দিপুর গল্প

দিপু যেনো বিশ্বাসই করতে পারছিলো না! আজ এই পরিস্থিতিতে সে সন্ধ্যাকে দেখবে কখনো চিন্তাই করেনি। সন্ধ্যাও দিপুকে দেখে চমকে উঠলো। মুহূর্তটা ফ্রিজ হয়ে থাকলো কিছুক্ষন। দিপুই প্রথম প্রকৃতিস্থ হলো। সন্ধ্যাকে এড়িয়ে ইমার্জেন্সী মেডিকেল অফিসারকে জিজ্ঞেস করলো রোগীর আত্নীয় স্বজন কেউ আছে কি না।

“আমিই রোগীর স্ত্রী,” সামনে এগিয়ে এসে স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো সন্ধ্যা। দিপুর কাছে মনে হলো কন্ঠটা কী একটু কেঁপে উঠলো! সেই পরিচিত কন্ঠস্বর! বহুদিনের পরিচিত! “প্রায় দুই ঘন্টা আগে কথা কথা বলতে বলতেই হঠাৎ করে খিচুনী শুরু হয়। এক দুই মিনিটের মতো ছিলো, এরপর বমি করলো,” জানালো সন্ধ্যা।

দিপু রোগীর দিকে তাকালো। বয়সে ওর থেকে কিছুটা বড়ই হবে। দেখতেও সুদর্শন, মায়া মায়া লাগে। পুরুষদের চেহারায় মায়া মায়া ভাবটা মনে হয় থাকা উচিত নয়, সেখানে থাকবে কিছুটা রুক্ষতা! দিপু সেটাই ভাবে। দ্রুত শারীরিক পরীক্ষা করে দেখলো, শরীরের বাম দিক কিছুটা দুর্বল, কথা অবশ্য পরিষ্কার। এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ সজ্ঞানও বটে। দিপু ওর প্রফেসরের সাথে ফোনে কথা বলে এমআরআই ব্রেন করার উপদেশ দিলো।

জায়েদ, সন্ধ্যার স্বামীকে কিছুক্ষনের মধ্যেই এমআরআই রুমে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। কম্পিউটার স্ক্রীনের সামনে বসে রইলো দিপু। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সন্ধ্যাকে নিয়ে তখন দিপুর ভিতরে উথাল পাথাল অবস্থা! ফিরে গেলো যেনো দশ বছর আগের দিনে।

মেডিকেলের প্রথম দিনেই ওদের পরিচয়। প্রতিদিন আড্ডা। তারপর একদিন সন্ধ্যাই ওকে বলেছিলো। এক বিকেলে ফোন করে সন্ধ্যা বললো, “আজ আমি একটা কথা বলবো। বলা শেষ হলেই ফোন রেখে দিবো। তোমাকে কিছু বলতে হবে না! তুমি সেদিন হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম বইটি পড়েছ। সেখানে একটা থিওরী আছে। একজন মানুষের হাতে পাঁচটি নীল পদ্ম থাকে। কেউ যদি এই পাঁচটি নীল পদ্ম একবারেই কাউকে দিয়ে দেয়, তাহলে সে কখনোই তাকে ভুলতে পারে না! আমার হাতে এখন একটিও নীল পদ্ম নেই, সব একসাথে দিয়ে দিয়েছি!” এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলেই সন্ধ্যা ওপাশ থেকে লাইন কেটে দিলো। দিপু হতভম্বের মতো চিন্তা করতে লাগলো সন্ধ্যাতো আগে কখনো ওকে তুমি করে বলতো না!

পরের দিন যখন ক্লাসরুমে দেখা, এক ফাঁকে সন্ধ্যা বিব্রতবোধ করে জানতে চাইলো দিপু কী চিন্তা করছে। দিপু হেসে বলেছিলো, “তুই যে নীল পদ্মগুলো আমাকেই দিয়েছিস, সেটা কিন্তু বলিস নি! কিন্তু আমি নিয়ে নিলাম। আর একটা ব্যাপার, আমি কখনই তোকে তুমি বলতে পারবো না”। সেই থেকে শুরু দুজনার একসাথে পথ চলা।

কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে নিরবতা ভাঙ্গলো দিপুই, “কেমন আছো তুমি?”  সন্ধ্যাও তাকিয়ে আছে স্ক্রীনের দিকে, সেখানে ধীরে ধীরে জায়েদের ব্রেনের ভিতরের ছবি ভেসে উঠছে। সেদিকে তাকিয়েই উৎকন্ঠিত স্বরে সন্ধ্যা জানালো, “ভালো। তুমি কিন্তু আমায় আজ তুমি বললে!” হেসে উঠতে গিয়েও থেমে গেলো দিপু। দৃষ্টি তখন স্ক্রীনে আটকে গেছে। সন্ধ্যাও ডাক্তার, ব্রেনের একটি অংশ দেখিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইলো, “এটা কি?”

দিপুর সময় যেনো থমকে গেছে। কোনো উত্তর দিতে পারছে না! মনে হলো বহুকাল পর যেনো বলে উঠলো, “মনে হচ্ছে কোনো বস্তু সেখানে দলা পেকে আছে!” টেকনিশিয়ানকে রঞ্জক পদার্থ দিয়ে প্রতিতুলনা করতে বললো দিপু। সন্ধ্যার বুঝতে আর বাকী রইলো না!

***********

দিপু অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তারদের জন্য বিশ্রাম কক্ষে চুপচাপ বসে আছে। শূন্য দৃষ্টিতে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে। টিক টিক করে সময় বয়ে যাচ্ছে, দিপুর যেনো কোনো সময় যাচ্ছে না। দিপু সন্ধ্যাকে খুব ভালোবাসতো। ওর এখনো স্পষ্ট মনে আছে,  মধুমিতা সিনেমা হলে যখন সন্ধ্যার সাথে টাইটানিক দেখছিলো, ওদের দুটো হাত পরস্পরের সাথে লেগে ছিলো। মনে হচ্ছিলো এ বাঁধন কখনো ছিন্ন হবে না। দিপুর প্রতি সন্ধ্যার ভালোবাসার প্রকাশটা ছিলো উচ্ছ্বল, দিপু সেভাবে প্রকাশ করতে পারতো না। এই প্রকাশ না করাটাই যেনো কাল হলো! একদিন পড়ন্ত বিকেলে রমনা উদ্যানের এক প্রান্তে বসে সন্ধ্যা হঠাৎ করে বলে উঠলো, “তুমি বোধহয় আমাকে খুব একটা ভালোবাসো না”। সেদিন কিছু বলতে পারে নি দিপু। ওর কাছে মনে হয়েছে ভালোবাসাটা দেখানোর কোনো বিষয় নয়, এটা একান্ত মনের ব্যাপার। সেইদিন থেকে যে কী হলো! মেডিকেলের চৌহদ্দি পেরোনোর আগেই দিপু আবিষ্কার করলো, ওদের মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা সেই আগের মতো নেই। অথচ কোনো মনোমালিন্য, কোনো সমস্যা কোনোকিছুই ছিলো না। তারপর একদিন দিপু দেখলো সন্ধ্যা আর সন্ধ্যা তারা হয়ে ও জীবনের আকাশে উঠবে না।

জায়েদের ব্রেন টিউমার হয়েছিলো। ডায়াগনোসিস চূড়ান্ত করার জন্য ওরা অপারেশন করতে চাইলো, যদিও এমআরআই দেখেই মনে হয়েছিলো খুব খারাপ ধরনের টিউমার। দিপুই সন্ধ্যাকে বলেছিলো অপারেশনের আগে যদি জায়েদের কোন কাজ থেকে থাকে, যেসব জায়গায় ওর স্বাক্ষর লাগতে পারে, সেগুলো যাতে করে ফেলে। এবারো দিপুর কথা সন্ধ্যার বুঝতে কষ্ট হয় নি! ওদের একটা ছোট মেয়ে আছে, তিন বছর বয়স হবে। জায়েদকে যখন অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে আসছিলো, দিপু তাকিয়ে ছিলো মেয়েটির চোখের দিকে- কী অদ্ভুত মায়াবী চোখ! মেয়েটি মায়ের চোখ পেয়েছে।

অপারেশনটা খুব জটিল ছিলো। ব্রেনের এমন জায়গায় টিউমারটা ছিলো- জায়গাটা ছিলো রক্তনালীতে পরিপূর্ণ। ওদের উদ্দেশ্যই ছিলো বায়োপসির জন্য যতটুকু দরকার, ঠিক ততটুকুই নিয়ে আসা। একবার ওর প্রফেসর দিপুকে বলেছিলো, ওর কোনো সমস্যা হলে না আসতে। দিপু রাজী হয় নি। অকম্পিত হস্তে মাথার খুলি কেটে যখন ব্রেনে প্রবেশ করলো, অবস্থা ধারণার চেয়েও খারাপ দেখলো । তারপর হঠাৎ করেই এক রক্তনালী কেটে রক্তপাত শুরু হলো……।

পারে নি, দিপু পারে নি জায়েদকে বাঁচাতে। ওর পাঁচ বছরের নিউরোসার্জারীর ক্যারিয়ারে এই প্রথম কোনো রোগী অপারেশনের টেবিলেই মারা গেলো, তাও আবার জায়েদ, সন্ধ্যার স্বামী। ওর প্রফেসর মাথাটা সেলাই করছে এখন, দিপু ওটি থেকে অফ হয়ে এসে একাকী বসে আছে বিশ্রাম কক্ষে। ওর প্রফেসর বললো, দিপু সন্ধ্যাকে জানে, তাই দিপুই খবরটা সন্ধ্যাকে জানাক।

*********

অপারেশন থিয়েটারের বাইরে  সন্ধ্যা আর ওর মেয়েটা অপেক্ষা করছে। দিপু সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়ালো। বাচ্চা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখলো আনমনে হাসপাতালের রেলিং ধরে খেলা করছে। সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে দেখলো, সেই চোখে একসাথে খেলা করছে আশা আর উদ্বিগ্নতা। সন্ধ্যার চোখের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে দিপু কথা বলা শুরু করলো………………।

দিপুকে নিয়ে লেখা আগের গল্পগুলোঃ

ক্যাডাভার

জীবন যেখানে যেমন

আমি আজ ক্ষমা করতে আসি নি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি

এক দফা, এক দাবী- কসাই কাদেরের ফাঁসি, ফাঁসি।
বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশের পর আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম, আওয়ামী লীগের পদ্মা সেতু নাটকও হজম করে ফেলতে চেয়েছিলাম, দুই আবুলরেও ক্ষমা করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম- শুধুমাত্র একটি জিনিসের আশায়— সব রাজাকারের ফাঁসি চাই আমি, জামাত শিবিরের নিষিদ্ধ ঘোষনা চাই আমি।
এই রায় সাজানো, আরেকটি আওয়ামী নাটক। কিন্তু বাংলার জনগণ এতো বোকা নয়! সামনে আরো দিন আছে! ভোট প্রার্থনা করতে আসার আগে হাসিনার বোঝা উচিত- জনগন কি চায়।
বাংলার জনগন এখন–
গোলাম আযমের ফাঁসি চায়
নিজামীর ফাঁসি চায়
সাইদীর ফাঁসি চায়
কাদের মোল্লার  ফাঁসি চায়
সাকা চৌ এর ফাঁসি চায়
সকল যুদ্ধপরাধীর ফাঁসি চায়
আর এই মুহূর্তেই বাচ্চু রাজাকারকে বন্দী দেখতে চায়, ফাসির রায় দ্রুত কার্যকর দেখতে চায়, ————– নইলে—–
আগামী নির্বাচনে আমি আমার বাসার দরজায় কোনো আওয়ামী নেতাকে ভোট চাইতে আসতে দিবো না।

যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর চাই, অতি দ্রুত—-

আজ সারাদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম। দিনের ক্লান্তি শেষে রুমে এসে কিছুক্ষন আগে যখন ল্যাপটপ খুলে বসলাম– আমি বাকরুদ্ধ, শিহরিত, আনন্দিত…!
জন্মেছি আমি অনেক পরে। ৭১ এর যুদ্ধ আমি দেখিনি। যে সময়টা পাঠ্য পুস্তকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে পড়ার কথা, সঠিক ইতিহাসটা তখন জানি নি। রাষ্ট্রযন্ত্রে শুনেছি অনেক অপপ্রচার। কিন্তু একজন মানুষ আমাকে ইতিহাসের পাঠ দিয়েছেন- সঠিক এবং সম্পূর্ণভাবে এবং প্রচন্ড আবেগ নিয়ে- তিনি আমার বাবা। সেই থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর রাজাকার আমার দুইটি চরম ঘৃনার জন্তু।
৯১- এ রাজনীতির কিছুই বুঝতাম না, ক্লাস সিক্সে বোধহয় পড়তাম। মনে আছে, তারপরও পাড়ায় পাড়ায় নৌকা নৌকা বলে চেঁচিয়েছি- এই আশায় যে নৌকা ক্ষমতায় গেলে বিটিভিতে “শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কন্ঠ” গানটি শুনতে পাবো, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফাঁসি হবে, পাকিস্তান আমাদের কাছে ক্ষমা চাইবে আর গোলাম আযমের (ছোট ছিলাম বলে তখনো নিজামী, সাইদী গংদের সম্পর্কে কম জানতাম) ফাঁসি দেখবো। সেই বছর আমার আশা পূর্ণ হয়নি!
৯৬-এ আমার প্রথম আশা পূর্ণ হলো। আর আওয়ামী লীগের এবারের শাসনামলের অনেক কাজ নিয়ে আমি সংক্ষুদ্ধ, বিক্ষুদ্ধ, আশাহত হলেও বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফাঁসি হওয়াটা ছিলো আমার জন্য চরম পাওয়া।
আর আজ?
পৃথিবীবাসীকে আমি জোর গলায় বলতে পারবো আমরা যত বছরই হোক, রাজাকার, আল বদর, আল শামসদের কখনো ক্ষমা করিনি, করতে পারি না। আমার সন্তানকে আমি বলতে পারবো- আমরা যেমন জাতির জনকের হত্যাকারী কুলাঙ্গারদের ফাসিতে ঝুলিয়েছি, ঠিক তেমনি জাতির বেইমান রাজাকার গোলাম আযম, নিজামী, সাইদী, সাকা, বাচ্চু গংদেরও ফাঁসিতে ঝুলানোর ব্যবস্থা করেছি। শুধু একটি কষ্টই আমার রইলো- আমার ইতিহাস পাঠের প্রথম শিক্ষক, আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবা সেটা দেখে যেতে পারলেন না। 
আমার এখন আর দুইটি ইচ্ছাই আছে- আমি সবগুলোর ফাঁসি দেখে যেতে চাই, আর দেখতে চাই- পাকিস্তান আমাদের কাছে নতজানু হয়ে ক্ষমা চাচ্ছে।

একটি আবোল তাবোল গল্প

কাহিনীর বিরতিঃ

সুমিত এই অনুভূতির সাথে পরিচিত। প্রায় এক যুগ আগে নীলার সাথে প্রথম যখন দেখা হয়েছিলো, ঠিক এই রকম অনুভূতি হয়েছিলো। কিছুক্ষণ স্থির, কিছুক্ষণ অস্থির। একটু পর পর আয়নাতে নিজের চেহারা দেখা। হঠাৎ করেই পোশাকের দিকে নজর দেওয়া! ঘন ঘন মোবাইল ফোনে একটি নির্দিষ্ট নম্বরের বাটন চাপা। প্রায় সারাক্ষণই নীলার সাথে কথা বলার আকুলতা! নীলাকে তো সুমিত ভালবেসেছিলো, কিন্তু শুচিস্মিতাকে? তাহলে কি সে এখন শুচিস্মিতাকে ভালোবেসে ফেলেছে? তা কি করে হয়? নীলা যে এখন সুমিতের ঘরনী! সুমিত যে এখনো নীলাকে ভালোবাসে। তবে কেনো শুচিস্মিতাকে দেখলে সুমিতের হার্ট বিট বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়! কেনো বার বার ওর সাথে সময় কাটাতে, ফোনে কথা বলতে ভালো লাগে! কেনই বা শুচিস্মিতার কথা ভাবতে সুমিতের এতো ভালো লাগে!

কাহিনীর শুরুঃ

নতুন চাকরীতে নতুন জায়গায় এসে শুচিস্মিতার সাথে সুমিতের পরিচয়। প্রথম দিনেই শুচিস্মিতার প্রাণবন্ত কথা আর অদম্য উচ্ছ্বলতায় সুমিত খুব মজাই পেয়েছিলো!

চাকরী হচ্ছে এখন সোনার হরিন! এই সোনার হরিণই যেনো খুব সহজে সব সময় সুমিতের হাতে ধরা দিয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে এই পর্যন্ত এক দিনও ওকে বেকার থাকতে হয় নি। একটার পর একটা চাকরী করেছে, ছেড়েছে, আবার নতুন একটা পেয়েছেও। এরই মধ্যে নীলাকে সাত পাঁকে বেঁধে ফেলেছে। ভালোবাসার বিয়ে। আজকালকার বাবা মায়েরা খুব আধুনিক। ছেলে মেয়েদের ভালোবাসার বিয়েতে কোনো অমত থাকেনা। কিন্তু সুমিতের গ্রামে বাস করা বাবা মা মন মানসিকতায় অনেকটাই সেকেলে। আধুনিক, উচ্চ শিক্ষিত, নম্র এবং সুন্দরী হওয়া সত্ত্বেও তাই নীলার সুযোগ হয় নি ওর শ্বশুর-শ্বাশুড়ির পদধূলি মাথায় নেবার!

নীলার কথাঃ

সুমিতের সাথে আমার সম্পর্ক প্রায় এক যুগের। চঞ্চল, ছটফটে কিন্তু দুষ্টু যে ছেলেটাকে প্রথম দিন দেখেই আমি মাতোয়ারা হয়ে গিয়েছিলাম, তাকে যে আমি আজীবনের জন্য পাবো সেটা চিন্তাই করিনি! তবু যেনো সব কীভাবে হয়ে গেলো! একটা ছোট্ট সংসার হলো আমাদের, টোনাটুনির সংসার। আমি আর সুমিত, সুমিত আর আমি।

স্বপ্নের মতো কেটে গেলো একটি বছর। সুমিতের অফিস থেকে বিকেলে আসার পরে একসাথে ঘুরতে যাওয়া, বাইরে কোনো রেস্টুরেন্টে খাওয়া- সবকিছুই দ্রুত চলে যেতে লাগলো। নতুন সংসারটিকে সাজিয়ে নিতে আমাদেরও যেনো কিছুটা সময় দিতে চাইলেন বিধাতা। এরই মাঝে একদিন আমাতে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব টের পেলাম আমি। অদ্ভুত এক শিহরণে শিহরিত হলাম। প্রবল উচ্ছ্বাসে সুমিতকে খবরটা দিতে গিয়েই জানলাম সুমিতকে গ্রামে যেতে হবে ওর বাবার মুখাগ্নি করতে।

সুমিতকে আমি একা ছাড়তে চাইলাম না। সব কাজ শেষ করে যখন আমরা ফিরে এলাম, আমাতে আর প্রাণের অস্তিত্ব পেলাম না! সুমিত কি খুব কষ্ট পেয়েছিলো সেদিন? জানি না! শুধু এটুকু জানি, আমি খুব কেঁদেছিলাম, অঝোর ধারায়।

পার্শ্ব কাহিনীঃ

এর কিছুদিন পরেই আমেরিকার খুব বড় একটি ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করার সুযোগ পেলো নীলা। সুমিত রইলো দেশে, একাকী। সময় কেটে গেলো দ্রুত। দুই বছর পর বিমান বন্দরে যখন নীলাকে সুমিত দেখতে পেলো, সুমিতের মনে হলো অসম্ভব রকমের বেশি ভালোবাসে সে এই মেয়েটিকে। খুব অবাক হলো, দুইটি বছর নীলাকে ছাড়া সে কীভাবে কাটিয়েছে!

এবার মনে হয় সময় হলো টোনাটুনির সংসারে এক নতুন অতিথি আসার। কিন্তু ঈশ্বর বোধহয় এবারো মুখ তুলে চাইলেন না! রক্তে ভেসে যাওয়া মেঝে থেকে সুমিত যখন নীলাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলো, সুমিতের কাছে তখন যেনো সমস্ত পৃথিবীটাই দুলে উঠছিলো।

সুমিত নীলাকে ঠিকই যমরাজের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এলো, এরপর এভাবেই বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেলো। টোনাটুনির সংসারে নতুন কেউ না এলেও, ভালোবাসার যেনো কমতি নেই!

রোচিষ্ণুর কথাঃ

আমি রোচিষ্ণু। আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন এই লোকটা আবার কোত্থেকে উদয় হলো! তাই প্রথমেই আপনাদের সমস্ত কৌতুহল মিটাচ্ছি। আর কিছুদিনের মধ্যেই শুচিস্মিতার সাথে আমার বিয়ে হতে যাচ্ছে। শুচিস্মিতাকে এখনো ভুলে যাননি তো আপনারা? হ্যা, শুচিস্মিতা হচ্ছে সুমিতের কলিগ। শুচিস্মিতার কাছেই আমি সুমিতের অনেক গল্প শুনেছি। অল্প ক’দিনের ভিতরেই সুমিত শুচিস্মিতার খুব কাছে চলে এসেছে। আমার কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী  এই ব্যাপারটিতে আমার চেয়েও বেশি চিন্তিত হয়ে পরেছে! আমি কিন্তু কখনই চিন্তিত হই নি। কারণ, সেই ছোটবেলা থেকেই আমি শুচিস্মিতাকে চিনি। ও আমাকে বলেছে, সে সুমিতকে খুব ভালো একজন বন্ধুর মতোই দেখে। এখনো সুমিতকে আমার কথা বলে নি, কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই আমার সাথে দেখা করিয়ে দিয়ে সুমিতকে চমকে দিবে!

আমি শুচিস্মিতাকে অনেক, অ-নে-ক ভালোবাসি, ঠিক তেমনি অনেক, অ-নে-ক বিশ্বাসও করি।

বিরতির পরঃ

“সুমিত, আগামীকাল সন্ধ্যায় নান্দোসে আসতে পারবে? তোমাকে একটি কথা বলবো, ধরো তোমার জন্য এক সারপ্রাইজ!” সুমিত যেনো এই দিনের জন্যই অপেক্ষা করছিলো। দ্বিধা দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে সিদ্ধান্ত নিলো শুচিস্মিতাকে সে ‘না’ বলবে না!

ভালোবাসা ব্যাপারটাই এরকম। যারা বলে থাকে জীবনে একবারই মাত্র ভালোবাসা হয়, সুমিত সেই দলের নয়। যে কারণে গুইনেভারা রাজা আর্থারকে ভালোবাসলেও, ল্যান্সেলটের প্রেমে পড়তে কোনো সমস্যাই হয় না। আবার বিয়ে করলেও যে অন্যের সাথে ভালোবাসা আর হবে না, সুমিত সেটাও বিশ্বাস করে না। এমনকি এটাকে সে অনৈতিকও ভাবে না! কারণ, রাঁধা তাহলে বিবাহিতা হয়ে কীভাবে কৃষ্ণের সাথে প্রেম করে? লাইলী মজনু বা রোমিও জুলিয়েটের কাহিনী আর বর্তমান যুগে খাটে না। “ভালোবাসা এমন কোনো বিষয় নয়, শুধু একজনে সীমাবদ্ধ থাকবে,” নিজেকে বোঝালো সুমিত। সে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেললো।

একটু কি খারাপ লাগলো সুমিতের? নীলার জন্য কেমন যেনো মনটা টন করে উঠলো না! “সেটা একসাথে অনেক দিন থাকার জন্য। নীলার প্রতি একটা মায়া পড়ে গেছে না! কিন্তু সেটা শুধুই মায়া, ভালোবাসা নয়”, আবারো নিজেকে নিজেই উত্তর দিলো সুমিত।

সবচেয়ে মোক্ষম উত্তরটা একটু পরেই নিজেকে শোনালো সুমিত, “আমি বাবা হতে চাই”।

কাহিনীর শেষের আগেঃ

অফিসে আজ শুচিস্মিতা আসে নি, ছুটি নিয়েছে। সুমিত ওকে না দেখতে পেয়েই ফোন দিয়েছিলো। শুচিস্মিতা জানিয়েছে, এক বিশেষ কাজে ব্যস্ত। বিকেলে দেখা করার কথাও মনে করিয়ে দিলো। সুমিত স্মিত হেসে বললো, “মনে আছে!”

অফিস থেকেই সুমিত সোজা ধানমণ্ডির নান্দোসে গিয়ে শুচিস্মিতার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। অপেক্ষার প্রহর যেনো দীর্ঘ! সহজে শেষ হতে চায় না! বার বার ঘড়ির দিকে আর প্রবেশ পথের দিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ করেই যখন শুচিস্মিতাকে দেখলো, কোথায় যেনো নীলার ছায়াটাও দেখতে পেলো সুমিত! শুচিস্মিতা একা আসেনি, সাথে একজন সুদর্শন যুবকও আছে!

“এই হচ্ছে রোচিষ্ণু, সামনের সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে হতে যাচ্ছে। আর এটাই হচ্ছে তোমার জন্য সারপ্রাইজ……” আরো কি কি যেনো বলছিলো শুচিস্মিতা, কিন্তু কোনো কথাই মনে হয় শুনতে পাচ্ছিলো না সুমিত!

নীলার শেষ কথাঃ

আজকে আমার খুব আনন্দের দিন! কয়েকদিন আগেই আমার একটু সন্দেহ হচ্ছিল। আজ সকালে সুমিত অফিসে চলে গেলে আমি কনফার্ম হবার জন্য হাসপাতালে গেলাম। যা ভেবেছিলাম! আলট্রাসাউন্ড রিপোর্টে বলছে আমি ‘মা’ হতে যাচ্ছি! নিজের কানকে যেনো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এতো বছর পর!

এতদিন নিশ্চিত না হয়ে সুমিতকে জানাতে চাচ্ছিলাম না। ভাবলাম অফিস থেকে এলে চমকে দিবো ওকে। কিন্তু আজ এই আনন্দের দিনেই ও খুব দেরী করে বাসায় এলো। দরজা খুলে ওর দিকে তাকাতেই কেমন যেনো বিধ্বস্ত লাগলো ওকে। ওকে সুস্থির হবার সময় দিলাম।

“তোমার বাবুর নাম তুমি কি রাখবে?” রহস্য করে সুমিতকে বললাম। সুমিত মনে হয় আমার কথাটা বুঝতে পারলো না, ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। আমি হাসিমুখে আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্টটা ওর হাতে ধরিয়ে দিলাম। পড়তে পড়তে দেখতে পেলাম, ও কাঁদছে। আনন্দের কান্না! হঠাৎ করেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো, “আমি তোমায় ভালোবাসি”।

আর যেনো কি বলতে লাগলো! ওহ হ্যা, মনে পড়েছে! আর বার বার বলতে লাগলো ‘আমায় ক্ষমা করো’।

সুমিত আসলেই খুব বোকা! কোন দিনে কি কথা বলতে হবে, এখনো শিখলো না! অফিসে কাজের চাপ এতো! যাহোক, কাঁদুক ও, কাঁদুক। বাবা হওয়ার সম্ভাবনায় কাঁদুক। ওর কান্না দেখতে আমার খুব ভালো লাগছে! মনে হচ্ছে আমিও কাঁদি, মা হওয়ার সম্ভাবনায় কাঁদি আর বলি, “সুমিত, আমি তোমায় খুব ভালোবাসি”।

 

একাকি আমি বিষন্ন!

গত দুইদিন যাবত একা একা দিন কাটাচ্ছি। যদিও অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে, আড্ডা দিয়েছি, উষ্ণ অভ্যর্থনাও পেয়েছি। তবুও কেমন যেনো একা! কিছু লিখতেও পারছি না, বা লেখায় মন বসছে না। কি যে করি!

হারিয়ে যাওয়া উপন্যাস

আর্থার কোনান ডয়েলের অপ্রকাশিত হারিয়ে যাওয়া প্রথম উপন্যাস নিয়ে লেখা–

হারিয়ে যাওয়া উপন্যাস.

ঠিকানা পরিবর্তন!!!

অনেকদিন ধরে ভেবেছি নিজের একটি ডোমেইন থাকবে, হোস্টিং থাকবে, থাকবে একটি ওয়েবসাইট। তখনো লেখালেখির জগতে আমি আসিনি। ডাক্তারি করছি ধুমিয়ে। আমার ইচ্ছার কথা শুনে বন্ধু হিরক এগিয়ে এলো। ওর BNH Production- এর সহায়তায় আমার একটি প্রফেশনাল ওয়েবসাইট হলো, ডাঃ নিয়াজ হিসেবে, ডাক্তারের রোজনামচা হিসেবে নয়। সেটি ছিলো www.drniaz.com

তারপর এলাম ব্লগিং-এর জগতে। কমিউনিটি ব্লগগুলোতে লিখতে লিখতে নিজের একটি সাহিত্য ব্লগ বানাতে ইচ্ছে করলো। ব্যবহার করলাম wordpress.com- কে। বানালাম এই ব্লগটি। এই ব্লগটিই পেলো এই ২০১২ সালের ডয়েচে ভেলের শ্রেষ্ঠ ব্লগ বাংলা হিসেবে ইউজার উইনার। মায়া জন্মালো খুব। কিন্তু আবারো নিজস্ব ডোমেইন আর হোস্টিং- এ একটি সাহিত্য ব্লগ রাখার ইচ্ছে প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। আবারো এগিয়ে এলো হিরক। এবার তৈরী করলাম self hosted wordpress.org blog. নাম সেই- সুড়ঙ্গঃ নিয়াজের ভুবন, আর ঠিকানা হলো www.niazmowla.com. সবাইকে আমার নতুন ব্লগ দেখার আমন্ত্রণ রইলো। এখন থেকে আমি নতুন ব্লগেই লিখবো, পাশাপাশি এই ব্লগে আগামী দুই মাস লেখা চালিয়ে যাবো, তারপর এটার ছুটি! কিন্তু Deactivate করবো না, রেখে দিবো প্রথম ভালোবাসা হিসেবে।

সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। 

অণুগল্পঃ জীবন যেখানে যেমন

বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকা শহরের বহুতল ভবনগুলো যেনো এই বৃষ্টিকে উপহাস করে। বড় বড় হাসপাতালগুলোর ভিতর থেকে তা আরো অনুভব করা যায় না। কেবিনে রোগী দেখতে এসে জানালা দিয়ে শুধু বৃষ্টির অঝোর ধারাই দেখা যাচ্ছে, শব্দগুলো অণুরনিত আর হচ্ছে না। কিন্তু এই অঝোর ধারা দেখেই দিপু কেমন উতলা হয়ে উঠলো। পালস দেখার জন্য রোগীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, পালস বিট দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে, সেখানে জায়গা দখল করেছে টাপুর টুপুর শব্দ।

“তুমি একটু অন্যরকম, অন্য সব ডাক্তারদের থেকে”
, রোগীর কথায় সচকিত হয়ে উঠে দিপু। রোগীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। “আপনিও একটু অন্যরকম, অন্য সব রোগীদের থেকে”, প্রত্যুত্তর দেয় দিপু। রোগীর নাম ভাস্কর, প্রথম দেখাতে বয়স খুব বেশি মনে হয় না। তার সাথে কথা বললে আরো কম মনে হবে। দিপু যখন ভাস্করের ব্রেনের সিটি স্ক্যান দেখে, মনে প্রচন্ড আঘাত পেয়েছিলো। ভেবেছিলো এতো তাড়াতাড়ি এই লোক এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে! যখন জানলো বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই, যেনো কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। কথাটা ওর প্রফেসরকে বলা মাত্রই পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ প্রফেসর হেসে বলে উঠেন, “ডাক্তার হচ্ছো তাহলে এখন! পঞ্চাশের উপরে কেউ মারা গেলে আর কষ্ট লাগে না, তাই না?” চমকে উঠে দিপু, পরে অনেক ভেবেছে এই ব্যাপারটি নিয়ে। মেনেও নিয়েছে সে। অবচেতনভাবেই সে খেয়াল করেছে, অল্প বয়স্ক রোগীদের বেলায় যতটা শ্রম দেয়, বয়স্কদের বেলায় ততটা নয়। যেনো ধরেই নিয়েছে তাদের দিন শেষ।

ভাস্করেরও দিন খুব বেশি নেই। অপারেশনের আগেই তাকে বলা হয়েছিলো কাগজ কলমের সমস্ত কাজ সেরে ফেলতে। এতো বড়ো টিউমার অপারেশন করেও খুব বেশি বের করা যাবে না, এরপর আছে কেমো আর রেডিওথেরাপির ধাক্কা, এ যেনো বিধাতার কাছ থেকে কিছু সময় কেনা। অন্যান্য রোগীরা এই সময় খুব ভেঙ্গে পড়ে, কিন্তু ভাস্করের স্বভাব তা নয়। জীবনের অধিকাংশ সময় জীবনটাকে খেলা হিসেবে নেওয়া ভাস্করের কাছে এটাও যেনো একটা খেলা। হয় হারবে, নয়তো জিতবে।

অপারেশনের দুই দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে এই দুই দিনেই তার সাথে দিপুর খুব সম্পর্ক হলো। দিপুও যেমন কথা বলতে ভালোবাসে, ভাস্করও তেমন কথা শুনতে ভালোবাসে। কখনো কখনো দুই জনের কথক আর শ্রোতার ভূমিকাও বদলে যায়। দিপুর নাইট ডিউটির অধিকাংশ সময় কেটে যায় এই রুমটিতেই।
অসম বয়সের এই আলোচনায় অনেক কিছুই আসে। রাজনীতি, ধর্মনীতি থেকে শুরু করে প্রেমও পর্যন্ত। এভাবেই ভাস্কর জেনে যায় সন্ধ্যার কথা। সন্ধ্যার সাথে দিপুর পরিচয় মেডিকেলে পড়তে এসে। একই সাথে মেডিকেলে প্রবেশ ওদের। এক সাথে ক্লাস। এক সাথে আড্ডা। তারপর হঠাৎ একদিন ভালোবাসাকে পেরিয়ে একেবারে প্রেম। ঘোষনাটা আসে সন্ধ্যার কাছ থেকে, আর দিপু তখনো কাউকে ‘না’ বলতে শিখে নি।

ভাস্কর জানে, ওদের সম্পর্কটা থাকে নি, কেনো থাকে নি, দিপু তা বলে নি। ভাস্করও আর জানতে চায় নি, বুঝে নিয়েছে, এই বুড়োকে যে এতো কথা বলেছে সেটাই ঢেড় বেশি। আজ একটু পরে ভাস্করকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবে। “কবিরা বলেন, তাদের মৃত্যু যেনো হয় চাঁদনী রাতে আর আমি দেখছি বিধাতা ডাকছেন আমায় এই বৃষ্টির দিনে,” ভাস্করের কথা শুনে সহজভাবে দিপু বলে, “আপনি কি তৈরী হয়েই আছেন? সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা শত চেষ্টা করলেও ফিরে আসবেন না?”

“কিছু দিনের জন্য? মন্দ লাগবে না! এই শেষ মুহূর্তে জীবনটাকে খুব প্রিয় মনে হচ্ছে। জানো, যারা হঠাৎ করে মারা যায়, তাদের মৃত্যুর কোনো চিন্তা নেই। আর যারা জানে, সময় বেশিদিন নেই, তারা হয় খুব বেশি করে বিধাতার দিকে ঝুঁকে পড়ে, নতুবা আমার মতো জীবনটাকে উপভোগ করতে চায়, বিন্দু পরিমাণও ছাড় দিতে চায় না”।

“আর যারা প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে দেখে?”
দিপুর কথা শুনে হা হা করে হেসে উঠে ভাস্কর, “ডাক্তার, শুধু তোমরাই প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে দেখো না, আরো অনেকেই দেখে। তুমি বরং তাদের কথা চিন্তা করো, যারা প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে কাটাছেড়া করে”। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় দিপু, “ডোম?”

আবারো হেসে উঠলো ভাস্কর, “তুমি আর মেডিকেল থেকে বের হতে পারলে না! তা হোক, তোমাকে বলি, যদি আজ আমি না ফিরে আসি, একটু হলেও আমার জন্য কষ্ট পেয়ো। কোনো জীবনই এতো সহজে চলে যাবার নয়, যতই সে বুড়ো হোক!”

***********************
ইমার্জেন্সীতে একটি বাচ্চা ছেলে এসেছে, রোড এক্সিডেন্টের। জ্ঞান নেই, অবস্থাও খুব ভালো নয়, মাথায় বিশাল আঘাতের চিহ্ন আছে। দিপু বাচ্চাটিকে নিয়ে খুব ব্যস্ত। ভীষনভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে বাঁচানোর জন্য। দীর্ঘ দুই ঘন্টা যুদ্ধ করে হেরে গেলো সে। হেরে গেলো ভাস্করও। হাসপাতালটা হঠাৎ করেই অসহ্য লাগছে দিপুর কাছে। বাইরে বেরিয়ে এলো।

বৃষ্টি থেমে গেছে অনেক আগেই। গুমোট ভাবটাও নেই, বরঞ্চ কী এক অনাবিল হাওয়া! বাইরে বেরিয়ে দিপুর খারাপ লাগছে না, চিন্তা থেকে বাচ্চা ছেলেটা, এমনকি ভাস্করও নেই। আকাশে ভেসে উঠা রংধনুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কী যে হলো দিপুর! শূন্য অনুভূতি! যেনো তা দিগন্তে মিলিয়ে যাবার অপেক্ষায়।

আনমনে হেসে উঠলো দিপু, একটু পরেই হাসপাতালের দিকে পা বাড়ালো।