই আমার খুবই প্রিয় এক বিষয়। অনেকদিন ভেবেছি মিথলজি, বিশেষত গ্রীক মিথলজি নিয়ে একটি ধারাবাহিক লেখা লিখবো। এই ভাবনাকেই বাস্তবে রুপ দেবার অপচেষ্টা শুরু করতে যাচ্ছি। শুরু করতে যাচ্ছি গ্রীক মিথলজির আদি থেকেই। এবং এখানে একটি কথা বলে রাখি, যদি কোন মিথে অনেকগুলো ভার্সন প্রচলিত থাকে, তাহলে অধিক গ্রহনযোগ্য ভার্সনটিকেই এখানে আমি নিয়েছি। যাহোক, সবাইকে গ্রীক মিথলজির জগতে স্বাগতম।

পৌরানিক কাহিনীগুলো অনেক রকমের হতে পারে। তবে যে কোন মিথলজিতে সৃষ্টিতত্ত্ব একটি অবিচ্ছেদ্য এবং গুরুত্বপূর্ন অংশ। এই সৃষ্টিতত্ত্ব আবার তিন রকমের হতে পারে- বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের সৃষ্টি,   দেবতাদের জন্ম এবং মানবজাতির সৃষ্টি। আর গ্রীক মিথলজিতে সৃষ্টিতত্ত্বে এই তিনটি অংশই আছে।

৭৫০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৬৫০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ সময়ে প্রাচীন গ্রীসে এক চারণকবি ছিলেন, নাম ছিলো তাঁর হেসিয়ড। হেসিয়ড ছিলেন আরেক বিখ্যাত গ্রীক মহাকবি হোমারের প্রায় সমসাময়িক। এই বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের সৃষ্টি, দেবতাদের জন্ম – এই সমস্ত কিছু তিনি তাঁর গ্রন্থ ‘থিওগোনী’-তে লিখে গিয়েছেন। সেই ‘থিওগোনী’ অনুযায়ী- সৃষ্টির আদিতে, দেবতাদের আবির্ভাবের বহু পূর্বে, সুদূরের তমসাচ্ছন্ন অতীতে শুধু ছিলেন ক্যায়োস – এক অবয়বহীন অস্তিত্ব, যা আচ্ছিন্ন ছিলো অবিচ্ছিন্ন অন্ধকারে। ক্যায়োস হচ্ছেন এই বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের আদিম দেবতা, বিশাল ও অপরিমেয় গভীরতার এক গর্ত, সমুদ্রের মতো নিষ্ঠুর, অন্ধকার, অমিতাচারী এবং উদ্দাম, একইসাথে অবয়বহীন শূন্যতা। সেই সময়ে না ছিলো কোনো স্থল ভূমি, না ছিলো কোনো জলভাগ, না ছিলো মানুষ, না ছিলো কোনো দেবতা। ছিলো না সূর্য বা চাঁদ, পাহাড় বা নদী। এমনকি সময়েরও অস্তিত্ব ছিলো না। ছিল শুধু এক বিশাল শূন্যতা।

Chaos ক্যায়োস- অবয়বহীন শূণ্যতা

এই বিশাল শূণ্যতা থেকে কীভাবে যেনো জন্ম নিলেন- গাইয়া বা পৃথিবী, বা অন্যভাবে বলা যেতে পারে  ক্যায়োসের পর গাইয়ার আবির্ভাব হয়, তিনি ক্যায়োসের সন্তান হো্ন, বা না হোন। গাইয়ার সাথেই জন্ম হয় টারটারাস (পাতালপুরী) এবং এরোসের, ভালোবাসার আদিম দেবতা। এভাবেই বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ড তখনো তৈরী হয় নি, কিন্তু  সৃষ্টি হয় পৃথিবী, পাতালপুরী আর ভালোবাসার।

হেসিয়ডের থিওগোনি অনুযায়ী, টারটারাস হচ্ছে এই বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ডের তৃতীয় আদিম দেবতা- ক্যায়োস ও গাইয়ার পর এবং এরোসের পূর্বে যার জন্ম। টারটারাস একইসাথে দেবতা এবং পাতালপুরী। স্থান হিসাবে টারটারাসের  অবস্থান পৃথিবীর গভীর তলে। হেসিওড  একে স্বর্গ থেকে বহু নিচে অবস্থিত অঞ্চল হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে- স্বর্গ থেকে একটি ব্রোঞ্জ মুদ্রা নিক্ষেপ করলে, পৃথিবীতে তা পৌঁছাতে নয় দিন সময় লাগে। একইভাবে পৃথিবী থেকে এই মুদ্রা পাতালে পৌঁছাতে সময় নেয় নয় দিন। পাতালের এই অঞ্চলটি অন্ধকারময়, গুমোট। এই অঞ্চল ঘিরে রয়েছে একটি ব্রোঞ্জ নির্মিত দেওয়াল। এই দেওয়ালকে বাইরের দিক থেকে ঘিরে রয়েছে তিন স্তরে বিন্যস্ত রাত্রির অন্ধকার। টারটারাস এবং এর অধিবাসীদের নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো।

ক্যায়োস এরপরে জন্ম দিলেন এরেবাস (অন্ধকার ও ছায়ার দেবতা) এবং নিক্স (রাত্রি-র দেবী)-কে। ভালোবাসার আদি দেবতা এরোসের হস্তক্ষেপে এরেবাস এবং নিক্স মিলিত হলেন, এবং জন্ম নিলেন ইথার (স্বর্গীয় আলো) এবং হেমেরা (দিন বা পৃথিবীর আলো)।

এরেবাস এবং নিক্সের এই মিলিত হওয়া যেনো বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ডের প্রথম মিলন। নিক্স আবার একা একা জন্ম দিলেন মোমুস (নিন্দা), মোরোস (অদৃষ্ট), থানাটোস (মৃত্যু), হিপনোস (নিদ্রা), ওনেইরোরি (স্বপ্ন), কের (ধ্বংস), ওইজিস (দুর্দশা), হেসপেরিদেস (সূর্যাস্ত), কেরেস (মৃত্যুভাগ্য), মোইরাই (ভাগ্য), নেমসিস (কর্মফল), এ্যাপাটে (কপটতা), ফিলোটেস (বন্ধুত্ব), গেরাস (বৃদ্ধত্ব) এবং এরিস (দ্বন্দ্ব)সহ মোট পনেরজন সন্তানকে, যারা অন্ধকার থেকে মানুষের কাছে এসেছেন। নিক্স আর এরেবাসের সন্তানদের কথায় আমরা পরে আসবো, তার আগে ঘুরে আসি গাইয়ার জীবনীতে।

আসলে গ্রিক মিথোলজির ক্রমানুসরণটা হয়েছে এই গাইয়া থেকেই। এই বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ড ধীরে ধীরে তার চেহারা পেতে থাকে গাইয়ার জন্যই। খুব দ্রুতই গাইয়া বা পৃথিবীর সন্তান জন্মাবার ইচ্ছা হলো এই বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ডকে বসতিপূর্ণ এবং শাসন করার জন্য। গাইয়ার সন্তানের জন্য এতোই প্রবল ইচ্ছা ছিলো যে সর্বপ্রথম নিজে নিজেই জন্ম দেন তাঁর সমপর্যায়ের ইউরেনাসকে (আকাশ, বা স্বর্গ), যাতে গাইয়ার অন্যান্য সন্তানেরা বা ভবিষ্যত প্রজন্ম গাইয়া বা পৃথিবীর বুকে দাঁড়াতে পারেন এবং ইউরেনাসে বা স্বর্গে বিশ্রাম নিতে পারেন। আর এভাবেই গাইয়া আর ইউরেনাস (পৃথিবী এবং স্বর্গ বা আকাশ) আলাদা হলেও সমপর্যায়ে পরিনীত হয়। ইউরেনাসকে জন্ম দেওয়ার পর গাইয়া অউরিয়া বা পাহাড় এবং পন্টাস বা সমুদ্রকে জন্ম দেন। ফলে এই বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ড আকৃতি পেতে থাকলো- পৃথিবী, পাতালপুরী, আকাশ (বা স্বর্গ), পাহাড় এবং সমুদ্র।

গ্রীক কবি হেসিয়ডের মতে, ইউরেনাস গাইয়ার সন্তান হলেও যেহেতু সমপর্যায়ের ছিলো তাই প্রতিরাতে গাইয়াকে চারপাশ থেকে আবৃত করে রাখতেন এবং এভাবেই গাইয়া মা হওয়া সত্ত্বেও ইউরেনাস তাঁর সাথে মিলিত হতেন। গ্রীক মিথলজিতে যে ইনচেষ্ট বা অজাচারের ছড়াছড়ি, সেটার উৎপত্তি যেনো সেই আদিতেই!

Gaea and Urenus গাইয়া এবং ইউরেনাস

গাইয়া এবং ইউরেনাসের মিলনে প্রথমে জন্মগ্রহন করেছিলো হেকাটনখিরাস নামক দানব। হেকাটনখিরাসরা সংখ্যায় ছিলো তিনজন- তেজস্বী ব্রিয়ারেস, উন্মত্ত কোট্টুস এবং বড় অঙ্গযুক্ত গিয়েস। তারা প্রত্যেকেই ছিলো শক্তিশালী, বিশালকায় এবং ভয়ঙ্কর ও দাম্ভিক প্রানী, যাদের প্রত্যেকের ছিলো একশটি হাত এবং পঞ্চাশটি মাথা, যেগুলোর উৎপত্তি হয়েছিলো কাঁধ থেকে। এই কিম্ভূতকিমাকার সন্তানদের দেখে ইউরেনাস খুব বিরক্ত হলেন, এদের শক্তিমত্তা দেখে ভীতও হলেন। তাই জন্মাবার পর পরেই এদেরকে গাইয়ার গর্ভাশয়ে ধাক্কা দিয়ে ফিরিয়ে দিলেন। ইউরেনাসের এই আচরনে গাইয়া খুব ব্যথিত হলেন।

Hekhatonchires শিল্পীর তুলিতে- হেকাটনখিরাস (শিল্পী- রাচেল মায়ো)

হেকাটনখিরাসদের পর ইউরেনাস আর গাইয়ার মিলনের ফলে জন্মগ্রহন করলো সাইক্লোপসরা, যারা দেখতে অনেকটা মানুষের মতোই, কিন্তু বিশালকায় আকৃতির। এরা বিশাল আকৃতির হলেও বুদ্ধিতে অনেক খাটো ছিলো। এদের কপালের মাঝখানে ছিলো একটি মাত্র চোখ। এরা স্বভাবেও অনেকটা একগুয়ে। সাইক্লোপরা ছিলো তিনজন- ব্রোন্টেস, স্টেরোপেস এবং আর্গেস। স্বভাবে একগুয়ে এবং বুদ্ধিতে খাটো হওয়ার জন্য এরা একের পর একের বিব্রতকর এবং অবাঞ্চিত ঘটনার জন্ম দিতে লাগলো। ইউরেনাস বিরক্ত হয়ে আবারো কঠোর হলেন। এদেরকেও বন্দী করে রাখলেন গাইয়ার অভ্যন্তরে কোন এক গোপন স্থানে। মা গাইয়া আবারো ব্যথিত হলেন।

Cyclopes শিল্পীর তুলিতে- সাইক্লোপস

হেকাটনখিরাস এবং সাইক্লোপসদের পরে গাইয়া এবং ইউরেনাসের একে একে আরো বারোটি সন্তান জন্ম গ্রহন করে, এদেরকেই বলা হয় টাইটান, আসলে এরা ছিলেন প্রথম প্রজন্মের টাইটান। এরাই মূলত দেবতাদের উত্তরসূরী হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকেন। এই টাইটানরাও আকৃতিতে ছিলেন বিশাল, তবে দেখতে ছিলেন সাইক্লোপদের চেয়েও মানবীয়। এই বারোজন টাইটানের ভিতর আবার পুত্র ছিলেন ছয়জন আর বাকী ছয়জন ছিলেন কন্যা সন্তান। ছয়জন পুত্র টাইটান হচ্ছেন- ওসেনাস, হাইপেরিয়ন, কয়ওস, ক্রিয়াস, ইয়াপেতুস ও ক্রোনাস এবং ছয়জন কন্যা টাইটান হচ্ছেন- টেথিস, থেইয়া, ফয়বে, থেমিস, নেমোসাইনে ও রিয়া। (হেসিয়ডের থিওগোনী অনুযায়ী, গাইয়া ও ইউরেনাসের প্রথমে টাইটান, পরে সাইক্লোপ এবং সবশেষে হেকাটনখিরাস জন্ম গ্রহন করে।)

এই বারোজন টাইটানদের কথাই আমরা জানবো, তবে সবার আগে আসি এদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, কিন্তু সবচেয়ে বেশী সাহসী, উচ্চাকাঙ্খী, দুর্বীনিত সন্তান ক্রোনাসের কথায়। আগেই বলেছি, বাবা ইউরেনাস কদাকার চেহারার জন্য সাইক্লোপস আর হেকাটনখিরাসদের গাইয়ার ভিতরে লুকিয়ে রাখেন। এই ব্যাপারটি গাইয়া মেনে নিতে পারেন নি। এছাড়া এদেরকে তাঁর ভিতরে লুকিয়ে রাখার জন্য ব্যথাও শুরু হতে লাগলো। ব্যথা যখন অসহনীয় পর্যায়ে পরিনীত হলো, গাইয়া তাঁর সন্তানদের আহবান করলেন এই অরাজক অবস্থার অবসান করার জন্য। গাইয়া তাঁর সন্তানদের বললেন, “হে আমার সন্তানেরা! পাপাচারে নিমগ্ন বাবার সন্তানেরা! যদি তোমরা আমাকে মান্য করো, তাহলে তোমাদের বাবাকে তাঁর পাপময় কৃতকর্মের জন্য অবশ্যই শাস্তি দেওয়া উচিত”। কিন্তু তাঁর টাইটান সন্তানরা কিছু করতে ভয় পেলেন, শুধুমাত্র একজন ছাড়া। তিনিই হচ্ছেন ক্রোনাস। তিনি গাইয়াকে বললেন, “মা! আমি এই দায়িত্ব নিলাম। বাবাকে শাস্তি দিবো, শুধু তুমি বলেছ বলে নয়, বরঞ্চ সে লজ্জাজনক পাপ কাজ করেছে বলে!” শুরু হলো ক্রোনাসের সাথে মা গাইয়ার ষড়যন্ত্র!

গাইয়া চিন্তা করলেন, ইউরেনাস বাবা হিসেবে মোটেও ভালো নন। অবশ্য যে তার সন্তানদের জন্মাবার সময় আবার মায়ের পেটে পাঠিয়ে দেয়, কিংবা কোথাও বন্দী করে রাখে, সে বাবা হবার যোগ্যও নয়। তাই গাইয়া ঠিক করলেন, ইউরেনাসকে আর বাবা হতে দেওয়া যাবে না!

গাইয়া ইউরেনাসকে নপুংসক করার জন্য একটি অনমনীয় কাস্তে তৈরী করে ক্রোনাসের হাতে তুলে দিলেন। এক রাতে ক্রোনাসের নেতৃত্বে ছয়জন পুত্রের মধ্যে পাঁচজন টাইটান ইউরেনাসকে আক্রমণ করার জন্য ওঁত পেতে থাকেন। অধিকাংশ মিথে দেখা গেছে, ওসেনাস ক্রোনাসের সাথে এই ষড়যন্ত্রে ছিলেন না। ইউরেনাস যখন অন্যান্য রাতের মতো গাইয়ার সাথে মিলিত হতে আসেন,  তখনই চারজন টাইটান হাইপেরিয়ন, কয়ওস, ক্রিয়াস এবং ইয়াপেতুস চারদিক থেকে ইউরেনাসকে শক্ত করে ধরে রাখেন এবং ক্রোনাস মাঝখানে গিয়ে মা গাইয়ার তৈরী অনমনীয় কাস্তে দিয়ে ইউরেনাসকে নপুংসক করেন।

Cronus and Urenus টাইটান ক্রোনাস ইউরেনাসকে নপুংসক করছেন (শিল্পী- জর্জিও ভাসারি ও ক্রিস্টোফানো ঘেরাডি, ১৫৬০ সাল)

ইউরেনাসকে নপুংসক করার সময় যেসব রক্তের ফোঁটা ঝরতে থাকে, সেগুলো গাইয়া নিজের বুকে রেখে দেন এবং মৌসুম শেষে সেখান থেকে জন্ম নেয় শক্তিশালী এরিনিজ, জায়ান্ট এবং মেলিয়া নামক এক অ্যাশ গাছের নিম্ফ। আর ইউরনাসের অন্ডকোষসহ জননাঙ্গটি সমুদ্রের যেখানে ফেলা হয়েছিলো, সেখানের ফেনা থেকে উত্থিত হয়েছিলেন দেবী আফ্রোদিতি, এজন্য আফ্রোদিতিকে বলা হয়ে থাকে “ফেনা থেকে উদ্ভূত”।এই সমুদ্র জন্মটি ঘটেছিলো সিথেরার অদূরে, সেখান থেকে আফ্রোদিতিকে ভাসিয়ে নেওয়া হয় সাইপ্রাসে। 

এভাবেই ইউরেনাসের পর এই বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের রাজা হলেন ক্রোনাস। ক্রোনাস ইউরেনাসকে নপুংসক করার পর গ্রীক মিথে ইউরেনাসকে আর খুব একটা দেখা যায় নি, যদিও ইউরেনাস জীবিত ছিলেন, কারণ তাঁকে হত্যা করা হয় নি, তবে আর কোনো ক্ষমতা ছিলো না। ক্রোনাস যখন ইউরেনাসকে নপুংসক করে তখন চোখে মুখে বিস্ময় নিয়ে ইউরেনাস বেদনার্ত কন্ঠে ক্রোনাসকে অভিশাপ দেন, “ক্রোনাস, তুমি আজ আমার সাথে যে ব্যবহার করেছ, একদিন তোমার সন্তানও তোমার সাথে সেই ব্যবহার করবে, তোমাকে ক্ষমতা থেকে ছুড়ে ফেলে সে এই বিশ্ব- ব্রক্ষ্মান্ডের রাজা হবে”। ক্রোনাস ইউরেনাসের কথাকে খুব গুরুত্বের সাথে বিশ্বাস করলেন।  

Greek Primordial God আদি গ্রীক দেবতাদের পরিবার তালিকা

ছি! আমি একজন ব্লগার!

আমি একজন সাধারণ মানুষ। এই সাধারণ মানুষের যত অসাধারণত্ব, সবকিছুই ব্লগিং করতে এসে অর্জন করা। একসময় নিজেকে ব্লগার পরিচয় দিতে খুব গর্ববোধ করতাম। এই গর্বটা এভারেষ্ট-এর উচ্চতায় উঠে গিয়েছিলো শাহবাগ আন্দোলনের প্রথম দিকে। ফেসবুকে আর ব্লগে লিখে কি করা যায়- তা যেনো দেখিয়ে দিতে লাগলাম আমরা। নতুন কারো সাথে পরিচয় হলে আগ বাড়িয়ে বলতাম, আমি একজন ব্লগার। আমার ডাক্তার পরিচয়টা বেমালুম ভুলে যেতাম। আর এখন? বেশ কিছুদিন যাবত আমি যে ব্লগার, সেই পরিচয়টাই ভুলে যেতে চাচ্ছিলাম। আর লিখবো না, লিখবো না বলে- কেনো যে আজ আবার লিখতে বসলাম!

(১)    

শাহবাগে যে অবস্থান ধর্মঘট রাজাকার কাদের মোল্লার রায়ের পর শুরু হয়েছিলো, সত্যি কথা বলতে গেলে তখন আমি ইমরান সরকারের নামও জানতাম না। অথচ তিনি একজন ডাক্তার, আর আমিও ডাক্তার! অবশ্য সব ডাক্তারের পক্ষে সবাইকে চেনা সম্ভব নয়, তাই না? খুব খুশি হয়েছিলাম, একজন ডাক্তারকে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে দেখে। হৃদয়ের দাবীর সাথে শাহবাগের দাবীর মিল দেখে একাত্মতা অনুভব করলাম। চাকরীর জন্য থাকতাম চাঁদপুরের মতলবে, কিন্তু মন পরে থাকতো শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে। টিভিতে দেখতাম ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে মুখরিত প্রজন্ম চত্বর। খুব ভালো লেগেছিলো- এই শ্লোগানের নতুন করে জন্মে। কিন্তু মনের গহীনে চিন চিন করে উঠলো- ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ যে নাই! বুঝতে পারলাম- এটাকে দলীয় শ্লোগান বলে বর্জন করা হয়েছে। অথচ ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলেই একাত্তরে সবাই যুদ্ধ করতে গিয়েছিলো, তখন দলীয় শ্লোগান মনে হয় নি। মানি, এই ব্যর্থতা আওয়ামী লীগেরই, তারাই বঙ্গবন্ধুকে দলীয়করণ করেছে। ভেবেছিলাম এতে যদি বিএনপিও সমর্থন দেয়, তাহলে এই ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ বর্জন হজম করা যাবে। কিছু ছাত্রদল সমর্থক বা নেতাদের শাহবাগে দেখে আশান্বিতও হয়েছিলাম। বিএনপির নেতাদেরও বেশ কিছুদিন নিশ্চুপ থাকার পর আন্দোলনের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি দেখে আশায় বুক বেঁধেছিলাম।

মানুষ ভাবে এক, কিন্তু হয় আরেক। আরেকবার বিশাল ঢাক্কা খেলাম মহাসমাবেশে ইমরান সরকারের বক্তব্য শুনে। এ কি! এটাতো কোনো নেতার ভাষন নয়! ইমরানের আশে পাশের লোকগুলোকে দেখেও আশাহত হলাম। জানলাম, তিনি না কি স্বাচিপের নেতা! তবুও সবকিছু মেনে নিলাম প্রাণের দাবীর জন্য।

(২)

বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে অনেকের কথা শুনতে লাগলাম। অনেক নেতা, অ-নেতা অনেক রকম কথা বলতে লাগলো। কেউ কেউ বলে উঠলো, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নিষিদ্ধ চাই। তারা ভুলে গেলেন কিসের বিরুদ্ধে তারা লড়তে শাহবাগে জড়ো হয়েছেন। আমার মতো যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পছন্দ করি না, তারা প্রমাদ গুণলাম, কারণ- এতে আমও যাবে, ছালাও যাবে- কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। যুদ্ধে খুব কৌশলী হতে হয়, কিন্তু শাহবাগের নেতারা দেখলাম অন্যের পরামর্শে চলতে লাগলো। জনগন কি চায়, প্রজন্ম কি চায়- সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। আর তাই শাহবাগের আন্দোলনকারীদের মতামতের তোয়াক্কা না করেই নেতারা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন- শাহবাগে টানা অবস্থান থেকে সরে আসার। সেদিন রাতেই খুন হলো রাজীব।

শাহবাগের নেতারা অসাধারণ এক অস্ত্র তুলে দিলেন এবার জামাত-শিবিরের হাতে। সামনে চলে এলো আস্তিক-নাস্তিক বিষয়। ফেসবুক, ব্লগে বিশাল বিশাল গবেষনা হলো নতুন বানানো ব্লগের লেখাগুলো রাজীবের নয়। কিন্তু এতে কি প্রমান হয়ে যায় রাজীব আস্তিক ছিলো? জামাত শিবির খুব কৌশলের সাথে ব্লগারদের নাস্তিক বানিয়ে দিলো, অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকেও একই আন্দোলনে শরিক করালো ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নিষিদ্ধের ধুয়া তুলে। আমাদের পাপেট নেতা ইমরান সরকারের কৌশল চরমভাবে মার খেলো। এই আন্দোলন যে আস্তিক আর নাস্তিকের নয়- সেটা বুঝাতে চরমভাবে ব্যর্থ হলেন তারা। অবশ্য নিজেদের নিরাপত্তার জন্য গানম্যান ঠিকই আদায় করে নিলেন। আর আন্দোলন হয়ে গেলো স্তিমিত। তবুও আন্দোলনের প্রতি আমার সমর্থন ছিলো, কারণ মূল দাবীতো কাগজে কলমে তখনো ছিলো জামাত শিবিরের নিষিদ্ধকরণ আর যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসি।

(৩)

এই সময়ে আন্দোলনে কিছু স্ববিরোধীতা লক্ষ্য করলাম। দেখতে পেলাম আওয়ামী লীগের কিছু নেতা বক্তব্য দিতে পারছেন, আবার কিছু নেতা লাঞ্চিত হচ্ছেন। বামপন্থী নেতারা আবার দেখলাম খুব ভালোভাবেই বক্তব্য দিচ্ছেন। আর ইমরানের আশে পাশে তো ছাত্রলীগের নেতারা ছিলেনই। আবার বলা হচ্ছে এই আন্দোলন রাজনীতিবিদদের নয়। আসলে কি বলতে হবে, কি করতে চাচ্ছে- শাহবাগের নেতারা কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনাই দিতে পারছিলো না। এরই মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দাবীদার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রীসভার সভাতে মন্ত্রীদের বেফাঁস মন্তব্যের জন্য তিরস্কার করলেন। সেই বেফাঁস মন্তব্য কি? অচিরেই জামাত শিবির নিষিদ্ধ হবে।

আমরা তখনই প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্য বুঝে গেলাম। তিনি জামাত নিয়ে ভোটের খেলা খেলছেন। ইমরান সরকারও একটি বালকসুলভ খেলা খেললেন- আল্টিমেটাম দিলেন ২৬শে মার্চের মধ্যে জামাতকে নিষিদ্ধের। কিন্তু চাপে রাখার জন্য সেরকম কোনো কর্মসূচী দিলেন না, মুখে ঝুলে রইলো মহাত্মা গান্ধীর সেই মহান বানী, বর্তমান যুগে যা অচল- ‘অহিংস আন্দোলন’।

(৪)

এক সময়ের আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়া বিদেশ থেকে এসেই শাহবাগের আন্দোলনের বিরুদ্ধে বলা শুরু করলেন। উনাকে ধন্যবাদ- উনি উনার স্ট্যান্ট জাতির কাছে স্পষ্ট করেছেন। উনি পরিষ্কারভাবেই সমগ্র বাঙ্গালী জাতিকে জানিয়ে দিলেন, তিনি জামাতকে ছাড়া বাঁচতে পারবেন না। আর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু সেই সাহস দেখালেন না। তাই ২৬শে মার্চের মধ্যে জামাত শিবির নিষিদ্ধ হলো না। আমাদের পরম নেতা ইমরান সরকার ঘোষনা দিলেন, এবার প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিবেন। আমার কাছে মনে হলো প্রধানমন্ত্রী বরাবর তার আসনে সংসদ নির্বাচনের জন্য আবেদন করলেন।

আন্দোলনের মাঝে এক চমৎকার ঘটনা ঘটেছিলো। ইমরানের দাদা যে রাজাকার তা নিয়ে রাজাকার পত্রিকা তথ্য উপাত্ত হাজির করলো। আমরা ঝাপিয়ে পরলাম ইমরানের দাদাকে মুক্তিযোদ্ধা বানাতে। আমাদের  কিছু ব্লগার নেতা বললেন, দাদা কি কাজ করলো, সেটা বড় কথা নয়, ইমরান কি কাজ করছে- সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। আমরা হাততালি দিলাম।

২৬শে মার্চ রাত থেকে শহীদ রুমী স্কোয়াডের কিছু ছেলে জামাত নিষিদ্ধের দাবীতে আমরণ অনশন শুরু করলেন। আমাদের সেই ব্লগার নেতারাই আবার বললেন, এদের মধ্যে কে যেনো বঙ্গবন্ধু খুনী বজলুল হুদার সন্তান, তাই এই অনশনে তাদের সমর্থন নেই। আমাদের সুশীল সমাজও বোধহয় সমর্থন দিলেন না, তাই অনশনের ১০০ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও কোনো সমাজসেবক অনশন ভাঙ্গাতে পানির গ্লাস হাতে এগিয়ে এলেন না। ব্লগে, ফেসবুকে আমরা এই অনশনকারীদের চৌদ্দগুষ্ঠির উদ্ধার করতে লাগলাম।

(৫)

আর কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে না। যে আশা নিয়ে, যে উদ্দীপনা নিয়ে শাহবাগ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো, তার অবশিষ্ট আর কিছু নেই। কয়েকদিন আগে কাকে যেনো বলেছিলাম, আমি ব্লগে লিখি। তার তৎক্ষনাত প্রতিক্রিয়া ছিলো, “ও, তুমি তাহলে নাস্তিক!” শাহবাগের আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে লাভ হলো আমাদের-

–      নাস্তিক উপাধি পেলাম

–      সরকারকে ব্লগ আর ফেসবুকে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিলাম

–      শহীদ রুমী স্কোয়াডের অনশনকে উপহাস করে আজ অমানুষও হলাম

নিজেকে তাই এখন আর ব্লগার পরিচয় দিতে খুবই লজ্জা লাগে। মনে মনে বলি, ছি! আমি একজন ব্লগার!

পরিশিষ্টঃ

এই লেখাটা চরম হতাশা নিয়ে লেখা। আসলে শাহবাগের প্রারম্ভে যে প্রবল উচ্ছ্বাস ছিলো, আশা ছিলো- তার কোনোটারই আর দেখা পাচ্ছি না। পাপেট নেতারা নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে, খালেদা জিয়া তার সম্পর্কে ধারনাটাকে আরো পাকাপোক্ত করেছেন, শেখ হাসিনা তার মুখোশটাকে খুলে ফেলেছেন, আমরা ব্লগাররা যেভাবে একতাবদ্ধ হয়েছিলাম, সেখানে এখন কেবলই অনৈক্য আর বিশৃঙ্খলা। কোনো সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা নেই, নেই কোনো কান্ডারী।

আমরা সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা চাই, শক্ত মেরুদন্ডের নেতা চাই, সকল যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসি চাই, জামাত শিবিরের নিষিদ্ধ চাই, জামাত শিবিরের সকল প্রতিষ্ঠানের বর্জন চাই। কেউ কি আছেন আশার বানী নিয়ে কোনো লেখা লিখবেন, আমাদেরকে আবার উদ্দীপিত করবেন?

(পুনশ্চঃ যে কাজটা করা উচিত ছিলো গণজাগরন মঞ্চ থেকে, সেই কাজটা করছে শহীদ রুমী স্কোয়াড। স্যালুট তাদেরকে।)

আমার দেখা শান্তিনিকেতন

শান্তি নিকেতন নামটির মধ্যেই মনে হয় শান্তি শান্তি ভাব আছে। শুধু নামে নয়, সেই জায়গাতে গেলেও মনে শান্তি শান্তি ভাব লাগে। অবশ্য আমার শান্তি নিকেতনে যাওয়াটাই ছিলো অদ্ভুতভাবে। বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমার উদ্দেশ্যে দার্জিলিং যাবো ঠিক করেছিলাম। বিধাতা বোধহয় মুচকি হাসছিলেন। বেনাপোল, পেট্রাপোল, বনগাঁ হয়ে কলকাতা পৌঁছে শুনি পাহাড় ধ্বসে দার্জিলিং- এ যাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে। ঠিক তখনই নিরুপায় হয়ে শান্তি নিকেতনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। কিন্তু শান্তি নিকেতনে এসে মনে হলো বিধাতা যা কিছু করেন ভালোর জন্যই করেন।

হাওড়া রেলস্টেশন থেকে সকালেই ট্রেনে করে বোলপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ইলেক্ট্রিক ট্রেনে করে বোলপুরে যেতে যেতে শান্তি নিকেতনের ইতিহাস কিছুটা বলি। কলকাতা থেকে ১৮০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত বীরভূম জেলার বোলপুর পৌর শহরের শান্তি নিকেতন অঞ্চলটি একসময় জমিদার ভুবন সিংহের নামানুসারে ভুবনডাঙ্গা নামে পরিচিত ছিলো। এই সিংহ পরিবারের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিলো। একবার তিনি নিমন্ত্রণ রক্ষায় সেখানে গেলে ভুবনডাঙ্গায় রাত হয়ে যায়। সেদিন আবার জ্যোৎস্না ছিলো আর ছিলো মাঠের মধ্যে একটি ছাতিম গাছ। এই নৈসর্গিক দৃশ্যে অভিভূত হয়ে ১৮৬৩ সালের ৩১শে মার্চ তিনি কুড়ি বিঘা জমি পাঁচ টাকায় পাট্টা নিলেন। সেখানেই তিনি শান্তি নিকেতন নামে গৃহটি তৈরী করেন।

১৮৮৮ সালের ৮ই মার্চ দেবেন্দ্রনাথ ট্রাস্টি চুক্তির মাধ্যমে শান্তি নিকেতনকে সবার জন্য উন্মুক্ত করেন। এরপর এখানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০১ সালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যদিও এর উদ্যোক্তা ছিলেন বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই বিদ্যালয়ের প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে ছিলেন ব্রক্ষ্মবান্ধব উপাধ্যায় আর ছাত্র হিসেবে ছিলেন গৌরগোবিন্দ গুপ্ত, প্রেমকুমার গুপ্ত, অশোককুমার গুপ্ত, সুধীরচন্দ্র, গিরিন ভট্টাচার্য, যোগানন্দ মিত্র, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তীতে কালের পরিক্রমায় এখানে ১৯২১ সালে বিখ্যাত বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

যা হোক, ইতিহাস পাঠের মধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার যাত্রায় অবশেষে বোলপুরে এলাম। ট্রেন থেকে স্টেশনের বাইরে এসেই কেমন যেনো রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ গন্ধ পেলাম। প্রাণটা জুড়িয়ে গেলো। শহরের প্রবেশ পথেই এক বিশাল তোরণ, যেনো আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে।

এক রিকশাচালক আমাদের সামনে এসে বললো চারশত টাকা দিলে সে আমাদেরকে পুরো শান্তি নিকেতন ঘুরে দেখাবে। এলাকার রিকশা ভাড়া সম্পর্কে অজ্ঞাত আমরা খুব সহজেই এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলাম। প্রথমেই থাকার জন্য হোটেলে রুম বুকড করতে গেলাম। অনেক হোটেলের ভীড়ে যে হোটেলে আমরা গেলাম, সেটার নামও শান্তি নিকেতন লজ। রুমে ব্যাগ রেখে এবার আমরা শান্তি নিকেতন ভ্রমণে বের হলাম।

সবার আগে এলাম উত্তরায়ন কমপ্লেক্সে। কয়েকটি বাড়ি নিয়ে গড়ে উঠেছে এই কমপ্লেক্স- উদয়ন,কোনার্ক,শ্যামলী,পুনশ্চ এবং উদিচী। সময় পেলই এই ভবনগুলোতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসে থাকতেন । তাঁর অসংখ্য কালজয়ী লেখা এখানেই সৃষ্টি হয়েছে । এখানে আবার ছবি তোলা নিষেধ, ভিতরে ঢুকতে গেলে ক্যামেরা রেখে দেয়। তবুও মোবাইল ক্যামেরায় লুকিয়ে কিছু ছবি তুলে ফেললাম। এর পরে আছে বিচিত্রা বা রবীন্দ্র ভবন।  এই ভবনের নকশা করেছিলেন কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।এই জায়গাটা অনেকটা মিউজিয়ামের মতো। মুগ্ধ নয়নে কবির ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রী, পেইন্টিং ইত্যাদি দেখে একটু সামনে এগোতেই দেখতে পেলাম উপাসনা গৃহ। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ সালে উপাসনা গৃহ ভবনের প্রতিষ্ঠা করেন ।রঙীন বেলজিয়ান কাঁচ এবং মার্বেল পাথরে চারদিক অলংকৃত এই ভবনটিতে সন্ধ্যার সময় অসংখ্য মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়া হলে এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা হয়। এরপর গেলাম শান্তিনিকেতন গৃহে। শান্তি নিকেতন গৃহ হচ্ছে  শান্তিনিকেতনের সবচেয়ে পুরানো ভবন ।আরো দেখলাম দুইতলা একটি বাড়ি, নাম দেহলী। দেহলীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর সাথে  বসবাস করতেন ।

উপাসনা গৃহ, শান্তিনিকেতন উপাসনা গৃহ, শান্তিনিকেতন

এরপরেই দেখলাম কালো বাড়ি। কালো বাড়িটি মাটির তৈরী, দেয়ালে বিভিন্ন কারুকাজ করা। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল বর্ষের ছাত্ররাই সাধারণত এখানে থাকে। ঘুরলাম ছাতিমতলা। দেখলাম কীভাবে কোন জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের সমাবর্তন হয়। সমাবর্তনে স্নাতকদের সপ্তপর্ণী গাছের পাঁচটি পাতার গুচ্ছ উপহার দেওয়া হয় ।

Black House, Shantiniketon কালো বাড়ি, শান্তিনিকেতন

ছাতিমতলা, শান্তিনিকেতন ছাতিমতলা, শান্তিনিকেতন

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাজুয়েটদের সমাবর্তনের জায়গা

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজরিত এইসব দেখতে দেখতে কখন যে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া শুরু করলো টেরই পাই নি। দ্রুতই একটি রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করে চড়া দামে কিছু খেয়ে নিয়েই আমার গিন্নী দৌড়ালেন এখানকার রাস্তার দুধারে সারি সারি করে গজিয়ে উঠা হ্যান্ডিক্রাফটসের দোকানগুলোতে। নিজের জন্য, আমার জন্য, দেশে থাকা আরো অনেকের জন্যই অনেক কিছু কিনে ফেললো। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম কোথাও স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে গেলে মানিব্যাগটাকে কখনোই ভারী করে নেওয়া যাবে না!

এবার হয়ে এলো সন্ধ্যা। সন্ধ্যার শান্তি নিকেতন আবার সম্পূর্ণ অন্যরুপ। সেই রুপের বর্ণনা দেবার সাধ্য বিধাতা আমায় দেননি। দেশে থাকতে শান্তি নিকেতনের বিভিন্ন উৎসবের কথা শুনেছিলাম- রবীন্দ্রজয়ন্তী, বসন্ত উত্সব,বর্ষামঙ্গল,শরতউত্সব,নন্দনমেলা , পৌষমেলা, মাঘমেলা ইত্যাদি। আমরা যে সময়টাতে গিয়েছিলাম, সেই সময়ে অবশ্য কোনো উৎসবের দেখা পাই নি। তখন মনে হয়েছিলো হয়তোবা আবার কখনো এই উৎসবগুলি দেখার জন্যই আবার শান্তি নিকেতনে আসবো।

পরেরদিন সকাল বেলায় আমরা গেলাম শান্তি নিকেতন থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ডিয়ার পার্কে। নাম শুনে ভেবেছিলাম প্রচুর হরিন দেখতে পাবো, ততটা দেখতে না পেলেও প্রকৃতির অপরুপ শোভায় যেনো বিমোহিতই হয়ে গিয়েছিলাম। তাই কখন যে ট্রেনের সময় হয়ে গিয়েছে খেয়ালই করিনি। যখন খেয়াল হলো, দ্রুত রেল স্টেশনে আসতে গিয়ে আরো অনেক কিছুই দেখা হয়নি ভালোভাবে। ট্রেনে করে যখন আবার হাওড়ার উদ্দেশ্যে ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম, মনে মনে বললাম- আমি আসবো, আবার আসবো, তোমাতে হারিয়ে যেতে, হে প্রিয় শান্তি নিকেতন!

শান্তিনিকেতন বিদায় শান্তিনিকেতন!

( এই লেখাটি ৮ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৩-এর দৈনিক যুগান্তরের ‘যেতে যেতে পথে’- এ প্রকাশিত।

আমার দেখা শান্তিনিকেতন )

 

আমার নীল পদ্মগুলি

তুমি আর নেই সেই তুমি,
জানি না, জানি না, কেনো এমন হয়!”—

শচীন কর্তার এই গানটি আমি যদি আমার স্ত্রীর সামনে গাই, নির্ঘাত কেলেঙ্কারি ঘটনা ঘটে যাবে! আর যদি চতুর্মাত্রিক নিয়ে গাই?

 (১)

অনেকদিন পর আজ চতুরে এলাম। পোস্টগুলো পড়তে পড়তে কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করলো। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম- কী বোর্ডে আঙ্গুল রাখতে গিয়ে একটু কি কেঁপে উঠলো?

গতকাল রাতে জ ই মানিকের সাথে মুঠোফোনে পাক্কা ৫৮ মিনিট কথা বললাম। ফোন করেছিল মানিক- মধ্য রাতের আগে। মানিকের সাথে কথা বলতে বলতে খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আমি চতুর্মাত্রিকের নিন্দা করছি! কী ধরনের নিন্দা করেছি, সেটা আমি বলবো না, তবে এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি- কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া সারমেয় সমাচারের মতো কোনো নিন্দা নয়! বাকীটুকু তো মানিক জানে! আশা করছি সে এ ব্যাপারে কলম বন্ধ রাখবে  ।

রাতে ঘুমাতে গিয়ে চিন্তা করছিলাম- আমি মানিককে যা বলেছি, তা কি আমার মনের কথা? তখন উত্তর পাই নি। আজ রাতে এসে নেট খুলে যখন অনেকদিন পর চতুরে লগ ইন করলাম, বুঝতে পারলাম- মানিককে বলা আমার কথাগুলো মনের নয়!

 (২)

আমি নিয়াজের ডাক্তারের রোজনামচা হয়ে উঠার জন্য চতুর্মাত্রিকই একমাত্র দায়ী- এই ব্যাপারটা আমার কোনোভাবেই অস্বীকার করার জো নেই। এই চতুর্মাত্রিক থেকে আমি কি পাইনি? ডয়েচে ভেলের সেরা বাংলা ব্লগ, সরলরেখা- বক্ররেখা থেকে শুরু করে অনেক অসাধারণ এবং নমস্য ব্লগারদের ভালোবাসা– কোনো কিছু বাদ যায় নি। একটা সময় চতুর্মাত্রিকই ছিলো আমার একমাত্র বিচরণক্ষেত্র। আমার স্ত্রী কপট রেগে বলতো- ল্যাপটপ এবং চতুর্মাত্রিক হচ্ছে তার দুই সতিন।

এরপর হঠাৎ করেই আমি অনিয়মিত হয়ে উঠলাম। নাহ- ব্যস্ততার জন্য নয়। বরং, স্বীকার করতে কুন্ঠা নেই, কিছুটা অভিমানের জন্য। ধর্মীয় পোস্টের কারণেই হয়তোবা প্রথম বিরাগ শুরু হয়েছিলো। এরপর কিছু প্রিয় এবং সেই সময়ের এক্টিভ কিছু ব্লগারের প্রতি ব্যক্তি আক্রমন এবং সেটার ব্যাপারে চতুর কর্তৃপক্ষের নিরবতা (প্লিজ, এই ব্যাপারটি নিয়ে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবেন না!)- আমাকে আরো চতুর বিরাগী করে তুলেছিলো। অনেকবার ভেবেছিলাম চতুর থেকে একেবারেই বিদায় নিবো- কিন্তু কিছু ব্লগারের নিস্বার্থ ভালোবাসাযুক্ত আবদারে মাঝে মাঝে অনিয়মিতভাবে পোস্ট দিয়েছিলাম।

অনিয়মিতভাবে যখন পোস্ট দিতাম, দেখতে পেতাম অনেক নতুন চতুরকে। যাদের লেখার জন্য আগে উন্মুখ হয়ে থাকতাম, তাদেরকে নিয়মিতভাবে অনিয়মিত দেখলাম। নতুনদেরকে চিনার বা বোঝার অবসরটুকু অবশ্য পেতাম না! এভাবেই একসময় চেনা চতুর্মাত্রিক কেমন যেনো অচেনা হয়ে উঠলো!

 (৩)

কিছুদিন আগে শূণ্য আরণ্যক ভাইয়া, ফেবুতে আমাকে একটি জিনিস ট্যাগ করেছিলো। আমি এই ট্যাগ করার বিষয়টি প্রথম জানতে পারি একুয়া রেজিয়ার কাছ থেকে। এরপর ব্যস্ততার মধ্যেও ফেবুতে ঢুকে ট্যাগের বিষয় বস্তুটা দেখে খুব কষ্ট লাগলো। নাহ, বিষয় বস্তুর জন্য কষ্ট লাগেনি, কষ্ট লেগেছে এই ভেবে যে – আরণ্যক ভাইয়া কেনো এই বিষয়টিতে আমাকে ট্যাগ করেছে? (বিষয় বস্তুটা আমি আগেই অন্য একজন ব্লগার মারফত জেনেছিলাম, এবং এই ব্যাপারে আমার অভিমতটাও কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে জানে)।

আমি ফেবুতে রেসপন্স করিনি, কিন্তু মনে হয় কেউ যদি আমার ব্যক্তিগত ব্লগ সুড়ঙ্গের ক্ষুদে স্টাটাসে দেখে- তাহলে বুঝে নিবে আমার প্রতিক্রিয়া। যা হোক, সেই ট্যাগিংটাও চতুরে উঁকি মারা থেকে আমাকে বিরত রেখেছিলো বেশ কিছুদিন। আমি যখন গত রাতে মানিকের সাথে কথা বলছিলাম, এই ব্যাপারটাই মনে হয় আমাকে বেশি পীড়া বা যন্ত্রনা দিচ্ছিলো। কিন্তু আজ অনেকদিন পরে চতুরে লগ ইন করে——-

 (৪)

মানুষ না কি তার প্রথম ভালোবাসাকে কখনো ভুলতে পারে না। হিমুর এক বইয়ে পাঁচটি নীল পদ্ম থিওরীও এক সময় পড়েছিলাম। আজ খুব অস্থির হয়ে আবিষ্কার করলাম- চতুরকে আমি বোধহয় পাঁচটি নীল পদ্মই দিয়ে ফেলেছি, তাই বোধহয় প্রথম ভালোবাসাকে আজো অস্বীকার করতে পারি নি!

আজ খুব অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম – কি পরিমাণে আমি নুশেরা আপু, জলাপু, মেঘাপু, বাপী ভাইয়া, শাওন ভাইয়া, অনীক, আমিন শিমুল, শিপন ভাইয়া, করিম, সুরঞ্জনাপু, আরিশ, শব্দপুঞ্জ, একুয়া, নাঈফা আপু, অপাংক্তেয় আপু — আর নাম লিখতে চাই না, শেষ করা যাবে না- এঁদের লেখা মিস করি (এখানে উদরাজী ভাইয়ার নামটাও আমি লিখতে চেয়েছি, ফিরে আসুন এই নীড়ে) ।
আজ আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো আবিষ্কার করলাম- চতুর্মাত্রিককে আমি কি পরিমাণ বেশী ভালোবাসি!

ভালো থাকুক চতুর্মাত্রিক, ভালো থাকুক সকল চতুর।

 

প্রজন্ম চত্বর ও জামালপুরের শেখ ফজল

আজ বিকাল চারটার সময় মতলব আইসিডিডিআর,বি-তে আমরা যখন তিন মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করছিলাম, তখন চিন্তাই করিনি একটু পরেই এক অদ্ভূত ঘটনা ঘটবে! নিরবতা পালন শেষে যখন হাসপাতালে ঢুকবো, এক অজানা নম্বর থেকে এক ফোন এলো। “হ্যালো” বলার পর অপর প্রান্ত থেকে একজন মধ্য বয়স্ক কন্ঠের এক পুরুষ জানতে চাইলেন আমি ডাঃ নিয়াজ কি না!

যখন তিনি নিশ্চিত হলেন, আমিই ডাঃ নিয়াজ, উনি বললেন, “আমি শেখ ফজল, জামালপুর থেকে বলছি। আমি প্রজন্ম চত্বর নিয়ে একটি কবিতা লিখেছি। আপনি কি এই কবিতাটি সেখানে আবৃত্তি করানোর ব্যবস্থা করতে পারবেন?” আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না! হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম- আমার কথা কে বললো বা আমার ফোন নম্বর কোথায় পেলেন? জানতে পারলাম, নেটে আমার সুড়ঙ্গ ব্লগ থেকে আমার সম্পর্কে জেনেছেন এবং সেখানে আমার ফোন নম্বর পেয়েছেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, “আমি আসলে এই ব্যাপারে যোগ্য ব্যক্তি নই। তবে আপনি আমার কাছে মেইলে কবিতাটি পাঠিয়ে দিতে পারেন, আমি ফেসবুকে শেয়ার করতে পারি। সেই রকম কারো চোখে যদি পড়ে, তাঁর যদি ভালো লাগে- তাহলে আপনার আবেগ দিয়ে লেখা এই কবিতাটি উনি প্রজন্ম চত্বরে পড়তেও পারেন। আর যদি না আবৃত্তি করা হয়, আমায় ক্ষমা করবেন”।

তিনি আমাকে কবিতাটি পাঠিয়েছেন। আমি হুবুহু তুলে দিলাম–

তুমিই একমাত্র পার
—–শেখ ফজল

উৎসর্গ: প্রজন্ম চত্ত্বর সমীপে

ওগো, জন্মভূমি মা আমার,
আমরা তোমার সন্তান সন্ততিরা-
মহা ঘোরকাল অতিক্রম করছি!
পৃথিবীর জাতি গোষ্ঠিতে যখন
বাঙ্গাল বলে পরিচিত ছিলাম,
ধর্মভাইদের লম্বাহাত থেকে-জাতিগত পরিচয়ের
সনাক্তচিহ্ন-মাতৃভাষাটুকু রক্ষা করতে
কতই না নির্যাতন-অপমান,প্রাণসংহার,
সরিষাভূতের ষড়যন্ত্র সহ্য করতে হয়েছে।
সেই সব নির্মম, নিষ্ঠুর, নিপীড়নই-শিক্ষা দিয়েছে আজ-
আত্মমর্যাদা, আত্মধিকার এবং স্বাধীনতার মূলমন্ত্র।

মাগো, একাত্তরের সেই ১১ সেক্টরের বীরচিত যুদ্ধ-
হিমালয় সমান, জগদ্দল অগ্নিযুগের মর্ম ব্যথা-
মরুভূমির লু-হাওয়াসম শোক-বিরহের হাহাকার-
মেঘে ঢাকা চাঁদের মত অম্লান কলঙ্ক-
কত বধ্যভূমিতে বুদ্ধিজীবিগণের প্রাণ উৎসর্গ ।
কত যুদ্ধশিশুর উদাস চাওনির অসহায়ত্ব-
কত বঙ্গমাতার-লাজে নত ঘোমটার অশ্রুরুদ্ধ অভিমান-
কত শহীদানের বীরচিত আত্মদানের মহিমা-
মা-তোমাকে করেছে আজ গরীয়ান গরীয়সী।
তুমি স্বগর্বে পৃথিবীতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছো।
সবুজ আচল বিছিয়ে দিয়েছো তোমার পরিসীমায়।
তুমি আজ বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষার গরীয়সী জন্মদাত্রী।

আজ তোমার সন্তানেরা বিন্দু বিন্দু ঐশ্বর্য সঞ্চয় করে,
তোমাকে ঐশ্বর্যবান করে তুলেছে।
আজ তোমার সন্তানেরা নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে-
আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখছে।
আজ তোমার সন্তানের আঁধার ঘোচাতে
সূর্যটাকে ধারণ করেছে বক্ষে।
আজ তোমার সন্তানেরা ন্যায়ের যুদ্ধে
আপোষহীন কলম নিয়েছে হাতে।
আজ তারা-দূরদর্শী প্রতিবাদ তুলে নিয়েছে কন্ঠে।

এ হেন সোনালি সকালে-
কারা এল কপাল ঢাকতে,তোমার কালো নেকাবে?
কারা এল কালো চশমা পড়াতে,তোমার চোখে?
কারা এল আফগানিস্তানের মত-বোলচাল মতলব নিয়ে?
কারা এল বিজয়ধব্জাধারীদের ধরাশায়ীর ধ্যানজ্ঞান নিয়ে?
লাল সূর্যটাকে ছিনিয়ে নিয়ে
চাঁদ-তারা বসনোর কূট-কূটার্থের কৌশল নিয়ে?
ওগো জন্মভূমি মা আমার-
তুমিই একমাত্র পারো,
তোমার সন্তানদেরকে সঠিক সুনির্দিষ্ট পথে চালাতে।
পারো নতুন প্রজন্মকে উদ্দাম উদ্দীপিত করতে।

তারাই পারে প্রজন্ম চত্ত্বরে যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির মঞ্চ গড়তে।
তারাই পারে সকল দুরভিসন্ধি উচ্ছেদ করতে।
তাদের সামনে প্রশ্ন আজ-
মাতৃভাষায় সংবিধান থাকবে কী না!
না কি, জাতীয় সঙগীত হবে-
“পাক সার জমিন সাদ বাদ”?

কবি পরিচিতিঃ
নাম- শেখ ফজল
পিতাঃ মৃত শেখ আজিজ মিছির
গ্রামঃ মহিরামকুল, পোস্টঃ ভাঙ্গুনীডাঙ্গা, উপজেলাঃ মেলান্দহ, জেলাঃ জামালপুর
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ ১) প্রিয় ভালোবাসা তোমাকে দিলাম, ২) মায়ের আশা মায়ের ভাষা, ৩) অধরা মাধুরী, ৪) ভালোবাসার তিন রং, ৫) প্রাণের দামে কেনা এই লাল সবুজের দেশ (পান্ডুলিপি প্রস্তুত)

শেখ ফজল ভাই আমাকে ঠিক যেভাবে তাঁর কবিতাটি এবং কবি পরিচিতি পাঠিয়েছেন- আমি সেইভাবেই তুলে দিলাম।

শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর, আমার অহংকার

আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। আমার জন্মই হয় নি তখন। কিন্তু আমার বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর কাছে শুনেছিলাম কী আবেগ নিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষ একাত্ম হয়েছিলেন দেশ মাতৃকাকে হানাদার বাহিনীর শিকল থেকে মুক্ত করতে। তাঁর কাছে আরও শুনেছিলাম কিছু অমানুষ, হায়েনাই শুধু স্বাধীনতাঁর বিরোধী ছিলো এবং সেই সব কুলাঙ্গার মীর জাফরদের জন্য আমরা হারিয়েছিলাম আমাদের সেরা সন্তানদের। আমি আমার বাবার কথা শুনে অবাক হয়েছি, আবার হেসেছি। তখন যে দেশের ক্ষমতায় স্বৈরাচার এরশাদ! বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম- কিছু বুঝতে পারার পর থেকেই দেখছি স্বৈরতন্ত্র, দেখছি মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত, দেখছি রাজাকাররা পুনর্বাসিত, শুনেছি রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম- তোমরা কি আমাদেরকে এই সব দেবার জন্য স্বাধীনতা এনেছিলে? প্রশ্ন করেছিলাম, ৭১ এ তোমরা কীভাবে সবাই এক সত্ত্বায় মিশে গিয়েছিলে? আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবা কোন উত্তর দিতে পারে নি, নিশ্চল নিশ্চুপ ছিলো। তাঁর চেহারায় সেদিন দেখেছিলাম প্রচন্ড লজ্জা, হতাশা, ক্ষোভ।

৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী গণ আন্দোলনে আমি ঢাকায় ছিলাম না। তখন খুব একটা বড়ও ছিলাম না। পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্র আমি তখন। নভেম্বর থেকে আন্দোলনের আঁচ কিছুটা টের পেতাম, কিছুটা বুঝতে পারতাম। বাবার কাছে থেকে প্রতিদিনের আপডেট শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। মনে আছে ৬ই ডিসেম্বর স্বৈরাচারের পতনের পর ছোট্ট মৌলভীবাজার শহরে চিৎকার করে বেড়িয়েছিলাম- “হৈ হৈ রৈ রৈ, এরশাদ চোরা গেলো কৈ?” কিন্তু তখনো গণ জাগরণের মূল উত্তাপটা ঢাকায় না থাকাতে আর ছোট হওয়াতে অতটা বুঝতে পারে নি। কিন্তু নতুন সূর্য উঠার দিন যে সামনে আসতে যাচ্ছে- সেটা বুঝতে পারছিলাম।

খুব দ্রুতই আশাভঙ্গ হলো, যখন একদিন বাবা অফিস থেকে এসে প্রচন্ড হতাশ কন্ঠে জানালেন, রাজাকার আব্দুর রহমান বিশ্বাস প্রেসিডেন্ট হয়েছে। রাজাকারদের দল, হায়েনাদের দল জামাতে ইসলামী ক্ষমতার জোটে আছে। রাজাকার, যুদ্ধপরাধীদের বিচার হবে না! তাই ৯৬-এ আমি যখন এস এস সি পরিক্ষার্থী, মনে আছে পড়াশোনা বাদ দিয়ে “নৌকা, নৌকা” বলে চিৎকার করেছি- আওয়ামী লীগ সাপোর্ট করার জন্য নয়, ভেবেছিলাম আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশ রাজাকারমুক্ত হবে। বিধাতা মুচকি হেসেছিলেন! আমরা একই মুদ্রার এপিঠ- ওপিঠ দেখলাম। জনগনকে তারা বোকা ভেবেছিলো, কিন্তু জনগন বোকা নয়। আওয়ামী লীগের জায়গায় এলো আবার বিএনপি।

কিন্তু বিএনপি খেললো চরম খেলা। রাজাকাররা জাতীয় পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে চোখের সামনে ঘুরতে লাগলো। ততদিনে আমি এবং আমরাও অনেক বড় হয়ে উঠেছি- আসল ইতিহাস জানতে শুরু করেছি। তরুন প্রজন্মের ভিতর রাজাকার, যুদ্ধপরাধী আর জামাত শিবির বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছে। কিন্তু তখনো কোনো স্বতঃস্ফুর্ত গণ জাগরণ দেখেনি। শুধু ৭১ এর একাত্ম হওয়ার ব্যাপারটি তখনো রুপকথার মতোই মনে হতে লাগলো। ভেবেছিলাম এই জনমে আর একাত্ম বাংলাদেশ দেখতে পাবো না। বিধাতা আবারো মুচকি হাসলেন।

আজ ৮ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৩ সাল। 


আজ বাবাকে করা একটি প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি। কীভাবে তাঁরা ৭১ এ একাত্ব হয়েছিলো। আজ গন জাগরণ কাকে বলে- নিজে বুঝেছি, এর উত্তাপ গায়ে মেখেছি। আজ হারিয়ে গিয়েছি নতুন আবিষ্কারের নেশায়, উল্লাসিত হয়েছি অসম্ভব সুন্দর বাংলাদেশের অসম্ভব দেশ প্রেমিক জনগণকে দেখে, আপ্লুত হয়েছি দেশ জোড়া বন্ধু দেখে, বিহবল হয়েছি দেশের বাইরে থাকা দেশপ্রেমিকদের দেশ নিয়ে ভাবনা দেখে।

Projonmo Chattor প্রজন্মে চত্বরে জনতার ঢল (ছবি কৃতজ্ঞতাঃ ফেসবুক)

কি বললেন? আপনি দেখেন নি? সময় আছে এখনো, চলে আসুন শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে, স্বাক্ষী হোন এক অসাধারণ ইতিহাসের। আর অবশ্যই বজ্র কন্ঠে বলে উঠুন, “কাদের মোল্লা, নিজামী, গো আ, মুজাহিদ, সাকা, বাচ্চুসহ সকল যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসি চাই, জামাত শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ চাই, জামাত শিবির নিয়ন্ত্রিত সকল ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বর্জন চাই।”

আসুন আপনি প্রজন্ম চত্বরে, আপনার অপেক্ষাতেই আমরা আছি।

আমি আজ ক্ষমা করতে আসি নি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি

এক দফা, এক দাবী- কসাই কাদেরের ফাঁসি, ফাঁসি।
বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশের পর আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম, আওয়ামী লীগের পদ্মা সেতু নাটকও হজম করে ফেলতে চেয়েছিলাম, দুই আবুলরেও ক্ষমা করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম- শুধুমাত্র একটি জিনিসের আশায়— সব রাজাকারের ফাঁসি চাই আমি, জামাত শিবিরের নিষিদ্ধ ঘোষনা চাই আমি।
এই রায় সাজানো, আরেকটি আওয়ামী নাটক। কিন্তু বাংলার জনগণ এতো বোকা নয়! সামনে আরো দিন আছে! ভোট প্রার্থনা করতে আসার আগে হাসিনার বোঝা উচিত- জনগন কি চায়।
বাংলার জনগন এখন–
গোলাম আযমের ফাঁসি চায়
নিজামীর ফাঁসি চায়
সাইদীর ফাঁসি চায়
কাদের মোল্লার  ফাঁসি চায়
সাকা চৌ এর ফাঁসি চায়
সকল যুদ্ধপরাধীর ফাঁসি চায়
আর এই মুহূর্তেই বাচ্চু রাজাকারকে বন্দী দেখতে চায়, ফাসির রায় দ্রুত কার্যকর দেখতে চায়, ————– নইলে—–
আগামী নির্বাচনে আমি আমার বাসার দরজায় কোনো আওয়ামী নেতাকে ভোট চাইতে আসতে দিবো না।