মনের মানুষঃ একটি ভালোলাগা চলচ্চিত্র, কিন্তু ……

আমার খুব প্রিয় একজন লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর ‘মনের মানুষ’ উপন্যাসকে অবলম্বন করে আরেক প্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ ছবি তৈরি করেছেন, নাম দিয়েছেন উপন্যাসের নামে ‘মনের মানুষ’। ছবিটি ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় ২০১০ সালের ৩রা ডিসেম্বর দুই বাংলায় একইসাথে ১০০টি পেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। যতোদূর জানা যায়, এর আগে যৌথ প্রযোজনায় বাংলাদেশে আরো অনেক চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও কখনোই কোনো চলচ্চিত্র একসঙ্গে দুই দেশে মুক্তি পায়নি। আর, মুক্তি পাওয়ার আগেই ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত ৪১তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘গোল্ডেন পিকক’ পায়। গত দশ বছরের মধ্যে আর কোনো ভারতীয় চলচ্চিত্র এ পুরস্কার পায়নি। ‘‘বিস্ময়কর চালিচ্চিত্রিক সৌন্দর্য এবং ঘৃণা-ক্লেদে পূর্ণ আজকের পৃথিবীতে ভালোবাসার আন্তরিক চিত্রায়ণের জন্য’’ মনের মানুষকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। দেখবো দেখবো করে অনেক দেরীতে আমি ছবিটি দেখেছি, তাও সিনেমা হলে গিয়ে নয়। ছবিটি ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক সাধকদের মধ্যে অন্যতম বাউল সাধক লালন শাহের জীবন দর্শনকে নিয়ে নির্মিত। ছবিটি নিয়ে আমার কিছু বলার নেই, আমি চিত্র সমালোচক নই। আমি শুধুমাত্র ছবিটি দেখতে গিয়ে আমার অনুভুতি আর প্রাসঙ্গিক কিছু কথা লেখার জন্যই আজ লিখতে বসেছি।

 

ফকির লালন সাঁই
ফকির লালন সাঁই

ছবিটির প্রথমেই দেখানো হয়েছে একটি আপাতদৃষ্টিতে মৃতদেহ ভেলায় করে নদীতে ভেসে চলছে। তারপরেই দেখা গেলো লালন চন্দ্র কর নামে এক যুবকের সাথে সিরাজ সাঁইয়ের পরিচয় হয়। যুবকটি সিরাজ সাঁইকে তাঁর গাওয়া গানটার মানে জিজ্ঞেস করলে সাঁইয়ের একটা কথা আমার খুব ভালো লাগে, ‘আহম্মক ছাড়া কেউ গানের মানে খুঁজে না’। আমি নিজেও এইসব আধ্যত্মবাদী গানের মানে খুব একটা বুঝতে পারি না, মানে বোঝারও চেষ্টা করি না, কিন্তু শুনতে খুব ভালো লাগে, মন জুড়িয়ে যায়। তারমানে আমি আহাম্মক নই, তাই না!

এরপরেই দেখা গেলো লালন চন্দ্র কর নামের যুবকটিই হচ্ছে লালন শাহ। আমি এখানে একটূ হোঁচট খেলাম। আমি যতদূর জানতাম, লালন কোন ধর্মের অনুসারী ছিলেন বা তাঁর জন্মগত ধর্ম কি ছিলো, সেটা নিয়ে বিস্তর গবেষনা করেও জ্ঞানী গুণী গবেষকরা কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেন নি। ১৮৯০ সালে ১৭ অক্টোবর লালন সাই দেহত্যাগ করলে এর পনের দিন পর স্থানীয় একটি পাক্ষিক পত্রিকা ‘হিতকরী’ পত্রিকায় ‘মহাত্মা লালন ফকির’ নামে এক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধে তাঁকে হিন্দু বানানোর প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ‘ইহার জীবনী লিখিবার কোনো উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছুই বলিতেন না । শিষ্যেরা হয়ত তাঁহার নিষেধক্রমে না হয় অজ্ঞতাবশত কিছুই বলিতে পারেন না । তবে সাধারণে প্রকাশ লালন ফকির জাতিতে কায়স্থ ছিলেন। … … ইঁনি ১১৬ বছর বয়সে গত ১৭ অক্টোবর শুক্রবার প্রাতে মানবলীলা স্মরণ করেছেন।’ (বিশ্বাস, লোককবি লালন-পৃঃ-১৩৭)। অবশ্য এরও আগে ১৮৭২ সালে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার তার প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘গ্রামবার্তা’ প্রকাশিকায় ‘জাতি’ নামক এক নিবন্ধে জানান, “লালন শাহ নামে এক কায়স্থ আর এক ধর্ম আবিষ্কার করিয়াছে। হিন্দু মুসলমান সকলেই এই সম্প্রদায়ভুক্ত। আমরা মাসিক পত্রিকায় ইহার বিবরণ প্রকাশ করিব। ৩-৪ বৎসরের মধ্যে এই সম্প্রদায় অতিশয় প্রবল হইয়াছে। ইহারা যে জাতিভেদ স্বীকার করে না সে কথা বলা বাহুল্য” (আহমদ; যুক্তবঙ্গে লালন চর্চার ক্রমবিকাশ; পৃঃ- ৩৩)। লালন শাহ তাঁর জীবদ্দশায় পাঁচ বিঘা জমি কিনেছিলেন। ১৮৮১ ও ১৮৮২ সনে তাঁর অনুকূলে দুটি দলিল সম্পাদিত হতে দেখা যায়, সেখানে তাঁকে অবশ্য মুসলমান হিসেবে দেখানো হয়েছে। ‘ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা থানার অন্তর্গত আলমডাঙ্গা গ্রামে লালন শাহ জমি কিনে আখড়া বাড়ি তৈরি করেন। ওই জমির দুটি পাট্টা দলিল পাওয়া গেছে। ১৮৮১ ও ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে দলিল দুটি সম্পাদিত হয় (সরকার; লালন শাহের মরমী দর্শন; পৃঃ- ৪৪৮)। এভাবেই বিছিন্ন কিছু তথ্য প্রবাহকে আশ্রয় করে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে টানা-হেঁচড়া শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ লালনের জন্ম সম্পর্কে আজো পর্যন্ত কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছানো সম্ভব হয় নি। লালন নিজেও বলেছেন,

“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
লালন কয় জাতের কিরুপ
দেখলাম না এই নজরে”।

অথবা,

“সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন
লালন বলে আমার আমি
না জানি সন্ধান”।

সেখানে ছবিতে তাঁর হিন্দু ঘরে জন্মানো দেখানোটা প্রকৃত তথ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তাই নয় কী?

একটু পরেই আমরা দেখতে পাই বৃদ্ধ লালন শাহ বজরাতে বসে আছেন, এক শহুরে কেতাদুরস্ত ব্যক্তি তাঁর পোর্ট্রেট আঁকছেন। একপর্যায়ে লালন ফকিরকে জিজ্ঞেস করছেন, “তুমি কী বাউল ফকির? কথায় কথায় গান বান্ধো? তুমি কে গো?” উনি লালন ফকিরকে সুধাচ্ছেন তুমি কে গো, অথচ তখনো আমরা জানতেই পারছি না এই কেতাদুরস্ত মানুষটি কে? অবশ্য কিছুপরের এক দৃশ্যে লালনের পোর্ট্রেটে স্বাক্ষর দেবার সময় দেখতে পাই মানুষটির নাম জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্র ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঞ্চম পুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর থেকে বারো বছরের ছোটো। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁকে উৎসাহ ও সঙ্গ দিয়ে তাঁর প্রতিভার পূর্ণ বিকাশে সহায়তা করেন। ছাত্রাবস্থাতেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ থিয়েটারের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর রচিত একটি নাটকের নাম ছিলো ‘সরোজিনী’। এই নাটকটির সাথে রবীন্দ্রনাথ কিছুটা জড়িত আছেন। নাটকটি যে ঘরে রচনা হত, তার পাশের ঘরে কিশোর রবীন্দ্রনাথ সংলাপ শুনতেন। সরোজিনী তৈরির সময় রবীন্দ্রনাথ প্রস্তাব করেন, সরোজিনী জ্বলন্ত আগুনে হেঁটে আত্মাহুতি দিতে যাচ্ছে এই দৃশ্যটির পিছনে উক্তি ব্যবহার না করে গান ব্যবহার করতে হবে এবং এই গানটি রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন। অঙ্কন ও স্কেচ করার দিকে আগ্রহী ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। নিজের পরিবারের অনেক সদস্যের পোর্ট্রেট তিনি আঁকেন। ছবিতে দেখা যায় তিনি লালনের পোর্ট্রেট আঁকছেন। আমি যতদূর জানি, লালনের প্রথম জীবনিকার বসন্তকুমার পালের লেখা থেকে-জ্যোতিরিন্দ্রনাথের গানের আসরেই বালক রবীন্দ্রনাথের সাথে লালনের প্রথম পরিচয়, এরপর প্রায়ই লালন-শিষ্যদের সাথে রবীন্দ্রনাথের প্রায়ই দেখা-কথা হতো।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের সাথে কথা বলে তাঁর ২৯৮ টি গান সংগ্রহ করেছিলেন। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে, লালনের সাথে জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে না দেখিয়ে রবীন্দ্রনাথকে দেখালেই যুক্তিসঙ্গত হতো।

এরপরেই আমরা দেখি, লালন ফ্লাসব্যাকে চলে গেছেন। ফ্লাসব্যাকে দেখা যায়, কিশোর লালন কবিরাজকে গান শোনাচ্ছে,‘‘আর আমারে মারিস নে মা/বলি মা তোর চরণ ধরে/ননী চুরি আর করবো না।’ আমি জানি না, লালনের জলবসন্ত হওয়ার আগে এই গান রচিত হয়েছিলো কী না। তাছাড়া তখন লালনের গান সংগ্রহ করার মতো তেমন কেউ ছিলো না। আর বাউল হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভের পরই।

এখানে একটা ব্যাপারে আমি একটু বলে নেই, যেহেতু পেশাগত কাজের সাথে জড়িত। ছবিতে যখন লালনের জ্বর হয়েছে, বলা হয়েছে কম্বল দিয়ে শরীর ঢাকতে। আধুনিক চিকিৎসায় এখন বলা হয়ে থাকে, জ্বর হলে শরীর থেকে সব কাপড় সরিয়ে ফেলতে। আর মৃত মনে করে ভেলায় ভাসিয়ে দেবার পর, বেঁচে থাকা বা বেঁচে উঠাকে আমার কাছে মনে হচ্ছে trans death-এর মতো। ট্রান্স ডেথ মানে হচ্ছে সোজা কথায় মৃত্যুর মতো মনে হবে, কিন্তু মারা যায় নি। ভাওয়াল রাজপরিবারের সন্যাসীর কাহিনীর সাথে এই ট্রান্স ডেথের খুব গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। আরেকদিন এটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। trans death-এর ব্যাপারটা মাথায় থাকে বলেই ডাক্তাররা সবসময় কোনো রোগী মারা গেলে, মারা যাবার প্রায় ৩০ মিনিট পর মৃত্যুর ঘোষনা দেয়।

ছবিটির এই পর্যায়ে এসে আমি আবার হোঁচট খাই। দেখানো হয়েছে নদী থেকে রাবেয়া নামে এক মুসলমান মহিলা তাঁকে উদ্ধার করেন। অথচ লালন নিজেই বলেছেন, বসন্ত রোগের পর যে মহিলার সেবায় তিনি সুস্থ হয়েছিলেন, যাকে ‘মা’ বলে ডাকতেন, তার নাম মতিজান। মতিজান লালনকে নদীর পাড়ে প্রথম খুঁজে পেয়েছিলেন এই তথ্যও কোথাও নেই। এখানেও লালন নিজেই গানে বলেছেন,

“আমি লালন এক শিরে
ভাই বন্ধু নাই আমার জোড়ে
ভুগেছিলাম পকসো জ্বরে
মলম শাহ করেন উদ্ধার।”

মলম শাহ হচ্ছেন মতিজান এর স্বামী। মলম শাহ এবং মতিজান পরবর্তী জীবনে লালনের প্রতি অপরিসীম ভক্তি ও অনুরাগে অনুপ্রাণিত হয়ে লালনের ভাবধারায় মিশে গিয়ে হয়ে যান ফকির মলম শাহ এবং মতিজান ফকিরানী। ছেউড়িয়ায় লালনের সমাধি পাশেই রযেছে মতিজান ফকিরানী এবং মলম শাহের সমাধি। লালন, মতিজান ফকিরানী আর মলম শাহ আমৃত্যু ছেউরিয়াতে একসাথে ছিলেন। অথচ মনের মানুষে সিরাজ সাঁই লালনকে রাবেয়া আর স্বামীর ঘর থেকে বের করে নিয়ে যায় আর কখনও লালনের জীবনে সেই মুসলমান বাবা মায়ের উপস্থিতি দেখানো হয় না।

এখানে আরেকটি জিনিস আমার কাছে ঠিকমতো বোধগম্য হয়নি। রাবেয়ার স্বামী রাবেয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলো, “আমাদের জাতের না, বুঝলি কি করে?” রাবেয়ার উত্তর ছিলো, “আমি ওর কাপড় বদলাইছি না!” খৎনা না করানো থাকলেই কী সে মুসলমান হতে পারবে না? বা অমুসলিম কেউ কী খৎনা করায় না?

এরপরেই লালনের সাথে আবার দেখা হয় তাঁর গুরু সিরাজ সাঁইয়ের। সিরাজ সাঁই জাতিতে মুসলমান এবং পেশায় পাল্কী বাহক বেহারা সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। নিরক্ষর লালনকে তিনি লেখাপড়া শেখাবার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলছিলেন, “এই দুনিয়ায় দুইটাই জাত, পুরুষ আর নারী, বাকী সব মানুষের অনাসৃষ্টি”। তিনি গান গেয়েছেন,

“জলের উপর পানি,
না পানির উপর জল,
আলীর উপর কালী,
না কালীর উপর আলী,
বল খোদা বল, বল খোদা বল”।

লালন শাহের স্মৃতিশক্তি ফিরে এলে লালনকে একটা চমৎকার কথা বলেন, “সময় বুঝে নিজেরে গোপন করা লাগে, আবার সময় বুঝে নিজেরে প্রকাশ করা লাগে”। কথাগুলো শুনতে ভালোই লেগেছে। সিরাজ সাঁইয়ের প্রতি মনটা শ্রদ্ধায় ভরে উঠে। কিন্তু যখন নিজের বাড়ি থেকে আসার পর লালনকে সাধন-সঙ্গী্র প্রয়োজন বলে ময়ূরী নামে কামুক নারীর কাছে পাঠায়, আর বলে, “নারীর অন্তরে ইর্ষা, চক্ষে কামনা” বা “নারীই হলো আনন্দ সহচরী, মহামায়া, তিনি সৃষ্টি আর স্থিতির জননী, আবার লয়-বিলয়ের মহা শক্তি”, তখন তাকে সামান্য একজন দালালের মতোই লাগে, কিন্তু আমি জানি সিরাজ সাঁইয়ের চরিত্র এরকম ছিলো না, তাহলে কেনো তা দেখানো হলো? খুব কী প্রয়োজন ছিলো সেই মেয়েটির মুখ দিয়ে “পারবে অমাবশ্যায় পূণির্মা জাগাতে?” বলানো এবং তারপরে লালনের সাড়া দেবার দৃশ্যটিকে দেখানো?

লালন নিজের বাড়িতে গিয়ে নিজের পরিচয় দেবার পর যখন লালনের মা বলে, “জাত গেছে, যবনের হাতে অন্ন খেয়েছিস”, এবং তারপর লালনের ধর্ম নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি্র পরিবর্তন দেখে মনে হয়েছে, যে ব্যক্তিটি আজীবন নিজের ধর্ম পরিচয়টিকে লুকিয়ে রাখলেন, তাঁর জন্য এই একটিমাত্র ঘটনাই কী টনিক হিসেবে কাজ করলো? আমার কেনো জানি মনে হলো এখানে লালনকে ছোট করা হয়ে গেলো।

ছবিতে এরপরে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। কালুয়া এবং কলমি। একজন মহান ব্যাক্তিকে নিয়ে বায়োগ্রাফিক্যাল মুভিতে এই দুইটি কাল্পনিক চরিত্রের কী আদৌ প্রয়োজন ছিলো? যেখানে দেখানো হয়েছে, অন্ধকার ঘরে লালন একলা বসে আছেন। কলমি এসে লালনের সাথে কথা বলার অনুমতি নিয়ে হঠাৎ করে লালনের কাঁধে মুখ ঘষতে থাকে, বলতে থাকে “আমার জ্বালা মিটিয়ে দেও গো সাঁই”, এরপর কলমির হাত এবং মুখ লালনের গা বেয়ে নিচে নামতে থাকে। আস্তে আস্তে এত নিচে নেমে যায় যে আর দেখা যায় না। লালন নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে কলমির খিলখিল হাসি শোনা যায়। কলমি বলে উঠে, “এইতো তোমার শরীর জেগে উঠেছে। আমাকে শান্ত করো সাঁই। তুমি দেখছি ভাবের ঘরে চুরি করো সাই”। লালন স্থির গলায় বলে উঠে, “শরীর জাগে শরীরের নিয়মে, মন যদি না জাগে?” কলমি চলে যায়। আবার একজায়গায় দেখানো হয়, কলমি ঘরের চালে ঘর বাধার কাজে ব্যস্ত কালুয়ার দিকে ইঙ্গিত মূলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করার পর কালুয়া চাল থেকে নেমে পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে থাকে। নিজের হাতে বানানো ঘর নিজেই দা দিয়ে কোপাতে থাকে। সব দেখে শুনে লালন কলমিকে বলে, “কালুয়ার নারী সঙ্গ লাগে, আমি চাই তুমি ওর সেবা করো”। কলমি বলে, “সময় গেলে সাধন হবে না”। শেষে যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও লালনের নিদের্শে পালন করতে রাজী হয়ে যায় কলমি। আমি জানি না, কাল্পনিক চরিত্র দিয়ে এগুলো দেখানোর উদ্দেশ্য কী? কলমির চেয়ে লালন ফকিরের সহধর্মিনী এবং সাধনসঙ্গী বিশখা ফকিরানীকে দেখানো হলে কী খুব অসুবিধা হতো? বিশখা ফকিরানী সারাজীবন লালনের সাথে ছিলেন। মৃত্যুর পর তার কবর লালনের কবরের সাথেই দেওয়া হয়েছে। সেই বিশখা ফকিরানীকে কেনো আমরা ছবিতে দেখতে পেলাম না? যেটা দেখানো হয়েছে, সেটা একধরনের ‘পারভার্সন’। কেননা, মনে হচ্ছে লালন যেন আনন্দবাজারে একটা ব্রোথেল পরিচালনা করে।

‘মনের মানুষে’ আরো দুইটি নারী চরিত্র দেখনো হয়েছে। একজনকে দেখা যায়, বিধবা হওয়ায় যাকে ‘সতীদাহ’ প্রথায় জীবন্ত পোড়ানো হচ্ছিলো। সেই নারীকে লালন ও তাঁর শিষ্যরা রক্ষা করে এবং ‘আনন্দবাজারে’ ঠাঁই দেয়। সেই নারী মানে ভানুমতিকে কলমি লালনের কাছে পাঠায় ‘সেবা’ করার জন্য এবং লালন আবার সাধনসঙ্গিনী করে দেন তাঁরই শিষ্য দুন্দু শাহ-এর। এক জায়গায় এই দুন্দু শাহের প্রশ্ন ইসলামে গান হারাম কী না, এর জবাবে “আকাশটা কাপছিল ক্যান ? জমিনটা নাচছিল ক্যান? বড়পীর ঘামছিল ক্যান, সেই দিন সেই দিন, গান গাইছিল খাজা যেই দিন” গানটি গেয়ে কী বোঝাতে চাইলো বুঝতে পারলাম না। আমি সঠিক জানি না, কোথায় যেনো পড়েছি, এই গানটি লালনের নয়, মাত্র ২০/২৫ বছর আগের লেখা! আরেকজন নারী চরিত্র হচ্ছেন সর্বক্ষেপী বোষ্টমী, যার নাম ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু ব্রাহ্মণের দ্বারা এই নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলো কী না, তা কোথাও খুঁজে পাই নি।

ছবিটির এই পর্যায়ে তিনটি ঐতিহাসিক চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। মনিরুদ্দিন শাহ, কাঙ্গাল হরিনাথ এবং মীর মশাররফ হোসেন। লালন জীবনে মনিরুদ্দিন শাহ খুবই গুরুত্বপূর্ন। লালন যখনই কোনো গান বাঁধতেন, মনিরুদ্দিন শাহকে ডাকতেন এবং গেয়ে শোনাতেন। মনিরুদ্দিন শাহ সেই গান শুনে লিখে রাখতেন। এখন পর্যন্ত লালনের যে সমস্ত গান পাওয়া গেছে তার বেশীর ভাগ কৃতিত্ব মনিরুদ্দিন শাহের। মাঝে মাঝে এই একই কাজ করতেন ফকির মানিক। কিন্তু ছবিতে ফকির মানিকের উপস্থিতি একেবারেই নেই আর মনিরুদ্দিন শাহকে রাখা হয়েছে অন্যান্যের মতো একজন সাধারণ বাউল বেশে। কেনো এটা করা হয়েছে, আমার ছোট মাথায় তা ধরেনি।

ছবিতে অসম্পূর্ণ দুই চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে কাঙ্গাল হরিনাথ আর মীর মশাররফ হোসেনকে। কাঙাল হরিনাথের জন্ম কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালিতে। তার আসল নাম হরিনাথ মজুমদার। ১৮৬০ সালের এপ্রিলে কাঙ্গাল হরিনাথ গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামক একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকায় সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ, ছড়া ইত্যাদি প্রকাশিত হতো। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি গ্রামবাংলার অত্যাচারিত কৃষক সমাজের দুঃখ দুর্দশার কথা বৃহত্তর জনসমাজে প্রচার করেন। গ্রামবার্তা পত্রিকায় হরিনাথ জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী প্রকাশের অপরাধে জমিদারেরা তাঁর ওপর হামলার পরিকল্পনা করেন। পত্রিকা অফিসে আক্রমন করার খবর ছেঁউড়িয়াতে পৌঁছলে লালন তার অনুসারীদের নিয়ে হরিনাথের বাড়ি পাহারা দেন। হরিনাথ মজুমদার একটি বাউলের দল করেছিলেন। তিনি গানও লিখতেন। লালনের সঙ্গে হরিনাথের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা ছিল। কাঙ্গাল হরিনাথের প্রেসে বসে লালন “এ যে দেখি কানার হাট-বাজার” গানটি রচনা করেন। অন্যদিকে কাঙ্গাল হরিনাথের অনেক গান বর্তমানে প্রচলিত থাকলেও তার নাম কাউকে উল্লেখ করতে দেখা যায় না। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ছবি পথের পাঁচালীতে কাঙ্গাল হরিনাথের “হরি দিনতো গেল-সন্ধ্যা হল-পার কর আমারে” গানটি ইন্দির ঠাকুরনের ভূমিকায় চূনীবালা গেয়েছিলেন। কিন্তু রচয়িতা হিসাবে হরিনাথের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

বিষাদ সিন্ধু ও জমিদার দর্পণ-এর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন, প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক জলধর সেন, অক্ষয় কুমার মৈত্র, দীনেন্দ্র কুমার রায়রা ছিলেন কাঙ্গাল হরিনাথের শিষ্যতুল্য এবং গ্রামবার্তার লেখক। মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন হরিনাথের বন্ধু ও গ্রামবার্তার সংবাদদাতা। কাঙ্গাল হরিনাথের কাছ থেকে মীর মশাররফ হোসেন গদ্য লেখা শিখে বিষাদ সিন্ধু রচনা করেন। এর সম্পাদনায় ছিলেন কাঙ্গাল হরিনাথ নিজে। লালনের মৃত্যুর ১২ দিন পর তৎকালীন পাক্ষিক পত্রিকা মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত ‘হিতকরী’-তে প্রকাশিত একটি রচনায় সর্বপ্রথম তাঁকে “মহাত্মা” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। রচনার লেখকের নাম ছিলো রাইচরণ।

পুরোহিত আর মৌলভীদের একটা অংশে আমি খুব মজা পেয়েছি। যখন তারা একটা বাঁশের সাঁকোতে দাঁড়িয়ে লালনের বিরুদ্ধে শলা-পরামর্শ করছিলো, পুরোহিত বার বার বলছে, “ছায়া যাতে না পড়ে। এখন গঙ্গাজল পাই কোথায়?” পরে বাহাসের সময় মারামারির একপর্যায়ে দেখা গেছে পুরোহিত আর মৌলভীকে হাত ধরাধরি করে পুকুর পাড়ে যেতে।

ছবিতে দেখানো হয়েছে লালন ‘আনন্দবাজার’ নামে এক জায়গায় আস্তানা গেড়েছে। অথচ ইতিহাস বলে লালনের আখড়া ছিলো ছেউরিয়ায়। দেখানো হয়েছে, সিরাজ সাঁই শিষ্যসহ গঞ্জিকা সেবন করছে, এর মাজেযা বুঝতে পারলাম না। দেখানো হয়েছে, কাঙ্গাল হরিনাথের পরামর্শে লালন হাতে লাঠি তুলে নেয়, অথচ তাদের জীবিকা নির্ধারনের কোনো রাস্তা দেখানো হয়নি। আমি যতদূর জানি, লালনের শিষ্যরা পানের বরাজসহ বিভিন্ন কৃষিকাজের সাথে যুক্ত ছিলেন।

দেখানো হয়েছে, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লালনের আনন্দবাজারের খাজনা মওকুফ করে দেন, অথচ দেখানো হয় নি কীভাবে ঠাকুর বাড়ির জমিদারদের সাথে লালনের পরিচয় হলো। একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় বাংলাদেশের কোনো পরিচালক সিনেমা বানালে ঠাকুরবাড়ির ফ্রেমের ভিতর দিয়ে লালনকে দেখতেন না; অন্য কোনো পরিপ্রেক্ষিত, লালনের অন্য কোনো অবয়ব ফুটে উঠতো চলচ্চিত্রটি জুড়ে। গৌতম ঘোষের মনের মানুষ সিনেমাটিতে লালনের জীবনকাহিনীর জন্য ঠাকুরবাড়ি কেন মুখ্য হয়ে উঠল সেটা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। সিনেমাতে দেখি, কুঠিবাড়িতে গভীর রাত পর্যন্ত জীবনকাহিনী বর্ণন শেষে লালনকে জমিদার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আখড়াটি ‘নিষ্কর হিসেবে পাট্টা’ লিখে দেবার জন্য নায়েব সচীন্দ্রনাথকে নির্দেশ দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এরকম আশবাসের কাহিনী অনেক পল্লবিত হলেও কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। লালন গবেষক শক্তিনাথ ঝা অনেক বছর পরের একটা ঘটনা লিখেছেন: ‘‘রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের নাম জড়িয়ে নানা ধরনের কল্প-কাহিনী রচনা করেছেন বিভিন্ন গবেষক, গ্রন্থাকার এবং উচ্চবর্গের ভদ্রলোকেরা। সর্বত্র ‘দাতা’ রবীন্দ্রনাথ, গ্রহীতা লালন। … জমিদারদের দিয়ে লালনের সমাধি বাঁধানোর চেষ্টা করেছিলেন মনিরুদ্দীন শাহ। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে জমিদাররা এতে কোন সাহায্য করেনি। … আর ভোলাই, মানিক শীতলের মৃত্যুর পর আখড়ার অনেক খাজনা বাকি পড়ে এবং জমিদারগণ ১৯৪৫-এর ১১ই ডিসেম্বর খাজনার জন্য আখড়াটি নিলামে তোলেন। লালনের শিষ্যরা ১ শত ৭ টাকা ৪ আনা দিয়ে নিলামে সম্পত্তি খরিদ করে আখড়ার অস্তিত্ব রক্ষা করেন। এ-বিষয়ে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।’’

ছেউরিয়াতে লালন শাহের মাজার
ছেউরিয়াতে লালন শাহের মাজার

ছবিটির নাম ‘মনের মানুষ’। বাউল ও লালন বিষয়ক পণ্ডিত অধ্যাপক উপেন্দ্রকিশোর ভট্টাচার্য বাউলদের ‘মনের মানুষ’ সম্পর্কে বলেনঃ

“মানব-দেহস্থিত পরমতত্ত্ব বা আত্মাকে বাউল ‘মনের মানুষ’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছে। আত্মাকে ‘মানুষ’ বলার তাৎপর্য মনে হয় এই যে, আত্মা মানবদেহকে অবলম্বন করিয়া বাস করিতেছেন ও মানবদেহের সাধনার দ্বারাই তিনি লভ্য এবং এই মানবাকৃতি তাঁহারই রূপ মনে করিয়া বাউল তাঁহাকে ‘মানুষ’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছে। এই মানুষ অলক্ষ্য অবস্থায় হূদয়ে বা মনে অবস্থান করিতেছেন, বোধহয় এই কল্পনা করিয়া তাহারা তাঁহাকে ‘মনের মানুষ’ বলিয়াছে। এই আত্মাকে তাহারা ‘মানুষ’, ‘মনের মানুষ’, ‘সহজ মানুষ’, ‘অধর মানুষ’, ‘রসের মানুষ’, ‘ভাবের মানুষ’, ‘আলেখ মানুষ’, ‘সোনার মানুষ’, ‘সাঁই’ প্রভৃতি নানা নামে অভিহিত করিয়াছে।”

এ প্রসঙ্গে লালন যা বলেন,

“এই মানুষে আছে, রে মন,
যারে বলে মানুষ রতন, লালন বলে পেয়ে সে ধন
পারলাম না রে চিনিতে।।”

মজার ব্যাপার হচ্ছে, গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র ‘মনের মানুষ’-এ আমি এরকম কোনো মনের মানুষের সংজ্ঞাই পেলাম না, যা পেয়েছি তা হচ্ছে ঝাপসা এবং অসম্পূর্ণ।

এবার যদি গৌতম ঘোষের ছবি নির্মানের ক্ষেত্রে বলি, তাহলে গৌতম ঘোষের ছবিতে যে গরিবি দারিদ্র্যপনা থাকে, এই ছবিতে সেটা আছে; কিন্তু তারপরও একটা গ্লজ দিয়ে মোড়ানো আছে। যার ফলে অন্তর্জ্বলি যাত্রা’র যে গরিবি, সেটা এখানে নাই; যদিও প্রেক্ষাপট প্রায় একই রকম, মানে একই রকম ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাটাস ব্যাকগ্রাউন্ড, কিংবা পদ্মা নদীর মাঝির যে গরিবি, সেটা এখানে থাকার কথা ছিল, কিন্তু নাই। হ্যাঁ, ছবিটা নির্মাণগত দিক থেকে ভালো, কিন্তু যদি লালনকে বোঝার জন্যে, যদি সেই বাউলতত্ত্ব বা দেহতত্ত্ব বা সেই দিকটাতে যাই, তাহলে একেবারে লালনকে বোঝার জন্যে “মনের মানুষ” না।

ছবিটি দেখতে আমার খুব ভালো লেগেছে। এর দৃশ্যায়ন, ক্যামেরার কাজ, যদিও এগুলো সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না, মুগ্ধ হয়ে দেখেছি। যে প্রাকৃ্তিক পরিবেশে শুটিং হয়েছে, মনে হয়েছে সেখানে হারিয়ে যাই। যুবক লালন হিসেবে জিশানের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছি, মনে হয়েছি সত্যি সত্যি যুবক লালনকে দেখছি। সিরাজ সাঁইয়ের চরিত্রে রাইসুল ইসলাম আসাদ, পদ্মাবতী হিসেবে গুলশান আরা চম্পা, কালুয়া চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী, কবিরাজ হিসেবে হাসান ইমাম-প্রত্যেকের অভিনয় দেখে বাংলাদেশি হিসেবে গর্ববোধ করেছি। আবার কলমি চরিত্রে পাওলি দামের অভিনয় দেখে মনেই হয় নি এর আগে সে শুধুমাত্র একটি ছবিতে (কালবেলা) প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর হিসেবে প্রিয়াংশু চ্যাটার্জীকে ভালোই মানিয়ে গিয়েছে। আর পূর্ণবয়স্ক লালন চরিত্রে প্রসেনজিতের কথা বলার কিছুই নেই, যতই দিন যাচ্ছে এই প্রতিভাবান এবং জনপ্রিয় অভিনেতার অভিনয়গুণ যেনো আরো প্রস্ফুটিত হচ্ছে। কিছুদিন আগে তাঁর ‘অটোগ্রাফ’ দেখে যতটা মুগ্ধ হয়েছিলাম তারচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছি মনের মানুষে তাঁর অভিনয় দেখে।

মনের মানুষে প্রচুর গান ব্যাবহার করা হয়েছে, সে অর্থে এটা একটি মিউজিক্যাল মুভিও বটে। এই ছবিটি দেখতে গিয়ে আমার বাংলাদেশের আরেকটি ছবি, প্রখ্যাত নাট্যকার মমতাজ উদ্দিনের পরিচালনায় ‘হাছন রাজা’র কথা মনে গেলো। দুইটি ছবিই প্রায় একই ধাঁচের, যদিও মেকিং-এ বিস্তর পার্থক্য আছে। আরেকটি কথা না বললেই নয়, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী চরিত্রে বিবি রাসেলের অভিনয় সপ্রতিভ না হলেও, তার চরিত্রগুলোর পোশাক ডিজাইন আমার কাছে ভালোই লেগেছে।

আসলে, মনের মানুষকে যদি আমি শুধুমাত্র চলচ্চিত্র হিসেবে দেখি, তাহলে আমার দেখা অসাধারণ এক চলচ্চিত্র, যে চলচ্চিত্র মন কে অনেকক্ষন ধরে আবেশ করে রাখে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে তখন মনের মানুষকে কাঠগড়াতে দাঁড়াতেই হবে।

সবশেষে একটি মজার তথ্য দিয়ে এই লেখা শেষ করতে চাচ্ছি। ছবিটির একদম শেষে দেখা যায়, গগন হরকরা নামে এক যুবক লালনকে “আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে”-গানটি শুনাচ্ছে। গগন হরকরা ছিলেন বিশিষ্ট বাউল গীতিকার। জন্ম হয়েছিলো শিলাইদহের নিকটস্থ আড়পাড়া গ্রামে। পেশা ছিল শিলাইদহ ডাকঘরে চিঠি বিলি করা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত “আমার সোনার বাংলা” গানটি রবীন্দ্রনাথ গগন হরকরার গাওয়া এই গানটিরই সুর ভেঙে রচনা করেন  (এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ কলকাতার উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত সমাজ মেনে নিতে পারেনি। তারা বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য উঠেপড়ে নেমেছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, বাংলার হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিভেদ তৈরির মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শাসক বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করে দেবার জন্য কার্জন সাহেব বাংলাকে দুইভাগ করেছেন। তবে একথাও ঠিক যে, হিন্দু-মুসলমানের ভিতরে বিরাজমান প্রবল বৈষম্যপূর্ণ একটা আর্থ-সামাজিক বিন্যাস ছাই-চাপা রেখেই জাতীয়তাবাদী হিন্দু নেতৃত্ব বঙ্গভঙ্গ রদ করতে নেমেছিল। যে-কারণে, পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়নি, কলকাতার প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। এই আন্দোলনে উৎসাহ যোগাতেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’’)। সরলা দেবী চৌধুরাণী তাঁর ‘শতগান’ গ্রন্থে উভয় গানের স্বরলিপিই প্রকাশ করেন।

“আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে –
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
লাগি সেই হৃদয়শশী সদা প্রাণ হয় উদাসী
পেলে মন হত খুশি দেখতাম নয়ন ভরে।
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে নিভাই অনল কেমন করে
মরি হায় হায় রে
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
ওরে দেখ না তোরা হৃদয় চিরে।
দিব তার তুলনা কি যার প্রেমে জগৎ সুখী
হেরিলে জুড়ায় আঁখি সামান্যে কি দেখিতে পারে
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে।
মরি হায় হায় রে –
ও সে না জানি কি কুহক জানে
অলক্ষ্যে মন চুরি করে।
কুল মান সব গেল রে তবু না পেলাম তারে
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে –
তাইতে মোরে দেয় না দেখা সে রে।
ও তার বসত কোথায় না জেনে তায় গগন ভেবে মরে
মরি হায় হায় রে –
ও সে মানুষের উদ্দেশ যদি জানিস কৃপা করে
আমার সুহৃদ হয়ে ব্যথায় ব্যথিত হয়ে
আমায় বলে দে রে”।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[১.] গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল (২০০৮)। মনের মানুষ। আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা।
[২.] মাইনুল ইসলাম, গৌতম ঘোষের ‘‘মনের মানুষ’’, দৈনিক ইত্তেফাক, ডিসেম্বর ১০, ২০১০।
[৩.] Gautam Ghosh’s ‘Moner..’ wins Golden Peacock at IFFI, Outlook, Dec 2, 2010.
[৪.] গৌতম ঘোষের “মনের মানুষ”: জাতহীনের জাত মারার তরিকাঃ দিনমজুর নামে সামহোয়ার ইন ব্লগ-এ লেখাটি হয়েছে। ফেসবুকে কল্লোল মোস্তফা স্বনামে লেখাটি পোস্ট করেছেন।
[৫.] অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায়। ১৯৬৬। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত। ৩য় খন্ড। কলকাতা। পৃষ্ঠা ১২০৬-২১।
[৬.] শক্তিনাথ ঝা। ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল শিল্প। সংবাদ, কলকাতা ১৯৯৫।
[৭.] আবুল আহসান চৌধূরী। ২০০৮। লালন সমগ্র। পাঠক সমাবেশ, ঢাকা।
[৮.] হারামনি, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৪-৬৫, উদ্ধৃত, শক্তিনাথ ঝা। ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল শিল্প। সংবাদ, কলকাতা ১৯৯৫, পৃ. ১৭৫।
[৯.] আহমদ; যুক্তবঙ্গে লালন চর্চার ক্রমবিকাশ; পৃঃ- ৩৩
[১০.] সরকার; লালন শাহের মরমী দর্শন; পৃঃ- ৪৪৮
[১১.] বিশ্বাস, লোককবি লালন-পৃঃ-১৩৭

Advertisements

10 thoughts on “মনের মানুষঃ একটি ভালোলাগা চলচ্চিত্র, কিন্তু ……

  1. তথ্যপূর্ন লিখাটি পরে আমার খুব ভালো লাগলো এই ভেবে যে কেউ এক জন লালন সাইজিকে ভূল পরিচয়ের প্রতিবাদ মুলক তথ্য প্রচার করেছে ৷

  2. দাদা আমি ত্রিপুরা থেকে। আপনার এই তথ্যপূর্ণ লেখাটি পড়ে খুব ভালো লাগলো। আমরা একটা ছোট চলচিত্র উৎসব করছি। এর জন্য একটা souvenir বের করছি। আপনার এই লেখাটা কি ছাপাতে পারি?

    • প্রিয় রুদ্রনিল দাসগুপ্ত,

      প্রথমেই এই লেখাটা পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি অবশ্যই লেখাটা ছাপাতে পারেন। যদি কোনো ই-ভার্সন করেন, আমাকে লিঙ্কটি পাঠিয়ে দিলেই হবে। আরেকটা কথা, আমার এই সাইটটা আমি niazmowla.com-এ ট্রান্সফার করেছি। সেখানে ঘুরে এলে খুশি হবো।

      • অবশ্যই। যদি ই-ভারসন হয় আমি পাঠিয়ে দেব। ধন্যবাদ দাদা।

  3. আপনার কথা পরে আপনাকে চিত্র বিষারদ মনে হচ্ছে, যাই হোক পোস্ট পড়ার পর যতটুকু ধারণা পেলাম সেটা হলো ছবিটিতে বেশ কিছু স্থানে ভুল তথ্য বা মিথ্যাচার করা হয়েছে… বাকি ধারণা ছবিটা দেখার পরেই পরিষ্কার হবে। আশা করছি শীঘ্রই দেখতে পাবো ছবিটি…

  4. নিয়াজ,

    লিখবো না লিখবো না করে শেষ পর্যন্ত লিখে ফেললাম। আমি লালন সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না। আমি ছবিটি দেখিওনি, এমন কী ‘মনের মানুষ’ বই পড়িনি। কিন্তু তোর লেখা পড়ে বুঝতে পারলাম যে, ছবিতে অনেক মিথ্যাচার করা হয়েছে।মজার ব্যাপার হলো ছবিটা একটা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মান করা হয়েছে। যেহেতু আমি বই পড়িনি আর তুই-ও এটা বলিস নাই যে বইয়ের কাহিনী কতটুকু পরি্বর্তন হয়েছে, সেহেতু আমি বলবো যে, এই মিথ্যাচারের আসল দায়ী লেখক। লেখকরা বাস্তব ঘটনার সাথে মনের মাধুরী মিশিয়ে কাল্পনিক চরিত্র তৈরী করে। কিন্তু যখন একটি বাস্তব চরিত্রের সাথে কল্পনা মিশানো হয়, তখন সেটা হয়ে যায় মিথ্যাচার (যতই লেখক বইয়ের শুরুতে বলুক যে এটা কল্পনা)। আমি কি জন্য এই কথাগুলো বলেছি, আশা করি তুই বুঝতে পারবি।

    • মনোয়ার, প্রথমেই অনেক দিন পরে মন্তব্য করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
      তোর সাথে আমার কিছুটা দ্বিমত আছে। অনেক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাস বা চলচ্চিত্রে ইতিহাস ঠিকভাবে নাও আসতে পারে। গল্পের জন্য বা ক্লাইম্যাক্সের প্রয়োজনে লেখক বা পরিচালক অনেক কিছুই করতে পারেন। কিন্তু সেটার ডিসক্লেইমার থাকতে হবে।
      তোকে একটা ঘটনা বলি, রুশ বিপ্লবের সময় প্রিন্স ফেলিক্স ইউসুপোভ রাসপুটিনকে খুন করেছিলেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন প্রিন্সেস ইরিনাকে। ১৯৩২ সালে MGM কোম্পানি Rasputin and the Empress ছবিটি তৈরী করে। ছবিটিতে প্রিন্সেস ইরিনার চরিত্রের ঘটনাবলীকে প্রিন্সেস নাতাশা নাম দিয়ে একটু অন্যভাবে দেখানো হয়েছিলো। ফলশ্রুতিতে ইতিহাস বিকৃতির জন্য MGM-কে ইউসুপোভ পরিবারকে ১৯৩৪ সালে ২৫,০০০ পাউন্ড ক্ষতিপূরন দেওয়া লাগে। এরপর থেকেই যেসব ছবিতে কাহিনীর প্রয়োজনে ঐতিহাসিক ঘটনা বা চরিত্র একটু অন্যভাবে আসে, সেগুলোতে ডিসক্লেইমার দেওয়া শুরু হলো যে, কাহিনীর চরিত্রের সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই।

      মনের মানুষ উপন্যাসেও সুনীল বলেন নি যে, এটা লালনের জীবনচরিত। কিন্তু গৌতম ঘোষ বলেছেন,

      ছবিটি উপন্যাস অবলম্বনে লালনের জীবনাদর্শন, কর্ম, গান-ইত্যাদির উপরে নির্মিত।

      তার মানে দাঁড়ালো, উনি বলছেন-এটা লালনের দর্শন, আসলে তা নয়। উনি বলছেন, এটা লালনের গান, আসলে তা নয়। উনি বলছেন, লালন এই এই কাজ করেছেন, আসলে তা নয়। উনি লালনের নাম দিয়ে লালন যা করেন নি তাই দেখিয়েছেন। লালনের দর্শনকে ভুলভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন, এটা কী তার গুরুতর অপরাধ নয়? তিনি ডিসক্লেইমার দিতেন, বলতেন , এটা শুধুই চলচিত্র, কোনো চরিত্রের সাথে বাস্তবের মিল নেই, বা এটা শুধুই উপন্যাসের চিত্ররুপ, লালনের জীবন দর্শন নয়, তাহলে কোনো সমস্যাই হতো না। তিনি একেবারেই লালনের উল্টা জিনিস দেখিয়েছেন, যা কোনোমতেই সমর্থনযোগ্য নয়।

      কোনো কিছুর ডিসক্লেইমার থাকলে সেটা নিয়ে বিতর্ক আর থাকে না। গতকালকে একটি ফ্রেঞ্চ ছবি দেখেছি, নাম Z. ছবির শুরুতে ডিসক্লেইমারে লেখা ছিলো, “Any resemblance to real events, to persons living or dead, is not accidental. It is INTENTIONAL.”

      ভালো কথা, কিছু লেখাতে তোর কমেন্ট মিস করছি আমি!

  5. আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
    আমারও তাই মনে হয়েছে যে, এটা লালন আর সিরাজের চরিত্রহানির জন্য নির্মিত।

    আমার ব্লগে আপনাকে স্বাগতম।
    ভালো থাকুন নিরন্তর।

  6. আপনার বেশ খুটিয়ে খুটিয়ে বিষয়গুলা লক্ষ্য করেছেন। ভালো লাগল। এতো মিথ্যাচারের পরও দৃশ্যায়ন, ক্যামেরার কাজকে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই। এটা জঘন্য একটা মুভি।
    আপনি জানেন বলে এইসব মিথ্যাচারিতা ধরতে পেরেছেন। কিন্তু যারা জানে না তাদের মনে করবে এটাই আসল লালন। এটা লালন আর সিরাজের চরিত্রহানির জন্য নির্মিত। আফসোস যে, এইগুলা প্রতিরোধ আমরা করতে পারি নাই।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s