দুই বিদেশী বন্ধুর গল্প এবং যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসি

আজ সকালে বিটিভিতে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাদানকারী বিদেশী বন্ধুদের সম্মামনা অনুষ্ঠান সরাসরি দেখছিলাম। তাঁদেরকে দেখতে দেখতে কেমন যেন আবেগী হয়ে যাচ্ছিলাম। তাঁদেরকেও আমার বাঙ্গালী, বাংলাদেশি আর মুক্তিযোদ্ধা মনে হচ্ছিল। আসলেই তো তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা, তাই না?

একজনকে দেখে আমার খুব কৌতুহল হলো আর আরেকজনের নাম শুনে শ্রদ্ধায় মন ভরে উঠলো। প্রথমেই দ্বিতীয়জনের কথাই বলি।

(১)

তাঁর নাম ডব্লিউ এ এস অডারল্যান্ড, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত একমাত্র বিদেশী ব্যক্তি। সাধারণ জ্ঞানে যাদের অগাধ দখল, তারা সকলেই এই তথ্যটি জানেন। সমস্যা হয় তখনই, যখন এই সম্পর্কে বিস্তারিত জানার প্রয়োজন হয়। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই অকুতোভয় বীর মানুষটিকে নিয়ে আমাদের দেশে কোনো উপন্যাস লেখা হয় নি, তৈরী করা হয় নি কোনো টেলিফিল্ম বা চলচ্চিত্র (২০০১ সালের ২ জুন বিটিভিতে অডারল্যান্ডকে নিয়ে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল রচিত একটি নাটক দেখানো হয়। নাটকটিতে অডারল্যান্ডের নাম ভূমিকায় ছিলেন খায়রুল আলম সবুজ)।  

ইন্টারনেটেও সার্চ দিয়ে যুদ্ধকালীন তাঁর কাজের খুব বিস্তারিত বর্ননা পাওয়া যায় না। আসলেই আমরা হতভাগা। এরপরও যা পাওয়া গেছে, তা দিয়েই এই লেখা।

তিনি ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামে জন্মগ্রহণ করেন। তখন ইউরোপ জুড়ে চলছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৭ বছর বয়সে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে কর্মজীবন শুরু  করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি বাটা জুতা কোম্পানিতে যোগ দেন। ১৯৩৬ সালে অডারল্যান্ড যোগ দেন রয়াল নেদারল্যান্ড সামরিক বাহিনীতে। ১৯৪০ সালে নেদারল্যান্ড সেনাবাহিনীর হয়ে কমান্ডো গেরিলা হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেন। হিটলারের নাৎসী বাহিনী নেদারল্যান্ড দখলের পর তিনি নাৎসী বাহিনীর হাতে বন্দী হন। কিন্তু অডারল্যান্ড নাৎসী বাহিনীর কারাগার থেকে কৌশলে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। নাৎসী কারাগার থেকে পালিয়ে এসে তিনি নেদারল্যান্ড আন্ডারগ্রাউন্ড মুভমেন্টের গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করেন। জার্মান ভাষায় দক্ষতা তাঁকে গোয়েন্দার ভূমিকায় সাহায্য করে। তিনি জার্মান সামরিক সদস্যদের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। তাদের কাছ থেকে গোপন সংবাদ উদ্ধার করে মিত্রশক্তির সামরিক বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে অডারল্যান্ড ফিরে যান বাটা কোম্পানির চাকুরিতে।

W.A.S. Ouderland-BP উইলিয়াম এ এস অডারল্যান্ড বিপি

ষাটের দশকে অডারল্যান্ডের কর্মস্থল ছিল সিঙ্গাপুরে। সেখান থেকে বদলী হয়ে ঢাকায় এলেন ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে। প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিলেন টঙ্গীতে অবস্থিত বাটা ফ্যাক্টরিতে । ১৯৭০ সালের শেষের দিকেই তিনি বাংলাদেশে বাটার ম্যানেজার নিযুক্ত হন। স্ত্রী মারিয়া অডারল্যান্ডকে নিয়ে থাকতেন ৯৬, গুলশান এভিনিউ এর বাড়িটিতে। ১৯৭১ এর ৭ মার্চের পর থেকে ঢাকার অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থার কারণে তিনি তাঁর স্ত্রীকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দেন। এরপর পুরো যুদ্ধের সময় তিনি একাই বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। তবে যুদ্ধের শেষের দিকে গুলশানের বাড়িতে নিরাপদ বোধ না করায় ১ ডিসেম্বর তারিখে  তিনি রেডক্রস ঘোষিত নিরপেক্ষ এলাকা হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে ( বর্তমানে রূপসী বাংলা) গিয়ে ওঠেন।

১৯৭১ এর ২৫ মার্চ এই নিরীহ জনগোষ্ঠীর ওপর পাকবাহিনীর বর্বর হামলা অডারল্যান্ডের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। বরং পাক বাহিনীর গণহত্যা অডারল্যান্ডকে যৌবনের প্রথমদিন গুলোতে ইউরোপে দেখা হিটলার এর নাৎসী বাহিনীর হত্যাযজ্ঞর কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে পড়ে মাত্র আধা ঘন্টায় নাৎসী বিমান বাহিনীর অপারেশনে নেদারল্যান্ডের রটেরডাম শহরের ৩০,০০০ নাগরিক নিহত হয়েছিল। মাতৃভূমির সেই বিষাদময় স্মৃতি তাঁর সৈনিক এবং মানবিক সত্ত্বাকে নাড়া দেয়। তাঁকে আবার যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যায় । তিনি সিদ্ধান্ত নেন এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করবেন। এবারের যুদ্ধ মাতৃভূমির জন্য নয়। অনেক দূরের ছোট্ট ও দরিদ্র একটি দেশের মানুষের মুক্তির জন্য যুদ্ধ। যুদ্ধ মানবতার জন্য। 

Ouderland with gun বন্দুকহাতে অডারল্যান্ড

বিদেশি নাগরিক হিসেবে এবং একটি বহুজাতিক কোম্পানির ম্যানেজার হিসেবে অডারল্যান্ডের পাকিস্তানি সেনাছাউনীতে সহজ প্রবেশাধিকার ছিল। তিনি এই সুবিধা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গোয়েন্দাগিরির অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। প্রথমে তিনি ২২ বালুচ রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে. সুলতান নেওয়াজের সাথে অন্তরঙ্গতা গড়ে তোলেন। সেই সুবাদে তিনি ঢাকা সেনানিবাসে যাতায়াত শুরু করেন এবং আরও বেশি সংখ্যক সামরিক কর্তকর্তার সাথে পরিচিত হন। এক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক গভর্নর লে. জেনারেল টিক্কা খান, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লে. জেনারেল নিয়াজি এবং সিভিল এ্যাফেয়ার্স এ্যাডভাইজার মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলির সাথে তাঁর হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। এই সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা ছাড়পত্র সংগ্রহ করেন।  এর ফলে কারফিউসহ যে কোন সময় তিনি যে কোন জায়গায় অবাধে যাতায়াতের অধিকার পান।

এভাবে অডারল্যান্ড পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক গোপন পরিকল্পনার খবর সংগ্রহ করতেন। সে সব তথ্য  মুক্তিবাহিনীর কাছে সংগোপনে পৌঁছে দিতেন। এভাবেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তিনি অর্থনৈতিকভাবে এবং বাটা জুতাসহ অন্যান্য সামগ্রী দিয়েও মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সাহায্য করেন। অডারল্যান্ড পাকিস্তানি সৈন্যদের হত্যাকান্ড ও অত্যাচারের অনেক ছবিও তোলেন। এসব ছবি তিনি আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকায় প্রেরণ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। এক পর্যায়ে তিনি  মুক্তিবাহিনীর সাথে আরও সরাসরি জড়ালেন নিজেকে। তিনি মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করলেন।

ঢাকায় অবস্থিত তৎকালীন অষ্ট্রেলিয়ান দূতাবাস তাঁর এ কাজে কোনো বাধা তো দেয়নি, বরং সাহায্য সহযোগিতাই করেছিলো। তাঁর সকল কাজের সঙ্গী ও সাহায্যকারী ছিলেন বাটার পার্সোনাল ম্যানেজার এ কে এম আব্দুল হাই। অডারল্যান্ড মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বপ্রকার সাহায্য করার জন্য বাটা কোম্পানির তদানীন্তন কর্মকর্তা আব্দুস সালাম, নুরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির খান, ডাঃ হাফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া (কুসুম ডাক্তার), আমেরিকার নাগরিক মিঃ ট্রাকারকে নিয়ে একটি গোপন টীম গঠন করেছিলেন। এঁদের মধ্যে তিনি হুমায়ুন কবির খান ও আব্দুস সালামকে গেরিলা ট্রেনিং নেওয়ার জন্য ত্রিপুরার আগরতলায় পাঠান।

তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানীদের যুদ্ধ কৌশল ও পরিকল্পনা জেনে ২ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এ টি এম হায়দার, জেড ফোর্সের মেজর জিয়াউর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানীর কাছে পাঠাতেন। এ কাজে তাঁকে সাহায্য করতেন তাঁর সহকর্মী এ কে এম আব্দুল হাই। অডারল্যান্ড নিজের ব্যক্তিগত পিস্তলটি বুলেটসহ যুদ্ধের কাজে দান করেছিলেন ২ নং সেক্টরের ১ নং প্লাটুন কমান্ডার এ কে এম জয়নুল আবেদীনকে। জয়নুল আবেদীনও পরে বীর প্রতীক উপাধি পেয়েছিলেন।

M A G Osmani with Ouderland এম এ জি ওসমানীর সাথে অডারল্যান্ড

বাটা কোম্পানিতে অডারল্যান্ডের আরেকজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন জনাব এম এ মালেক  । ২৭ মার্চ কারফিউ তুলে নেয়ার পর এম এ মালেক অডারল্যান্ডের সাথে দেখা করেন। অডারল্যান্ড তাঁকে সাবধানে থাকতে বলেন এবং শ্রমিকদের বেতন দেয়ার ব্যবস্থা করতে বলেন। যুদ্ধের প্রথমদিকে মাস দুয়েক বাটা ফ্যাক্টরি বন্ধ রাখা হয়। এম এ মালেক তখন গ্রামের বাড়িতে চলে যান। এরপর ফ্যাক্টরি চালু হলে জুন মাসে আবার কাজে যোগ দেন। ফিরে এসে তিনি বুঝতে পারেন অডারল্যান্ড বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করছেন। এম এ মালেক অডারল্যান্ডের সাথে টঙ্গীতে বাটা ফ্যাক্টরির পাশে টেলিফোন শিল্প সংস্থা  ভবনে স্থাপিত সেনাবাহিনীর যুদ্ধকালীন দপ্তরে একাধিকবার গিয়েছিলেন। তাঁরা বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন, শ্রমিকের অভাব সহ  যুদ্ধজনিত কারণে উদ্ভুত ফ্যাক্টরি চালনায় অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আলোচনার অজুহাতে সেখানে যান। সেখানে প্রবেশের সময় অডারল্যান্ড গাড়িতে অস্ট্রেলিয়ান পতাকা ব্যবহার করেছিলেন। কথাপ্রসঙ্গে সেনা অফিসারদের কাছ থেকে তিনি তাঁদের অপারেশন সহ নানা ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য উদ্ধার করেন। এম এ মালেকসহ কয়েকজন বিশ্বস্ত সহকর্মী তুরাগ নদীর ওপারে উলুখোলা নামক জায়গায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এসব তথ্য পৌঁছে দেন। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য জুতা এবং অন্যান্য সামগ্রীও গোপনে নৌকা যোগে পাঠানো হয়। ১ ডিসেম্বর অডারল্যান্ড এম এ মালেককে অনুরোধ করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের একটি পতাকা সংগ্রহ করে দিতে। এম এ মালেক চক বাজার থেকে একটি পতাকা সংগ্রহ করেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ঝুঁকি এড়িয়ে তিনি ইন্টারকন্টিন্টোল হোটেলে অডারল্যান্ডকে পতাকাটি পৌঁছে দিয়েছিলেন।

অডারল্যান্ড নিজের জীবন বিপন্ন করে কেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জড়ালেন সে সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা পাওয়া যায় একটি চিঠিতে যেটি তিনি ফরিদি নামক একজন মুক্তিযোদ্ধাকে লিখেছিলেন ১৯৯৭ সালে। 

Dear Mr Faridi

Thank you for your letter of January 24, 1997 advising your effort to gather and preserve for the future generations of Bangladesh, relevant and vital information and facts about the struggle of the Bengali people for Freedom and independence commencing in 1971.

As one who was intimately involved in this struggle.  I am writing to give you the information you requested.  Firstly concerning myself and then to share with you some recollections of the 1971 struggle. I was born on December 1917 in Amsterdam.  Holland while Europe was in the grip of the third year of the First World War.  I was conscripted for National service in 1936 shortly after I had commenced my employment with the Bata Shoe Company.  Shortly before my mother land was invaded by Germany, I was called up to serve as a sergeant in the Dutch Royal Signals Corp. IN the face of the might of Adolf Hitler’s German Junta, equipped with sophisticated Tank and other massive weapons my platoon of 36 men then were simply armed with short rifles and twelve rounds of ammunitions each. As we went out to face this enemy, flying overhead was the huge fleet of Germen warplanes headed for Rotterdam where, in the space of half an hour, 30,000 innocent Dutch citizens died as result of their massive air attack. Following this blitzkrieg of Rotterdam the Germen Junta issued an ultimatum to the other cities of Holland, Belgium and France.  Within week the Dutch, Belgium and the France people were under the domination of Germen Junta.

Having escape from the POW camp after short internment, I joined the Dutch underground assistance movement.  As I spoke fluent Germen and several Dutch dialects. I befriended the germen high command and was thus able to help the Dutch underground movement as well as the allied forces with the vital information.  Therefore, when the event of March 1971 started with Tanks of Pakistani forces rolling in to Dhaka, I was reliving my experience of my younger days in Europe.  I could fully appreciate and predicament of the Bengali people and this motivated me to spring in to action on their behalf. As a result of indiscriminate and cruel actions of this invading Pakistani Junta, thousands of Bengali died in the ensuing week.  I felt that someone had made the world aware of what was happening since I was able to

move freely.  I was able to photograph the atrocities committed by Pakistanis against the innocent people which including young children.  I was able to pass these photos to the world press to high light the plight of the Bengali people.

Deeply touched and move by the almost unbearable sufferings and atrocities I witness of the cruel and oppressive occupying force.  I secretly began Guerrilla movement with the brave Bengalis at Bata Tongi and all around sectors 1 and 2. In addition, and as an expatriate CEO of an international company, I had the company of the occupying Pakistani high command. This enables me to help the Bengali freedom fighters.  I trained and worked with in relation to their Guerilla activities.  All these action were taken as a result of my deep love and affection I felt for the Bengali people.

There is much more I could say in details but it is near impossible because I am now retired and almost blind.

I have enclosed an album of Photograph cataloguing the atrocities of the occupying Pakistani army and the untold suffering of the Bengali people. Also include are photos of some of the brave freedom fighters whom I consider as my sons.

I hope this will be some help to your worthwhile endeavor and I wish you every success.

Your sincerely

 

W. A S Ouderland

Perth, Australia

22 February 1997

 

অডারল্যান্ড যখন এ চিঠি লেখেন তখন তিনি অসুস্থ এবং প্রায় অন্ধ হয়ে গেছেন। তাই আরও বিস্তারিত লিখতে পারেননি। এর আগে তাঁর ইচ্ছা থাকলেও অভিজ্ঞতাগুলো লেখা হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর অডারল্যান্ড ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এখানে বসবাস করেন। দুঃখজনক যে এই দীর্ঘ সময় তাঁর কাছে গিয়ে অভিজ্ঞতাগুলো কেউ লিপিবদ্ধ করেছে বলে জানা যায় না। তারপর তিনি শারিরীক অসুস্থতার কারণে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান এবং অস্ট্রেলিয়ার পার্থ নগরীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।

২০০০ সালের নভেম্বর মাসে সিডনী থেকে অজয় দাশগুপ্ত একটি কলাম লেখেন দৈনিক প্রথম আলোতে। তিনি অডারল্যান্ডের স্ত্রী মারিয়া অডারল্যান্ডের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেন, অডারল্যান্ড তখনও থাকতেন বাংলাদেশের ভাবনায় ব্যকুল। দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যাওয়ার পরেও বাংলাদেশ সম্পর্কে কোন লেখা পেলেই চোখের সামনে মেলে ধরতেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকান্ড এমনকি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় তিনি বিক্ষুব্ধ হতেন। মারিয়া জানান, তাঁর জন্য এটাই ছিল স্বাভাবিক, কারণ তিনি স্বচক্ষে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, নিজে যুদ্ধ করেছেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদেরকে তিনি নিজের ছেলের মত দেখতেন। অজয় দাশগুপ্ত তাঁর কলামে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন,

“অকুতোভয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধা একাত্তরে আমাদের হয়ে শুধু যুদ্ধ করেননি, এখনও তাঁর পরিচয়ে সে স্মৃতি বহন করে চলেছেন। তাঁর প্যাডে দেখেছি ডাব্লিউ এ এস অডারল্যান্ড বি. পি. লেখা। এই যে বীর প্রতীক (বি. পি.) খেতাবটি, নিজের নামের সাথে তার সংযুক্ত বজায় রেখে ‘তিনি আমাদের লোক’ এই পরিচয় তুলে ধরেছেন আজীবন।”

মারিয়া জানিয়েছিলেন, অডারল্যান্ড তাঁকে ও তাঁদের কন্যাকে বলতেন,বাংলাদেশ আমাদের ভালবাসা। পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি আবেগের এই ধারাটা অব্যাহত রেখো।

২০০০ সালে অডারল্যান্ডের ৮৩ তম জন্মদিবস উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে তাঁকে পুস্পস্তবক পাঠানো হয়। এর আগে একটি ই-গ্রুপ খুলে আউডারল্যান্ড সম্পর্কে তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। এই ই-গ্রুপের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকেই অডারল্যান্ডকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা এবং মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। সেসব শুভেচ্ছা বার্তা এক সাথ করে তাঁর কাছে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী মারিয়ার কাছ থেকে জানা যায়, শুভেচ্ছা বার্তাগুলো অডারল্যান্ডকে পড়ে শোনালে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। এটি ছিল অডারল্যান্ডের শেষ জন্মদিন। 

জানা যায় অডারল্যান্ড ১৯৭৫ এর পরে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিলেন। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার তাঁর আবেদনটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখেননি। ফলে এটি  ফাইলচাপা পড়ে যায়। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙালিরা ই-নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অডারল্যান্ডের নাগরিকত্বের জন্য কয়েক হাজার স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। এ সব স্বাক্ষর সহ তাঁরা অডারল্যান্ডের নাগরিকত্বের জন্য একটি আবেদন জমা দেন বাংলাদেশ সরকারের কাছে। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই অডারল্যান্ড মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অডারল্যান্ডকে “বীর প্রতীক” পদক গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু অসুস্থতার জন্য তিনি আসতে পারেননি। দীর্ঘদিন হৃদরোগসহ বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগার পর ২০০১ সালের ১৮ মে তারিখে তিনি ৮৪ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে মৃত্যুবরণ করেন। অডারল্যান্ডের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর স্ত্রী’র কাছে শোকবার্তা পাঠান। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদও একটি পৃথক শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মির্জা শামসুজ্জামান বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাঁর শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দেন। শেষকৃত্যানুষ্ঠানে আউডারল্যান্ডের কফিন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা দিয়ে আচ্ছাদিত করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মান প্রদর্শণ করা হয়। পার্থে বসবাসরত প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধারা আউডারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে সামরিক কায়দায় গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

অডারল্যান্ডের মৃত্যুর পর সাবেক ছাত্র নেতা ও বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী কামরুল আহসান খান এর উদ্যোগে ক্যানবেরায় অডারল্যান্ড মেমোরিয়াল কমিটি গঠন করা হয়। অডারল্যান্ডের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ক্যানবেরায় বাংলাদেশ হাই কমিশন তাঁর নামে একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করেছে। কামরুল আহসান খানের নিরলস প্রচেষ্টায় ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ২০১০ সালে ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের সামনের রাস্তাটি অডারল্যান্ডের নামে নামকরণ করেন। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকা রাস্তাটির নামকরণের ফলক উন্মোচন করেন। এ অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার জাস্টিন লি, সেক্টর কমান্ডারগণ এবং বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন। 

Ouderland উইলিয়াম এ এস অডারল্যান্ড

(২)

এবার আসি প্রথম জনের গল্পে। নাম তাঁর সৈয়দ আসিফ শাহকার। অনুষ্ঠানে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় সুইডেনের নাগরিক, বর্তমানে হাইকোর্টের জাজ হিসেবে। তিনি যখন পদক নিতে ডায়াসে যান, করতালিটা একটু বেশিই মনে হচ্ছিল। দ্রুত নেটের দ্বারস্থ হলাম।

কি পেলাম নেটে?

সুইডেনের বিচারক শাহকার ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে ন্যাপ ছাত্রনেতা ছিলেন, ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানী। কিন্তু বাংলাদেশে, সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন সেই ছাত্রনেতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় শাহকার বাঙালিদের পক্ষে সহকর্মীদের মাঝে প্রচারপত্র বিতরণ করেছিলেন, যে কারণে তাকে ঘৃণার চোখে দেখা হতো। বাংলাদেশের সমর্থন করায় তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল, ঢুকানো হয়েছিলো জেলেও। তার ভাষায়, “সেই সময় আমাদেরকে গাদ্দার (বিশ্বাস ঘাতক) হিসেবে দেখা হতো। আমার মধ্যে সব সময় একটা ভয় কাজ করতো, ভয় শুধু সরকারের কারণে নয়, বরং এও মনে হতো জনগণ যেকোনো সময় আমাদের হত্যা করতে পারে।” 

Syed Asif Shahkar সৈয়দ আসিফ শাহকার

১৪ ডিসেম্বর বিডিনিউজ২৪ ডট কমকে দেওয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, “এখানে আসতে পেরে আমি অভিভূত। আমি মনে করি এটা আমার জীবনের একটি নতুন অধ্যায়। আমি পর্যটক হিসেবে বাংলাদেশে আসতে চাই নি। আমি আসতে চেয়েছি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। গতকাল আমাকে সেভাবেই গ্রহণ করা হয়েছে।  

সৈয়দ আসিফ শাহকারের ফেসবুক একাউন্ট এখানে

(৩)

বিজয়ের আগের রাতে এই দুই বীর মানুষকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি যারা আন্দোলন করে, নেতৃত্ব দিয়ে, কলম দিয়ে, অর্থ দিয়ে, সরাসরি যুদ্ধ করে এদেশকে স্বাধীন করেছেন। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের অসাধারণ নেতৃত্বকে আর একরাশ ঘৃণা শুধু তাদের জন্যই যারা এই বাংলার স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, ঘৃণা সেইসব জামায়াত শিবিরের প্রতি, যাদের জন্য আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারিয়েছি। আজকের দিনে একটিই দাবী তাই, যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসি চাই- এই মাসেই

 

 

 

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতাঃ

১) উইলিয়াম এ এস অডারল্যান্ড বীর প্রতীকঃ ফজলে ইলাহী মাহমুদ শাহিন

২) বিজয় দিবসের জয়গাঁথায় এঁদের নামও উচ্চারিত হওয়া উচিতঃ আব্দুল গাফফার চৌধুরী

৩) একমাত্র বিদেশী বীর প্রতীক- বাঙ্গালীর গৌরবঃ সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s