Days of Glory/Indigenes: একদল প্রতারিত সৈন্যের অসীম সাহসিকতা আর অদ্ভুত আনুগত্যের কাহিনী

সবসময় সব জায়গাতেই যুদ্ধের মুভিগুলোর বাজার আছে, যেমন আছে যুদ্ধের। আমরা খুব আগ্রহ নিয়ে যুদ্ধের মুভিগুলো দেখি, দেখি কতটা বাস্তব সম্মতভাবে যুদ্ধ ফুটে উঠেছে, আর সামান্য মাত্র কৌতুহল থাকে কারা যুদ্ধ করছে, কিসের জন্য যুদ্ধ করছে তা নিয়ে।

আলজেরিয়ান বংশদ্ভুত ফ্রেঞ্চ পরিচালক Rachid Bouchareb এর ফ্রেঞ্চ এবং এরাবিক ভাষার মুভি ‘Indigenes’ যার অর্থ ‘Native’ দেখে কিন্তু প্রথমেই মনে আসে যারা যুদ্ধ করছে, তারা কিসের জন্য যুদ্ধ করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নাজীদের কাছে পরাজিত পরাধীন ফ্রান্সকে উদ্ধার করার জন্য যুদ্ধ করছে ফ্রান্সেরই কলোনি আলজেরিয়া আর উত্তর আফ্রিকার আরো কিছু কলোনির অধিবাসীরা, যাদের স্বাধীনতাই ফ্রান্স তখনো দেয়নি, যারা ফ্রান্সকে নিজেদের দেশ মনে করেই এর উদ্ধারে যুদ্ধে নেমেছে, অথচ প্রতিটি পদে পদে বৈষম্যসূচক আচরণের সম্মুখীন হয়েছে, হয়েছে বর্ণবাদের স্বীকার।

২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই অসম্ভব শক্তিশালী মুভিটি শুধু ২য় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের নেতাদের মানসিকতাই তুলে ধরেনি, একই সাথে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাককেও বাধ্য করেছে ফ্রান্সের আইন পরিবর্তন করতে।

‘Indigenes’ (ইংরেজী টাইটেল ‘Days of Glory’) মুভিটি শুরু হয়েছে উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়াতে, ১৯৪৩ সালে, যেখানে জেনারেল চার্লস দ্য গলের অধীন Free French Forces-এর জন্য ফ্রান্সের কলোনিগুলো থেকে সৈন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। (Free French Forces হচ্ছে ফ্রান্সের সেইসব সৈন্যদল, যারা জার্মানীর কাছে ফ্রান্সের পরাজয়ের পরও ফ্রান্সকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে গেছে।) কাহিনী শুরু হয়েছে চার আরব মুসলিমকে নিয়ে, যারা এই সৈন্যদলে নাম লিখিয়েছে। সাইদ, এক দরিদ্র ও অশিক্ষিত সৈন্য যে দারিদ্রতা থেকে পালাতে চায়; মেসাউদ- একজন প্রেমিক সৈন্য যে ফ্রান্সেই বিয়ে করে থেকে যেতে চায়; ইয়াসির এবং তার ভাই লারবি, যারা যুদ্ধে এসেছে পরিবারের সম্মানের জন্য এবং অর্থের আশায়, যে অর্থ দিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে লারবি বিয়ে করবে এবং আব্দেল কাদের, একজন শিক্ষিত আলজেরিয়ান সৈন্য, যে যুদ্ধ করতে চায় স্বাধীনতা এবং ফ্রেন্স আর্মির সমান অধিকার পাবার জন্য, একই সাথে আলজেরিয়ার প্রতি ফ্রান্সের মনোভাব বদলানোর জন্যও। যে কারণেই তারা যুদ্ধে আসুক, তারা প্রত্যেকেই যুদ্ধ করেছে এমন একটি দেশের জন্য, যে দেশ তারা কোনদিন চোখেই দেখেনি।তারা প্রতেক্যেই যুদ্ধের শুরুতে বলে উঠে, “We must wash the French flag with our blood!” তারা চিৎকার করে উঠে, “We must liberate France!”

বর্তমান কালে এই মুভি দেখে আমরা চিন্তা করি, কীভাবে তা সম্ভব? কীভাবে কলোনিয়াল সৈন্যরা এমন আনুগত্যের সাথে যুদ্ধ করে? আমরা ভুলে যাই, একই যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীতে ভারতীয় সৈন্যদের কথা, গুর্খাদের কথা। এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাতকারে পরিচালক Bouchareb বলেছিলেন, “I can quite understand that you might think this is strange. But what perhaps you don’t know is that many Maghrebins [people from the former French colonies of Morocco, Tunisia and Algeria] had fought for France before and felt an ancestral commitment to France – their fathers and grandfathers had already fallen for France in the Franco-Prussian war and the first world war.” মুভির মাঝামাঝি জায়গাতে, এক চার্চে, লারবি তার ভাই ইয়াসিরকে জিজ্ঞেস করে, “When I was little, French soldiers killed our whole family. What did they call it?” ইয়াসির উত্তর দেয়, “Pacification.” আমি তখন কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলি, নিশ্চল তাকিয়ে রই স্ক্রীনের দিকে।

ইতালি ক্যাম্পেইনে Cannon Fodder (যেখানে সৈন্যরা ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধ করে, সীমাহীন ক্ষতি জেনেও, সাধারণত অনভিজ্ঞ সৈন্যরাই ক্যানন ফোড্ডের হিসেবে ব্যবহৃত হয়) হিসেবে ব্যবহৃত এইসব কলোনিয়াল সেনারা Provence যাবার পথে শিপে দেখতে পেলো সাদা ফ্রেঞ্চ সৈন্যরা টমেটো পাচ্ছে, তারা পাচ্ছে না। তাদের বাহিনীর সাদা সৈন্যরা পদোন্নতি পাচ্ছে, তারা পাচ্ছে না। তারা তাদের পরিবার পরিজনকে দেখার অধিকার পাচ্ছে না, বরঞ্চ দেখতে হচ্ছে ব্যালে নৃত্য, যা দেখে মেসাউদ বলে উঠে, “What’s this shit?” মেসাউদ যখন ফ্রেঞ্চ মেয়ে ইরেনের প্রেমে পড়ে, সে তখন তার ভাগ্যকে বিশ্বাস করেতে পারে না। ইরেনেকে বলে, “In my country, we don’t go with French women.” কিন্তু ইরেনে ঠিকই মেসাউদকে ভালোবাসে, মেসাউদকে চিঠি লিখে, মেসাউদের কাছ হতে চিঠি পাবার অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু পায় না, কারণ, ফ্রেঞ্চ আর্মি তখনো মেনে নিতে পারেনি এক ফ্রেঞ্চ মেয়ের সাথে এক কলোনিয়াল আরবের প্রেমকে, যে কি না তাদের দেশের জন্যই যুদ্ধ করছে।

কিন্তু সবাই এইসব নেটিভ সৈন্যদের প্রতি একই রকম মনোভাব পোষন করতো না। টমাটো নিয়ে সৃষ্ট ঝামেলায় এক পর্যায়ে সার্জেন্ট মার্টিনেজ, তার সুপিরিয়র অফিসারের সাথে কথা বলছে, “They’re ready to die for us, sir, but any injustice will cause mutiny.” কিন্তু তার সৈন্যদের “natives” হিসেবে সম্বোধন করে নি, এমনকি “Muslims”ও তার কাছে যথোপযুক্ত মনে হয় নি। ক্যাপ্টেন যখন তাকে জিজ্ঞেস করে, “What should I call them, then?” সার্জেন্ট মার্টিনেজের উত্তর ছিলো, “The men.” তখন মনে হয় পৃ্থিবীর সব জায়গাতেই সব পরিস্থিতিতেই মানবতার পতাকাবাহী কিছু মানুষ থাকবেই। এই সার্জেন্ট মার্টিনেজের মা আবার আরব। এই সত্যটি যখন সাইদ টের পেয়ে যায়, মার্টিনেজ তখন তাকে খুন করার হুমকী দেয়। আবার এই মার্টিনেজই সুপিরিয়র অফিসারের কাছে আব্দেল কাদেরের পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করে। ১৯৪৪ সালের আগস্টে এই সৈন্যরা যখন মার্সেইলী নাজী দখলমুক্ত করে, তখন সেখানকার ফ্রেঞ্চ আর্মি চীফ General Jean de Lattre de Tassigny লিখেছিলেন, “the unforgettable and poignant procession of all the makers of this … victory – the tirailleurs, the Moroccan Tabors, troopers, zouaves, and gunners – followed by the motley, fevered, bewildering mass of the FFI [French resistance], between the two lines of a numberless crowd, frenzied, shouting with joy and enthusiasm, whom the guardians of order could not hold back.” ‘Days of Glory’-খুব সুন্দরভাবেই তা ফুটিয়ে তোলে আমাদের সামনে।

পরিচালক Bouchareb বলেছিলেন, “These were heroes that history has forgotten. My purpose was to make them live again in the memories of those who have forgotten and make those who never knew learn something of their heritage.” মজার ব্যাপার হচ্ছে মূল চরিত্রে অভিনয়কারীরা মুভির শুটিং শুরু হবার আগ পর্যন্ত এইসব কলোনিয়াল সৈন্যদের উপর ফ্রেঞ্চ আর্মির বৈষম্যসূচক আচরণের কথা জানতো না। তেমনি জানতো না, ছবির শেষে যে ফুট নোট লেখা হয়েছিলো তা নিয়েও।

মুভিটির শেষ হয়েছিলো ফুটনোট দিয়ে, “In 1959, a law was passed to freeze the pensions of infantrymen from former French colonies about to become independent. In 2002, after endless hearings, the French government was ordered to pay the pensions in full. But successive governments have pushed back this payment.” মুভিটি ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনে এত তোলপাড় ফেলেছিলো যে, সেই সময়ের ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক মুভিটির প্রিমিয়ারের আগে ঘোষনা দিয়েছিলেন যে, কলোনিয়াল সৈন্যরাও পুরো পেনশন পাবে।
মুভিটির একদম শেষটা দেখে মনে পড়ে যায় Saving Private Ryan-এর কথা। যদিও এতে Saving Private Ryan-এর মতো চরিত্রের জটিলতা নেই, নেই তেমন রক্তও, যা যুদ্ধের মুভিগুলোর অতি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। তারপরও Patrick Blossier-এর সিনেমাটোগ্রাফিতে মুভিটিকে অন্যরকম লাগছিলো, অন্যরকম লাগছিলো এর শক্তিশালী ডায়লগের জন্যও।

অভিনেতাদের পারফর্মেন্স মুভিটির একটি বিশাল প্লাস পয়েন্ট। ২০০৬ সালের কান ফেস্টিভ্যালে মুভিটি সেরা অভিনেতার পুরস্কার পায়- পাঁচজন অভিনেতাই একসাথে- সাইদ, আব্দেল কাদের, মেসাউদ, ইয়াসির এবং মার্টিনেজ। সবাই মিলে সবার চরিত্রকে পূর্ণতা দিয়েছে। মুভিটি আলজেরিয়া থেকে অস্কারে বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পায় এবং চূড়ান্ত পর্বে গিয়ে The lives of others-এর কাছে হেরে যায়।

‘Days of Glory’ নামে আরেকটি যুদ্ধের মুভি আছে, যা ১৯৪৪ সালে মুক্তি পায়, যেখানে ১৯৪১ সালের একদল সোভিয়েট গেরিলা যোদ্ধার কাহিনী দেখায় যারা জার্মানীর রাশিয়া আক্রমন প্রতিরোধ করেছিলো। এই মুভিটিতে আমার খুব প্রিয় একজন অভিনেতা গ্রেগরি পেক অভিনয় করেন, যা তার প্রথম মুভি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s