গ্রীক মিথলজি ৩ (প্রথম টাইটান যুদ্ধ এবং জিউসের উত্থান)

ক্রোনাসসহ তাঁর বার ভাই-বোনকে বলা হয় প্রথম যুগের টাইটান। সাধারণ অর্থে তাদের যে সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহন করেছিলেন, তাদেরকে বলা হয় দ্বিতীয় যুগের টাইটান। এই হিসেবে ক্রোনাস এবং রিয়ার ছয় সন্তানকেই দ্বিতীয় যুগের টাইটান বলা উচিত ছিলো, কিন্তু অলিম্পাস পাহাড়ে অবস্থানের কারণে তাদেরকে বলা হয় অলিম্পিয়ান। আবার টাইটান ওসেনাস এবং টেথিসের সন্তান তিন হাজার নদী দেবতা এবং তিন হাজার ওসেনিড নিম্ফকেও টাইটান বলা হয় না। শুধুমাত্র ওসেনিড স্টিক্স এবং তার বোন মেটিস ব্যতিক্রম। এই দুইজন একইসাথে ওসেনিড এবং টাইটান হিসেবে গন্য হয়ে থাকেন। আবার দ্বিতীয় যুগের টাইটান হবার জন্য যে বাবা- মা দুইজনকেই টাইটান হতে হবে, তা কিন্তু নয়। যেমন, টাইটান ইয়াপেতুস এবং ওসেনিড (ওসেনাস এবং টেথিসের সন্তান) ক্লাইমেনে বা এশিয়ার চার সন্তান এটলাস, মিনোউটিয়াস, প্রমিথিউস ও এপিমেথিয়াস হচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ চারজন দ্বিতীয় যুগের টাইটান। দ্বিতীয় যুগের টাইটানদের মধ্যে আরো উল্লেখযোগ্য ছিলেন- টাইটান কয়ওস এবং ফয়বের সন্তান লেটো ও এস্টেরিয়া, টাইটান ক্রিয়াস এবং ইউরাইবিয়ার (গায়া ও পন্টাসের কন্যা) সন্তান পারসেস, পাল্লাস ও এস্ট্রাইস। আবার কেউ কেউ টাইটান হাইপেরিয়ন এবং থেইয়ার সন্তান হেলিয়াস ও তার বোনদেরকেও দ্বিতীয় যুগের টাইটান বলে থাকেন।

যা হোক, অলিম্পিয়ানরা একসাথে সিদ্ধান্ত নিলেন, ক্রোনাসের ক্ষমতা বিনাশ করবেন। তাই ক্রোনাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলেন। শুরু হলো গ্রীক মিথলজির প্রথম যুদ্ধ টাইট্যানোম্যাকি বা টাইটান যুদ্ধ। যুদ্ধে অন্যান্য টাইটানরা ক্রোনাসকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তাদের নেতা হলেন শক্তিমান এটলাস। অলিম্পিয়ানদের জন্য  এই যুদ্ধ যেনো আরো কঠিন হয়ে উঠলো। তারা যুদ্ধ করতে লাগলেন ক্রোনাসকে সরানোর জন্য, একইসাথে তাদের যুদ্ধ করা লাগলো নিজেদের রক্ষা করার জন্য, কারণ সুযোগ পেলেই ক্রোনাসের পক্ষে তখনো সম্ভব ছিলো তাদেরকে পুনরায় গিলে ফেলা।

অলিম্পিয়ানরা যুদ্ধ শুরু করলেন অলিম্পাস পাহাড় থেকে এবং টাইটানরা যুদ্ধ শুরু করলেন অথ্রিস পাহাড় থেকে। দুটি পাহাড়ই অবস্থিত ছিলো থেসালী নামক জায়গায়, অলিম্পাস ছিলো উত্তরে এবং অথ্রিস ছিলো দক্ষিণে।

যুদ্ধ যখন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিলো, এবং অলিম্পিয়ানরা যখন ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে উঠছিলেন, তখন জিউস একটি ঘোষনা দিলেন। হেকাটে নামে একজন আদি দেবী ছিলেন, যিনি ছিলেন দ্বিতীয় যুগের টাইটান পারসেস এবং এস্টেরিয়ার কন্যা। কেউ কেউ হেকাটেকে তৃতীয় যুগের টাইটান বলে থাকেন। তিনি মানবদেরকে (সোনালী যুগের মানব) ধন, বিজয়, জ্ঞান, নাবিক এবং শিকারীদের প্রতি সৌভাগ্য এবং তারুণ্যের উন্নতিও সাধন করতেন, কিন্তু যদি কোনো মানব এই সমস্ত জিনিস না চাইতো, তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা ফিরিয়েও নিতেন। হেসিয়ড তার থিওগোনীতে সবচেয়ে বেশি সম্মান দিয়েছেন হেকাটেকেই। হেকাটে ছিলেন রাতের রানী ও চৌমাথার দেবী। একইসাথে তিনি ছিলেন জাদুবিদ্যা, ডাইনীবিদ্যা, আগুন ও আলোরও দেবী। স্বর্গের, পৃথিবীর এবং পাতালপুরীর সম্পদের উপর হেকাটের ছিলো অংশীদারিত্ব, তাই চন্দ্র-দেবী, উর্বরতা (পৃথিবী) দেবী এবং পাতালপুরীর দেবী হিসেবেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। জিউস ঘোষনা দিলেন, হেকাটের এই বিশেষ সুবিধা তিনি বাতিল করবেন না। তাই ওসেনাস এবং টেথিসের কন্যা স্টিক্স (স্টিক্স নদী), তার সন্তানদের নিয়ে জিউসকে সমর্থন করতে সর্বপ্রথম অলিম্পাসে আসেন। এই কারণে জিউস স্টিক্সের নামেই শপথের প্রচলন করেন (স্টিক্সের নামে কোনো শপথ নেওয়া হলে সেটাকে বলা হয় অলঙ্ঘনীয় শপথ) এবং স্টিক্সের সন্তানদের (নাইক, জেলোস, ক্রাটোস এবং বিয়া) তার নিকটেই বসবাস করার অনুমতি দেন।

কোনো নারী টাইটান এই যুদ্ধে অংশগ্রহন করলেন না। ইউরেনাস এবং গাইয়ার সকল সন্তানদের মধ্যে ওসেনাস নিরপেক্ষ থাকলেন। প্রমিথিউস ছিলেন টাইটান ইয়াপেতুস আর ওসেনিড ক্লাইমেনে (বা এশিয়া)-এর সন্তান। যুদ্ধের শুরুতেই টাইটান দেবী থেমিস জানতেন এই যুদ্ধে নির্বুদ্ধিতা বা হিংস্রতার জয় হবে না, জয় হবে চাতুর্য্যের। প্রমিথিউস এটা শুনেছিলেন, তিনি ছিলেন দূরদর্শী এবং ভবিষ্যত দ্রষ্টা। তাই টাইটান যুদ্ধের প্রথম দিকে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলেও পরবর্তীতে জিউসের পক্ষাবলম্বন করেন এবং বাবা ইয়াপেতুস ও ভাই এটলাসকেও প্ররোচিত করেন জিউসকে সমর্থন করার জন্য। তাদের দুইজনের কেউই তাতে রাজী না হলেও, প্রমিথিউসের আরেক ভাই এপিমেথিউস প্রমিথিউসের সাথে টাইটান যুদ্ধে অলিম্পিয়ান দেবতাদের পক্ষে যোগ দেন।

এরপরও যুদ্ধে কোনো পক্ষই জিততে পারছিলেন না। এভাবে প্রায় দশ বছর পেরিয়ে গেলো। (ট্রয়ের যুদ্ধও দশ বছরব্যাপী হয়েছিলো!) জিউস তখন গায়ার কাছে পরামর্শের জন্য গেলেন। গায়া জিউসকে জানালেন, পাতালপুরীতে বন্দী হেকাটনখিরাস এবং সাইক্লোপসদের মুক্ত করলে, তারা যদি যুদ্ধে জিউসকে সাহায্য করে, তাহলে যুদ্ধে জিউসের জয়ের সম্ভাবনা আছে।  তখন জিউস পাতালপুরীতে যান এবং দ্বার-রক্ষী ড্রাগন কেম্পকে হত্যা করে হেকাটনখিরাস এবং সাইক্লোপসদের মুক্ত করেন, তাদেরকে নেকটার ও এম্ব্রোসিয়া খেতে দেন, ফলে তারা শক্তিপ্রাপ্ত হোন।

জিউস হেকাটনখিরাসদের মুক্ত করে তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, গায়া এবং ইউরেনাসের দুরন্ত সন্তানেরা, আমার হৃদয়ে যা আছে, আমি সেই কথাই তোমাদেরকে বলছি। অনেক বছর ধরে আমরা ক্রোনাস এবং অন্যান্য টাইটানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি, কিন্তু বিজয়ী হতে পারছি না। কিন্তু তোমরা যদি তোমাদের শক্তিমত্তার নিদর্শন আমাদের পক্ষে দেখাও, তাহলে টাইটানদের পরাজিত করা সম্ভব। তোমরা নিশ্চয়ই মনে রাখবে, অন্ধকার পাতালপুরী থেকে আলোর জগতে আমিই তোমাদেরকে নিয়ে এসেছি  জবাবে হেকাটনখিরাসদের মধ্যে অন্যতম কোট্টুস জিউসকে সাহায্য করতে প্রতিশ্রুতবদ্ধ হয়।

Titanomachy শিল্পীর তুলিতে প্রথম টাইটান যুদ্ধ

সাইক্লোপসরা ছিলো এই বিশ্ব-ব্রক্ষন্মান্ডের প্রথম কামার। বন্দীদশা থেকে মুক্ত করার কৃতজ্ঞতাস্বরুপ তারা জিউসকে লাইটনিং বজ্র তৈরী করে দেয়, যেটাতে আর্গেস উজ্জ্বলতা, ব্রন্টেস বজ্রপাত এবং স্টেরোপেস আলো যোগ করে। এছাড়াও সাইক্লোপসরা পসাইডেনের ট্রাইডেন্ট ও হেডসের অন্ধকারের হেলমেট তৈরী করে দেয়, যেটা পরিধান করলে ক্রোনাসসহ অন্যান্য টাইটানরাও অলিম্পিয়ানদের দেখতে পেতেন না। অন্যদিকে হেকাটনখিরাসরা ক্লান্তিহীনভাবে একসাথে একশটি পাহাড়ের সমান পাথর টাইটানদের দিকে ছুড়ে মারতো। এভাবে যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেলো অলিম্পিয়ানদের দিকে।

Titanomachy শিল্পীর তুলিতে প্রথম টাইটান যুদ্ধ

যুদ্ধের পর অধিকাংশ টাইটানকে টারটারাসে বন্দী করে রাখা হয়। হেকাটনখিরাসদের নেতা ছিলো ব্রিয়ারেস, বন্দী টাইটানদের পাহারা দেবার জন্য জিউস ব্রিয়ারেসসহ হেকাটনখিরাসদের নিযুক্ত করলেন। টাইটানদের দলনেতা এটলাসকে দেওয়া হলো অন্যরকম শাস্তি। তিনি কাঁধে করে আকাশকে ধরে রাখলেন অনন্ত সময় ধরে। টারটারাসে বন্দী থাকার চেয়ে এই শাস্তি কঠোরতর মনে হলো এটলাসের কাছে। অন্যদিকে টাইটান যুদ্ধের পর প্রথমদিকে ক্রোনাসকে টারটারাসে  বন্দী করে রাখা হলেও পরবর্তীতে তাকে  মৃতদের দ্বীপে, যেখানে সাহসী এবং সৌভাগ্যবান মানুষদের আত্মা মৃত্যুর পর যায়, সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, সেখানেই ক্রোনাস সবসময়ের জন্য বসবাস করতে লাগলেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি হয়েছিলেন সেই মৃতদের দ্বীপের রাজা।

সব ধরনের শাস্তি দেওয়ার পর, জিউস, পসাইডন এবং হেডস আলোচনা শুরু করলেন- কে কোন জায়গার অধীশ্বর হবেন। যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত অলিম্পিয়ানরা লটারীর মাধ্যমে ঠিক করলেন হেডস হবেন পাতালপুরীর অধীশ্বর, সকল মৃতদের রাজা। পসাইডন ভাগ পেলেন সকল সমুদ্র এবং পৃথিবীর সকল পানির উপর রাজত্ব। আর জিউস হলেন আকাশের রাজা, আর যেহেতু আকাশে স্বর্গ থাকে এবং আকাশ পৃথিবীকে আবৃত করে রাখে, তাই জিউস হলেন সকল দেবতাদের রাজা।  

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s