একদিন পাখিবাড়ি

অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই কবির য়াহমদ ভাইয়ার সাথে ফেসবুকে বার্তা বিনিময় হলো। শুক্রবার দিনটা কীভাবে কাটাবো- যখন বিশাল সমস্যার সম্মুখীন হলাম, কবির ভাইয়া জানিয়ে দিলেন দুপুর আড়াইটার দিকে তিনি এবং তারা পাখিবাড়ি যাবেন। আমি ইচ্ছে করলে এই তারাদের সাথে ঢুকে যেতে পারি। “তারা” কারা জিজ্ঞেস করা মাত্র ফেসবুকের “ঘুরাফেরা A to Z”  নামে একটি পেজ দেখিয়ে দিলেন। বুঝতে পারলাম “তারা” হচ্ছে ঘোরাফেরার কাঙ্গাল, যৌবনের রক্তে উদ্দীপিত একদল তরুন। আর পাখিবাড়ি?

“পাখিবাড়ি” লিখে আন্তর্জালে খোঁজ নিতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম! এ যে পাখিবাড়ির ছড়াছড়ি! প্রথম যে পাখি বাড়িটি পেলাম, তা হচ্ছে দুদু মিয়ার পাখিবাড়ি। সিলেট নগরী থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে দক্ষিন সুরমার পশ্চিম শ্রীরামপুর গ্রামে এই বাড়ির অবস্থান। এই পাখি বাড়ি ঘুরে না কি দেখা গেছে, বাঁশ ঝাড়ে বাঁধা বাসায় ডিমে তা দিচ্ছে সাদা বক, আছে লাল বক, শালিক, ঝাটিয়া বক, মণিহার বক, মাছারাঙ্গা, দোয়েলসহ অনেক প্রজাতির পাখি। পানকৌড়ি ধ্যান ধরে বসে আছে গাছের মগডালে, আরো আছে সরালি, বালিহাঁস, পাতিহাঁস। (কৃতজ্ঞতাঃ শাহ দিদার আলম নবেল, সিলেট, বাংলাদেশ প্রতিদিন)

Bird House

আরেকটি পাখি বাড়ি পেলাম মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে টেংরা ইউনিয়নের হরিপাশা গ্রামে। সেখানে আরক আলীর বাড়িটিকে স্থানীয়ভাবে বলা হয়ে থাকে “পাখি বাড়ি” এবং সেখানে সাদা বক ও পানকৌড়ি মিলিয়ে প্রায় ৮-১০ হাজার পাখি না কি বর্তমানে বাস করছে। (কৃতজ্ঞতাঃ এস মাহবুব

Bird House

আবার মৌলভীবাজার জেলারই বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের সালদিগা গ্রামে আরো একটি পাখি বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে। এই বাড়ির মালিকের নাম বরহুম মিয়া। দেশের অন্যতম বৃহৎ হাকালুকি হাওরের পাশেই অবস্থান হওয়ার কারণে নানা প্রজাতির পাখি এখানে ভিড় জমায় বলে জানান বড়লেখার বন সংরক্ষক। (কৃতজ্ঞতাঃ মিলাদ জয়নুল, সালদিগা

এতো পাখি বাড়ির ভীড়ে আমরা তৈরী হলাম অন্য একটি পাখি বাড়ির উদ্দেশ্যে- সিলেটের সালুটিকরের ছালিয়া গ্রামের নুরুদ্দিনের পাখিবাড়ি।

যাত্রা হলো শুরুঃ

সিলেটে আমি নতুন। তাই যখন আমাকে বলা হলো আম্বরখানা ইষ্টার্ণ প্লাজা থেকে যাত্রা শুরু হবে, সেখানে পৌছাঁতেই আমি গন্ডগোল করে ফেলি। একেতো বাঙ্গালী স্বভাবমতো দেরী করে ফেলেছিলাম, তার উপরে জায়গাই চিনি না! কবির ভাইয়া অবশেষে জনারণ্যে খাবি খেতে থাকা আমাকে খুঁজে বের করলেন, ততক্ষণে দুই দল সিএনজি নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেছে। আমাদের সাথে সিএনজিতে ছিলেন কবির ভাইয়া, স্বস্ত্রীক বেলাল ভাইয়া, রাজীব রাসেল, ফজলুর রহমান নুমান ভাইয়া। বেলাল ভাইয়ার হাতে DSLR ক্যামেরা দেখে মনে মনে খুব আশ্বস্ত হলাম!

পথে আমাকে সিলেট শহরের বিভিন্ন জায়গা চিনিয়ে দেবার মহান দায়িত্ব নিলেন সজীব রাসেল। আমাদের যাত্রা শুরু হলো এয়ারপোর্ট রোড ধরে। যাত্রা পথের প্রথমেই ছিলো হাতের বাম দিকে লাকাতুরা চা বাগান এবং ডান দিকে মালনীছড়া চা বাগান। মালনীছড়া চা বাগান হচ্ছে উপমহাদেশের প্রথম চা বাগান। ইংরেজ সাহেব হার্ডসনের হাত ধরে ১৮৫৪ সালে (সিলেটের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে লেখা আছে ১৮৪৯ সালে) এ বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও ১৮৫৭ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। প্রায় ১৫০০ একর জায়গা জুড়ে এই চা বাগানে বর্তমানে চায়ের পাশাপাশি কমলা লেবু এবং রাবারের চাষ করা হয়।

Malnichora Tea Garden

একটি কুড়ি দুটি পাতার রূপ দেখা শেষ হতে না হতেই চোখের সামনে চলে এলো সিলেট ক্যাডেট কলেজ। এরপরেই সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সুবিশাল এলাকা দেখতে দেখতে হঠাৎই হাতের ডানপাশে দেখতে পেলাম এডভেঞ্চার ওয়ার্ল্ড, এর একটু আগেই আছে সিলেট ক্লাব। ঠিক করলাম, একেক শুক্রবার একেকটা জায়গা ঘুরতে হবে, দেখতে হবে, সিলেটের ঘুরাফেরার এ টু জেড শেষ করতে হবে।

Adventure World

আরো কিছুদূর যাওয়ার পর ডান দিকে চলে যাওয়া একটি রাস্তা দেখিয়ে কবির ভাইয়া জানিয়ে দিলেন, সেই রাস্তা ধরে এগোলে রাতারগুল যাওয়া যাবে, যা বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলাবন। মনে মনে ঠিক করলাম বাংলাদেশের পৃথিবী বিখ্যাত  ম্যানগ্রোভ বন এখন পর্যন্ত না দেখতে পারলেও, দেশের একমাত্র জলাবন সিলেট থাকতে থাকতেই দেখতে হবে। www.travelobd.com-  এর সৌজন্যে পাওয়া রাতারগুলের ছবিটি দেখে আমার এই সিদ্ধান্ত আরো পোক্ত হলো বৈ কি!

Ratargul

এবার হঠাৎ করে রাস্তার পাশের এক আলিশান বাড়ির সামনে সিএনজি থেমে গেলো। চালক আমাদেরকে বাড়িটি দেখিয়ে বললেন- এটাই সেই নুরুদ্দিনের বিখ্যাত পাখি বাড়ি!

ইতিহাসঃ

আমি পেশায় ডাক্তার হলেও ইতিহাস আমার খুব প্রিয়। নুরুদ্দিনের পাখি বাড়ির ইতিহাস জানতে গিয়ে শুনলাম, নুরুদ্দিন বিশ্বাস করতেন “বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে”, তাই নীল আকাশের অধিবাসী পাখিদেরও তাঁর কাছে আকাশে মুক্ত দেখতেই ভালো লাগতো, বদ্ধ খাঁচাতে নয়। তিনি যখনই বাজারে যেতেন, পাখি কিনতেন। কখনো এক জোড়া, কখনো পাঁচ জোড়া, কখনোবা আরো বেশি। কিনে নিজ বাড়িতে এনে তিনি সেগুলোকে মুক্ত করে দিতেন।

Bird House Of Nuruddin, Sylhet

পাখিরা কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে জানে? হয়তোবা! তা না হলে কিছু পাখি ঘুরে ফিরে তাঁর বাড়িতেই আবার আসবে কেনো? মুক্ত হওয়া কিছু পাখি তাঁর তিন একর বাড়ির গাছগাছালিতে থেকে যেত। দেখাদেখি আরো পাখি আসতে থাকে, একসময় তা অনেক হয়ে যায়। পাখি চুরি ঠেকাতে পাহারা বসান নুরুদ্দিন।  এভাবেই নুরুদ্দিনের সাধারণ বাড়ি এক সময় হয়ে যায় “নুরুদ্দিনের পাখি বাড়ী”।

নুরুদ্দিন সাহেব আজ বেঁচে নেই। তাঁর সুযোগ্য পুত্র এমদাদুল হকও বাবার নীতিকে অনুসরণ করে চলেছেন আজো।

ঘুরাফেরা এ টু জেডঃ

পাখি বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় চারটা বেজে যায়। বাড়ির ভিতরে ঢুকে চুপসেই গেলাম। বাড়ির মূল ফটকের ডান পাশেই কিছু জায়গা ঘেরাও করা দেখলাম, জানলাম এক সময় এখানে হরিন থাকতো। এরপরেই দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনেই একটি পুকুর আছে। পাখিদের বসার জন্য প্রায় পুরো পুকুর জুড়ে বাঁশ গেড়ে দেওয়া আছে, আছে শান বাঁধানো ঘাট। আর পুরো বাড়ি জুড়ে গাছ-গাছালি। কিন্তু পাখি কৈ?

কোনো পাখিই দেখতে না পেয়ে যখন হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম, তখনই বাড়ির লোকদের কাছে থেকে জানতে পারলাম আছরের নামাযের পর থেকেই পাখিরা আসা শুরু করে, এবং সন্ধ্যার দিকে আক্ষরিক অর্থেই পাখি বাড়িতে পরিণত হয়। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম- আমরা মানে প্রায় বিশজনের এক বিশাল বহর। সবাই ঘোরাফেরা এ টু জেড এর সদস্য।

কারো একজনের উল্লাস ধ্বনিতে সচকিত হয়ে দেখি দূর থেকে একটি বক জাতীয় পাখি এসে বাড়িটির একটি গাছের ডালে বসলো। এরপর একটি, দুইটি করে, হঠাৎ করেই শুরু হলো ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসা! এ যেনো এক অসাধারণ দৃশ্য! বর্ণনা দেবার ভাষা আমার নেই, সেই চেষ্টাও এখন করবো না, বরঞ্চ কিছু ছবি দেখানোর চেষ্টা করাই ভালো।

ছবির আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথাঃ

পাখি বাড়িতে যাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতাঃ কবির য়াহমদ ভাইয়া (উনি শুক্রবার আমাকে ফেবুতে না জানালে, আমার যাওয়াই হতো না)।

ভ্রমণটা খুব আনন্দদায়ক হওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতাঃ বিনয় দা, রাজীব রাসেল, সৈয়দ রাসেল, বেলাল ভাই, ফজলূর রহমান নুমান ভাই, কাজী ওহিদ, মেসবাহউদ্দিন সোহেল, একুশ তাপাদের, বিষন্ন বেদুইন, পাপলু বাঙ্গালি, জাফরুল জনি, নিষিদ্ধ থারটিন, কুয়াশাসহ সেদিন যারা গিয়েছিলেন।

‘একদিন পাখিবাড়ি’ নামের জন্য কৃতজ্ঞতাঃ ইমন যুবায়ের ভাইয়া (তাঁর একদিন… সিরিজের মতোই এই নামকরণ)।

সবশেষে নিচে যে ছবিগুলো দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর জন্য বিশাল রকমের কৃতজ্ঞতাঃ বেলাল আহমেদ ভাইয়া (উনি আমার তিনটি অসাধারণ পোট্রেট তুলেছেন, আমি বিমুগ্ধ!)

বেলাল আহমেদ ভাইয়ার তোলা পাখিবাড়ির কিছু ছবিঃ

Bird House of Nuruddin, Sylhet

 

Bird

 

Birds

 

Birds

 

Birds

 

Niaz

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s