সরলরেখা – বক্ররেখা

(এটি একটি বারোয়ারি গল্প। ‘চতুর্মাত্রিক’ ব্লগে প্রথম পর্বটি লিখেন নাজমুল হুদা ভাই। এই পর্বটি হচ্ছে তৃতীয় পর্ব। সবগুলো পর্বের লিঙ্ক যথাসময়ে আপডেট করা হবে।)

সরলরেখা – বক্ররেখাঃ প্রথম পর্ব

সরলরেখা – বক্ররেখাঃ দ্বিতীয় পর্ব

রুম থেকে বের হয়েই হাসির দমকে ছলকে উঠছে সেলিনা, এতো বড়ো একটা মানুষ এখনো ছোট বাচ্চাদের মতো বিছানা থেকে গড়িয়ে পড়ে! মিলনের অপ্রস্তুত ভাবটা সেলিনা খুব উপভোগই করেছে, মিলন ভাবছে সেলিনা বুঝতেই পারেনি।

আজকের সব খাবার সেলিনা নিজ হাতেই রান্না করেছে। সাধারণত বুয়াই সবসময় এই কাজটা করে, কিন্তু আজকে রান্না করতে সেলিনার ভালোই লাগছিলো। ভাইয়া যখন দুয়ে্ক দিন আগে বললো সে ঢাকায় যাবে, বাসায় এসে মিলন থাকবে, শুনে সেলিনা কিছুক্ষন চুপ ছিলো। একবার ভাবলো বলে, একসাথেই দুইজনে ঢাকায় যাবে বা ও একাই বাসাতে থাকতে পারবে। কিন্তু বললো না। ভাইয়া ওর বন্ধুদেরকে, বিশেষ করে সিরাজ ভাই আর মিলন ভাইকে খুব পছন্দ করে। এখন ও ‘না’ বললে ভাইয়া কষ্ট পাবে, ভাববে সেলিনা বোধহয় মিলনকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তাই শেষ পর্যন্ত সেলিনা রাজি হয়েছে।

সেলিনা খুব ছোট থেকেই সিরাজ ভাইকে দেখে এসেছে, ওদের বাসায় ভাইয়ার সাথে প্রায়ই আসতো। সিরাজ ভাইকে ওর প্রথম দিকে খুব বিরক্ত লাগতো। বাসায় যখন আসতো, সুযোগ পেলেই পিচ্চি সেলিনার ঝুটি বাঁধা চুল ধরে টান দিতো, আর হেসে হেসে বলতো, ‘সেলিনা, সেলিনা, তোমার সাথে খেলিনা, খেলিনা’। কিন্তু ওর যেদিন প্রচন্ড জ্বর হলো, জ্বরের ঘোরে সেলিনা প্রলাপ বকা শুরু করলো, মধ্যরাতে ওর ভাইয়া হতবুদ্ধি হয়ে সিরাজের কাছে ছুটে গেলো। সেদিনের কথা সেলিনার এখনো মনে আছে, ওর ভাইয়া আর সিরাজ ভাই ওকে পাঁজাকোলা করে শহরের আরেকপ্রান্তে ডাক্তার চাচার বাড়িতে নিয়ে, অতরাতে তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে সেলিনাকে দেখিয়েছে। ফার্মেসীর ছেলেকে বাড়ি থেকে আনিয়ে দোকান খুলে ঔষুধ কিনেছে। সেদিন সিরাজ ভাই না থাকলে ওর ভাইয়া কিছুই করতো পারতো না। সেই থেকে সিরাজ ভাইয়ের প্রতি সেলিনার একটা প্রবল শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে, যদিও তার সেলিনাকে নিয়ে মজা করার স্বভাবটা এখনো যায় নি। তবে সেলিনা ইদানীং সিরাজ ভাইয়ের উপর একটু বিরক্ত। ও মাঝে মাঝে টের পায়, ভাইয়া বাইরে থেকে কিছু একটা খেয়ে মাঝরাতে বাসায় আসে, কথা বলার সময় জড়িয়ে যায়। ওকে ধরাধরি করে নিয়ে আসে সিরাজ ভাই। একদিন সিরাজ ভাইয়ের কাঁধ হতে ভাইয়াকে ধরতে গিয়ে ও দুইজনের মুখেই একটা বাজে গন্ধ পেয়েছিলো, গন্ধটা পেয়ে ওর খুব বমি আসছিলো।

এইদিক থেকে মিলন ভাই অনেক ভালো। মিলন ভাইয়ের সাথে ওর ভাইয়ার পরিচয় হয় কলেজে। মাঝে মাঝে বাসায় আসতো। খুব কম কথা বলতো, কথা বলতে গেলে মনে হয় লজ্জায় কথা আটকে যেতো। ভাইয়ার কাছ হতে শুনেছে মিলন ভাইয়ের কোনো বোন নেই, তাই বোধহয় মেয়েদের সাথে কথা বলতে একটা জড়তা কাজ করে। সেলিনা সেজন্য খুব একটা সামনেও যেতো না। মিলন ভাই সম্পর্কে খুব একটা ভালোও জানে না। মানুষটা কি কি খেতে পছন্দ করে, কীভাবে থাকতে চায় চিন্তা করতে গিয়ে সেলিনা একটু বিপদেই পড়ে গিয়েছিলো। পরে সবকিছু নিজের পছন্দ মতো করেছে। থাকার রুমটা পছন্দ হলো কী না সেটাও এখন পর্যন্ত জানা হলো না।

এসব কিছু ভাবতে ভাবতে কখন যে মিলন খাবার টেবিলের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, সেলিনা লক্ষ্যই করেনি।

– আরে, এতো এলাহী ব্যাপার! আমাকে কী তোমার রাক্ষস মনে হচ্ছে? এতো কিছু খাবো কীভাবে?
– যতটুকু খেতে পারবেন, ততটুকুই খাবেন। কোনো সমস্যা নেই।

চেয়ার টেনে মিলন খেতে বসলো। উল্টোদিকে সেলিনাও খেতে বসলো। বুয়া খাবার বেড়ে দিচ্ছে। সেলিনার দিকে মিলন তাকিয়ে দেখলো ও একটা হালকা নীল রঙের সেলোয়ার কামিজ পড়েছে, দীঘল কালো চুল ছেড়ে দেওয়া আছে। কপালে একটা নীল রঙের ছোট টিপও দিয়েছে। খুব সুন্দর লাগছে সেলিনাকে। খেতে খেতেই মিলন সেলিনাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি হতে চাও, সেলিনা?’

মিলনের প্রশ্ন শুনে সেলিনা হেসে দিলো।

– ভাইয়া, আমি এখনো এস এস সি পরীক্ষা দেইনি, আগামী বছর দিবো। তাই সেভাবে ঠিক করিনি কি করবো। শুধু এটুকু বলতে পারি আমি আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখি। তাতে আকাশটাকে ছুঁতে না পারলেও কাছাকাছি তো যেতে পারবো। আমার কথা বাদ দিন। আপনার কি ইচ্ছে সেটা বলুন।

সেলিনার উত্তর শুনে মিলন খুব মুগ্ধ হলো, এমনিতেই সেলিনার কথা শুনতে ওর খুব ভালো লাগে, ও কথাগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে বলতে পারে। সঙ্গো্পনে মিলন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, ওর যদি এরকম একটা ছোট বোন থাকতো!

– আমি ডাক্তার হতে চাই, মানুষের সেবা করতে চাই। অসহায়, দরিদ্র মানুষের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই।
– শুধু মানুষের সেবা করতে চান? আজকাল ডাক্তাররা তো মানুষের সেবার চেয়ে নিজের সেবাটাই বেশি করে। একেকজন ডাক্তার যেনো একেকজন কসাই, শুধু টাকা চেনে। ডাক্তার হবার আগে বলে মানবসেবা করতে চাই, ডাক্তার হবার পরে বলে ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’।
– পুরোপুরি ভুল তুমি বলো নি। তবে অবস্থার পরিবর্তন আস্তে আস্তে হচ্ছে। সময় লাগবে, কিন্তু হবে। ভালো কথা, খাবারটা তোমার মতোই খুব সুন্দর হয়েছে। কে রান্না করেছে?

মিলনের কথায় লজ্জা পেয়ে গেলো সেলিনা, ওর ফর্সা গালটা রক্তিম হয়ে উঠলো। কোনো রকমে বলতে পারলো, ‘আমি’। পরমুহুর্তেই বলে উঠলো, ‘আপনিও তো চমৎকার করে কথা বলেন! আর আমি ভেবেছি, আপনি বোধহয় কথা বলাই জানেন না’, বলেই সেলিনা হেসে উঠলো। এবার মিলনের লজ্জা পাবার পালা। ও একটু চমকেই গেলো, বুঝতে পারছে না আজ কীভাবে সে এতো কথা বলতে পারছে! খাওয়া শেষ করে রুমে যাবার আগে মিলন সেলিনাকে জানালো সে আগামীকাল সকালে একটা জরুরী কাজে ব্যস্ত থাকবে, দুপুরে খেতে আসতে পারবে না, একেবারে বিকেলে আসবে।

রাতে ঘুমাতে গিয়ে মিলনের বার বার সেলিনার আকাশ ছোঁয়ার কথাটা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে আকাশ নিয়ে নির্মলেন্দু গুণের লেখা কবিতাটি-

“আমার সমস্ত ভাবনা যখন তোমাকে ছোঁয়,
আমার সমস্ত উপলব্ধি যখন তোমার
আত্মাকে স্পর্শ করে, আমার সমস্ত বোধ
যখন তোমার বোধিতে নিমজ্জিত হয়,
তখন আমার প্রাণের গভীর থেকে
স্বতঃস্ফূর্ত মোহন মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হয়
একটি অত্যন্ত সহজ শব্দ…”আকাশ” ।

আমি শব্দটিকে ক্রমাগত উচ্চারণ করি ।
জানি না কেন এ শব্দটিই শুধু
এত বারবার ঘুরে ঘুরে আসে ।
জানি না কী পেয়েছে সে আমার ভিতরে?
আমি লক্ষ্য করেছি, ‘আকাশ’ শব্দটি
উচ্চারিত হওয়ার পরে আমার ভিতরে
আর কোন কষ্টই অবশিষ্ট থাকে না ।
যেন যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বুলেটের মতো
আমার বুকের ভিতরে গেঁথে ছিল
এই যন্ত্রণাক্ত আকাশ শব্দটি ।

তোমার আমার মাঝে আছে এরকম
অনেক আকাশ । – আমি
ব্যর্থ প্রেমিকের মতো মুগ্ধমূর্খচোখে
কেবল তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে” ।

————————————-

ঢাকার ধানমন্ডিতে লেকের পাশেই হাবিবের ফুফুর বাসা। খুব ফুরফুরে মন নিয়ে হাবিব ঢাকায় এসেছে, অনেকদিন পর। সাত দিনে ঢাকাকে সে আবার আবিস্কার করবে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে ফুফুর বাসায় ঢুকার সময় ওর মিলির চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সেই দুই বছর আগে দেখেছে ওকে। তখনই খুব সুন্দর লেগেছিলো, এখনকার কথা চিন্তাই করতে চাচ্ছে না। হাবিব কী মিলিকে ভালোবাসে? জানে না, একটু একটু বোধহয় ভালোবাসে, তাও নিজের কাছে স্বীকার করতে লজ্জা পায়। মিলি কী হাবিবকে ভালোবাসে? হাবিব জানে, মিলি ওকে খুব ভালোবাসে। গতবার একটা চিঠি সবার অজান্তে হাবিবের হাতে তুলে দিয়েছিলো চলে আসবার সময়। বাড়িতে এসে চিঠিতে দেখে রবীন্দ্রনাথের ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’ গানটিই শুধু লেখা। তাতেই যা বোঝার বুঝে গিয়েছিলো হাবিব। ব্যাপারটা নিয়ে ও তখন সিরাজের সাথে কথাও বলেছিলো, সিরাজ একটু আদি রসিকতা করেছিলো। হাবিব সিরাজের উপর তখন খুব বিরক্ত হয়েছিলো। পরে যখন মিলনকে বলেছিলো, মিলন বলেছিলো চিঠি না লিখে একেবারে সামনা সামনি কথা বলতে। আজ মিলির সাথে সামনা সামনি দেখা হবে। হাবিবের বুক কী একটু ধড় ফড় করছে?

কলিং বেল টেপার পর কাজের বুয়া দরজা খুলে দিলো। ফুফুতো হাবিবকে দেখে অনেক খুশি! জড়িয়ে ধরে বলছে, ‘কতদিন পর এলি!’ হাবিব ফুফুর আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কিন্তু মিলিকে দেখতে পাচ্ছে না। সে জিজ্ঞেসই করে ফেললো, ‘ফুফু, মিলি কৈ? দেখছি না যে!’ ‘রুমে আছে, ওকে ডাক দিচ্ছি’, বলেই ফুফু চলে গেলেন মিলিকে ডাকতে।

ফুফু মিলিকে ডাকতে যেতেই হাবিব ড্র্য়ংরুমের ওয়ালমেটগুলো দেখতে লাগলো। খুব সুন্দর ছবিগুলো। চিন্তা করছে, এবার বাড়িতে যাবার সময় সেও দুয়েকটা কিনে নিয়ে যাবে, সেলিনা খুব খুশি হবে। বোনটার খুব রুম সাজানোর বাতিক আছে। সেলিনার কথা মনে আসতেই, ওর মনে হলো বাড়িতে কিছুক্ষন পরে ফোন দিবে। নিশ্চয়ই ভালো থাকবে, মিলন আছে যেখানে, কোনো সমস্যা হবে না।

– অবশেষে এলেন! আমি তো ভাবলাম, আপনাকে আর কাছেই পাবো না।

কখন যে মিলি চলে এসেছে টেরই পায়নি হাবিব। ঘুরে মিলিকে দেখে খুব ভালো লাগলো ওর। আগের চেয়ে আরো সুন্দর হয়েছে মেয়েটা। হেসে বললো,

“কাছে যতটুকু পেরেছি আসতে, জেনো
দূরে যেতে আমি তারো চেয়ে বেশী পারি।
ভালোবাসা আমি যতটা নিয়েছি লুফে
তারো চেয়ে পারি গোগ্রাসে নিতে ভালোবাসা হীনতাও”।

———————————————–

বিকেলের দিকে মিলন কাজ শেষ করে হাবিবদের বাসায় আসলো। দরজা খুলে দিলো বুয়া। সেলিনা কোথায় জিজ্ঞেস করতে বললো ওর রুমে আছে। কিছুটা ইতস্তত করে মিলন সেলিনার রুমের দরজায় টোকা দিলো। ভিতর থেকে সেলিনা জানতে চাইলো, ‘কে?’ মিলন ভেজানো দরজাটা আলতো করে খুলে ভিতরে তাকিয়ে দেখলো সেলিনা বিছানাতে আধশোয়া হয়ে বই পড়ছে, নামটা দেখতে পেলো ‘সাতকাহন’। দরজায় দাঁড়িয়েই মিলন বললো,

“কাছে যাওয়া বড্ড বেশি হবে
এই এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ভালো,
তোমার ঘরে থমকে আছে দুপুর
বারান্দাতে বিকেল পড়ে এলো”।

চমকে উঠলো সেলিনা, ‘আপনি কীভাবে বুঝলেন আমি এখন এই অংশটুকুই পড়ছি’। হেসে কিছুটা রহস্য করে মিলন বললো, ‘আমি যাদু জানি!’ মিলনের কথা বলার ধরনে হেসে ফেললো সেলিনা। বললো, ‘আচ্ছা চলুন, বাইরে বাগানে যাই’।

ওরা যখন বাগানে আসলো, মিলন দেখতে পেলো রাস্তা থেকে ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে সিরাজ!

——————————————————-

সরলরেখা – বক্ররেখাঃ চতুর্থ পর্ব

সরলরেখা-বক্ররেখা : পঞ্চম পর্ব

সরলরেখা – বক্ররেখাঃ ষষ্ঠ পর্ব

সরলরেখা – বক্ররেখাঃ সপ্তম পর্ব

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s