অণুগল্পঃ জীবন যেখানে যেমন

বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকা শহরের বহুতল ভবনগুলো যেনো এই বৃষ্টিকে উপহাস করে। বড় বড় হাসপাতালগুলোর ভিতর থেকে তা আরো অনুভব করা যায় না। কেবিনে রোগী দেখতে এসে জানালা দিয়ে শুধু বৃষ্টির অঝোর ধারাই দেখা যাচ্ছে, শব্দগুলো অণুরনিত আর হচ্ছে না। কিন্তু এই অঝোর ধারা দেখেই দিপু কেমন উতলা হয়ে উঠলো। পালস দেখার জন্য রোগীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, পালস বিট দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে, সেখানে জায়গা দখল করেছে টাপুর টুপুর শব্দ।

“তুমি একটু অন্যরকম, অন্য সব ডাক্তারদের থেকে”
, রোগীর কথায় সচকিত হয়ে উঠে দিপু। রোগীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। “আপনিও একটু অন্যরকম, অন্য সব রোগীদের থেকে”, প্রত্যুত্তর দেয় দিপু। রোগীর নাম ভাস্কর, প্রথম দেখাতে বয়স খুব বেশি মনে হয় না। তার সাথে কথা বললে আরো কম মনে হবে। দিপু যখন ভাস্করের ব্রেনের সিটি স্ক্যান দেখে, মনে প্রচন্ড আঘাত পেয়েছিলো। ভেবেছিলো এতো তাড়াতাড়ি এই লোক এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে! যখন জানলো বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই, যেনো কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। কথাটা ওর প্রফেসরকে বলা মাত্রই পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ প্রফেসর হেসে বলে উঠেন, “ডাক্তার হচ্ছো তাহলে এখন! পঞ্চাশের উপরে কেউ মারা গেলে আর কষ্ট লাগে না, তাই না?” চমকে উঠে দিপু, পরে অনেক ভেবেছে এই ব্যাপারটি নিয়ে। মেনেও নিয়েছে সে। অবচেতনভাবেই সে খেয়াল করেছে, অল্প বয়স্ক রোগীদের বেলায় যতটা শ্রম দেয়, বয়স্কদের বেলায় ততটা নয়। যেনো ধরেই নিয়েছে তাদের দিন শেষ।

ভাস্করেরও দিন খুব বেশি নেই। অপারেশনের আগেই তাকে বলা হয়েছিলো কাগজ কলমের সমস্ত কাজ সেরে ফেলতে। এতো বড়ো টিউমার অপারেশন করেও খুব বেশি বের করা যাবে না, এরপর আছে কেমো আর রেডিওথেরাপির ধাক্কা, এ যেনো বিধাতার কাছ থেকে কিছু সময় কেনা। অন্যান্য রোগীরা এই সময় খুব ভেঙ্গে পড়ে, কিন্তু ভাস্করের স্বভাব তা নয়। জীবনের অধিকাংশ সময় জীবনটাকে খেলা হিসেবে নেওয়া ভাস্করের কাছে এটাও যেনো একটা খেলা। হয় হারবে, নয়তো জিতবে।

অপারেশনের দুই দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে এই দুই দিনেই তার সাথে দিপুর খুব সম্পর্ক হলো। দিপুও যেমন কথা বলতে ভালোবাসে, ভাস্করও তেমন কথা শুনতে ভালোবাসে। কখনো কখনো দুই জনের কথক আর শ্রোতার ভূমিকাও বদলে যায়। দিপুর নাইট ডিউটির অধিকাংশ সময় কেটে যায় এই রুমটিতেই।
অসম বয়সের এই আলোচনায় অনেক কিছুই আসে। রাজনীতি, ধর্মনীতি থেকে শুরু করে প্রেমও পর্যন্ত। এভাবেই ভাস্কর জেনে যায় সন্ধ্যার কথা। সন্ধ্যার সাথে দিপুর পরিচয় মেডিকেলে পড়তে এসে। একই সাথে মেডিকেলে প্রবেশ ওদের। এক সাথে ক্লাস। এক সাথে আড্ডা। তারপর হঠাৎ একদিন ভালোবাসাকে পেরিয়ে একেবারে প্রেম। ঘোষনাটা আসে সন্ধ্যার কাছ থেকে, আর দিপু তখনো কাউকে ‘না’ বলতে শিখে নি।

ভাস্কর জানে, ওদের সম্পর্কটা থাকে নি, কেনো থাকে নি, দিপু তা বলে নি। ভাস্করও আর জানতে চায় নি, বুঝে নিয়েছে, এই বুড়োকে যে এতো কথা বলেছে সেটাই ঢেড় বেশি। আজ একটু পরে ভাস্করকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবে। “কবিরা বলেন, তাদের মৃত্যু যেনো হয় চাঁদনী রাতে আর আমি দেখছি বিধাতা ডাকছেন আমায় এই বৃষ্টির দিনে,” ভাস্করের কথা শুনে সহজভাবে দিপু বলে, “আপনি কি তৈরী হয়েই আছেন? সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা শত চেষ্টা করলেও ফিরে আসবেন না?”

“কিছু দিনের জন্য? মন্দ লাগবে না! এই শেষ মুহূর্তে জীবনটাকে খুব প্রিয় মনে হচ্ছে। জানো, যারা হঠাৎ করে মারা যায়, তাদের মৃত্যুর কোনো চিন্তা নেই। আর যারা জানে, সময় বেশিদিন নেই, তারা হয় খুব বেশি করে বিধাতার দিকে ঝুঁকে পড়ে, নতুবা আমার মতো জীবনটাকে উপভোগ করতে চায়, বিন্দু পরিমাণও ছাড় দিতে চায় না”।

“আর যারা প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে দেখে?”
দিপুর কথা শুনে হা হা করে হেসে উঠে ভাস্কর, “ডাক্তার, শুধু তোমরাই প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে দেখো না, আরো অনেকেই দেখে। তুমি বরং তাদের কথা চিন্তা করো, যারা প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে কাটাছেড়া করে”। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় দিপু, “ডোম?”

আবারো হেসে উঠলো ভাস্কর, “তুমি আর মেডিকেল থেকে বের হতে পারলে না! তা হোক, তোমাকে বলি, যদি আজ আমি না ফিরে আসি, একটু হলেও আমার জন্য কষ্ট পেয়ো। কোনো জীবনই এতো সহজে চলে যাবার নয়, যতই সে বুড়ো হোক!”

***********************
ইমার্জেন্সীতে একটি বাচ্চা ছেলে এসেছে, রোড এক্সিডেন্টের। জ্ঞান নেই, অবস্থাও খুব ভালো নয়, মাথায় বিশাল আঘাতের চিহ্ন আছে। দিপু বাচ্চাটিকে নিয়ে খুব ব্যস্ত। ভীষনভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে বাঁচানোর জন্য। দীর্ঘ দুই ঘন্টা যুদ্ধ করে হেরে গেলো সে। হেরে গেলো ভাস্করও। হাসপাতালটা হঠাৎ করেই অসহ্য লাগছে দিপুর কাছে। বাইরে বেরিয়ে এলো।

বৃষ্টি থেমে গেছে অনেক আগেই। গুমোট ভাবটাও নেই, বরঞ্চ কী এক অনাবিল হাওয়া! বাইরে বেরিয়ে দিপুর খারাপ লাগছে না, চিন্তা থেকে বাচ্চা ছেলেটা, এমনকি ভাস্করও নেই। আকাশে ভেসে উঠা রংধনুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কী যে হলো দিপুর! শূন্য অনুভূতি! যেনো তা দিগন্তে মিলিয়ে যাবার অপেক্ষায়।

আনমনে হেসে উঠলো দিপু, একটু পরেই হাসপাতালের দিকে পা বাড়ালো।

রিক্ত আমি


সে অনেকদিন আগের কথা
তোমাকে দেখেছি দূর থেকে
লাল পেড়ে শাদা শাড়ি, পায়ে নূপুর।

রিনি ঝিনি শব্দে তুমি
ধীর পায়ে চলে গেলে
পিছনে ফেলে মুগ্ধতার সুর!

এরপর বহুবার দেখেছি তোমায়
কলেজে, ক্যান্টিনে, লাইব্রেরীতে
বলা হয় নি কথাটা।

সাহসে কুলোয়নি আমায়
পাছে হারিয়ে ফেলি
তোমার সখ্যতা।

একদিন তুমি এলে
হাতে ধরিয়ে দিলে রঙ্গিন কার্ড
সলাজ হাসিতে।

নিশ্চল দাঁড়িয়ে আমি
জানলাম সে দিন
অক্ষম ভালোবাসিতে।

এরপর বহুকাল পেরিয়ে গেলো
তুমি গেলে হারিয়ে
আমি হলাম প্রেমিক।

ভালোবাসার উদভ্রান্ত চোখে
খুঁজেছি তোমার মরিচীকা
ঘড়ির কাটা চলেছে টিক টিক।

কেটেছে অনেক রাত
নিস্ফল অশ্রুতে
টই টম্বুর চোখের পাড়।

একদিন হলাম শান্ত
জীবনটা হলো ব্যস্ত
আমি তখন ডাক্তার।

সময় কেটে গেলো
হঠাৎ এলে তুমি
সাথে তোমার বর।

রোগী তোমার বর নয়
আমি আবারো নিশ্চল
অনুভূতিটা কষ্টকর।

মরনব্যাধিতে তুমি
কাষ্ঠ হেসে বললে
“আর কতদিন আছি আমি?”

তোমার উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে
আমিও হাসলাম
শূণ্য হাসি।

তোমার আত্মজার সাথে
করিয়ে দিলে পরিচয়
নয়ন তোমার সিক্ত।

এলো সেই দিন
তুমি গেলে চলে
আবারো আমায় করে রিক্ত।

সোনামুখী সুঁইয়ে রূপোলী সুতো ও একটি নাকফুল

আমার গ্রামের বাড়ি একটি দ্বীপে- হাতিয়া, তারও গ্রামের বাড়ি একটি দ্বীপে, আমার দ্বীপের পাশাপাশি একটি দ্বীপ- সন্দ্বীপ। আমার পৃথিবীতে আগমন যে সময়ে, তারও পৃথিবীতে আগমন সেই কাছাকাছি সময়ে। কিন্তু আমার লেখার ধার যতটুকু, তার লেখার ধার তারচেয়ে অনেক, অনেক গুণ বেশি।

আমি তার কথা বলছি, আমি আব্দুর রাজ্জাক শিপনের কথা বলছি। আমি তার লেখা ‘সোনামুখী সুঁইয়ে রূপোলী সুতো’-র কথা বলছি।

(১)
প্রথমেই থমকে দাঁড়াই! লেখকের সাথে আসানসোলের ঝাঁকরা চুলের বাবরি দোলানো কবির উপস্থিতিতে মনটা আনন্দে ভরে উঠে। কান পেতে রই রেললাইনে তাদের অপূর্ব সুর ঝংকার শোনার জন্য। শুনতে থাকি একের পর এক সিম্ফনি।

তারা সুর তুলে এগিয়ে যায় খন্ড খন্ড কিন্তু গুরুত্বপূর্ন কিছু বিষয়ের ভিতর দিয়ে। চটের বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে থাকা মানবশিশুর সিম্ফনি শুনে কিছুক্ষনের জন্য হলেও থেমে যাই, নিজের ভাবনাকে নিয়ন্ত্রনকারী নিউরনগুলোর ছুটোছুটি দ্রুত বেড়ে যায়। এই নিউরনগুলিই আবার নিশ্চল হয়ে পড়ে চাঁদনীর করুণ রসে,মনে হয় এরকম কতো চাঁদনী সিম্ফনি শুনেছি, এরকম কতো চাঁদনী আছে আমাদের আশেপাশে, অথচ কখনো ভাবিনি তাদের কথা। চিন্তা করিনি বোন হিসেবে, ভেবেছি শুধুই অচ্ছুৎ!

সালাম শিপন, তোমায় সালাম।

(২)
“মাছির জাতপাত নেই। জাতপাত শুধু মানুষের”– মানবনীতির পাশেই আছে রাজনীতি, আছে শক্ত প্যারোডি। সিম্ফনিগুলো শুনতে শুনতে আঁতকে উঠছিলাম, ভাবছিলাম এটি কবির সেই বিখ্যাত সুরের মতোই আরেকটা ‘বিদ্রোহী’ সুর কি না!

ইদানীং আমাদের সমাজে ‘বিদ্রোহী’ আর ভালো লাগে না, ঘুম পাড়িয়ে দেয়। আমাকেও পাড়িয়ে দিতো, যদি না রিপা নীল খামে চিঠি পাঠাতো! রিপা তার স্বপ্নের সাথে আমাকেও নিয়ে গেল নাকফুল পর্যন্ত। এই নাকফুল সিম্ফনি আমায় এতো বুঁদ করে রাখলো যে, এই মধ্যরাতে মনে হলো আমিও আমার রিপার জন্য নাক (সোনামুখী সুঁই) ফুল (রূপোলী সুতো) চাই।

(৩)
আমায় এখন বঙ্কিম টানে না, কারণ আমার আছে প্রমথ চৌধুরি। আমায় ‘কুসুমাদপি সূর্যটা টুপ করে পশ্চিমে ডুব দেয় কি দেয় না, সেই দৃশ্য অবলোকনে আমরা ব্যর্থ হলেও ঘনীভূত অন্ধকার আঁচ করা যায়’– ভাষা সহজ হতে দেয় না, যতটা সহজ হই ‘মা আহাজারি করছিলেন, রানু চিৎকার করে কাঁদছিল’– বাক্যচয়নে। কিন্তু বিভ্রান্ত হয়ে যাই যখনই বঙ্কিম আর প্রমথ আমার সামনে একসাথে চলে আসে। এদেরকে কখনোই আমি একসাথে দেখতে চাই না, তাতে মোজার্টের নাইনথ সিম্ফনি শোনার আবেদনটাই হুমকীর মুখে পড়ে।

(৪)
“স্বপ্ন কাজল না, স্বপ্ন চোখে এঁকে রাখা যায় না- এ কথা পুরোপুরি সত্য না! কাজলের মতো করে স্বপ্নও চোখে লাগিয়ে রাখা যায়। মানস আয়নায় স্বপ্ন জিইয়ে রেখে, স্বপ্ন ছুঁতে হাত বাড়াতে বাড়াতে হাতটা যখন লম্বা হয়, এক সময় স্বপ্ন ছুঁতেও পারা যায়’—এই সুর ঝংকারে আমার সামনে থেকে যেনো এক নিমিষে আসানসোলের কবি অদৃশ্য হয়ে যায়, সেখানে শুধু উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হতে থাকে বিরলপ্রজ সাদা মনের মানুষদের দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো আব্দুর রাজ্জাক শিপন।

আবারো সালাম শিপন, তোমায় সালাম।

(৫)
এবার কিছু সোজা কথা। বইটির প্রচ্ছদটি আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে, ভালো লেগেছে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর লেখা সেই বিখ্যাত কবিতা ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা’-দেওয়ায়। মুগ্ধ হয়েছি নজরুল, জীবনানন্দ এবং পূর্নেন্দু পত্রীর কবিতাগুলোর সুন্দর গাঁথুনিতে।

মনে দোলা লেগে গেছে অদ্ভুত সুন্দর ‘নাকফুল’ থিমটির জন্য। মনে হচ্ছে নাকফুলের মানে শুধু মেয়েরাই জানে না, আমরা ছেলেরাও জানি!

আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে এবং নষ্টালজিক

সময়টা ২০০৭, মাসটা নভেম্বর। তারিখ মনে নেই। আমি তখন এপোলো হাসপাতালের নিউরোসার্জারী বিভাগের মেডিকেল অফিসার। সেদিন রাতের ডিউটি ছিলো। রাত নয়টা কি দশটা (সঠিক সময়টা মনে নেই), ইমার্জেন্সী থেকে আমাকে জানানো হলো একজন খুব খারাপ রোগী এসেছে, অজ্ঞান, দেখে যাওয়ার জন্য।

বয়স মনে হচ্ছিল পয়ত্রিশ- চল্লিশের মতো, সারা গালে চাপ চাপ দাড়ি। সম্পূর্ণ অজ্ঞান। তার সাথে আসা এক আত্নীয় বললো, বাপ্পাদা আসুক, তারপর ডাক্তারের সাথে কথা বলবে। ততক্ষণে সিটি স্ক্যান হয়ে গেছে, ব্রেনে নিউরোসার্জারীর দিক থেকে কিছু নেই। অতএব, আমার ডিপার্টমেন্টের নয়, কিন্তু আত্নীয়ের কথার ধরনে কিছুটা বিরক্ত হয়ে “বাপ্পাদা” লোকটা কোন ধরনের মানুষ, সেটা দেখার জন্য ইমার্জেন্সীতে রয়ে গেলাম।

এক ঘন্টা পর বাপ্পাদা এলেন- বাপ্পা মজুমদার! সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান মানুষটিকে চিনতে পারলাম- সঞ্জীব চৌধুরী! আমি আমার জীবনে সঞ্জীব চৌধুরীকে ঐ একবারই দেখেছি, তাও অজ্ঞান অবস্থায়। এর সম্ভবত দুইদিন পরই উনি মারা যান, এপোলো হাসপাতালেই।

দুই বছর পর। আমি তখন সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালে, সেই নিউরোসার্জারীতে। মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা সাংস্কৃতিক সপ্তাহের আয়োজন করবে। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো সেলিব্রিটি শিল্পীদের খুব অল্প খরচে এই অনুষ্ঠানের জন্য নিয়ে আসতে। এই কঠিন কাজে আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন প্রখ্যাত সুরকার ইবরার টিপু, তিনি আমাকে আমার খুব প্রিয় গায়ক বাপ্পা মজুমদারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

বাপ্পাদা ব্যস্ততার জন্য আসতে চাইলেন না। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানলেন, এপোলোতে সেই রাতে আমিই প্রথম নিউরো থেকে সঞ্জীব চৌধুরীকে রিসিভ করেছিলাম। বাপ্পাদা সিরাজগঞ্জে আসতে রাজী হলেন। ২০০৯ সালে বাপ্পা মজুমদার যমুনার পূর্ব পাশে তার প্রথম সলো অনুষ্ঠানটি করলেন আমার অনুরোধে এবং তারিখটি ছিলো ১৮ নভেম্বর, সঞ্জীব চোধুরীর মৃত্যুবার্ষিকীর এক দিন আগে। সেই থেকে বাপ্পাদার সাথে আমার পরিচয়, কথা-বার্তা।

এবার আরো দুই বছর পর। ব্লগ গুলিতে লেখা লেখি করতে গিয়ে “নষ্টালজিক” নামে এক ব্লগারের লেখার সাথে প্রথম পরিচয়। নিকের আড়ালের মানুষটির আসল নাম জানতে পারলাম বারোয়ারী উপন্যাস “সরলরেখা – বক্ররেখা” নিয়ে কাজ করতে গিয়ে। অনামিকা আপুর অনুরোধে তিনি তার সৃষ্ট কিছু পংক্তিমালা উপন্যাসটির নায়ক শিহাবকে অবলীলাক্রমে দিয়ে দিলেন। আমি খুব অভিভূত হলাম। ২০১২- এর একুশের বইমেলায় এসে দেখা হলো তার সাথে – গীতিকার শেখ রানা।

মানুষটিকে দেখে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। এতটা লাজুক, এতটা বিনয়ী, এতটা নম্র মানুষ তিনি! জানতে পারলাম এবারের বইমেলায় লিরিক ও লিরিকের পিছনের গল্প নিয়ে তার একটি বই বের হবে, তার প্রথম বই- “আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে”। একদিন মেলা থেকে বইটি কিনে তার অটোগ্রাফও নিয়ে ফেললাম।

এবার একটি ডিসক্লেইমার- কোনো এক অদ্ভুত কারণে গীতিকার শেখ রানা নামটি আমার কাছে পরিচিত হলেও, তার সৃষ্টিগুলো কোনগুলো আমি তা জানতাম না। আসলে কোনো গান ভালো লাগলে, সেটার গায়ককে যেভাবে চিনে রাখতাম, সেভাবে কখনো কোনো গীতিকারের নামের দিকে তাকাইনি। তাই অনেক প্রখ্যাত গীতিকারের নাম জানলেও, কে কোন লিরিকটি লিখেছে, তা আমার অজানাই থাকতো সবসময়।

ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জে এসে গতরাতে বিছানাতে গা এলিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে যখন “আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে”- এর প্রথম লিরিক “আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে”-এর দিকে নজর পড়লো, তখনই, ঠিক তখনই আমি প্রথমবারের মতো বুঝতে পারলাম –এটা আমার খুব প্রিয় গায়ক বাপ্পাদার গাওয়া আমার খুব প্রিয় একটা গান – ‘পরী’ এবং আমি ভীষনভাবে চমকে উঠলাম। চমকে উঠলাম, কারণ, বুঝতে পারলাম- এই লিরিকটার রচয়িতা হচ্ছেন গীতিকার শেখ রানা, আমাদের নষ্টালজিক!

লিরিকটির পিছনের কাহিনী মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে যখন দ্বিতীয় লিরিকটাতে চোখ গেলো, তখন যেনো বিস্ময়াভূত হতেও ভুলে গেছি। এটা যে, আই সি সি বিশ্বকাপ ক্রিকেট’২০১১ –এর অফিসিয়াল থিম সং “জিতবে এবার জিতবে ক্রিকেট”! নষ্টালজিকের মতো আমিও আবেগাপ্লুত হলাম এর পিছনের কাহিনী পড়ে।

সামনের দিকে একটু একটু করে এগোতে থাকি, আর আমার সামনে উন্মোচিত হতে থাকে একটার পর একটা বিস্ময়! “বৃষ্টি পড়ে অঝোর ধারায়, বৃষ্টি পড়ে লজ্জা হারায়”, “আঁধার শেষে আলোয় হেসে সূর্য আকাশ বুকে ধরে, সামনে দাঁড়া”, “মেঘবালিকা এসো, আমার কাছে এসো”, “আমি ফিরে পেতে চাই সেই বৃষ্টি ভেজা সুর, আমি ফিরে পেতে চাই সাত সুখের সমুদ্দুর”, “চার দেয়ালে বন্দী ভোরের ঘুম, দরজাটাতে অনেক দিনের ঘুণ”, “বৃষ্টি কখন কার শিয়রে, জলের কণা আদর করে”, “তুমি হবে বুড়ি”, “খোলা আকাশ, একটি গাছ। সবুজ পাতা, একটি গাছ”- একটার পর একটা প্রিয় লিরিকগুলো পড়ছিলাম, পড়ছিলাম এই লিরিকগুলোর সৃষ্টির কাহিনী আর আমি হারিয়ে যাচ্ছিলাম এক অদ্ভূত ভালো লাগার জগতে।

আমার এই লেখার শুরুতে আমি সঞ্জীব চৌধুরী আর বাপ্পা মজুমদারের কথা বলেছিলাম, কারণ নষ্টালজিক এই দুইজন মানুষকে খুব পছন্দ করেন, ভালোবাসেন। তা যেনো প্রতিটি লিরিকের পিছনের কাহিনীতেই ফুটে উঠেছে। তাই তার ভালোবাসার মানুষদের সাথে আমার সংযোগটা জানানোর লোভটা আমি সামলাতে পারি নি, যেমন পারছি না এই লেখাটা শেষ করার আগে আমার খুব প্রিয় একটা লিরিক তুলে না দিয়ে ( আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে, এই লিরিকটার সাথে শেখ রানা ভাইয়া খুব আবেগিকভাবে জড়িত)-

“কাকে আমি নামটা ধরে ডাকি
কে বা বলো মুখটা তুলে চায়
আমার চোখে অন্য দুটি চোখ
স্বপ্ন সমান সমুদ্র ভাবায়।

আমি শুধু চোখটা খুঁজে ফিরি
আমার চোখে জলও ছবি আঁকে
ঐ মেয়েটা আমার মতোই একা
আমার মতো খোজে কি মেঘটাকে?
আমার মতোই খোজে কি মেঘটাকে?

মেঘের মেয়ে, আকাশটা আজ নীল
দখিণ হাওয়ায় উড়ছে শংখচিল
দিলাম তোমায় স্বপ্ন সমান আশা
দিলাম তোমায় শংখ ভালোবাসা
শংখচিলের ডানায় ভালোবাসা——- ”

সেরা তিন শব্দ

সেদিন সকাল বেলায় ভোরের সূর্য
জানালায় উঁকি দিয়ে
কানে কানে আমায় বললো,
‘তুমি যখন তার কাছে যাবে,
একটি লাল গোলাপ নিয়ে যাবে’ ।
আমি টকটকে লাল গোলাপের কাছে গেলাম।
গোলাপটি আমাকে দেখেই বলে উঠল,
‘আমি কাঁটাযুক্ত, তুমি রজনীগন্ধ্যার কাছে যাও’।
আমি একগুচ্ছ রজনীগন্ধ্যার কাছে গেলাম।
রজনীগন্ধ্যার একটি স্টিক আমাকে
সাদরে বরণ করে বললো,
‘আমি অতি সাধারণ, তুমি বরং
স্বর্ণ অশোকের কাছে যাও’।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের কোনো এক প্রান্তে-
আমি স্বর্ণ অশোকের কাছে গেলাম।
‘আমি রসহীন, তুমি যাও তার কাছে
দুর্লভ পারুল ফুলের মালা নিয়ে’।
রমনা পার্কে কারো অযত্ন, অবহেলায় বেড়ে উঠেছে
দু’টি পারুল গাছ, তা কেউ জানে না।
আমি সেই পারুলের কাছে গেলাম।
কিন্তু হায়! সমস্ত পারুল ফুল ঝরে পড়ে আছে।
শিশির সিক্ত নয়নে যেই আমি ফিরে আসবো
তখনই তারা কথা বলে উঠলো,
যেন আমায় বললো-
‘তুমি তার কাছে যাও-
পৃথিবীর সেরা তিনটি শব্দের ডালি সাজিয়ে
আমি তোমাকে ভালোবাসি’।

ক্যাডাভার


দিপু চুপচাপ ডক্টরস রুমে বসে আছে। রাত একটা বাজে। একটু আগে এক রোগী মারা গিয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার রোগী। বয়স্ক পুরুষ, পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যে বয়স হবে। পরনে খাকি রঙের লুঙ্গি, সাদা পাঞ্জাবী। দিপু পরীক্ষা করার সময় খেয়াল করেছে ডান হাতার বগলের দিকে একটা ছোট ছিদ্র আছে। সাদা পাঞ্জাবীর জায়গায় জায়গায় ছোপ ছোপ রক্ত। মাথার দিকে একটা অংশ দেবে গেছে। কপালের অনেকটা জায়গা খুবলে গেছে।

সন্ধ্যার দিকে রাস্তা পার হতে গিয়ে একটি মাইক্রোবাস লোকটিকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে। আশেপাশের লোকজন সচকিত হবার আগেই মাইক্রোবাসের চালক ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। এমনিতেই মহাসড়কের পাশে ছোট্ট একটা বাজার। লোকটার সাথে কিছুই ছিলো না। দুর্ঘটনা হবার পর যারা এসেছিলো তারা কেউ লোকটিকে চিনতেও পারলো না। চেনার চেষ্টা করতে করতেই কিছু সময় চলে গেলো। তারপর কি মনে করা দু’তিনজন যুবক ছেলে একটা ভ্যানে করে লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে এলো। কিছুক্ষণ পরেই ছেলেগুলোর আর খোঁজ পাওয়া গেলো না।

ইমার্জেন্সী বিভাগের ডাক্তার পোড় খাওয়া, অভিজ্ঞ। এরকম অবস্থার সম্মুখীন অনেকবার সে হয়েছে। সহজেই বুঝতে পারলো এই লোকের আত্নীয়-স্বজনের খবর পাওয়া অনেক কষ্টকর হবে। প্রথমে সে ভর্তিই করাতে চায়নি, কিন্তু যেহেতু সে একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সী ডাক্তার, মাথায় আঘাতের জন্য নিউরোসার্জারীর জুনিয়র ডাক্তার দিপুকে খবর দিলো।

দিপু যখন দেখতে এলো তখন লোকটির কোনো জ্ঞান নেই, আসলে দুর্ঘটনার পর থেকেই লোকটি অজ্ঞান। লোকটিকে দেখে দিপু নিউরো ওয়ার্ডে ভর্তি করাতে বললো। বিপত্তি ঘটলো ভর্তির জন্য অগ্রিম টাকা দিতে গিয়ে। টাকা দেবারতো কেউ নেই! হাসপাতালের নিয়ম, কিছু টাকা অগ্রিম না দিলে রোগী ভর্তি করানো যাবে না। ডক্টরস রুমে দিপু আর ইমার্জেন্সী ডাক্তার মুখোমুখি বসে আছে। নিঃশব্দ! হঠাৎ করে দেয়ালের ঘড়ির ঘন্টার শব্দে দুইজনেই যেনো চমকে উঠে। অভিজ্ঞ ইমার্জেন্সী ডাক্তার ‘উফ’ বলে উঠে, “বয়স হয়ে গেছে, তাই মনেই পড়েনি। আমাদেরতো হাসপাতালের নাইট ম্যানেজারকে ডাকা উচিত ছিলো!”

দিপু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে ফোনের দিকে হাত বাড়ায়।

ইকবাল সাহেব। রিটায়ার্ড আর্মি মেজর। এই বেসরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভালো মাইনেতেই এসেছে। দেখতে রাশভারী মনে হয়, অবশ্য আর্মির সব লোকদেরই দিপুর কাছে তা মনে হয়। কিন্তু দিপু জানে ইকবাল সাহেব রাশভারী লোক নয়, আমুদে একজন মানুষ। তাকে দিপুর ভালোই লাগে। সেই রিটায়ার্ড আর্মি মেজর ইকবাল সাহেব ইমার্জেন্সীতে আসতে আসতেই কিছু সময় ব্যয় করে ফেলেন, ইমার্জেন্সীতে এসে দুই ডাক্তারের কাছ হতে পুরো ঘটনা শুনতে আরো সময় ব্যয় করেন।

“আর বলবেন না, এইসব ঝামেলার জন্যইতো আমরা আছি। আপনারা ঠিক কাজ করেছেন ভর্তি করানোর আগে আমাকে খবর দিয়ে। দেখি কী করা যায়!” তিনি কি করা যায় দেখার জন্য একটু সরে গিয়ে কাকে যেনো ফোন দিলেন। কাছে এসে বললেন, “আপনারা পুলিশে ফোন দিয়েছেন? এটাতো পুলিশ কেস!” দিপু কিছুটা অসহায় কন্ঠে বলে উঠে, “আপনি পুলিশে খবর দেন, আমাদের বলেন আমরা রোগীকে ভর্তি করাবো কি না? রোগীর অবস্থা খুব ভালো না।” “ঠিকাছে,ঠিকাছে। ভর্তি করান, তবে ওয়ার্ডে নিবেন না, ইমার্জেন্সীতেই রাখেন। পুলিশ আসুক,” কথাটা বলেই ইকবাল সাহেব আবার ফোন হাতে তুলে নিলেন।

দিপু রোগীর কাছে চলে গেলো। এখনো নিশ্বাস নিচ্ছে, শুধু সেটুকুই। কেটে যাওয়া কপালের দিকে তাকিয়ে সিস্টারকে বললো সেলাই দেবার জিনিসপত্র নিয়ে আসতে। লোকটির মাথার কাছে বসে ওয়াশ দিয়ে সেলাই করতে শুরু করলো। লোকটিকে দেখে ওর বাবার কথা মনে পড়ে গেলো, একই রকম বয়স। এই লোকটার মতোই লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী পরে। গ্রামে থাকে, ছোট খাট ব্যবসা করে। দিপু যখন সরকারী মেডিকেল কলেজে চান্স পেলো, ওর বাবার আনন্দ যেনো শেষ হয় না। সবাইকে বলে বেড়ায়, “আমার ছেলে ডাক্তার! আমার ছেলে ডাক্তার!” দিপু খুব লজ্জা পায়, ও যে তখনো মেডিকেলে ভর্তিই হয়নি। তারপর কীভাবে যে ছয়টা বছর কেটে গেলো! ইন্টার্র্নি শেষ করেই এই বেসরকারী মেডিকেল কলেজটার নিউরোসার্জারীতে চাকরী পেয়েছে। গ্রামে গেলে ওর বাবা এবার সবাইকে বলে বেড়ায়, “আমার ছেলে খুব বড় ডাক্তার!” দিপু এবারও খুব লজ্জা পায়। হঠাৎ করে আনমনে হেসে উঠে। লোকটির দিকে তাকিয়ে পরম মমতায় কপাল সেলাই করতে থাকে।

থানা থেকে পুলিশের একজন এস আই এসেছে। ইকবাল সাহেবের সাথে যেনো কি কি কথা বললো। একবার লোকটির চেহারা দেখেই চলে গেলো। দিপু সেলাই করার রুম থেকেই শুনতে পেলো এস আই ইকবাল সাহেবকে বলছে, “চলুন ইকবাল সাহেব, একটু চা খেয়ে আসি।” আবার সব চুপচাপ, শুনশান নিরবতা। শুধু দিপু একমনে লোকটির কপাল সেলাই করে যাচ্ছে।

দিপুর একবার মনে হলো ওর প্রফেসরকে ফোন করে, দিপুর সাথে ওর প্রফেসরের খুব ভালো সম্পর্ক। দিপু খুব ভালো জানে বা কাজ ভালো করে, যে কারণেই হোক, ওর প্রফেসর ওকে খুব পছন্দ করে। “স্যার, আপনি কী একটু দেখে যাবেন?” ফোনের অপর প্রান্তে কিছুক্ষণ সাদা, তারপর ওর প্রফেসর বলে উঠেন, “দেখো, যদি সকাল পর্যন্ত বাঁচাতে পারো, তাহলে আমি তখন দেখে যাবো। এখন এক দাওয়াতে আছি, আর রোগীর লোককে নেগেটিভ কাউন্সেলিং করে রাখো।”
– স্যার, রোগীর লোকই তো পাওয়া যাচ্ছে না!
– ও! তাহলে আর কী করা! দেখো, কী করতে পারো!

দিপু আর কথা বলতে পারে না, আসলে ওর কথা বলতে আর ইচ্ছে করে না। অনেকদিন আগের কথা ওর মনে পড়ে গেলো। তখনো ও মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দেয়নি। ওর মায়ের খুব বুকে ব্যথা শুরু হলো। দিপু আর দিপুর বাবা খুব তাড়াতাড়িই থানা সদরের হাসপাতালে নিয়ে গেলো, তখনো সন্ধ্যা নামেনি। হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় একটা স্যালাইন ঝুলিয়ে দিলো। ডাক্তারকে পেলো না। জানা গেলো, চেম্বারে আছেন তিনি, এখন আসতে পারবেন না। দিপু ওয়ার্ড বয়ের প্রতি ভরসা না করে ওই সময়েই জেলা শহরের হাসপাতালের দিকে রওয়ানা দেয়। কিন্তু দূরত্বটা অনেক বেশী! এতটা সময় অপেক্ষা করতে দিপুর মায়ের ভালো লাগেনি, তিনি কাউকে কিছু না বলেই একদম চুপ হয়ে গেলেন। দিপুর ডাক্তার হবার জেদের শুরু তখন থেকেই। দীর্ঘশ্বাস ফেললো দিপু। ওর এখন মনে হচ্ছে ডাক্তার না হলেই মনে হয় ভালো হতো!

দিপু লোকটির দিকে তাকালো। এখনো শুধু নিশ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু বুকের উঠা নামাটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। ও হঠাৎ চিন্তায় পড়ে গেলো। মনে করতে পারছে না, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া লোকদের পোস্ট মর্টেম করা হয় কি না। দিপুর ফরেনসিক মেডিসিনের টুরের কথা মনে পড়ে গেলো। ওরা যখন ফোর্থ ইয়ারের ছাত্র, সরকারী হাসপাতালের মর্গে গিয়েছিলো পোস্ট মর্টেম দেখতে। বড় ভাইয়ারা বলেছিলো সেইন্ট আর রুমাল নিয়ে যেতে। ও বুঝতে পারেনি কেনো, তাই নিয়েও যায় নি। মর্গে যখন ডোম পানিতে ডুবে যাওয়া এক ব্যক্তির পেট কাটলো, ফুস করে বের হয়ে আসা গন্ধে দিপুর গা গুলীয়ে বমি আসতে চাইলো। ডোমের মুখ দিয়েও যেনো কী বিভৎস গন্ধ আসছিলো। যখন লোকটার মাথা হাতুড়ি আর বাটাল দিয়ে ভাঙ্গলো, দিপু সহ্য করতে পারেনি, বমিই করে ফেলেছিলো। পরে কিন্তু দিপু এটা নিয়ে লজ্জা পায়নি, কারণ সেদিন দুইটা মেয়ে অজ্ঞানই হয়ে গিয়েছিলো। আনমনে হেসে উঠলো দিপু।

মেডিকেলে প্রথম বর্ষে ডেড বডি কাটতে হয়, তখন ডেড বডিকে বলে ক্যাডাভার। প্রথম যেদিন ডেড বডি কাটবে, ওদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা হয়ে গিয়েছিলো কে কাটবে সেটা নিয়ে। ফরমালিনের তীব্র গন্ধ সহ্য করেও ডেড বডির গা ঘেঁষে দাঁড়াতো সবাই। একবার এক মজার ব্যাপার হয়েছিলো। দিনটা ছিলো ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ওদের সেদিন হৃৎপিণ্ড কাটার কথা। কিন্তু সেদিন কেউই কাটতে চাইলো না, কিন্তু দিপুর ব্যাপারটা না জানা থাকায়, সেই হৃৎপিণ্ড কাটলো। এরপর থেকে অনেকদিন পর্যন্ত ক্লাসের মেয়েদের কাছ হতে দিপুকে ‘হার্টলেস’ কথাটা শুনতে হয়েছে, এভাবেই হাড়ে হাড়ে সে ১৪ই ফেব্রুয়ারির মর্মার্থ বুঝতে পেরেছে। আর সে ছেলেই কি না পোস্ট মর্টেম দেখতে গিয়ে বমি করে দিয়েছে! আবারো আনমনে হেসে উঠলো দিপু, হাসি মুখেই আবার লোকটির দিকে তাকালো।

লোকটি আর নিশ্বাস নিচ্ছে না!

দিপু এখন চুপচাপ ডক্টরস রুমে বসে আছে। রুমের বাইরে ইকবাল সাহেবের কথা শুনতে পাচ্ছে, পুলিশের এস আই-এর সাথে ফোনে কথা বলছে। সব কিছু শুনতে না পারলেও ‘বেওয়ারিশ’ শব্দটা ভালো শোনা যাচ্ছে। একটু পরে ইকবাল সাহেবকে দেখা গেলো হাসপাতালের ডিরেক্টরের সাথে ফোনে কথা বলতে। কাজ যেনো এই মুহূর্তে সব ইকবাল সাহেবের!

*******************
মেডিকেল কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের আজ ওরিয়েন্টেশন। বড় বড় নামকরা প্রফেসরদের খুব গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য শেষে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে নিয়ে প্রিন্সিপ্যাল কলেজ পরিদর্শনে বের হয়েছেন। এনাটমি ডিসেকশন হলে গিয়ে তিনি সবাইকে বলছেন, “এটা তোমাদের এনাটমি ডিসেকশন রুম। এখানে তোমরা ডেড বডি কাটবে। ডেড বডিকে কখনোই তোমরা ডেড বডি বলবে না, বলবে ক্যাডাভার। তাদের দেহকে কখনোই অসম্মান করবে না। যা হোক, ওই যে লম্বা টেবিলে একটি ক্যাডাভার দেখছ, সেটা তোমরাই কাটবে, তোমাদের জন্যই এই ক্যাডাভার আনা হয়েছে।” কিছু উৎসাহী ছাত্র ক্যাডাভারের দিকে এগিয়ে গেলো। বয়স্ক ব্যাকটি, পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যে বয়স হবে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, ক্যাডাভারটার কপালে খুব সুন্দর করে একটা সেলাই দেওয়া আছে!

নিঝিনি (অনামিকা আপু, আপনার জন্য)

হঠাৎ করেই রেমির ঘুম ভেঙ্গে গেলো। এই সময়ে রেমির ঘুম ভাঙ্গার কথা নয়। মাত্র সকাল সাতটা বাজে। আর সকালটাও লন্ডনের চিরাচরিত সকালের মতো। সূর্যের আলো ঝলমলে চেহারা দেখার কোনো আভাসই পাওয়া যাচ্ছে না। শীত শীত ভাব তো রয়েছেই। এই অবস্থায় রেমির ঘুম ভাঙ্গলেও বিছানা থেকে উঠে আসার কোনো ইচ্ছাই নেই কিন্তু রান্নাঘরের টুং টাং আওয়াজ শুনে শিহাবের জন্য মায়াই লাগছে। শিহাব রেমিকে কোনো কাজই এখন করতে দেয়না। রেমি অনেকবার চেষ্টা করেছে, প্রত্যেকবার শিহাবের ভালোবাসাময় জেদের কাছে হার মেনেছে। তাই শিহাবের জন্য মায়া লাগলেও রেমি চুপচাপ শুয়েই রইলো।

একটা ট্রেতে করে মামলেট, ব্রেড, কর্ণফ্লেক্স এবং কফি নিয়ে শিহাব যখন রুমে ঢুকলো, শুভ্র বিছানায় শ্বেত পরীর মতো শরীরটাকে এলিয়ে দেওয়া রেমি তখন দেওয়ালে ঝুলানো এক বাচ্চার পোস্টারের দিকে সুখী সুখী ভাব নিয়ে তাকিয়ে ছিলো। শিহাব সেটা দেখে বলে উঠে, “জানি, যখন নিঝিনি আসবে তখন আর এই ছবির দিকে তাকানোরও সময় পাবেনা, সারাক্ষণ নিঝিনিকে নিয়েই থাকবে।” রেমি হেসে ফেললো। একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “নিঝিনি নামটা কখন ফাইনাল করলে?” “গতরাতে তুমি যখন বললে, নিঝিনি মানে ভালোবাসার চিহ্ন, তখন তোমার কন্ঠস্বরের ভালো লাগা শুনেই ঠিক করেছি আমাদের মেয়ের নাম নিঝিনি রাখবো। এবার চুপচাপ খেয়ে নাও, আমাকে এখনই কাজে যেতে হবে।”

রেমি মনে মনে খুব খুশি হলো। ও শিহাবকে বলেনি, গতরাতে যখন ফোনে ওর বাবার সাথে কথা হয়েছে, তখন এই নামটা ওর বাবাই দিয়েছেন। বলেছে্ন নিঝিনি হবে রেমি আর শিহাবের ভালোবাসার চিহ্ন। রেমি খুব লজ্জা পেয়েছিলো, আস্তে করে জানতে চেয়েছিলো এটা কোন ভাষার শব্দ। ফোনের অপরপ্রান্তে রেমির বাবা হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, “তোর বিদ্বান জামাই, বর্তমানে তোর রাঁধুনি- শিহাবের কাছ হতে জেনে নিস!” রাতের কথাটা মনে পড়ায় আনমনে হেসে উঠলো রেমি। ঘুমাতে যাবার আগে হাল্কা চালে শিহাবকে বলেছিলো ওদের সন্তানের নাম নিঝিনি রাখলে কেমন হয়! শিহাব ওর কথা রেখেছে, রেমির খুব ভালো লাগছে।

রেমির এখন এডভান্স পর্যায়। বাংলাদেশ থেকে প্রায় প্রতিদিনই ওর বাবা-মা ফোন করে খবর নেয়, যেনো মনে হয় রেমির চেয়ে তারাই বেশী উত্তেজিত! কেনো হবে না? প্রথমবারের মতো নানু ভাই হতে যাচ্ছে, রেমি তো প্রথমে বলতেই চায়নি ছেলে হবে, না মেয়ে। বাবার কাতর অনুরোধ শুনে শেষ পর্যন্ত আর না বলে থাকতে পারেনি। আর মেয়ে হবে শুনে, একদিনও দেরী হয়নি, নাম ঠিক করে ফেলেছে! বাবারা বোধহয় এমনই হয়!

মেয়েরা নাকি সবসময় বাবা ঘেঁষা হয়, রেমি মনে হয় আরো বেশী। হবেই না বা কেনো? সেই ছোটবেলা থেকেই রেমির যতো আবদার, সব বাবার কাছে। বাবাও তেমনি কখনো মেয়েকে নিরাশ করেননি। আবার এরই মাঝে মেয়েকে দিয়েছেন স্পষ্টবাদী, সাহসী, ভদ্র আর আত্মসচেতন হওয়ার অমূল্য শিক্ষা এবং দিয়েছেন এক নির্লোভ ও দায়িত্বশীল সরকারী কর্মকর্তার মেয়ে হবার দুর্লভ অহংকার। রেমি কেনো ছেলে না হয়ে মেয়ে হলো, এটা নিয়ে রেমির মায়ের মনে কোনো কষ্ট থেকে থাকলেও, রেমির বাবা রেমিকেই করে রেখেছেন তার একমাত্র সন্তান হিসেবে। তাই বাবার সব ভালোবাসাই রেমি নিরংকুশভাবে পেয়েছে। বিয়ের পর যখন শিহাবের সাথে লন্ডনে চলে আসে, তখনো রেমি জানে বাবার এই ভালোবাসায় কেউ ভাগ বসাতে পারবেনা। কিন্তু এখন পারবে, এখন একজন এই ভালোবাসায় ভাগ বসাতে পারবে, সে নিঝিনি! হেসে ফেললো রেমি, ও কেমন মা হতে যাচ্ছে, যে তার মেয়েকে, এই পৃথিবীতে আসার আগেই প্রতিদ্বন্দী বানিয়ে ফেলছে!

ডোরবেলের শব্দে সচকিত হয়ে উঠে রেমি। এই সময়েতো কারো আসার কথা নয়! ধীরে ধীরে এসে সে দরোজা খুলে শিহাবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু অবাক হয়ে গেলো। অসহায়ের হাসি দিয়ে শিহাব বলে উঠে, “কেমন আছো তুমি?” চমকে উঠে রেমি, ভুরু কুচকে তাকায় শিহাবের দিকে। দরোজা থেকে রেমিকে সরিয়ে ভিতরে ঢুকে শিহাব, বলে, “খুব পানির পিপাসা পেয়েছে।” উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে রেমি, “কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ? উল্টাপাল্টা কথা বলছো কেনো?” নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না শিহাব, অস্ফুট স্বরে বলে উঠে, “বাবা নেই!”
রেমি প্রথমে বুঝতে পারেনি, ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। শিহাবকে কিছু বলতে যাবে, তখনই মনে হলো শিহাবের বাবা চার বছর আগেই মারা গেছেন, রেমির আর শিহাবকে কিছু বলা হলো না।

********
কোনো এয়ারলাইন্সই রাজী হলো না রেমিকে নিয়ে বাংলাদেশে আসতে, রেমির এডভান্স প্রেগনেন্সীর জন্য। পাগলপ্রায় রেমিকে তিনদিনের মাথায় ভর্তি করা হলো হাসপাতালে।

কেবিনে শুয়ে থাকা রেমির দিকে শিহাব বাড়িয়ে দিলো নিঝিনিকে। আলতো করে নিঝিনির গালে হাত দিলো রেমি, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো এক ফোঁটা জল।

নিঝিনির আর রেমির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠা হলো না!

(অনামিকা আপু, আপনার জন্য আমার খুব প্রিয় একজন মানুষের কিছু কষ্টের কাহিনী উপহার দিলাম, জানি না আপনার কেমন লাগবে!)

অণুগল্পঃ একটি ভালোবাসার মৃত্যু

সন্ধ্যার গোধূলী আলোয় রায়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। চোখে আগামী দিনের রঙ্গিন স্বপ্ন। টিটু শহরের সবচেয়ে বড় এবং নামকরা হাসপাতালের আইসিইউ-এর ইনচার্জ হিসেবে গত সপ্তাহে যোগদান করেছে। দুই বছর হলো টিটুর সাথে ওর বিয়ে হয়েছে, রায়া নিজেও একজন ডাক্তার। একটি বেসরকারী হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কাজ করছে। দুইজনের ভালোবাসার বিয়ে। বিয়ের পর থেকেই রায়া চেয়েছিলো আলাদা বাসা নিয়ে টিটুর সাথে থাকতে। বাবা-মা অন্তপ্রাণ টিটু তার শিকড়কে ছেড়ে যেতে চায় নি, কিন্তু বার বার রায়ার প্ররোচনায় শেষে রাজী হলো, রায়াকে জানালো শহরের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের আইসিইউ-এর ইনচার্জ হিসেবে আবেদন করেছে। চাকরীটা পেয়ে গেলেই আলাদা বাসা নিয়ে দুজনে সংসার শুরু করবে। সন্ধ্যার গোধূলী আলোয় রায়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আগামী দিনের সেই রঙ্গিন স্বপ্নের কথা কল্পনা করছে।

রহমান সাহেব একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ের বিভিন্ন অলি-গলি তার জানা। কিন্তু যখন তার সমস্ত মুলধন হঠাৎ করে শিপিং ব্যবসায় খাটায়, তার অব্যবসায়ী ডাক্তার ছেলে টিটু তা মেনে নিতে পারে নি, কিন্তু বাবার সিদ্ধান্তকেও অসম্মান করে নি। রহমান সাহেবের জাহাজ যখন প্রথমবারের মতো বিদেশ থেকে বিভিন্ন কোম্পানির মালামাল নিয়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো, তখনই টিটু তাকে আলাদাভাবে থাকার কথা জানালো। মনে মনে প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেলেও রহমান সাহেব তা হাসিমুখে মেনে নিলেন, শুধু জানালেন জাহাজের প্রথম শিপমেন্টটা দেশে আসার পরেই যেনো টিটু রায়াকে নিয়ে নতুন বাসায় উঠে।

সময়টা ছিল কাল বৈশাখীর। রহমান সাহেব খবর পেয়েছেন আর দুই দিনের মধ্যেই জাহাজ বন্দরে এসে ভিড়বে। এদিকে আবহাওয়া অফিস থেকে সাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টির কথা প্রচার করা হলো। রহমান সাহেব খুব চিন্তিত হয়ে পরলেন। টিটুর সাথেও কথা বলতে পারছেন না, হঠাৎ করে সৃষ্ট ডাক্তার সংকটে আগামী দুইদিন টিটু হাসপাতালেই থাকবে। দুইদিন পর জাহাজ মোহনাতে এসে পৌঁছালো। একই সাথে আবহাওয়াও পাল্লা দিয়ে খারাপ হতে লাগলো। এক সময় শুরু হলো এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়।
************************
সারারাত হাসপাতালে টিটুর আতঙ্কে কেটেছে। বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দে আর জলোচ্ছ্বাসের প্রবল আওয়াজে ভীতগ্রস্ত, নিদ্রাহীন টিটু সকালের দিকে যখন একটু দুই চোখের পাতা এক করবে, তখনই এক ফোনে ওর পৃথিবীটা যেনো দুলে উঠলো।

রহমান সাহেবকে যখন অচেতন অবস্থায় হাসপাতালের আইসিইউতে আনা হলো, টিটু কেমন যেনো হত- বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সহকর্মীর ডাকে সম্বিত ফিরে পেয়ে যখন রহমান সাহেবকে সিপিআর দিতে লাগলো, দুই চোখেই ঝাপসা দেখতে পাচ্ছিলো। টিটু দুই হাত দিয়ে সিপিআর দিয়ে যাচ্ছে, আর মানসপটে ছোটবেলা থেকে একের পর এক ঘটনা যেনো দেখতে পাচ্ছে। বুঝতে পারার পর টিটুর যখন প্রথম জ্বর হলো, ওর বাবা সারারাত বিছানার পাশে বসে মাথায় জলপট্টি দিয়েছিলো। টিটুর সাথে ওর মায়ের চেয়ে ওর বাবার সাথেই সম্পর্কটা ছিলো একই সাথে খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং নীতিবান অভিভাবকের মতো। রায়াকে যখন বিয়ে করতে চাইলো, ওর মা মোটেও রাজী না থাকলেও, বাবার জন্যই রায়া এই বাড়িতে আসতে পেরেছিলো। আবার আলাদা বাসা নেওয়ার কথাও টিটু ওর বাবাকেই বলতে পেরেছে, মাকে নয়। সেই বাবা আজ অচেতন, টিটু নিজের বাবাকে বাঁচানোর জন্য সিপিআর দিয়ে যাচ্ছে!

ঝড়ের পরদিন সকাল বেলায় যখন খবর আসে রহমান সাহেবের জাহাজটা মোহনাতেই ডুবে গেছে, তিনি এই আঘাতটা আর সহ্য করতে পারেন নি। তাকে যখন অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়, তার কোনো কোনো আত্মীয়-স্বজন কোথায় কবর হবে সেটা নিয়ে গবেষনা শুরু করে দিলো। কিন্তু টিটুর জ্ঞান, অদম্য ইচ্ছাশক্তি সেই গবেষণাকে বেশিদূর এগোতে দেয় নি। কিন্তু রহমান সাহেবের জীবন বাতি নিভে না গেলেও, মাথায় রক্তক্ষরণের জন্য কোমা অবস্থায় সে রয়ে গেলো। টিটুর আর আলাদা বাসায় উঠে রায়ার সাথে সংসার শুরু করা হয়ে উঠলো না।
**************************
“এভাবে আর কতোদিন? কতোদিন তুমি এখানে থাকবে?” রায়া প্রায় উত্তেজিতভাবে টিটুকে জিজ্ঞেস করে। টিটু রায়ার চোখে চোখ রেখে শান্তভাবে বলে, “যতদিন না পর্যন্ত বাবা জ্ঞান ফিরে পাচ্ছে,” রায়া অধৈর্য্য হয়ে উঠে, “প্রায় এক বছর হতে চললো, আর কবে জ্ঞান ফিরবে? আর তাছাড়া তুমি তো একজন নার্স রাখতে পারো। আমরা অন্য বাসায় উঠলে সেখান থেকে তুমি এক-দুইদিন পর পর দেখে যেতে পারো, তাই না?” “বাবাকে এই অবস্থায় রেখে আমি কখনো আলাদাভাবে থাকতে পারবো না, আর মা-ই বা কীভাবে সবদিক একা সামলাবে? জাহাজের ইনস্যুরেন্সের ব্যাপার আছে, কোম্পানিগুলোর ক্ষতিপূরণের ব্যাপার আছে, বাবার চিকিৎসার ব্যাপার আছে, আরো কত কি। তুমি কীভাবে এইসব কথা এখন বলতে পারলে!” অবাক হয়ে যায় টিটু, “তুমিও তো একজন ডাক্তার। আজ যদি তোমার বাবার এই অবস্থা হতো, তুমি কি করতে?”

ঝাঁঝের সাথে রায়া বলে ফেললো, “তাহলে আমার মা বলতো, জামাইকে নিয়ে অন্য জায়গায় থাকো। মাঝে মাঝে দেখে যায়ো,” অসহিষ্ণুতার সাথে আরো বলে, “আমার আর এই পরিবেশে থাকতে ভালো লাগছে না, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তুমি বুঝতে পারছো না, একজন অজ্ঞান রোগীর সাথে থাকাটা কতটা যন্ত্রণাকর ব্যাপার!” টিটু চুপ হয়ে যায়। নিনির্মেষে তাকিয়ে থাকে রায়ার দিকে, যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো সে। কি যেনো চিন্তা করে। একসময় মাথা নিচু করে রুম থেকে বের হয়ে যায়। যাবার আগে অস্ফুট স্বরে বলে, “যন্ত্রণাকর ব্যাপার হলে তুমি তোমার বাবার বাসায় চলে যেতে পারো।”
*****************************
প্রায় ছয় মাস পর। টিটু হাসপাতাল থেকে বাসায় এসে এখনো রহমান সাহেবের রুমে যায় নি। ওর মা ওর হাতে একটা বন্ধ লম্বাটে খাম ধরিয়ে দিলো। চিন্তা করতে করতে খামটা ছিড়ে ভিতরের কাগজটা পড়তে লাগলো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাগজটা টেবিলের উপর রেখে ওর রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। টিটুর মা কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলো এটা তালাকনামা, রায়ার উকিল পাঠিয়েছে!
******************************
আজ রহমান সাহেবের রুমে ঢুকেই টিটু থমকে দাঁড়ালো। রহমান সাহেব আজ প্রায় দেড় বছর পরে চোখ খুলে তাকালেন, ডান হাতটা সামান্য উঁচু করতে পারলেন। টিটু কাছে এসে ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরলো, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো অশ্রু, আনন্দাশ্রু।

একটি অন্যরকম অণুগল্পঃ নীলা আর আমি

আজ সকাল থেকেই আকাশটা মুখ ভার করে গুড় গুড় শব্দে ডাকছে। নীলা ভেবেছে এই বুঝি বৃষ্টি নামলো, তাই ভার্সিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস থাকা সত্ত্বেও সে গেলো না। বরং বাদলা দিনে কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানাতে শুয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনার আয়োজন করতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত যখন দুপুর হয়ে এলো, কিন্তু বারি পাত আর হলো না, নীলা খুব বিরক্ত হয়ে উঠলো। বিরক্তভাব কাটানোর জন্যই ঠিক করলো এখন এই আবহাওয়ার মধ্যে নাফিসার বাসায় যাবে। দুই ঘনিষ্ঠ বান্ধবী জমিয়ে আড্ডা দিবে।

নাফিসাকে ফোন দিয়ে দুপুরে কোনো রকমে কিছু মুখে দিয়েই নীলা বাসা থেকে বের হয়ে এলো। সামনের মোড় থেকে মিটারের ভাড়ার চাইতে দ্বিগুন টাকায় সিএনজিতে করে যখন প্রধান সড়কের পাশে নাফিসার বাসার সামনে আসলো, তখনই মুষলধারে বৃষ্টি নামলো।

প্রায় ভিজা অবস্থায় নীলা নাফিসার বাসায় ঢুকেই আমাকে দেখে মনে হলো ভুত দেখার মতো চমকে উঠেছে। আমি নিয়াজ, নাফিসার খালাতো ভাই। আমি আর নাফিসা ছয় মাসের বড়ো-ছোটো, তুই-তোকারি সম্পর্ক। নাফিসা আর নীলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাতে পড়ছে আর আমি নামের আগে ডাক্তার শব্দ বসানোর জন্য প্রানান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছি, থাকি মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে। নাফিসার সাথে নীলার বন্ধুত্ব সেই স্কুল থেকে । ওরা দুইজনেই একই স্কুল, এরপর একই কলেজ এবং এখন একই ভার্সিটিতে একই সাবজেক্টে পড়ছে। বন্ধু বলে একেই!

নাফিসার খালাতো ভাই হবার সুবাদে নীলার সাথে আমারো সেই আদিকাল থেকেই পরিচয়। নাফিসার অগোচরে নীলার সাথে সেই পরিচয় থেকে পরিণয় কখন যে শুরু হয়েছে, তা আমি নিজেও ভুলে গেছি। নীলা জানে না, আমার সাথে ওর সম্পর্কের কথাটা আমি যে নাফিসাকে বলেছি। ও চায় নি নাফিসা আমাদের সম্পর্কের কথাটা জানুক। মেয়েরা পারেও বটে! খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবীকে না জানিয়ে তার খালাতো ভাইয়ের সাথে প্রেম করা!

গত দুই দিন ধরে নীলার সাথে আমার ঝগড়া চলছে, সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে। গত দুইদিন আগে ওর সাথে দেখা করতে আমি একটু দেরি করেছি। কেনো আমি দেরি করেছি, এটাই আমার অপরাধ। তাই, নীলা এই দুইদিন আমার ফোন রিসিভ করছে না, সেও ফোন করছে না। আমি নাফিসাকে বলে রেখেছিলাম নীলা ওদের বাসায় যখনই আসবে, আমাকে যেনো খবর দেয়। নাফিসা একটু আগে আমাকে খবর দিয়েছিলো।

আমি যখন নাফিসার বাসায় এলাম, তখনই আমার ছোট বোনের বর আমাকে ফোন দিলেন, “ভাইয়া, ডাক্তার বলছে রিদিতার সিজার করতে হবে এখন। আপনার সময় থাকলে কি আপনি একটু আসতে পারবেন?” আমি এখনও ডাক্তার না হলেও, পরিবারের একমাত্র মেডিকেল পড়ুয়া ছেলে হিসেবে যে কোনো হাসপাতাল সংক্রান্ত কাজে আমার ডাক পড়বেই। আমার বোন রিদিতার সিজারের তারিখ যে আজকেই পরবে, কে যে ভেবেছিলো! এদিকে বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি বিষণ্ণমনে নাফিসার বাসা থেকে বের হবার সময়ই নীলা এলো। ওর চমকে যাওয়া প্রশ্নবোধক চোখের সামনে দিয়ে আমি কিছু না বলেই বাইরে চলে আসলাম। নীলা পিছন ফিরে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।

নাফিসার রুমে ঢুকেই বললো, “কি রে, তোর পাজী, হতচ্ছাড়া ভাইকে দেখলাম মনে হলো!” কোনো রকমে না হেসে নাফিসা গম্ভীরভাবে বললো, “হ্যাঁ, আমার কাছে এসেছিলো একটা পরামর্শের জন্য। ওর মেডিকেলের জুনিয়র একটা মেয়ে গতকালকে ওকে ভালোবাসার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ও হ্যাঁ বলবে, না কী, না বলবে, সে ব্যাপারে আমার মূল্যবান মতামত নিতে এসেছিলো।” নীলা ভুরু কুচকিয়ে কি যেনো বলতে গিয়ে থেমে গেলো। নাফিসার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো, “চল, ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজি।”

দুই বান্ধবী মনের আনন্দে সেই ছোট্ট বেলার মতো বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলো। এক সময় নাফিসা বলে ফেললো, “জানিস, আজ নিয়াজ, মামা আর আমি খালা হতে যাচ্ছি।”
-মানে?
-মানে, আজ আর একটু পরে নিয়াজের ছোট বোন রিদিতার সিজার হবে, বুঝেছেন নীলামনি?

নীলা আজকের দিনে দ্বিতীয় বারের মতো চমকে উঠলো। ও জানতো, নিয়াজ বলেছে, রিদিতা মা হতে যাচ্ছে। সেটা যে আজকেই হবে নীলা বুঝতে পারে নি, আসলে বোঝার কথাও না। নীলার আর বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে না। নিয়াজের প্রতি গত দুইদিন ধরে জমে থাকা রাগটাও পানি হয়ে গেলো। খুব ইচ্ছে করছে নিয়াজের সাথে ফোনে কথা বলতে। কিন্তু নীলা কোনোভাবেই নাফিসার সামনে নিয়াজকে ফোন দিবে না। নাফিসাও বান্ধবীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বললো, “চল, রুমে যাই, আরেকটু ভিজলে ঠাণ্ডা লাগবে।”

নীলা ওর ভিজা পোশাক খুলে নাফিসার একটা পোশাক পরলো। নাফিসা চা বানানোর কথা বলে রান্নাঘরে যাওয়া মাত্রই নীলা নিয়াজকে ফোন দিলো।
-কি খবর নিয়াজ? রিদিতার কি অবস্থা?

ফোনে নীলার উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শুনে কেনো জানি না, আমার খুব ভালো লাগলো। আমার পরিবারের প্রতি ওর এই দরদের জন্যই ওকে আমি আরো বেশী পছন্দ করি। দুষ্টু কন্ঠে বললাম, “তুমি দুই মিনিট আগে মামী হয়েছো!” নীলা আমার কথা শুনে হেসে ফেললো। আরো কিছুক্ষণ নীলার সাথে কথা বলে এবং আগামীকালকে কোথায়, কখন দেখা করবো জেনে নিয়ে ফোন রেখে দিলাম।

আমার অসম্ভব আনন্দ লাগছে। আজ আমি মামা হয়েছি। মামা শব্দটার মধ্যেই একটা আলাদা ভাব আছে। আমি আবার নিয়মিতভাবে ব্লগিং করি। পিচ্চি বাবুর ছবি মোবাইলে তুলে নিয়েই হোস্টেলে চলে এলাম। দ্রুত ল্যাপটপ ওপেন করে নেটের কানেকশন দিয়ে ব্লগে ঢুকে লেখা শুরু করলাম আমার পিচ্চি ভাগনিকে নিয়ে। লেখা যখন প্রায় শেষ, নাফিসা আমাকে ফোন দিলো।
-হ্যলো, নিয়াজ, তুই কোথায়?

ফোনে ঠিকমতো নাফিসা কথাও বলতে পারছে না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নাফিসা আর নীলা, দুই বান্ধবী, জমিয়ে আড্ডা দেবার পর একটু আগে নীলা বললো রাত হয়ে যাচ্ছে, বাসায় যাবে। নাফিসার বাসার সামনে কোনো সিএনজি না পেয়ে রাস্তা অতিক্রম করে আরেক পাশে যাবার সময় দ্রুতগতিতে আসা এক বাসের ধাক্কায় নীলা ছিটকে পড়ে। পুরো ব্যাপারটাই ঘটে নাফিসার চোখের সামনে।

ফোনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নাফিসা নিয়াজকে বলতে থাকে, “নিয়াজ, নীলা আর নেই। একটু আগে রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে!”

পরিশিষ্টঃ

“মামা, এই জন্যই তুমি তাহলে এই জীবনে আর বিয়ে করলে না! এতো ভালবাসতে আন্টিটাকে!” ওর কথা বলার ধরনে আমি ফিক করে হেসে দিলাম, বললাম,
-এই তো, তুই তাহলে বুঝতে পার লি।
-মামা, তুমি কী আমাকে এই আন্টির নামেই নীলা ডাকো?
একটু চুপ থেকে, একটা বড়ো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, “হ্যাঁ, তোকে আমি ওর নামেই ডাকি, নীলা!”

আমি ‘বাবা’ ডাক শুনতে চাই……আমি ‘বাবা’ ডাকতে চাই

(১)

মো. গোলাম মোস্তফা। ২৮ বছরের উচ্ছ্বল যুবক। সদা হাসিখুশি, আলাপী মোস্তফা। গ্রামের সবাই তাকে খুব পছন্দ করে, যে কারো যে কোনো প্রয়োজনে ডাক দিলেই মোস্তফাকে পাওয়া যাবে। কোথাও বিয়ে হবে, কণে বাড়ির সব আয়োজন মোস্তফা সামলাবে। কেউ মধ্যরাতে অসুস্থ হয়ে পড়লো, তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসবে মোস্তফা। কারো অর্থনৈতিক সমস্যা, মোস্তফা এগিয়ে আসবে। কোথাও কোনো খেলাধুলা হবে, মোস্তাফাকে ডাকো। এই হচ্ছে মোস্তফা, গ্রামের সবার মধ্যমনি। আর মোস্তফার মধ্যমনি হচ্ছে তার বাইক। যেখানেই যে কাজে যাবে, সবার আগে বাইকে করে মোস্তফা যাবে।

ইদানীং মোস্তফা খুব ব্যস্ত। সে বিয়ে করেছে প্রায় এক বছর হয়েছে। এখন সে বাবা হতে চলেছে। তার প্রথম সন্তান, বংশের প্রথম সন্তান। প্রতিদিন রাতে সে আর তার স্ত্রী ঘুমাবার সময় তাদের অনাগত সন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে, কল্পনার জাল বুনে। স্বামী, স্ত্রী খুনসুটি করে, বাচ্চাকে আগে ‘মা’ ডাক শিখাবে, না কি ‘বাবা’ ডাক শিখাবে। ‘বাবা’ ডাক শোনার প্রবল আতিশায্যে মোস্তফার সারারাত ঘুম হয় না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিকায়নের জন্য তারা জানে তাদের একটি ছেলে সন্তান হবে। ফুটফুটে, সুস্থ, সবল ছেলে সন্তান। মোস্তফার স্বপ্ন, ছেলেকে নিজের মতো করে গড়ে তুলবে। নিজে যা করতে পারেনি, ছেলেকে দিয়ে তা করাবে। ছেলের মধ্যেই নিজেকে ধরে রাখবে এই নশ্বর পৃথিবীতে। বাজারে নবজাতক শিশুদের নামকরণের অনেক বই পাওয়া যায়। প্রায় সবগুলো বই-ই মোস্তফার কেনা হয়ে গেছে। প্রতিদিন রাতে তারা এক একটি নাম পছন্দ করে, আর বাতিল করে। নাম রাখা আর হয় না।

আজ গ্রামের বাজারের মুন্সী মিয়ার চা দোকানে বসে মোস্তফা বন্ধুদের সাথে গল্প করছে। আজ হাঁটবার, সকালের দিকেই সে বাজারে এসেছে। অনাগত সন্তানের জন্য ব্যাগ ভর্তি খেলনা কিনে মুন্সী মিয়ার দোকানে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে এসেছে। রোযার দিন, অতএব চা-সিগারেটের বালাই নেই। বন্ধুরা অনেক কথা বলে যাচ্ছে। মীরসরাইয়ে ট্রাক উল্টে একচল্লিশ ছাত্রের মৃত্যু, সোনিয়া গান্ধীর হাতে তুলে দেওয়া দুইশত ভরি সোনার পদক, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশে আসা, সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবিদের আদালত অবমাননা বা পারস্পরিক হাতাহাতি-কী নেই সেই আড্ডায়! কিন্তু কোনো কিছুতেই মোস্তফা ঠিকমতো মন দিতে পারছে না। বন্ধুদের কথায় হা হু করে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দাঁত দিয়ে আঙ্গুলের নখ কাটছে। এককথায়, মোস্তফাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে।

দুইদিন আগেই মোস্তফার স্ত্রীর ইডিডি (Expected date of delivary)পার হয়ে গেছে। অথচ এখনো প্রসব বেদনা শুরু হয় নি। সে বুঝতে পারছে তার স্ত্রীকে এখনই ডাক্তার দেখানো উচিৎ, কিন্তু গ্রামীন সমাজের মুরুব্বীদের কিছু বাধা এখনো সে ডিঙ্গাতে পারে নি। তবে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, আর একদিন সে অপেক্ষা করবে। এরমধ্যে কিছু না হলে স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে, কারো বাধাই সে তখন শুনবে না। রিয়াসাতের কথায় মোস্তফার মৌনব্রত ভঙ্গ হলো।

-কি রে, তুই কী কোনো কথা শুনছিস?
-হ্যা, আমি শুধু ‘বাবা’ ডাক শুনছি।

মোস্তফার ত্বরিত জবাবে সবাই হেসে উঠলো। এমন সময় মোস্তফার মোবাইল ফোনের রিং বেজে উঠলো। বাড়ি থেকে ফোন এসেছে।

প্রায় দুই ঘন্টা হলো মোস্তফার স্ত্রীর পানি ভেঙ্গেছে। বাড়িতে দাই মা এনে চেষ্টা করানো হচ্ছে, কিন্তু কোনো কিছুই হচ্ছে না। মোস্তফা মোবাইলে এই সংবাদ শুনে সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করলো স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। মুন্সী মিয়ার চা দোকান থেকে দ্রুত উঠে বাইকে করে ঝড়ের গতিতে বাড়ির দিকে যেতে লাগলো। ওর একটাই চিন্তা, স্ত্রীকে বাঁচাতে হবে, ‘বাবা’ ডাক শুনতে হবে। ছেলেকে দিয়ে ওর সমস্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের সময় ওর পাশে ছেলের মা-কেও থাকতে হবে। ভাবতে ভাবতে মোস্তফা যেনো উড়ে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। হঠাৎ করে ওর মাথাটা একটু চক্কর দিয়ে উঠলো। চোখের সামনে কিছু দেখতে পাচ্ছে না, অন্ধকার ওকে গ্রাস করে নিচ্ছে। বাইকের হ্যান্ডেলের উপর রাখা ওর হাত দুটি নিশ্চল হতে লাগলো। ছিটকে পড়লো মোস্তফা, দূরে কোথাও। তার পাশেই বাইকের চাকা দু’টো অনবরত ঘুরতে লাগলো।

(২)

১৩ই আগষ্ট থেকে ১৫ই আগষ্ট পর্যন্ত আমি ছুটিতে ঢাকায় ছিলাম। রোযার মাসে এই প্রথম পরিবারের (পরিবার বলতে শুধুমাত্র আমার সহধর্মিনী) সাথে ইফতার করার আনন্দে মন খুব পরিপূর্ণ। একই সাথে প্রিয় চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনীরের অকাল প্রয়ানে কিছুটা হতভম্ব। এই অবস্থায় ১৬ই আগষ্ট ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জের বিরক্তিকর বাস যাত্রা শেষে দুপুরবেলায় যখন হাসপাতালে আসি, যাত্রাজনিত আলসেমীর কারণে ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীগুলো আর দেখতে ইচ্ছে করছিলো না। কিন্তু একটা রোগীর সামনে ইউসুফ ভাইয়ের (ডাঃ মো. ইউসুফ, রেজিস্ট্রার, নিউরো আইসিইউ) অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকাটাকে দেখে শরীরের সমস্ত আলস্য নিয়ে গুটি গুটি পায়ে রোগীটার দিকে এগিয়ে গেলাম।

রোগীটিকে জীবন রক্ষাকারী মেশিনের সাহায্যে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। ব্রেইনের সিটি স্ক্যানে দেখলাম একটা বিশাল রক্তপাত, রোগীর বয়স আর রক্তপাতের জায়গা দেখে মনে হচ্ছে কোনো rupture aneurysm (মাথার ভিতরের কোনো কোনো রক্তনালীর দেয়াল জন্মগত কারণে বা অন্য কোনো কারণে, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল জমে যাওয়া অথবা কিছু জেনেটিক কারনে দুর্বল হয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে থাকে, অনেক সময় সেটা ফেটে গিয়ে স্ট্রোকের কারণ ঘটায়)। বুকের এক্সরে দেখে বুঝতে পারলাম স্ট্রোকের সময় রোগী হয়তোবা বমি করেছিলো, সেটার কিছু অংশ শ্বাসনালী হয়ে ফুসফুসে গিয়ে aspiration pneumonia হয়েছে। মেশিনে দেওয়া সত্ত্বেও অক্সিজেন সাচুরেশন বাড়ছে না, শরীরের রক্তচাপ কমে যাচ্ছে, সবকিছু মিলিয়ে অবস্থা খুব আশাব্যাঞ্জক নয়। সাধারণত এই অবস্থায় রোগী খুব একটা ফেরত আসে না, তাই আমি ওখান থেকে চলে আসলাম। আসার আগে ফাইলে চোখ বুলিয়ে দেখলাম রোগীর নাম মো. গোলাম মোস্তফা, বয়স ২৮ বছর।

প্রায় ঘন্টাখানেক রোগীকে নিয়ে যুদ্ধ করার পর ইউসুফ ভাইয়া যখন একটু বিশ্রাম নিতে এলো, আমি উনার desperate মনোভাবের কারণ জানতে চাইলাম। “দুইদিন আগে রোগীটির একটি সন্তান হয়েছে, ছেলে সন্তান, প্রথম সন্তান। তখন সে ভেন্টিলেটর মেশিনে, ছেলে জন্মানোর খবর জানে না। তোমার ভাবীও সন্তানসম্ভবা। আমি যেমন চাই, আমার সন্তানকে আমি দেখি, আমার সন্তান আমাকে দেখুক, ঠিক তেমনি ভীষনভাবে চাচ্ছি এই বাচ্চাটিও তার বাবাকে দেখুক, বাবাও তার বাচ্চাকে দেখুক। জানি না এই অসম যুদ্ধে জিতবো কী না, তবুও যতক্ষন শ্বাস, ততক্ষন আশ,” এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলেন ইউসুফ ভাইয়া।

(৩)

ইউসুফ ভাইয়া এখনও যুদ্ধ করে যাচ্ছেন তাঁর সমস্ত জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর অভিজ্ঞতা নিয়ে মোস্তফাকে বাঁচানোর জন্য, আর মোস্তফা যুদ্ধ করে যাচ্ছে মৃত্যুর সাথে, তার সন্তানের কাছ হতে ‘বাবা’ ডাক শুনবার জন্য, সন্তানকে ‘বাবা’ ডাকার সুযোগ করে দেবার জন্য।

(এই লেখাটা ইউসুফ ভাইয়াকে উৎসর্গ করা, যিনি এক সন্তানের কাছে তার বাবাকে ফিরিয়ে দেবার জন্য দিন-রাত যুদ্ধ করে যাচ্ছেন।)