আমার দেখা শান্তিনিকেতন

শান্তি নিকেতন নামটির মধ্যেই মনে হয় শান্তি শান্তি ভাব আছে। শুধু নামে নয়, সেই জায়গাতে গেলেও মনে শান্তি শান্তি ভাব লাগে। অবশ্য আমার শান্তি নিকেতনে যাওয়াটাই ছিলো অদ্ভুতভাবে। বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমার উদ্দেশ্যে দার্জিলিং যাবো ঠিক করেছিলাম। বিধাতা বোধহয় মুচকি হাসছিলেন। বেনাপোল, পেট্রাপোল, বনগাঁ হয়ে কলকাতা পৌঁছে শুনি পাহাড় ধ্বসে দার্জিলিং- এ যাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে। ঠিক তখনই নিরুপায় হয়ে শান্তি নিকেতনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। কিন্তু শান্তি নিকেতনে এসে মনে হলো বিধাতা যা কিছু করেন ভালোর জন্যই করেন।

হাওড়া রেলস্টেশন থেকে সকালেই ট্রেনে করে বোলপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ইলেক্ট্রিক ট্রেনে করে বোলপুরে যেতে যেতে শান্তি নিকেতনের ইতিহাস কিছুটা বলি। কলকাতা থেকে ১৮০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত বীরভূম জেলার বোলপুর পৌর শহরের শান্তি নিকেতন অঞ্চলটি একসময় জমিদার ভুবন সিংহের নামানুসারে ভুবনডাঙ্গা নামে পরিচিত ছিলো। এই সিংহ পরিবারের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিলো। একবার তিনি নিমন্ত্রণ রক্ষায় সেখানে গেলে ভুবনডাঙ্গায় রাত হয়ে যায়। সেদিন আবার জ্যোৎস্না ছিলো আর ছিলো মাঠের মধ্যে একটি ছাতিম গাছ। এই নৈসর্গিক দৃশ্যে অভিভূত হয়ে ১৮৬৩ সালের ৩১শে মার্চ তিনি কুড়ি বিঘা জমি পাঁচ টাকায় পাট্টা নিলেন। সেখানেই তিনি শান্তি নিকেতন নামে গৃহটি তৈরী করেন।

১৮৮৮ সালের ৮ই মার্চ দেবেন্দ্রনাথ ট্রাস্টি চুক্তির মাধ্যমে শান্তি নিকেতনকে সবার জন্য উন্মুক্ত করেন। এরপর এখানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০১ সালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যদিও এর উদ্যোক্তা ছিলেন বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই বিদ্যালয়ের প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে ছিলেন ব্রক্ষ্মবান্ধব উপাধ্যায় আর ছাত্র হিসেবে ছিলেন গৌরগোবিন্দ গুপ্ত, প্রেমকুমার গুপ্ত, অশোককুমার গুপ্ত, সুধীরচন্দ্র, গিরিন ভট্টাচার্য, যোগানন্দ মিত্র, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তীতে কালের পরিক্রমায় এখানে ১৯২১ সালে বিখ্যাত বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

যা হোক, ইতিহাস পাঠের মধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার যাত্রায় অবশেষে বোলপুরে এলাম। ট্রেন থেকে স্টেশনের বাইরে এসেই কেমন যেনো রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ গন্ধ পেলাম। প্রাণটা জুড়িয়ে গেলো। শহরের প্রবেশ পথেই এক বিশাল তোরণ, যেনো আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে।

এক রিকশাচালক আমাদের সামনে এসে বললো চারশত টাকা দিলে সে আমাদেরকে পুরো শান্তি নিকেতন ঘুরে দেখাবে। এলাকার রিকশা ভাড়া সম্পর্কে অজ্ঞাত আমরা খুব সহজেই এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলাম। প্রথমেই থাকার জন্য হোটেলে রুম বুকড করতে গেলাম। অনেক হোটেলের ভীড়ে যে হোটেলে আমরা গেলাম, সেটার নামও শান্তি নিকেতন লজ। রুমে ব্যাগ রেখে এবার আমরা শান্তি নিকেতন ভ্রমণে বের হলাম।

সবার আগে এলাম উত্তরায়ন কমপ্লেক্সে। কয়েকটি বাড়ি নিয়ে গড়ে উঠেছে এই কমপ্লেক্স- উদয়ন,কোনার্ক,শ্যামলী,পুনশ্চ এবং উদিচী। সময় পেলই এই ভবনগুলোতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসে থাকতেন । তাঁর অসংখ্য কালজয়ী লেখা এখানেই সৃষ্টি হয়েছে । এখানে আবার ছবি তোলা নিষেধ, ভিতরে ঢুকতে গেলে ক্যামেরা রেখে দেয়। তবুও মোবাইল ক্যামেরায় লুকিয়ে কিছু ছবি তুলে ফেললাম। এর পরে আছে বিচিত্রা বা রবীন্দ্র ভবন।  এই ভবনের নকশা করেছিলেন কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।এই জায়গাটা অনেকটা মিউজিয়ামের মতো। মুগ্ধ নয়নে কবির ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রী, পেইন্টিং ইত্যাদি দেখে একটু সামনে এগোতেই দেখতে পেলাম উপাসনা গৃহ। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ সালে উপাসনা গৃহ ভবনের প্রতিষ্ঠা করেন ।রঙীন বেলজিয়ান কাঁচ এবং মার্বেল পাথরে চারদিক অলংকৃত এই ভবনটিতে সন্ধ্যার সময় অসংখ্য মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়া হলে এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা হয়। এরপর গেলাম শান্তিনিকেতন গৃহে। শান্তি নিকেতন গৃহ হচ্ছে  শান্তিনিকেতনের সবচেয়ে পুরানো ভবন ।আরো দেখলাম দুইতলা একটি বাড়ি, নাম দেহলী। দেহলীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর সাথে  বসবাস করতেন ।

উপাসনা গৃহ, শান্তিনিকেতন উপাসনা গৃহ, শান্তিনিকেতন

এরপরেই দেখলাম কালো বাড়ি। কালো বাড়িটি মাটির তৈরী, দেয়ালে বিভিন্ন কারুকাজ করা। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল বর্ষের ছাত্ররাই সাধারণত এখানে থাকে। ঘুরলাম ছাতিমতলা। দেখলাম কীভাবে কোন জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের সমাবর্তন হয়। সমাবর্তনে স্নাতকদের সপ্তপর্ণী গাছের পাঁচটি পাতার গুচ্ছ উপহার দেওয়া হয় ।

Black House, Shantiniketon কালো বাড়ি, শান্তিনিকেতন

ছাতিমতলা, শান্তিনিকেতন ছাতিমতলা, শান্তিনিকেতন

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাজুয়েটদের সমাবর্তনের জায়গা

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজরিত এইসব দেখতে দেখতে কখন যে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া শুরু করলো টেরই পাই নি। দ্রুতই একটি রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করে চড়া দামে কিছু খেয়ে নিয়েই আমার গিন্নী দৌড়ালেন এখানকার রাস্তার দুধারে সারি সারি করে গজিয়ে উঠা হ্যান্ডিক্রাফটসের দোকানগুলোতে। নিজের জন্য, আমার জন্য, দেশে থাকা আরো অনেকের জন্যই অনেক কিছু কিনে ফেললো। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম কোথাও স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে গেলে মানিব্যাগটাকে কখনোই ভারী করে নেওয়া যাবে না!

এবার হয়ে এলো সন্ধ্যা। সন্ধ্যার শান্তি নিকেতন আবার সম্পূর্ণ অন্যরুপ। সেই রুপের বর্ণনা দেবার সাধ্য বিধাতা আমায় দেননি। দেশে থাকতে শান্তি নিকেতনের বিভিন্ন উৎসবের কথা শুনেছিলাম- রবীন্দ্রজয়ন্তী, বসন্ত উত্সব,বর্ষামঙ্গল,শরতউত্সব,নন্দনমেলা , পৌষমেলা, মাঘমেলা ইত্যাদি। আমরা যে সময়টাতে গিয়েছিলাম, সেই সময়ে অবশ্য কোনো উৎসবের দেখা পাই নি। তখন মনে হয়েছিলো হয়তোবা আবার কখনো এই উৎসবগুলি দেখার জন্যই আবার শান্তি নিকেতনে আসবো।

পরেরদিন সকাল বেলায় আমরা গেলাম শান্তি নিকেতন থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ডিয়ার পার্কে। নাম শুনে ভেবেছিলাম প্রচুর হরিন দেখতে পাবো, ততটা দেখতে না পেলেও প্রকৃতির অপরুপ শোভায় যেনো বিমোহিতই হয়ে গিয়েছিলাম। তাই কখন যে ট্রেনের সময় হয়ে গিয়েছে খেয়ালই করিনি। যখন খেয়াল হলো, দ্রুত রেল স্টেশনে আসতে গিয়ে আরো অনেক কিছুই দেখা হয়নি ভালোভাবে। ট্রেনে করে যখন আবার হাওড়ার উদ্দেশ্যে ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম, মনে মনে বললাম- আমি আসবো, আবার আসবো, তোমাতে হারিয়ে যেতে, হে প্রিয় শান্তি নিকেতন!

শান্তিনিকেতন বিদায় শান্তিনিকেতন!

( এই লেখাটি ৮ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৩-এর দৈনিক যুগান্তরের ‘যেতে যেতে পথে’- এ প্রকাশিত।

আমার দেখা শান্তিনিকেতন )

 

একদিন পাখিবাড়ি

অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই কবির য়াহমদ ভাইয়ার সাথে ফেসবুকে বার্তা বিনিময় হলো। শুক্রবার দিনটা কীভাবে কাটাবো- যখন বিশাল সমস্যার সম্মুখীন হলাম, কবির ভাইয়া জানিয়ে দিলেন দুপুর আড়াইটার দিকে তিনি এবং তারা পাখিবাড়ি যাবেন। আমি ইচ্ছে করলে এই তারাদের সাথে ঢুকে যেতে পারি। “তারা” কারা জিজ্ঞেস করা মাত্র ফেসবুকের “ঘুরাফেরা A to Z”  নামে একটি পেজ দেখিয়ে দিলেন। বুঝতে পারলাম “তারা” হচ্ছে ঘোরাফেরার কাঙ্গাল, যৌবনের রক্তে উদ্দীপিত একদল তরুন। আর পাখিবাড়ি?

“পাখিবাড়ি” লিখে আন্তর্জালে খোঁজ নিতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম! এ যে পাখিবাড়ির ছড়াছড়ি! প্রথম যে পাখি বাড়িটি পেলাম, তা হচ্ছে দুদু মিয়ার পাখিবাড়ি। সিলেট নগরী থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে দক্ষিন সুরমার পশ্চিম শ্রীরামপুর গ্রামে এই বাড়ির অবস্থান। এই পাখি বাড়ি ঘুরে না কি দেখা গেছে, বাঁশ ঝাড়ে বাঁধা বাসায় ডিমে তা দিচ্ছে সাদা বক, আছে লাল বক, শালিক, ঝাটিয়া বক, মণিহার বক, মাছারাঙ্গা, দোয়েলসহ অনেক প্রজাতির পাখি। পানকৌড়ি ধ্যান ধরে বসে আছে গাছের মগডালে, আরো আছে সরালি, বালিহাঁস, পাতিহাঁস। (কৃতজ্ঞতাঃ শাহ দিদার আলম নবেল, সিলেট, বাংলাদেশ প্রতিদিন)

Bird House

আরেকটি পাখি বাড়ি পেলাম মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে টেংরা ইউনিয়নের হরিপাশা গ্রামে। সেখানে আরক আলীর বাড়িটিকে স্থানীয়ভাবে বলা হয়ে থাকে “পাখি বাড়ি” এবং সেখানে সাদা বক ও পানকৌড়ি মিলিয়ে প্রায় ৮-১০ হাজার পাখি না কি বর্তমানে বাস করছে। (কৃতজ্ঞতাঃ এস মাহবুব

Bird House

আবার মৌলভীবাজার জেলারই বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের সালদিগা গ্রামে আরো একটি পাখি বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে। এই বাড়ির মালিকের নাম বরহুম মিয়া। দেশের অন্যতম বৃহৎ হাকালুকি হাওরের পাশেই অবস্থান হওয়ার কারণে নানা প্রজাতির পাখি এখানে ভিড় জমায় বলে জানান বড়লেখার বন সংরক্ষক। (কৃতজ্ঞতাঃ মিলাদ জয়নুল, সালদিগা

এতো পাখি বাড়ির ভীড়ে আমরা তৈরী হলাম অন্য একটি পাখি বাড়ির উদ্দেশ্যে- সিলেটের সালুটিকরের ছালিয়া গ্রামের নুরুদ্দিনের পাখিবাড়ি।

যাত্রা হলো শুরুঃ

সিলেটে আমি নতুন। তাই যখন আমাকে বলা হলো আম্বরখানা ইষ্টার্ণ প্লাজা থেকে যাত্রা শুরু হবে, সেখানে পৌছাঁতেই আমি গন্ডগোল করে ফেলি। একেতো বাঙ্গালী স্বভাবমতো দেরী করে ফেলেছিলাম, তার উপরে জায়গাই চিনি না! কবির ভাইয়া অবশেষে জনারণ্যে খাবি খেতে থাকা আমাকে খুঁজে বের করলেন, ততক্ষণে দুই দল সিএনজি নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেছে। আমাদের সাথে সিএনজিতে ছিলেন কবির ভাইয়া, স্বস্ত্রীক বেলাল ভাইয়া, রাজীব রাসেল, ফজলুর রহমান নুমান ভাইয়া। বেলাল ভাইয়ার হাতে DSLR ক্যামেরা দেখে মনে মনে খুব আশ্বস্ত হলাম!

পথে আমাকে সিলেট শহরের বিভিন্ন জায়গা চিনিয়ে দেবার মহান দায়িত্ব নিলেন সজীব রাসেল। আমাদের যাত্রা শুরু হলো এয়ারপোর্ট রোড ধরে। যাত্রা পথের প্রথমেই ছিলো হাতের বাম দিকে লাকাতুরা চা বাগান এবং ডান দিকে মালনীছড়া চা বাগান। মালনীছড়া চা বাগান হচ্ছে উপমহাদেশের প্রথম চা বাগান। ইংরেজ সাহেব হার্ডসনের হাত ধরে ১৮৫৪ সালে (সিলেটের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে লেখা আছে ১৮৪৯ সালে) এ বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও ১৮৫৭ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। প্রায় ১৫০০ একর জায়গা জুড়ে এই চা বাগানে বর্তমানে চায়ের পাশাপাশি কমলা লেবু এবং রাবারের চাষ করা হয়।

Malnichora Tea Garden

একটি কুড়ি দুটি পাতার রূপ দেখা শেষ হতে না হতেই চোখের সামনে চলে এলো সিলেট ক্যাডেট কলেজ। এরপরেই সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সুবিশাল এলাকা দেখতে দেখতে হঠাৎই হাতের ডানপাশে দেখতে পেলাম এডভেঞ্চার ওয়ার্ল্ড, এর একটু আগেই আছে সিলেট ক্লাব। ঠিক করলাম, একেক শুক্রবার একেকটা জায়গা ঘুরতে হবে, দেখতে হবে, সিলেটের ঘুরাফেরার এ টু জেড শেষ করতে হবে।

Adventure World

আরো কিছুদূর যাওয়ার পর ডান দিকে চলে যাওয়া একটি রাস্তা দেখিয়ে কবির ভাইয়া জানিয়ে দিলেন, সেই রাস্তা ধরে এগোলে রাতারগুল যাওয়া যাবে, যা বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলাবন। মনে মনে ঠিক করলাম বাংলাদেশের পৃথিবী বিখ্যাত  ম্যানগ্রোভ বন এখন পর্যন্ত না দেখতে পারলেও, দেশের একমাত্র জলাবন সিলেট থাকতে থাকতেই দেখতে হবে। www.travelobd.com-  এর সৌজন্যে পাওয়া রাতারগুলের ছবিটি দেখে আমার এই সিদ্ধান্ত আরো পোক্ত হলো বৈ কি!

Ratargul

এবার হঠাৎ করে রাস্তার পাশের এক আলিশান বাড়ির সামনে সিএনজি থেমে গেলো। চালক আমাদেরকে বাড়িটি দেখিয়ে বললেন- এটাই সেই নুরুদ্দিনের বিখ্যাত পাখি বাড়ি!

ইতিহাসঃ

আমি পেশায় ডাক্তার হলেও ইতিহাস আমার খুব প্রিয়। নুরুদ্দিনের পাখি বাড়ির ইতিহাস জানতে গিয়ে শুনলাম, নুরুদ্দিন বিশ্বাস করতেন “বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে”, তাই নীল আকাশের অধিবাসী পাখিদেরও তাঁর কাছে আকাশে মুক্ত দেখতেই ভালো লাগতো, বদ্ধ খাঁচাতে নয়। তিনি যখনই বাজারে যেতেন, পাখি কিনতেন। কখনো এক জোড়া, কখনো পাঁচ জোড়া, কখনোবা আরো বেশি। কিনে নিজ বাড়িতে এনে তিনি সেগুলোকে মুক্ত করে দিতেন।

Bird House Of Nuruddin, Sylhet

পাখিরা কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে জানে? হয়তোবা! তা না হলে কিছু পাখি ঘুরে ফিরে তাঁর বাড়িতেই আবার আসবে কেনো? মুক্ত হওয়া কিছু পাখি তাঁর তিন একর বাড়ির গাছগাছালিতে থেকে যেত। দেখাদেখি আরো পাখি আসতে থাকে, একসময় তা অনেক হয়ে যায়। পাখি চুরি ঠেকাতে পাহারা বসান নুরুদ্দিন।  এভাবেই নুরুদ্দিনের সাধারণ বাড়ি এক সময় হয়ে যায় “নুরুদ্দিনের পাখি বাড়ী”।

নুরুদ্দিন সাহেব আজ বেঁচে নেই। তাঁর সুযোগ্য পুত্র এমদাদুল হকও বাবার নীতিকে অনুসরণ করে চলেছেন আজো।

ঘুরাফেরা এ টু জেডঃ

পাখি বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় চারটা বেজে যায়। বাড়ির ভিতরে ঢুকে চুপসেই গেলাম। বাড়ির মূল ফটকের ডান পাশেই কিছু জায়গা ঘেরাও করা দেখলাম, জানলাম এক সময় এখানে হরিন থাকতো। এরপরেই দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনেই একটি পুকুর আছে। পাখিদের বসার জন্য প্রায় পুরো পুকুর জুড়ে বাঁশ গেড়ে দেওয়া আছে, আছে শান বাঁধানো ঘাট। আর পুরো বাড়ি জুড়ে গাছ-গাছালি। কিন্তু পাখি কৈ?

কোনো পাখিই দেখতে না পেয়ে যখন হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম, তখনই বাড়ির লোকদের কাছে থেকে জানতে পারলাম আছরের নামাযের পর থেকেই পাখিরা আসা শুরু করে, এবং সন্ধ্যার দিকে আক্ষরিক অর্থেই পাখি বাড়িতে পরিণত হয়। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম- আমরা মানে প্রায় বিশজনের এক বিশাল বহর। সবাই ঘোরাফেরা এ টু জেড এর সদস্য।

কারো একজনের উল্লাস ধ্বনিতে সচকিত হয়ে দেখি দূর থেকে একটি বক জাতীয় পাখি এসে বাড়িটির একটি গাছের ডালে বসলো। এরপর একটি, দুইটি করে, হঠাৎ করেই শুরু হলো ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসা! এ যেনো এক অসাধারণ দৃশ্য! বর্ণনা দেবার ভাষা আমার নেই, সেই চেষ্টাও এখন করবো না, বরঞ্চ কিছু ছবি দেখানোর চেষ্টা করাই ভালো।

ছবির আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথাঃ

পাখি বাড়িতে যাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতাঃ কবির য়াহমদ ভাইয়া (উনি শুক্রবার আমাকে ফেবুতে না জানালে, আমার যাওয়াই হতো না)।

ভ্রমণটা খুব আনন্দদায়ক হওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতাঃ বিনয় দা, রাজীব রাসেল, সৈয়দ রাসেল, বেলাল ভাই, ফজলূর রহমান নুমান ভাই, কাজী ওহিদ, মেসবাহউদ্দিন সোহেল, একুশ তাপাদের, বিষন্ন বেদুইন, পাপলু বাঙ্গালি, জাফরুল জনি, নিষিদ্ধ থারটিন, কুয়াশাসহ সেদিন যারা গিয়েছিলেন।

‘একদিন পাখিবাড়ি’ নামের জন্য কৃতজ্ঞতাঃ ইমন যুবায়ের ভাইয়া (তাঁর একদিন… সিরিজের মতোই এই নামকরণ)।

সবশেষে নিচে যে ছবিগুলো দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর জন্য বিশাল রকমের কৃতজ্ঞতাঃ বেলাল আহমেদ ভাইয়া (উনি আমার তিনটি অসাধারণ পোট্রেট তুলেছেন, আমি বিমুগ্ধ!)

বেলাল আহমেদ ভাইয়ার তোলা পাখিবাড়ির কিছু ছবিঃ

Bird House of Nuruddin, Sylhet

 

Bird

 

Birds

 

Birds

 

Birds

 

Niaz

নাড়ীর টানে, শিকড়ের বুকে

অনেকদিন ধরে গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয় না। যাওয়ার ইচ্ছে নেই, সেজন্য নয়। যেতে এবং আসতে যে সময় লাগে, সে সময়টা পাওয়া যায় না বলে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয় না। আমার গ্রামের বাড়ি অনেকদূরে, একেবারে বঙ্গোপসাগরের কাছে, এক দ্বীপে – যার নাম হাতিয়া, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর এক দ্বীপ।


চিত্র ১: বাংলাদেশের মানচিত্রে হাতিয়া (লাল কালিতে লেখা)

আমার জন্ম হাতিয়াতে নয়, আমার বেড়ে উঠাও হাতিয়াতে নয়। বাবার আগ্রহে একসময় বছরে দুই-তিনবার হাতিয়া যাওয়া হতো। অনেক, অনেকদিন আগে, যখন বরিশালে ছিলাম, বরিশাল থেকে বড়ো জাহাজে করে হাতিয়া যেতাম, একটা জাহাজের নাম এখনো মনে আছে-এম ভি আলাউদ্দিন। বিকেল বেলা বরিশাল হতে জাহাজ ছাড়তো, পরদিন সকালে হাতিয়াতে পৌছাতো, তাও আবার একেবারে পাড়ে থামতো না। মাঝনদীতে নোঙর করা জাহাজ থেকে আবার সী-ট্রাকে করে তীড়ে আসতে হতো।

বরিশাল থেকে চলে যাবার পর হাতিয়া যাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে উঠলো। তখন ঢাকা থেকে বাসে নোয়াখালীর সোনাপুর, সেখান থেকে ভাঙ্গা বাসে স্টিমার ঘাট পর্যন্ত (যার কোমড় ব্যাথা আছে, তার যাওয়া নিষেধ!) এবং এরপর সী-ট্রাকের জন্য অপেক্ষা আর অপেক্ষা কখন জোয়ার শুরু হবে। সব মিলিয়ে দেড় দিনের ধাক্কা! একদিন শুনলাম, ঢাকা থেকে হাতিয়া সরাসরি লঞ্চ সার্ভিস চালু হয়েছে, যাত্রা আরামদায়ক হলো কিন্তু সময় সংকোচন হলো না।

বাবা মারা যাবার পর গত দুই বছরে আমার চার বার হাতিয়া যাওয়া হয়। গ্রামে গিয়ে কখনোই আমার খারাপ লাগে না, এই চারবারও খারাপ লাগেনি, শুধু প্রতিটি পদক্ষেপেই বাবাকে খুব অনুভব করেছি। আবেগে বিহ্বল হয়েছি যখন বুঝতে পেরেছি, এক সময় যে কাজগুলো বাবা করেছেন, এখন সেগুলো আমাকে করতে হচ্ছে। খুব অবাক হয়েছি, যখন দেখেছি এলাকার মুরুব্বীরা বাবাকে যে আসনে বসিয়েছিলেন, হঠাৎ করে আমাকেও সে আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। নীরবে মেনে নিয়েছি, অফিসিয়াল প্রটোকলের অনুপস্থিতি। আকস্মিকভাবে পরিস্থিতির এই পরিবর্তনের হেতু আমার জন্য খুব কষ্টদায়ক হলেও, পরিবর্তনটা কেনো জানি আমি খুব উপভোগ করছি।

এবার বেশকিছু কারণে অনেক আগেই বাড়ি যাবার খুব প্রয়োজন হলেও, সময় বের করতে না পারায় যাওয়া হচ্ছিল না। অবশেষে কোরবানীর ঈদের পর চারদিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঢাকা থেকে হাতিয়া পর্যন্ত মাত্র দুইটি লঞ্চ চলে, একদিন একটা করে। আমি যেদিন যাবো, সেদিন এম ভি পানামার হাতিয়ার উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা। ঢাকা-বরিশালে যেসব বড়ো এবং বিলাসবহুল লঞ্চ চলে, সেগুলোর তুলনায় এম ভি পানামা বা অপর লঞ্চ এম ভি টিপু খুব নগণ্য। তারপরও এক অদ্ভুত কারণে লঞ্চ দুটিকে খুব আপন মনে হয়।

ঢাকা সদরঘাট থেকে সন্ধ্যাবেলা যখন লঞ্চ ছেড়ে দিলো, দেখা গেলো আশেপাশের কেবিনগুলোতেও আমার পরিচিত লোকেরাই যাচ্ছে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আত্মীয়ও আছে। আড্ডায় আড্ডায় যখন রাতের খাবারের সময় হলো, ডাল চর্চরি আর মুরগীর মাংশ সবাই গোগ্রাসে গিললো। সকাল বেলায় যখন লঞ্চ ঘাটে ভিড়লো, বেশ কিছু মানুষজন, যারা আমাকে নিতে এসেছে, দেখে খুব অবাকই হলাম। মনে পড়ে গেলো, বাবা মারা যাবার পর প্রথমবার যখন বাড়িতে আসি, ঘাটে বাড়ির ম্যানেজার ছাড়া আর কেউ ছিলো না। বুঝতে পারলাম, হয়তোবা আমি তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি, হয়তোবা তারা বুঝতে পেরেছে আমি বাবার দেখানো পথেই চলবো।


চিত্র ২: বুড়িগঙ্গার বুকে


চিত্র ৩ : লঞ্চ থেকে, মেঘনা নদীতে


চিত্র ৪:যাত্রা পথে

গ্রামের বাড়িতে আমি দুই দিন ছিলাম। প্রথম দিন প্রায় পুরোটা দিন ছিলাম উপজেলা সদরে, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং উপজেলা সদরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করতে করতেই সন্ধ্যা হয়ে গেলো। প্রায় সবাই আলাপ শুরু করেছেন বাবাকে সূত্র ধরে, “উনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন, হাতিয়ার জন্য অনেক কিছু করেছেন,” ইত্যাদি ইত্যাদি এবং আলাপ শেষ করেছেন আমাকে নিয়ে, “তুমি গ্রামে আসিও, তোমার বাবার কাজগুলো শেষ করিও, গ্রামের সাথে সম্পর্ক ভুলে যেও না,” ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কিছু বলিনি, আসলে বলার কিছু ছিলো না।


চিত্র ৫ : প্রথম দিন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করতে করতেই সন্ধ্যা হয়ে গেলো

পরের দিন ছিলো এক বিশাল কাজ। বাবা মারা যাবার পর আমাদের বসত ভিটার প্রতিবেশী কিছু ব্যক্তি, যারা সম্পর্কে খুব দূরের আত্মীয় নয়, তারা বাড়ির সীমানা নিয়ে কিছু অযৌক্তিক প্রশ্ন তুলেন। আমাকে সরাসরি কিছু না বলে বাড়ির ম্যানেজারকে বলতে থাকেন। বাড়ির ম্যানেজারের কাছ হতে ফোনে শুনেই আমি এবার বাড়িতে আসি। আসার আগে জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি এসে সরকারী জরিপকারক দিয়ে সীমানা মাপাবো।

গ্রামে এসে বুঝতে পারলাম আমার কাছে সঠিকভাবে খবর পৌঁছায়নি, কিছুটা অতিরঞ্জিত ছিলো। প্রকৃতপক্ষে সীমানা নিয়ে তেমন কিছু ঘটেনি। আমি অনেকখানিই বিব্রত হলাম। তারপরও মুরুব্বীরা বললেন, “তোমার সীমানা মাপা উচিত, নিজের চোখে সবকিছু দেখা দরকার,” উনাদের কথায় সান্তনা পেলাম। বাড়ির ম্যানেজারের সাথে কিছু ব্যক্তির আরো সমস্যা ছিলো, মুরুব্বীরা বললেন, “তুমি যে সিদ্ধান্ত দিবে, সবাই তা মেনে নিবে,” আমি আবারো বিব্রত কিন্তু ভীষণভাবে আবেগাপ্লুত হলাম।


চিত্র ৬ : অনেকের সাথে চায়ের দোকানে


চিত্র ৭ : এখনো শীত আসেনি, কিন্তু প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে! খেজুরের রস আমার খুব প্রিয়।


চিত্র ৮ : সাপ দেখে অবশ্য আমি ভয় পাই নি!


চিত্র ৯ : আমারো ইচ্ছে হয়েছিলো এভাবে গাছে উঠে কামরাঙ্গা পাড়তে


চিত্র ১০ : গ্রামের এই উচ্ছ্বল কিশোরীদের চোখে মুখে কী বিস্ময় লুকিয়ে আছে, তা বোঝার সাধ্য বোধহয় আমার নেই!

হাতিয়া থেকে আসার দিন আমার খুব তাড়া ছিলো, সেদিন সন্ধ্যার মধ্যেই ঢাকা পৌছাতে হবে। তাই লঞ্চে না এসে, সী-ট্রাকে না উঠে, স্পীড বোর্ট ভাড়া করলাম। ত্রিশ মিনিটে মেঘনা নদী পাড় হয়ে যখন দুপুরের দিকে নোয়াখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম, মনে হোল গ্রামে আমি আবার ফিরে যাবো। এটা যে নাড়ীর টান! নাড়ীর টানে যে শিকড়ের বুকে ফিরে আসতেই হবে!


চিত্র ১১ : বিদায় হাতিয়া! আবার আমি ফিরে আসবো আমার এই শিকড়ের কাছে।