আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে এবং নষ্টালজিক

সময়টা ২০০৭, মাসটা নভেম্বর। তারিখ মনে নেই। আমি তখন এপোলো হাসপাতালের নিউরোসার্জারী বিভাগের মেডিকেল অফিসার। সেদিন রাতের ডিউটি ছিলো। রাত নয়টা কি দশটা (সঠিক সময়টা মনে নেই), ইমার্জেন্সী থেকে আমাকে জানানো হলো একজন খুব খারাপ রোগী এসেছে, অজ্ঞান, দেখে যাওয়ার জন্য।

বয়স মনে হচ্ছিল পয়ত্রিশ- চল্লিশের মতো, সারা গালে চাপ চাপ দাড়ি। সম্পূর্ণ অজ্ঞান। তার সাথে আসা এক আত্নীয় বললো, বাপ্পাদা আসুক, তারপর ডাক্তারের সাথে কথা বলবে। ততক্ষণে সিটি স্ক্যান হয়ে গেছে, ব্রেনে নিউরোসার্জারীর দিক থেকে কিছু নেই। অতএব, আমার ডিপার্টমেন্টের নয়, কিন্তু আত্নীয়ের কথার ধরনে কিছুটা বিরক্ত হয়ে “বাপ্পাদা” লোকটা কোন ধরনের মানুষ, সেটা দেখার জন্য ইমার্জেন্সীতে রয়ে গেলাম।

এক ঘন্টা পর বাপ্পাদা এলেন- বাপ্পা মজুমদার! সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান মানুষটিকে চিনতে পারলাম- সঞ্জীব চৌধুরী! আমি আমার জীবনে সঞ্জীব চৌধুরীকে ঐ একবারই দেখেছি, তাও অজ্ঞান অবস্থায়। এর সম্ভবত দুইদিন পরই উনি মারা যান, এপোলো হাসপাতালেই।

দুই বছর পর। আমি তখন সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালে, সেই নিউরোসার্জারীতে। মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা সাংস্কৃতিক সপ্তাহের আয়োজন করবে। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো সেলিব্রিটি শিল্পীদের খুব অল্প খরচে এই অনুষ্ঠানের জন্য নিয়ে আসতে। এই কঠিন কাজে আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন প্রখ্যাত সুরকার ইবরার টিপু, তিনি আমাকে আমার খুব প্রিয় গায়ক বাপ্পা মজুমদারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

বাপ্পাদা ব্যস্ততার জন্য আসতে চাইলেন না। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানলেন, এপোলোতে সেই রাতে আমিই প্রথম নিউরো থেকে সঞ্জীব চৌধুরীকে রিসিভ করেছিলাম। বাপ্পাদা সিরাজগঞ্জে আসতে রাজী হলেন। ২০০৯ সালে বাপ্পা মজুমদার যমুনার পূর্ব পাশে তার প্রথম সলো অনুষ্ঠানটি করলেন আমার অনুরোধে এবং তারিখটি ছিলো ১৮ নভেম্বর, সঞ্জীব চোধুরীর মৃত্যুবার্ষিকীর এক দিন আগে। সেই থেকে বাপ্পাদার সাথে আমার পরিচয়, কথা-বার্তা।

এবার আরো দুই বছর পর। ব্লগ গুলিতে লেখা লেখি করতে গিয়ে “নষ্টালজিক” নামে এক ব্লগারের লেখার সাথে প্রথম পরিচয়। নিকের আড়ালের মানুষটির আসল নাম জানতে পারলাম বারোয়ারী উপন্যাস “সরলরেখা – বক্ররেখা” নিয়ে কাজ করতে গিয়ে। অনামিকা আপুর অনুরোধে তিনি তার সৃষ্ট কিছু পংক্তিমালা উপন্যাসটির নায়ক শিহাবকে অবলীলাক্রমে দিয়ে দিলেন। আমি খুব অভিভূত হলাম। ২০১২- এর একুশের বইমেলায় এসে দেখা হলো তার সাথে – গীতিকার শেখ রানা।

মানুষটিকে দেখে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। এতটা লাজুক, এতটা বিনয়ী, এতটা নম্র মানুষ তিনি! জানতে পারলাম এবারের বইমেলায় লিরিক ও লিরিকের পিছনের গল্প নিয়ে তার একটি বই বের হবে, তার প্রথম বই- “আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে”। একদিন মেলা থেকে বইটি কিনে তার অটোগ্রাফও নিয়ে ফেললাম।

এবার একটি ডিসক্লেইমার- কোনো এক অদ্ভুত কারণে গীতিকার শেখ রানা নামটি আমার কাছে পরিচিত হলেও, তার সৃষ্টিগুলো কোনগুলো আমি তা জানতাম না। আসলে কোনো গান ভালো লাগলে, সেটার গায়ককে যেভাবে চিনে রাখতাম, সেভাবে কখনো কোনো গীতিকারের নামের দিকে তাকাইনি। তাই অনেক প্রখ্যাত গীতিকারের নাম জানলেও, কে কোন লিরিকটি লিখেছে, তা আমার অজানাই থাকতো সবসময়।

ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জে এসে গতরাতে বিছানাতে গা এলিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে যখন “আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে”- এর প্রথম লিরিক “আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে”-এর দিকে নজর পড়লো, তখনই, ঠিক তখনই আমি প্রথমবারের মতো বুঝতে পারলাম –এটা আমার খুব প্রিয় গায়ক বাপ্পাদার গাওয়া আমার খুব প্রিয় একটা গান – ‘পরী’ এবং আমি ভীষনভাবে চমকে উঠলাম। চমকে উঠলাম, কারণ, বুঝতে পারলাম- এই লিরিকটার রচয়িতা হচ্ছেন গীতিকার শেখ রানা, আমাদের নষ্টালজিক!

লিরিকটির পিছনের কাহিনী মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে যখন দ্বিতীয় লিরিকটাতে চোখ গেলো, তখন যেনো বিস্ময়াভূত হতেও ভুলে গেছি। এটা যে, আই সি সি বিশ্বকাপ ক্রিকেট’২০১১ –এর অফিসিয়াল থিম সং “জিতবে এবার জিতবে ক্রিকেট”! নষ্টালজিকের মতো আমিও আবেগাপ্লুত হলাম এর পিছনের কাহিনী পড়ে।

সামনের দিকে একটু একটু করে এগোতে থাকি, আর আমার সামনে উন্মোচিত হতে থাকে একটার পর একটা বিস্ময়! “বৃষ্টি পড়ে অঝোর ধারায়, বৃষ্টি পড়ে লজ্জা হারায়”, “আঁধার শেষে আলোয় হেসে সূর্য আকাশ বুকে ধরে, সামনে দাঁড়া”, “মেঘবালিকা এসো, আমার কাছে এসো”, “আমি ফিরে পেতে চাই সেই বৃষ্টি ভেজা সুর, আমি ফিরে পেতে চাই সাত সুখের সমুদ্দুর”, “চার দেয়ালে বন্দী ভোরের ঘুম, দরজাটাতে অনেক দিনের ঘুণ”, “বৃষ্টি কখন কার শিয়রে, জলের কণা আদর করে”, “তুমি হবে বুড়ি”, “খোলা আকাশ, একটি গাছ। সবুজ পাতা, একটি গাছ”- একটার পর একটা প্রিয় লিরিকগুলো পড়ছিলাম, পড়ছিলাম এই লিরিকগুলোর সৃষ্টির কাহিনী আর আমি হারিয়ে যাচ্ছিলাম এক অদ্ভূত ভালো লাগার জগতে।

আমার এই লেখার শুরুতে আমি সঞ্জীব চৌধুরী আর বাপ্পা মজুমদারের কথা বলেছিলাম, কারণ নষ্টালজিক এই দুইজন মানুষকে খুব পছন্দ করেন, ভালোবাসেন। তা যেনো প্রতিটি লিরিকের পিছনের কাহিনীতেই ফুটে উঠেছে। তাই তার ভালোবাসার মানুষদের সাথে আমার সংযোগটা জানানোর লোভটা আমি সামলাতে পারি নি, যেমন পারছি না এই লেখাটা শেষ করার আগে আমার খুব প্রিয় একটা লিরিক তুলে না দিয়ে ( আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে, এই লিরিকটার সাথে শেখ রানা ভাইয়া খুব আবেগিকভাবে জড়িত)-

“কাকে আমি নামটা ধরে ডাকি
কে বা বলো মুখটা তুলে চায়
আমার চোখে অন্য দুটি চোখ
স্বপ্ন সমান সমুদ্র ভাবায়।

আমি শুধু চোখটা খুঁজে ফিরি
আমার চোখে জলও ছবি আঁকে
ঐ মেয়েটা আমার মতোই একা
আমার মতো খোজে কি মেঘটাকে?
আমার মতোই খোজে কি মেঘটাকে?

মেঘের মেয়ে, আকাশটা আজ নীল
দখিণ হাওয়ায় উড়ছে শংখচিল
দিলাম তোমায় স্বপ্ন সমান আশা
দিলাম তোমায় শংখ ভালোবাসা
শংখচিলের ডানায় ভালোবাসা——- ”

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s