লিবিয়ার পথে পথেঃ (৫)

ত্রিপোলী এয়ারপোর্টে এক বাংলাদেশি ডাক্তারের সাথে পরিচয় হলো। উনি ত্রিপোলিতেই থাকেন। খবর পেয়েছিলেন এক দল দেশী ডাক্তার এবং সিস্টার আসবে, তাই সময় করে এয়ারপোর্টে এসেছেন। শুনে খুব ভালো লাগলো। উনার কাছ থেকেই জানলাম গারিয়ান শহর সম্পর্কে। আবহাওয়াগতভাবে লিবিয়ার সবচেয়ে আরামপ্রদ অঞ্চল। পাহাড়ের উপরে শহরটি। যে হাসপাতালে আমাকে দেওয়া হয়েছে সেখানে দুই বছর আগে উনি ছিলেন, পরিবেশটাও না কি ভালো। আমি খুব কৌতুহলী হলাম, কিন্তু চিন্তায় পড়ে গেলাম লিসাকে নিয়ে।

লিসা তখনই কান্না শুরু করে দিলো। বলতে লাগলো, ফিরতি ফ্লাইটেই ঢাকায় চলে যাবে। আরবী জানা সিস্টারের সাহায্যে সরকারী লোকগুলোকে বুঝাতে সক্ষম হলাম আমরা স্বামী- স্ত্রী, আমাদেরকে ঢাকায় থাকতে বলা হয়েছিলো আমাদের পোষ্টিং একই হাসপাতালে হবে। লিসার পাসপোর্ট করা হয়েছিলো বিয়ের আগে, পাসপোর্টে স্বামী হিসেবে আমার নাম ছিলো না! তারা প্রমাণ চাইলো আমরা স্বামী- স্ত্রী কি না!

এই বিদেশ-বিভূয়ে এসে এই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে চিন্তাও করিনি। লিসার দিকে তো দূরের কথা, অন্যদের দিকেও অস্বস্তিতে তাকাতে পারছিলাম না। কীভাবে প্রমাণ করবো আমরা স্বামী-স্ত্রী!

ঠিক এই সময়ে আমাদের সাথে আসা আরেক দম্পতিরও (আমরা এই দুই দম্পতিই ছিলাম প্রথম ট্রিপে) একই অবস্থা হলো। তাদেরও দুইজনকে দুই জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হলো এবং তারা স্বামী-স্ত্রী জানার পর তাদের কাছেও প্রমান চাওয়া হলো। হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেলো, কাবিননামার কথা! ঢাকায় থাকতে বলা হয়েছিলো, যারা স্বামী-স্ত্রী যাবেন, কাবিননামা আরবীতে অনুবাদ করে নিয়ে যাবেন। সেই আরবীতে অনুবাদকৃত কাবিননামা দেখিয়েই অবশেষে আমরা প্রমাণ করলাম আমরা স্বামী- স্ত্রী!

এক সমস্যা শেষতো, আরেক সমস্যার শুরু। অন্য দম্পতির স্বামী যে হাসপাতালে পোস্টিং পেয়েছিলো, সেই হাসপাতালের ডিরেক্টরের সাথে তৎক্ষনাতভাবে ফোনে কথা বলে তার স্ত্রীকেও একই হাসপাতালে পোস্টিং দেওয়া হলো। সমস্যা হলো আমাদের ক্ষেত্রে। লিসার যে হাসপাতালে পোস্টিং, সেখানে নিউরোসার্জারী ডিপার্টমেন্ট নেই, আর আমার যে হাসপাতালে পোস্টিং, সেখানকার ডিরেক্টর তখন ছুটিতে তিউনিসিয়ায়!

আমাকে বলা হলো, আপাতত যার যার হাসপাতালে যোগদান করতে এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই লিসাকে আমার হাসপাতালের ডিরেক্টরের সাথে কথা বলে নিয়ে আসবে। এখানে একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। আমাদের দেশে ডাক্তারদের পোস্টিং-এর ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রিত হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। লিবিয়াতেও পোস্টিং দেওয়া হয় কেন্দ্রীয়ভাবে, সেটা হাসপাতালের চাহিদা অনুযায়ী। গারিয়ান হাসপাতালের চাহিদা ছিলো শুধুমাত্র নিউরোসার্জারীতে। তাই সেখানে বাড়তি একজন ডাক্তার দিতে হলে সেই হাসপাতালের ডিরেক্টরের অনুমোদন লাগবে, অন্যথায় কেন্দ্রীয়ভাবেও পোস্টিং পরিবর্তন করা যাবে না!

এবার লিসাকে আর থামানো গেলো না! অঝোর ধারায় অশ্রু বর্ষন করতে লাগলো। এয়ারপোর্টে থাকা অন্য সবাইও লিসাকে শান্ত করতে পারছিলো না। পৃথিবীর সব ভাষাতেই হয়তোবা মেয়েদের চোখের জলের অর্থ একই! বাংলা না জানা, ইংরেজী না জানা সেই আরবীভাষী সরকারী লোকগুলোও এই চোখের জলের ভাষা যেনো বুঝতে পারলো। তাদের একজন রোমিং করা ডিরেক্টরের ব্যক্তিগত মোবাইলে ফোন দিয়ে সবকিছু খুলে বললো। একটু পরে সে আমাদের সামনে এসে হাসিমুখে আরবীতে কি বললো কিছুই বুঝতে পারলাম না। শেষে সেই আরবী জানা সিস্টার জানালো, আমাদের সমস্যার সমাধান হয়েছে, গারিয়ান হাসপাতালের ডিরেক্টর রাজী হয়েছেন লিসাকে তার হাসপাতালে নিতে। লিসার চোখ সঙ্গে সঙ্গে শুষ্ক হয়ে উঠলো!

***************

ইয়াকুব ড্রাইভার আমাদেরকে ডেপুটি ডিরেক্টরের অফিসে নিয়ে গেলো। অফিসরুমে ঢুকে ডেপুটি ডিরেক্টরের চেয়ার খালি দেখলাম। পাশের একটা টেবিলে একজন মহিলাকে বসা দেখলাম, মাথা নিচু করে কাগজ পত্র দেখছে। আরেকজন মহিলা পাশের ফটোস্ট্যাট মেশিনে কিছু জিনিস কপি করছে। ইয়াকুব ইশারায় আমাদেরকে বসতে বলেই কোথায় যেনো চলে গেলো। রুমের মধ্যে আমরা চারজন মানুষ, অথচ ফটোস্ট্যাট মেশিনের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা যাচ্ছিলো না। এক অদ্ভুত নিরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম।

যে মহিলা পাশের টেবিলে কাগজ দেখছিলো, তার বয়স পচিশ কি ছাব্বিশ হবে (লিসার ধারনা, আরো বেশি হবে), দেখতে ফর্সা, শারিরীকভাবে কিছুটা মোটা। লম্বা ঢোলা এক পোশাক পড়া, মাথায় স্কার্ফ। একবার আমাদের দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার কাগজগুলোর দিকে তাকাচ্ছে। আবার কিছুক্ষণ পর পর ফটোস্ট্যাট মেশিনে কাজরত মহিলার সাথে কথা বলছে। এই মহিলাকে অবশ্য মহিলা না বলে তরুনী বলা উচিৎ। জিনসের প্যান্ট পরা, সাথে ওয়েস্টার্ন টি-শার্ট, এরও মাথায় স্কার্ফ। এখানে আসার আগে ভেবেছিলাম লিবিয়ার মেয়েরা বোধহয় অনেক রক্ষণশীল, কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে হাসপাতালে আসার পথে এবং হাসপাতালে এদেরকে দেখে ধীরে ধীরে আমার ধারণাটা পরিবর্তন হতে লাগলো।

রাজা ইদ্রিসের সময়াকালে মেয়েদের পড়াশোনাটাকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখা হতো। তার শাসনামলের শেষ দশকে মেয়েদের প্রাইমারী স্কুলে পড়ার হার ছিলো প্রায় ১৫ শতাংশের মতো। গাদ্দাফী ক্ষমতায় আসার পর মেয়েদের শিক্ষার হার বাড়তে থাকে, তাও খুব ধীরে ধীরে। কয়েকবছর আগে উচ্চ মাধ্যমিক লেভেলে নারী শিক্ষার হার ছিলো প্রায় ৪৮ শতাংশ এবং ভার্সিটি পড়তে আসতো মাত্র ১৬ শতাংশ। চাকরীক্ষেত্রে লিবিয়ার মেয়েরা তুলনামূলকভাবে অনেক এগিয়ে। এই ২০০৬ সালেও প্রায় ৩০ শতাংশ নারী বিভিন্ন চাকরীতে জড়িত ছিলো, যা যে কোনো আরব দেশের চেয়ে বেশি। তারা চাকরীও করছে নিজেদের পছন্দমতো ক্ষেত্রে। ব্যাপারটা হচ্ছে ১৬ শতাংশ মেয়ে ভার্সিটি পড়তে এলেও, চাকরীতে আসছে ৩০ শতাংশ, যাদের অধিকাংশই ইংরেজীতে দক্ষ নয়। সম্প্রতি লিবিয়ান গৃহযুদ্ধের সময় বিদ্রোহীরা লিবিয়ার নারীদের চাকরী করার এই স্বাধীনতা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। ২০১১ সালের মে মাসের ‘নিউইয়র্ক টাইমস’- এ বলা হয়েছে, ২৩ বছর বয়সী এক লিবিয়ান নারী থেরাপিস্ট, যিনি বিদ্রোহী National Transitional Council থেকে পদত্যাগ করেছেন, অভিযোগ করেছেন, বিদ্রোহের প্রথম দিকে এর সাথে অনেক লিবিয়ান নারীদের সরাসরি সংস্পর্শ ছিলো, কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের দমিয়ে রাখার মনোভাব বিদ্রোহীদের মধ্যে দেখতে পাওয়ায় অনেক নারী এই আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে।

ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত! যা হোক, মোটা গোলগাল মহিলাটাকে মনে হচ্ছিলো ডেপুটি ডিরেক্টরের ব্যক্তিগত সহকারী। খুব আগ্রহ নিয়ে তার সাথে কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারলাম- এও ইংরেজী ভালো জানে না। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে জানতে পারলাম, গারিয়ান টিচিং হাসপাতাল একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। দুই বছর হলো এখান থেকে ছাত্রদের প্রথম ব্যাচ বের হয়ে ডাক্তার হয়েছে। এই হাসপাতালের ডিরেক্টর একজন ডাক্তার, হাড়-গোড় ভাঙ্গার ডাক্তার! নাম মোঃ ইউসুফ। তিনি প্রায়শই ফ্রান্স, তিউনিসিয়ায় যান সেখান থেকে এক দুই দিনের জন্য অর্থো-সার্জন নিয়ে আসতে। তারা এই হাসপাতালে উইক এন্ডে এসে অপারেশন করেন, বিনিময়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে বিরাট পরিমান অর্থ পান। একটু অবাক হলাম। চিন্তা করছিলাম, কেনো এই কাজ করা হচ্ছে। অনেক পরে জেনেছিলাম তা!

একটু পরেই একজন মধ্য বয়স্ক সুটেড লোক এসে ডেপুটি ডিরেক্টরের চেয়ারে বসলেন। দুইজন মহিলার কারো মধ্যে কোনো চিত্ত-চাঞ্চল্য লক্ষ্য করলাম না, যে যার মতো কাজ করে যাচ্ছে। উনি চেয়ারে বসেই আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “ I am Dr. Nurruddin, Paediatrician. Welcome to Mustasfa Markaji, Garian.” কথা বলার ভঙ্গিমায় বুঝতে পারলাম, উনিই ডেপুটি ডিরেক্টর। এই সময়ে ড্রাইভার ইয়াকুব রুমে ঢুকে কাউকে কিছু না বলে ডাঃ নুরুদ্দিনের সামনে এক চেয়ারে বসলো। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না – এখানকার ব্যাপারগুলো। এখানে কেউ কি কাউকে সম্মান করে না? না কি এখানে পদমর্যাদা বলে কোনো জিনিস নেই? এই ব্যাপারটাও খোলাসা হয়েছিলো বেশ কিছুদিন পর!

পরিচয়ের পালা শেষ হবার পর ডাঃ নুরুদ্দিনের কাছে আমার প্রথম প্রশ্ন ছিলো, এই হাসপাতালে আর কোনো বাংলাদেশী ডাক্তার আছেন কি না। তার মুখ মন্ডলটি খুব সুন্দর হাসিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো। একজন পুরুষ মানুষের কন্ঠে যতটুকু মাধুর্য্য থাকা দরকার, তার সবটুকু দিয়ে তিনি উত্তর দিলেন, “এই হাসপাতালে এই মুহূর্তে কোনো বাংলাদেশী ডাক্তার বা সিস্টার নেই!”

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s