গ্রীক মিথলজি ২ (টাইটান যুগের সূচনা এবং অলিম্পিয়ানদের জন্ম)

ক্রোনাস বিশ্ব- ব্রক্ষ্মান্ডের রাজা হয়েই মা গায়ার গর্ভাশয় থেকে হেকাটনখিরাস এবং টারটারাস থেকে সাইক্লোপসদের মুক্ত করেন। কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর ক্রোনাসের মনোজগতেও পরিবর্তন ঘটে, এই পরিবর্তন পরবর্তীতে পৃথিবীতে সব সময়েই হয়ে এসেছে। ক্রোনাস যখন দেখলেন হেকাটনখিরাসরা বিশাল শক্তির অধিকারী, প্রায় কাছাকাছি শক্তি সাইক্লোপসদেরও, তখন তিনি ভীত হয়ে পড়েন এবং মুক্ত করার বেশ কিছুদিন পরেই এদেরকে ও ইউরেনাসের রক্ত থেকে জন্ম নেওয়া জায়ান্টদেরকে আবার টারটারাসে বন্দী করেন এবং দ্বার-রক্ষী হিসেবে নিযুক্ত করেন নারীর মতো মাথা ও শরীর এবং  বৃশ্চিকের মতো লেজ বিশিষ্ট ড্রাগন কেম্পকে। ক্রোনাসের এই আচরনে মা গায়া ক্ষুদ্ধ হলেন, তিনি যে উদ্দেশ্যে ক্রোনাসকে সাহায্য করেছিলেন, সেটা সম্পূর্ণরুপে ব্যর্থ হলো। তাই তিনিও ভবিষ্যতবানী করলেন, ক্রোনাস তার বাবা ইউরেনাসের মতোই ক্ষমতা থেকে উৎখাত হবেন এবং সেই কাজটি করবেন ক্রোনাসেরই সন্তান।

ক্রোনাস তার বোনদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী এবং শান্ত রিয়াকে বিয়ে করলেন। অল্প দিনের মধ্যেই রিয়া জন্ম দিলেন তার এবং ক্রোনাসের প্রথম সন্তান হেস্টিয়াকে। ক্রোনাসের তখন মনে পড়ে বাবা ইউরেনাসের দেওয়া অভিশাপের কথা। একই ভবিষ্যতবানী করেছিলেন মা গায়াও। তাই প্রথম থেকেই ক্রোনাস সতর্কতা অবলম্বন করেন। হেস্টিয়া হওয়ামাত্রই ক্রোনাস তাকে গলাধঃকরণ করেন। একই ব্যবস্থা গ্রহন করেন পরবর্তীতে দিমিতার, হেরা, হেডিস এবং পসাইডনের ক্ষেত্রেও। ক্রোনাসের এই উন্মত্ততায় রিয়া খুব কষ্ট পান। প্রতিবার কষ্ট করে গর্ভধারণ করেন, কিন্তু কোনো বারেই মায়ের মমতা দিয়ে কোনো সন্তানকেই লালন পালন করতে পারেন না! কষ্টে, ক্রোধে, যন্ত্রনায় যখন ষষ্ঠ বারের মতো সন্তান জন্ম দেবার সময় হয়, রিয়া মা গায়া আর বাবা ইউরেনাসের কাছে যান পরামর্শের জন্য।

Cronos and his offsprings ক্রোনাস তার শিশু সন্তানকে গলাধঃকরন করছেন (ষষ্ঠদশ শতকে পিটার পল রুবেনসের আঁকা)

গায়া এবং ইউরেনাসের পরামর্শমতো ষষ্ঠ সন্তান জন্মানোর সময় নিকটবর্তী হলে রিয়া প্রথমেই  একটি কাপড়ে আবৃত করা পাথর ক্রোনাসের হাতে দিয়ে বলেন, “এই নাও তোমার সন্তান”। অহংকারী এবং উদ্ধত ক্রোনাস কোনো কিছু অবিশ্বাস না করেই কাপড়ে আবৃত পাথরটিকে তাঁর ষষ্ঠ সন্তান মনে করে গোগ্রাসে গিলে ফেলেন। এরপর রিয়া চলে যান ক্রীট নামের একটি দ্বীপে।

Rhea and Cronos রিয়া ক্রোনাসকে কাপড়ে আবৃত পাথর দিচ্ছেন (আলেকজান্ডার এস মারের ১৮৯৮ সালের আঁকা)

সেই ক্রীট দ্বীপে একটি গুহা ছিলো, যেটার নাম ছিলো ডিক্টে। সেই গুহাতে শিশুটিকে জন্ম দেবার পর রিয়া এক নিম্ফের হাতে লালন পালন করার জন্য তুলে দেন। নিম্ফ হচ্ছে প্রকৃতির নারী আত্মার মতো, যারা অনেক অনেক বছর বাঁচে, কিন্তু তবুও মৃত্যু যেনো পিছু ছাড়ে না। নিম্ফটি আমালথিয়া নামের এক ছাগলের দুধ খাইয়ে শিশুটিকে বড় করতে থাকেন। শিশুটি যখন কেঁদে উঠে, কাঁদার শব্দ যাতে ক্রোনাস শুনতে না পায়, সেজন্য কিউরেটেস নামে পাঁচ থেকে নয়জনের সশস্ত্র প্রহরীরা তাদের বর্শা দিয়ে ঢালে আঘাত করতো। এই শিশুটিই হচ্ছেন জিউস- গ্রীক মিথোলজির অধিকাংশ জায়গা যিনি দখল করে আছেন।

Curetes with Baby Zeus কিউরেটেসরা ঢালে শব্দ করে জিউসকে রক্ষা করছে, পাশে রিয়া

কেউ কেউ বলে থাকেন, আমালথিয়া আসলে কোনো ছাগলের নাম নয়, বরং আমালথিয়াই হচ্ছেন সেই নিম্ফ, যিনি জিউসকে লালন পালন করেন। তিনি জিউসকে একটি গাছ থেকে এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখেন, যাতে ক্রোনাস পৃথিবী, স্বর্গ বা পাতালপুরীর সবকিছু দেখলেও জিউসকে দেখতে না পান। আমালথিয়ার একটি ষাড়ের শিং ছিলো, যেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য ও পানীয় পাওয়া যেতো। আবার কেউ কেউ বলেন, আমালথিয়ার একটি ছাগল ছিলো, যে ছাগলের স্তন্য পান করতেন জিউস। একদিন সেই ছাগলটি আমালথিয়ার সেই ষাড়ের শিংটি ভেঙ্গে ফেললে, আমালথিয়া লতা গুল্ম   দিয়ে শিংটি ঢেকে ফলে পরিপূর্ণ করে শিশু জিউসকে খেতে দেন। বলা হয়ে থাকে, এই কারণেই জিউস যখন দেবতাদের রাজা হোন, তখন আমালথিয়া আর ছাগলটিকে আকাশের তারায় পরিণত করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এভাবেই বড় হতে থাকেন জিউস।

Amalthea and Baby Zeus শিশু জিউসকে আমালথিয়া ষাড়ের শিং থেকে খাবার দিচ্ছেন

 

শিশু জিউস ছাগলের দুধ পান করছেন

ইতোমধ্যে ক্রোনাস বুঝে গিয়েছিলেন তাঁকে প্রতারিত করা হয়েছে। তিনি পৃথিবীর আনাচে কানাচে জিউসকে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন। খুঁজতে খুঁজতে এলেন ফিলাইরা দ্বীপে। এখানে এসে দেখা হলো ফিলাইরার সাথে, ওসেনাস এবং টেথিসের কন্যা। নিজের ভাইয়ের মেয়ের রুপ দেখে ক্রোনাস মুগ্ধ হয়ে গেলেন। কিন্তু ফিলাইরা রাজী হলেন না। ক্রোনাস থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য মাদী ঘোড়ায় রুপান্তরিত হলেন। ক্রোনাসও কম গেলেন না, নিজেকে স্ট্যালিয়নে পরিণত করলেন। ক্রোনাস আর ফিলাইরার মিলনের ফলে জন্ম নিলেন চীরণ- অর্ধেক ঘোড়া এবং অর্ধেক মানব।  চীরণকে বলা হয় এই বিশ্ব- ব্রক্ষ্মান্ডের প্রথম সেন্ট্যুর, কিন্তু সেন্ট্যুরদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য থেকে আলাদা- গভীর জ্ঞানী এবং সৎ। তিনি কখনো তাঁর অস্ত্র কোনো মানবের সাথে ব্যবহার করেন নি। বৃদ্ধ বয়সে তিনি ওষধি নিয়ে গবেষনা করে মানবজাতির অনেক উপকার করেন। সে অবশ্য অনেক পরের কথা। যথাসময়ে চীরণের কথায় আমরা আসবো। ফিলাইরার শেষ কথায় আসি। চীরণের মতো এই রকম অদ্ভুত সন্তান দেখে প্রচন্ড লজ্জা পেলেন ফিলাইরা। কেউ কেউ বলেন, জিউসের কাছে, আবার কেউ কেউ বলেন, ক্রোনাসের কাছে প্রার্থনা করেন (আমার কাছে মনে হচ্ছে, ক্রোনাসই হবে), তাঁকে অন্য কিছুতে পরিণত করার জন্য। সেই থেকে ফিলাইরাকে লিন্ডেন বা এক ধরনের লেবু গাছে পরিণত করা হয়।

Cronos and Philyra ফ্রান্সিসকো মাজ্জোলার তুলিতে ক্রোনাস এবং ফিলাইরা

ক্রোনাসের রাজত্বের সময়েই প্রথম মানব জাতির সৃষ্টি হয়। এই মানবজাতি বসবাস করতেন দেবতাদের মতোই, তাদের না ছিলো কোনো দুঃখ, কষ্ট, না করা লাগতো কোনো কঠোর পরিশ্রম। তারা জানতেন না বৃদ্ধ বয়স বলতে কি বোঝায়! যদিও তারা মৃত্যু বরণ করতেন, এবং সেই মৃত্যুটা হতো ঘুমের মধ্যে। সেই সময়ে পৃথিবী ফলে পরিপূর্ণ, ছিলো চির বসন্ত, সব সময় বয়ে যেতো নেকটার (স্বর্গের পানীয়)  ও দুধের নহর, ওক গাছ পরিপূর্ণ থাকতো মধুতে।

Golden Age of Man মানবদের সোনালী যুগ ( পিয়েট্রো দ্য কোরটোনার তুলিতে আঁকা এই ছবিতে নারীদের দেখা যাচ্ছে, যদিও সোনালী যুগে কোনো নারী ছিলেন না)

মানবজাতির এই যুগটাকে বলা হতো সোনালী যুগ। তারা সবাই এসেছিলেন স্বর্গ থেকে, তাই তাদের ছিলো না কোনো স্ত্রী বা সন্তান-সন্ততি। তারা শাসিত হতেন দেবতাদের মাধ্যমে। তাই এই  যুগে সবাই সঠিক কাজটিই করতেন, একে অপরের উপর বিশ্বাস এবং আস্থা রাখতেন। দেবতারা তাদের খুব পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন। সেই সেময়ে ছিলো না কোনো আইন, ফলে শাস্তিরও কোনো ভয় থাকতো না। না ছিলো কোনো শহর, কোনো তলোয়ার বা হেলমেট, না ছিলো কোনো বিদেশী রাষ্ট্র, ফলে ছিলো না কোনো যুদ্ধের আশংকা। মানুষের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিলো না, কারণ সব কাজই হতো সমষ্টিগতভাবে। খোলা আকাশের নিচে পোশাক পরিধান ছাড়াই তারা বসবাস করতেন। তারা কোনো কৃষিকাজ জানতেন না, অথচ খাবার নিয়ে কখনো চিন্তা করতে হয় নি!

এদিকে জিউস ক্রীট দ্বীপে ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলেন। হেসিয়ড আমাদেরকে জানিয়েছেন, জিউস খুব দ্রুত বড় হয়ে উঠেছিলেন। প্রায় এক বছরের মধ্যেই জিউস শক্তিশালী যুবকে পরিণত হোন। এক পর্যায়ে জিউসের মা রিয়া কৌশল করে জিউসকে ক্রোনাসের দাস হিসেবে নিয়োগ দেন। ক্রোনাস বুঝতেও পারেন নি যে, নতুন এই দাস তার নিজেরই সন্তান। জিউস ধীরে ধীরে তার অপর ভাই-বোনদের পরিণতির কথা জানতে পারলেন এবং তিনি তাদের উদ্ধার করতে বদ্ধপরিকল্প হলেন। ওসেনাস এবং থেটিসের কন্যা মেটিস ছিলেন জ্ঞানের দেবী, একই সাথে প্রচন্ড সুচতুর। জিউস এই ব্যাপারে মেটিসের কাছে সাহায্য চাইলেন। মেটিস একটি বমিকারক উপাদান জিউসকে দেন এবং জিউস এক কাপ ওয়াইনের সাথে সুকৌশলে এটি মিশিয়ে ক্রোনাসকে খাওয়ান। ফলে ক্রোনাস অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বমি করতে করতে প্রথমে সেই পাথরটি এবং পরে বাকী পাঁচ ভাই-বোনকে পেট থেকে উদ্গীরণ করেন। (হেসিয়ডের থিওগোনী অনুযায়ী, গায়াই চালাকী করে ক্রোনাসকে বমি করতে বাধ্য করান।)  জিউসের এই পাঁচ ভাই-বোনই হচ্ছেন হেস্টিয়া, দিমিতার, হেরা, পসাইডন এবং হেডস। তারা প্রত্যেকেই ক্রোনাসের পেটের মধ্যে এতোদিনে পূর্ণবয়স্ক হয়ে উঠেন। ক্রোনাস সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠার আগেই এই জিউসসহ ছয় ভাই-বোনই পালিয়ে চলে আসেন অলিম্পাস পাহাড়ে এবং সেখানে বসতি স্থাপন শুরু করেন। যেহেতু তারা অলিম্পাস পাহাড়ে বসবাস করতে লাগলেন, তাই তাদেরকে বলা হতো অলিম্পিয়ান। 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s