লিবিয়ার পথে পথেঃ (৬)

গারিয়ান টিচিং হাসপাতালের ডেপুটি ডিরেক্টর ডাঃ নুরুদ্দিন একজন বয়স্ক এবং মোটাসোটা মানুষ। প্রথম দেখাতেই তাঁকে আমার ভালো লেগে যায়। অনেকখানি বন্ধুবৎসল মনে হয়। এই বিদেশ – বিভুয়ে এসে, যেখানে কোনো বাংলাদেশী ডাক্তার আর সিস্টার নেই, একজন বন্ধুবৎসল মানুষ পাওয়াটাই তখন খুব ভাগ্যের ব্যাপার। ডাঃ নুরুদ্দিন চমৎকার ইংরেজী বলতে পারেন। তিনি নিজেই নিজের পরিচয় দিলেন, ‘শিশু বিশেষজ্ঞ’, ডেপুটি ডিরেক্টর বলেননি।

আমাকে নিউরোসার্জারীর ট্রমা স্পেশালিস্ট (ট্রমা স্পেশালিস্ট হিসেবে কি বুঝাতে চেয়েছিলেন, তখনো সেটা বুঝিনি। ঢাকায় আমার পোস্ট ঠিক করা হয়েছিলো রেজিস্ট্রার হিসেবে।) হিসেবে এবং লিসাকে মেডিসিনের জিপি (জেনারেল ফিজিশিয়ান) হিসেবে পরের দিন থেকেই যোগদান করতে বলেন। ঠিক সেই সময়ে ডাঃ নুরুদ্দিনের রুমের সামনে দিয়ে এক বয়স্ক, স্থূল দেহের মহিলা হেঁটে যাচ্ছিলেন। তাঁকে দেখে আমার উপমহাদেশের মনে হলো। ডাঃ নুরুদ্দিন আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, “সিস্টার ফযিলাত, পাকিস্তানী। এখানে প্রায় ২৬ বছর ধরে আছেন। আপনাদের ফ্ল্যাটও উনার ফ্ল্যাটের পাশে।” সিস্টার ফযিলাতকে বলা হলো আমাদেরকে পুরো হাসপাতাল ঘুরিয়ে দেখাতে।

জীবনের অনেক কিছুই চিন্তা ভাবনার বাইরে ঘটে যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে আজীবন পাকিস্তানীদের এড়িয়ে চলেছি, সত্যি কথা বলতে গেলে তাদের ঘৃনা করে এসেছি। অথচ এই লিবিয়াতে এসে এক পাকিস্তানীকেই এখন সবচেয়ে কাছের মনে হচ্ছে। লিসা হিন্দি সিরিয়াল দেখে হিন্দিতে ভালোই কথা বলতে পারতো। সে ফযিলাতের সাথে হিন্দিতে কথা বলা শুরু করলে, আমি বাংলায় লিসাকে বললাম ইংরেজীতে কথা বলার জন্য। কিন্তু তীর আগেই ছুড়ে দেওয়া হয়েছে, ফযিলাত হিন্দিতেই লিসার সাথে কথা বলা শুরু করলে, আমাকে শেষ পর্যন্ত বলতে হয়, “আমি হিন্দি বুঝি না!”

সিস্টার ফযিলাত আমাদেরকে হাসপাতাল ঘুরে দেখাতে লাগলেন। হাসপাতাল ভবনটি দুইটি অংশে বিভক্ত। একটি অংশ অফিস বা ইদারা। এখানে সমস্ত প্রশাসনিক কাজ হয়। আরেকটি অংশ হাসপাতালের ইনডোর। এখানে কোনো আউটডোর বা বহিঃবিভাগ নেই। আসলে লিবিয়ার জেলা শহরগুলোতে কোনো হাসপাতালেই আউটডোর ফ্যাসিলিটিজ থাকে না। প্রতিটি শহরে পলি ক্লিনিক নামে একটি ছোট ক্লিনিক থাকে। এই সব পলি ক্লিনিকগুলোর প্রধান কেন্দ্রীয়ভাবে সরকার নিয়োগ করে থাকে, কিন্তু ডাক্তার হিসেবে হাসপাতালগুলোর ডাক্তাররাই রোটেশন পলিসিতে দায়িত্ব পালন করে। এই পলি ক্লিনিকগুলোতে শুধুমাত্র আউটডোর পেশেন্ট বা কুল কেস (Cool case) দেখা হয়, এবং এখান থেকে যদি হাসপাতালে ভর্তির জন্য উপদেশ দেওয়া হয়, তাহলেই রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবেন। হাসপাতালে আর শুধু ইমার্জেন্সী রোগী ভর্তি করা হয়, এক্ষেত্রে পলি ক্লিনিকগুলোর কোনো ভূমিকা নেই।

যা বলছিলাম, আমাদের গারিয়ান টিচিং হাসপাতালটি তিন তলা, ‘ডাবল টি’ আকারের । নিচ তলার একপ্রান্তে আছে শিশু বিভাগ, আরেকপ্রান্তে রেডিওলজি বিভাগ। মাঝখানে ইমার্জেন্সী এবং তার বিপরীত দিকে আছে হাসপাতালের একমাত্র ক্যান্টিন। দ্বিতীয় তলার মাঝামাঝি জায়গায় বিশাল অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স এবং আই সি ইউ, রেডিওলজি বিভাগের উপরে আছে অর্থোপেডিক্স বিভাগ এবং শিশু বিভাগের উপরে আছে গাইনী বা স্ত্রী- প্রসূতি বিভাগ। তিনতলার একপ্রান্তে সার্জিকাল বিভাগসমূহ, যেমন, চক্ষু, নাক-কান-গলা বিভাগ, নিউরোসার্জারী, ইউরোলজি এবং জেনারেল সার্জারী। অন্যপ্রান্তে রয়েছে মেডিসিন বিভাগগুলো, যেমন, ত্বক ও যৌনরোগ বিভাগ, নেফ্রোলজি আর মেডিসিন।

লাল দাগের ভিতরের পুরো জায়গাটি গারিয়ান টিচিং হাসপাতাল কমপ্লেক্স (সূত্রঃ উইকি ম্যাপ)

হাসপাতালের পাশেই বিশাল এক হেলিপ্যাড। (আমি বাংলাদেশে এপোলো হাসপাতালে হেলিপ্যাড দেখেছি হাসপাতালের সামনের রাস্তায়, যদিও ১৪ তলায় হেলিপ্যাডের সমস্ত সুবিধা আছে, স্কয়ার হাসপাতালে ছিলো হাসপাতালের ছাদেই।) হেলিপ্যাডটির শেষ সীমানা থেকেই ডাক্তার এবং ফরেন সিস্টারদের বসবাসের জন্য কোয়ার্টার শুরু, আর হেলিপ্যাডটির বাম পাশে মেডিকেল কলেজ। তবে পুরো মেডিকেল কলেজটি দেয়াল দিয়ে ঘেরাও করে রাখা, হাসপাতালের সাথে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

হেলিপ্যাডটির পিছনে মেডিকেল কলেজ, বামে হাসপাতাল ভবন

হাসপাতাল ঘুরে দেখার পর আমাদের জন্য নির্ধারিত বাসায় এসে দেখি সেখানে আমাদের ব্যাগগুলো আগেই চলে এসেছে। এটি একটি তিন তলা ভবন। প্রতিটি তলায় তিনটি করে ফ্ল্যাট, মোট নয়টি ফ্ল্যাট। আমাদের ফ্ল্যাটটি ছিলো নিচতলার মাঝে, আমাদের ডানের ফ্ল্যাটটিই ছিলো সিস্টার ফযিলাতের, বামেরটা তখনো খালি। আমাদের ঠিক উপরের ফ্ল্যাটটাতে সস্ত্রীক থাকতেন ভারতীয় ডাক্তার সাদেক, উনি ছিলেন মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিভাগের ডাক্তার। আর বাকী সমস্ত ফ্ল্যাটগুলোতে থাকতেন ইউক্রেনিয়ান সিস্টার এবং ডাক্তার।

আমাদের ফ্ল্যাটটি ছিলো তিন রুমের। দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রথমে ডাইনিং রুম। ডাইনিং রুমের ডান পাসের প্রথম রুমটাই ড্রয়িং রুম এবং দ্বিতীয় রুমটা মাস্টার বেড। মাস্টার বেডের পাশেই (এটাচড নয়) ফ্ল্যাটটির একমাত্র বাথরুম। ডাইনিং রুমের বাম পাশে কিচেন ঘর। কিচেন ঘরে একটি, মাস্টার বেডে একটি এবং ড্রয়িং রুমে একটি, পুরো ফ্ল্যাটে সর্বমোট তিনটি জানালা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছু ফার্নিচার এবং জিনিস দিয়েছিলো, যেমন, ডাইনিং রুমের জন্য টেবিল এবং চেয়ার, ড্রয়িং রুমের জন্য কার্পেট, মাস্টার বেডরুমের জন্য খাট এবং আলমিরা এবং কিচেনের জন্য ফ্রিজ, ইলেকট্রিক চুলা এবং ওভেন। আরো কিছুদিনের মধ্যে টিভি এবং এয়ারকন্ডিশনার দেবার কথা বলা হলো। আমরা বুঝতে পারলাম ড্রয়িং রুমের জিনিসপত্রগুলো আমাদের কিনতে হবে, কিন্তু চুক্তিতে লেখা ছিলো এগুলোও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দিবে।

এই ভবনটির নিচতলাতেই ছিলো আমাদের ফ্ল্যাট

ফযিলাত সিস্টার বলে গেলেন দুপুরে আমরা তার বাসায় খাবো। হাসপাতাল থেকে অবশ্য আমাদেরকে বলা হয়েছে প্রথম ২০ দিন খাবার হাসপাতাল থেকেই পাঠানো হবে। কিন্তু আমরা দুপুরে ফযিলাত সিস্টারের বাসাতেই খেতে গেলাম। উনাদের ছোট পরিবার। উনার স্বামীর নাম রহমান, কোনো সন্তান নেই, ফযিলাত সিস্টার ছোট বোনের মেয়েকে নিজের কাছেই রেখেছেন। বাসাটা খুব সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন। তার কাছ থেকেই জানলাম, তিনি ১৬ বছর বয়সে পাকিস্তান থেকে লিবিয়াতে আসেন সিস্টারের চাকরী নিয়ে। প্রথম কয়েক বছর ত্রিপোলিতে ছিলেন, এরপরেই গারিয়ানে চলে আসেন এবং এখানে প্রায় বিশ বছরের বেশি হয়ে গেছে। উনার সাথে গল্প করে ভালোই লাগলো, মনে হলো সব পাকিস্তানী এক নয়। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, পুরো গারিয়ান এলাকায় কোনো বাঙ্গালী পরিবার নেই। কিছু বাংলাদেশি আছেন, যারা কোম্পানিগুলোতে কাজ করেন। আমাকে আরোও বললেন, দুই এক দিনের মধ্যেই এই সব বাংলাদেশি খবর পেয়ে যাবেন, এই হাসপাতালে একজন বাংলাদেশি ডাক্তার এসেছেন এবং তারা আমার বাসায় আসা শুরু করবেন, আমাকে আর খবর দেওয়া লাগবে না!

আমাদের সাথে ফযিলাত সিস্টার দম্পতি

দুপুরে খেয়ে যখন বাসায় এলাম, তার কিছুক্ষণ পরেই হাসপাতাল থেকে প্রথম দিনের জন্য খাবার নিয়ে এক সুদানিজ এলো। সেও শুধুমাত্র আরবী জানে। ফযিলাত সিস্টারের মাধ্যমেই জানতে পারলাম, সে সুদানিজ। আমি আর লিসা প্রথম দিনের খাবারের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম, তারপর ফযিলাত সিস্টারের মাধ্যমে সুদানিজের কাছে অবাক কন্ঠে জানতে চাইলাম, “এটা কি শুধুমাত্র প্রথম দিনের খাবার? মানে আগামীকালকেও কি আপনারা এরকম খাবার দিবেন?” নিগ্রো সুদানিজের হাসিটা বিস্তীর্ণ হলো, “না’য়াম” (হ্যাঁ)।

হাসপাতাল কর্তৃক দেওয়া প্রথম দিনের খাবার

Advertisements

3 thoughts on “লিবিয়ার পথে পথেঃ (৬)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s