একজন জারের মৃত্যু

Before an execution, there’s supposed to be a trial. Before a trial, there’s supposed to be a crime.
There was No crime. No trial. No justice. This is their story.

প্রাক-কথনঃ

যখন তার বয়স মাত্র ১০ বছর, তখনই গুরুতর সমস্যা শুরু হলো। গুরুতর সমস্যা শুরু হলো রাজ্যে। অ্যালেক্সি, রাশিয়ার জার নিকোলাস দ্বিতীয়ের পঞ্চম সন্তান এবং একমাত্র পুত্র, যার গুরুতর সমস্যার উৎস তারই মা রাশিয়ার জারিনা অ্যালেক্সজান্দ্রা। অ্যালেক্সি একজন হিমোফিলিক। অ্যালেক্সি সেই সময়ের হিমোফিলিক, যেই সময়ে হিমোফিলিয়া ছিলো মরণব্যাধি। অ্যালেক্সি সেই সময়ের হিমোফিলিক, যেই সময়ে জারতন্ত্র তাদের গোপন কথা বাইরে প্রকাশ করতো না।

জার নিকোলাসের একমাত্র পুত্র সন্তান অ্যালেক্সি
জার নিকোলাসের একমাত্র পুত্র সন্তান অ্যালেক্সি

কি প্রতিক্রিয়া হতো রাশানদের যদি তারা জানতো তাদের পরবর্তী জার গুরুতর অসুস্থ? হয়তোবা তারা সত্যটা জানলে কিছুটা হলেও বুঝতে পারতো কেনো তাদের জার নিকোলাস জনগনের চাহিদা পূরনের চাইতে তার পরিবারকে সময় দিচ্ছেন বেশী। হয়তোবা তারা নিকোলাসকে একজন শাসক হিসেবে চিন্তা না করে একজন স্নেহপ্রবন বাবা হিসেবে দেখতো। কিন্তু যখন জনগন জানতে পারলো অ্যালেক্সি মরণব্যাধিতে আক্রান্ত, ততদিনে রাশিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে, তারা প্রচন্ড রকমের ক্ষুধার্ত। তাদের অধিকাংশ সৈন্য যুদ্ধ করছে খালি পায়ে, তখন রাশিয়ার পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু জার নিকোলাস জনগনের চাওয়াকে অনুধাবন করতে পারেন নি, যখন অনুধাবন করতে পেরেছে্ন, রাশিয়ার উপর তার সেই কর্তৃ্ত্ব আর নেই, যে কর্তৃ্ত্বকে তিনি ইশ্বরপ্রদত্ত ভাবতেন।

রাশিয়ার শেষ জার নিকোলাস দ্বিতীয়
রাশিয়ার শেষ জার নিকোলাস দ্বিতীয়

সাধারণভাবে নিকোলাস দ্বিতীয় ছিলেন একজন ভালো মানুষ। তার বাবা ছিলেন জার অ্যালেক্সজান্ডার তৃতীয়, যিনি ৪৯ বছর বয়সে মারা যান আর দাদা ছিলেন জার অ্যালেক্সজান্ডার দ্বিতীয়, যিনি নৃশংসভাবে খুন হোন। নিকোলাস কখনোই নিজে থেকে জার হতে চাননি, জার হওয়াটা ছিলো তার নিয়তি। তিনি ছিলেন প্রেমিক পুরুষ। তিনি জার্মানির সুন্দরী প্রিন্সেস, ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়ার নাতনী, এলিক্সের (পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে অ্যালেক্সজান্দ্রা) প্রেমে পড়েছিলেন। অ্যালেক্সজান্দ্রার মা, ভিক্টোরিয়ার মেয়ে, এলিস অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন। এলিসের বয়স যখন ৩৫ বছর, তখন তার ছেলে ডিপথেরিয়াতে আক্রান্ত হয়। ছেলেকে সহানুভূতি জানাতে গিয়ে এলিস চুমু খান, সেই সময়ের মরণঘাতক ডিপথেরিয়ার জীবাণু এভাবেই এলিসের শরীরে সংক্রমিত হয়। এলিসের মৃত্যুর পর অ্যালেক্সজান্দ্রা জার্মানিতে থাকলেও, বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত করতেন ইংল্যান্ডেই নানী ভিক্টোরিয়ার সাথে। পরবর্তীতে রাশিয়া যখন জার্মানির সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, রাশিয়ান জনগন ভুলে গেলো অ্যালেক্সজান্দ্রা্র শরীরে ইংরেজ রক্তও প্রবাহিত হচ্ছে। বেশিরভাগ রাশান তাকে মনে করতো ঘৃন্য জার্মান হিসেবে।

রাশিয়ার শেষ জারিনা অ্যালেক্সজান্দ্রা ফিউডেরোভনা
রাশিয়ার শেষ জারিনা অ্যালেক্সজান্দ্রা ফিউডেরোভনা

নিকোলাস যখন অ্যালেক্সজান্দ্রাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়, নিকোলাসের বাবা-মা রাজী ছিলেন না, কারণ রাশিয়ার জারিনা হবার জন্য যেসব ডাইনামিক গুণাবলীর প্রয়োজন, সেগুলোর অধিকাংশের অভাব ছিলো অ্যালেক্সজান্দ্রার চরিত্রে। তাছাড়া তারা ফ্রান্সের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ফ্রান্সের প্রিন্সেসের সাথেই নিকোলাসের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলে নিকোলাসের ইচ্ছাই প্রাধন্য পায়। বাবা অ্যালেক্সজান্ডার তৃতীয়ের আকস্মিক মৃত্যুর পর, নিকোলাস প্রায় একই সময়ে অ্যালেক্সজান্দ্রাকে বিয়ে করেন এবং রাশিয়ার জার হিসেবে সিংহাসনে বসেন। তখন কেউই কী সেই সময়ে বুঝতে পেরেছিলো, যে রাজবংশ রাশিয়াকে ৩০০ বছর ধরে শাসন করেছে, নিকোলাস হবেন সেই রাজবংশের শেষ জার?

১৮৯৪ সালে নিকোলাস যে সাম্রাজ্যের জার হলেন, কীভাবে মাত্র ২০ বছরের মধ্যেই সেই সাম্রাজ্য তার হাতছাড়া হয়ে গেলো? কীভাবে তিনি তার জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন? প্রকৃ্ত সত্য হলো, নিকোলাস কখনোই সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি কখনোই অনুভব করতে পারতেন না এক বেলা খাবারের জন্য তার জনগন কতটা মরিয়া থাকতো। যখন জনগনের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো জারের উপস্থিতি, তার সহানুভুতি, নিকোলাস তখন থাকতেন তার প্রাসাদে অসুস্থ সন্তান অ্যালেক্সির শয্যাপাশে। জনগন ভাবতো, জার তাদের এই দুর্বিষহ অবস্থাকে অবজ্ঞা করছেন। যদিও জার এবং জারিনার ব্যক্তিগত ডায়েরী (A Lifelong Passion: Nicholas and Alexandra: Their Own Story) থেকে জানা গেছে, নিকোলাস জনগনের দুর্দশার কথা অনুভব করতেন, তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য চিন্তা করতেন, কিন্তু তা জনগনের জনগনের সামনে প্রকাশ পায়নি। নিকোলাসের সাথে সাধারণ জনগনের সম্পৃক্ততা না থাকলেও, এলিট সমাজের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু এমন এক সময় আসলো, যখন এলিট সমাজের সাথে এই সম্পর্কে ঘুণ ধরলো। এমন এক সময় আসলো, যখন রাজপরিবারের জীবনে Gregory Efimovich Novyk নামে আশ্চর্য ক্যারিশম্যাটিক সন্যাসীর আগমন ঘটলো, বেশিরভাগ মানুষ যাকে চিনে রাসপুটিন নামে। অধিকাংশ আধুনিক ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস, রাসপুটিনের উপস্থিতিই জার নিকোলাসের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ।

রাসপুটিনের উত্থান এবং পতনঃ

নিকোলাস দ্বিতীয় অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যখন তিনি জার ছিলেন।

অ্যালেক্সজান্দ্রাকে বিয়ের পর এবং নতুন জার হিসেবে অভিষেকের সময় নিকোলাস তার প্রজাদের জন্য রাজকীয় ভোজের আয়োজন করেছিলেন, যে ভোজে খাবার ও মদ সংগ্রহ করতে গিয়ে, ভিড়ের মধ্যে পদদলিত হয়ে প্রায় দুই হাজার জনগন মারা যায়, যা Khodynka Tragedy নামে পরিচিত। এই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় নিকোলাস ও অ্যালেক্সজান্দ্রা প্রচন্ডভাবে মুষড়ে পড়েছিলেন এবং নতুন জারের সম্মানে ইউরোপের অন্যান্য রাজপরিবারের সদস্যদের জন্য যে পার্টির আয়োজন ছিলো, তা বাতিল করতে চাইলেন। কিন্তু বাতিল করতে পারলেন না, তার উপদেষ্টাদের জন্য, যারা ভাবলেন এই পার্টি বাতিল করা হলে যেসব রাজপরিবারের সদস্যরা ইতিমধ্যে এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে চলে এসেছেন, তারা অপমানিত বোধ করবেন। নিকোলাস-যিনি কখনোই জার হতে চাননি, তিনি শিখলেন কীভাবে তার নিজের ইচ্ছাকে অবদমিত করে উপদেষ্টাদের পরামর্শকে প্রাধন্য দিতে হয়। রাশিয়ার জনগন জারের অভিষেক অনুষ্ঠানের এই ট্রাজেডিকে অশুভ লক্ষন হিসেবে দেখতে লাগলো।

জার নিকলাসের সাথে অ্যালেক্সজান্দ্রার বিয়ের অনুষ্ঠান
জার নিকলাসের সাথে অ্যালেক্সজান্দ্রার বিয়ের অনুষ্ঠান

নিকোলাস মাত্র ২৬ বছর বয়সে রাশিয়ার জার হোন। তিনি ছিলেন জারের দায়িত্ব গ্রহনে অপ্রস্তুত, সিদ্ধান্ত গ্রহনে অপরিপক্ক। ১৯০৪ সালে নিকোলাস জাপানের সাথে এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, তিনি ভেবেছিলেন প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে একটা বরফ-মুক্ত বন্দর তার দেশের প্রয়োজন। কিন্তু সে যুদ্ধে রাশিয়া শোচনীয়ভাবে জাপানের কাছে পরাজিত হয়, যা রাশিয়ার জনগনের অহমে আঘাত করে। কিছু জেনারেলের প্ররোচনায় ১৯০৫ সালে জনগনের ব্যর্থ বিপ্লব সংঘটিত হয়, যা দমন করতে গিয়ে Bloody Sunday-এর মতো ঘটনা ঘটে, যা জনগনের মধ্যে নিকোলাসের গ্রহনযোগ্যতা আরও কমিয়ে দেয়। যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, নিকোলাস রাশিয়ান সেনাবাহিনীর কর্তৃ্ত্ব নিজের হাতে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন, সামরিক নেতা হিসেবে ততটা যোগ্যতাসম্পন্ন না হওয়া সত্ত্বেও। যখন সেন্ট পিটার্সবার্গে দাঙ্গা শুরু হলো, তখন তিনি ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে-অথচ তিনি তখন শহরে থাকলে পরিস্থিতি অন্যরকমও হতে পারতো।

নিকোলাস দ্বিতীয় অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যখন তিনি জার ছিলেন। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তই রাসপুটিনকে রাজপরিবারের ভিতরে ঢোকার সুযোগ করে দেওয়ার চাইতে খারাপ ছিলো না।

যখন কেউ অ্যালেক্সির রক্তপাত বন্ধ করতে পারলো না, তখন একমাত্র রাসপুটিনই রক্তপাত বন্ধ করে দিয়েছিলো। যদিও বিংশ শতাব্দীর ডাক্তারদের ধারণা, রাসপুটিন হিপনোটাইজিং জানতো, এবং অ্যালেক্সিকে হিপনোটাইজড করেই রক্তপাত বন্ধ করতো। কিন্তু শতাব্দীর গোড়ার দিকে জারিনা অ্যালেক্সজান্দ্রার কাছে রাসপুটিনের এই রক্তপাত বন্ধ করার ক্ষমতাকে ঐশ্বরিক ক্ষমতা বলেই মনে হতো এবং তিনি সন্তানের বেঁচে থাকার জন্য রাসপুটিনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন।

রাসপুটিন
রাসপুটিন

উছ্বংখল জীবন-যাপন পদ্ধতি, অতিরিক্ত মাত্রায় এলকোহল সেবন, নারীদের প্রতি অশালীন আচরন প্রভৃতি কারণে রাসপুটিনের প্রচুর শত্রু তৈরী হয়। তাদের উপুর্যুপরি অভিযোগ সত্ত্বেও রাসপুটিনের প্রতি জার নিকোলাস, বিশেষ করে অ্যালেক্সজান্দ্রার হস্তক্ষেপের জন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন নি। তারপরও নিকোলাস রাসপুটিনকে একবার রাজদরবার থেকে নির্বাসিত করেছিলেন। কিন্তু ১৯১২ সালে পোল্যান্ডে অবকাশ যাপনের সময় অ্যালেক্সির আবার রক্তপাত শুরু হলে, জার ও জারিনা, উভয়েই খুব বিচলিত হয়ে পড়েন। যখন ছোট্ট অ্যালেক্সি ব্যথা সহ্য করতে না পেরে কাতর কন্ঠে মাকে বলল, ‘আমি যদি মারা যাই, তাহলে বোধহয় এই কষ্ট থেকে মুক্তি পাবো, তাই না মা?’, সঙ্গে সঙ্গে রাসপুটিনকে খবর দেওয়া হয় এবং সে এসে আবারো রক্তপাত বন্ধ করে। যেহেতু, অ্যালেক্সির হিমোফিলিয়া জনগনের কাছে গোপন ছিলো, তারা বুঝতে পারতো না কেনো জারিনা রাসপুটিনকে এতো প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন। অধিকাংশ জনগন মনে করতো, অ্যালেক্সজান্দ্রার সাথে রাসপুটিনের কোনো অবৈধ সম্পর্ক আছে। এমনকি এলিট সমাজও জার ও জারিনার সাথে রাসপুটিনের এই সম্পর্ককে মেনে নিতে পারলো না। রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও আতঙ্কিত হওয়া শুরু করলো, যখন দেখলো জারের সিদ্ধান্তেও রাসপুটিন জোরালো ভূমিকা রাখছে, কারণ নিকোলাস প্রায়ই সিদ্ধান্ত নিতেন অ্যালেক্সজান্দ্রার সাথে কথা বলে আর অ্যালেক্সজান্দ্রা শুনতেন রাসপুটিনের পরামর্শ। অবশেষে রাজপরিবারের কিছু সদস্য আর এলিট সমাজের কিছু প্রতিনিধি মিলে সিদ্ধান্ত নিলো রাসপুটিনকে হত্যা করার মাধ্যমেই জার এবং রাশিয়াকে রাসপুটিনের বলয় থেকে মুক্ত করা যাবে।

প্রিন্স ফেলিক্স (Prince Felix Yussupov), জার নিকোলাসের বোনের মেয়ের স্বামী, রাসপুটিনকে ১৯১৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৯শে ডিসেম্বর) সেন্ট পিটার্সবার্গে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানায়। সেখানে প্রথমে রাসপুটিনকে সায়ানাইড মিশ্রিত মদ আর কেক খাওয়ানো হয়, কিন্তু রাসপুটিন মারা যায়নি। এরপর ফেলিক্স রাসপুটিনের বুকে গুলি করেন, এমনকি আরেকজন ষড়যন্ত্রকারী আরো দুইবার গুলি করে, কিন্তু তখনো রাসপুটিন মারা যায়নি। আহত রাসপুটিনকে পরে পেট্রোভস্কি দ্বীপের ব্রিজ থেকে নেভা নদীতে ফেলা দেওয়া হয়। কিছুদিন পর তার লাশ পাওয়া যায়।

রাসপুটিনের পোস্ট-মর্টেম ছবি
রাসপুটিনের পোস্ট-মর্টেম ছবি

মৃত্যুর পূর্বে রাসপুটিন জার নিকোলাসের কাছে এক অদ্ভুত ভবিষ্যতবানী করে যানঃ

“ যদি আমি সাধারণ জনগনের হাতে মারা যাই, তুমি, রাশিয়ার জার, তোমার সন্তানদের জন্য কোনো চিন্তা করো না, তারা আরো শত শত বছর রাশিয়া শাসন করবে।
……আর যদি আমার মৃত্যুর কারণ হয় তোমার আত্মীয়দের মধ্যে কেউ, তাহলে শুনে রাখো, তোমার পরিবারের সবাই আগামী দুই বছরের মধ্যে খুন হবে, খুন হবে রাশিয়ার জনগনের হাতে………”

রোমানভ পরিবারের সদস্যের হাতে রাসপুটিনের খুন হওয়ার তিন মাস পর ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে নিকোলাস দ্বিতীয় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হোন, এবং দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে নিকোলাসের পরিবারের সবাই নিহত হোন, রাশিয়ার জনগনের নেতাদের হাতে!

জারতন্ত্রের অবসানঃ

প্রিন্স ফেলিক্স ভেবেছিলেন রাসপুটিনকে হত্যার মাধ্যমে তিনি জারতন্ত্র রক্ষা করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে এর বিপরীত অবস্থাই ঘটেছিলো। বর্তমানে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, প্রিন্স ফেলিক্সই রুশ বিপ্লবের প্রথম গুলিটা ছুড়েছিলেন। তার আগেই নিকোলাস তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী জার্মান সাম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু রণাঙ্গনে দেখা গেলো রুশ বাহিনী যুদ্ধের জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলো না। জার্মানির সাথে তারা প্রতিটি যুদ্ধেই হারতে লাগলো। এমন সময়, নিকোলাস মারাত্মক এক ভুল সিদ্ধান্তে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হলো না, বরঞ্চ সমস্ত পরাজয়ের জন্য দায়ী করা হলো জারকে।

যুদ্ধ পরিচালনার জন্য তিনি রাজধানী থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে চলে আসলেন। অ্যালেক্সজান্দ্রার উপর দিয়ে আসলেন দেশ পরিচালনার গুরু দায়িত্ব। অনভিজ্ঞ জারিনা রাসপুটিনের পরামর্শমতো দেশ চালাতে গিয়ে এক অরাজক অবস্থার সৃষ্টি করেন। রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গে দেখা দেয় প্রচন্ড খাদ্য সংকট। প্রতিদিন চলতে থাকে বিক্ষোভ। এরই মধ্যে রাসপুটিন খুন হলে জারিনা হয়ে পড়েন একা। যুদ্ধের পরাজয়ের জন্য জনগন অ্যালেক্সজান্দ্রাকে জার্মান গুপ্তচর বলা শুরু করলো। ক্রমেই তারা চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ আর প্রচন্ড খাদ্য সংকটের জন্য ফুঁসে উঠতে লাগলো। জার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নির্দেশ পাঠালেন আর্মিকে দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে। কিন্তু সেই দক্ষ আর্মি কোথায়? তারা তো তখন পোল্যান্ডের গণকবরে শায়িত। এরপরে যাও ছিলো, তা নিয়ে জার যুদ্ধে ব্যস্ত। রাজধানীতে তখন শুধুমাত্র ভলান্টিয়ার সৈন্য। অনভিজ্ঞ এই সৈন্যবাহিনী সাধারণ জনগনের উপর গুলি বর্ষন করলো। আইনসভা দুমার নির্বাচিত সদস্যরা জারকে জনগনের অবস্থার উন্নতি করার জন্য পদক্ষেপ নিতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু জার নিকোলাস জনগনের ভাষা বুঝতে আবারো ব্যর্থ হলেন, দুমাকে নির্ধারিত সময়ের আগেই ভেঙ্গে দিলেন।

তিনি যদি সাধারনের সাথে কথা বলতেন, বুঝতে পারতেন কতো অসহায় তারা, কতটা দরিদ্র তারা! তিনি যদি ফ্যাক্টরীগুলোও দেখতেন, বুঝতে পারতেন সেখানে কী দুর্বিষহ অবস্থা চলছে! কিন্তু নিকোলাস বড়ো হয়েছেন এমন এক রাজকীয় পরিবারে, যেখানে তাকে শিখানো হয়েছে, জার কখনো সাধারণের সাথে কথা বলে না, জারের কখনো ফ্যাক্টরীর পরিবেশ দেখতে যাওয়া লাগে না! নিকোলাস কখনোই সে সময়ে সমগ্র ইউরোপ জুড়ে পরিবর্তনের হাওয়া বুঝতে পারেন নি। তিনি অনুধাবনও করতে পারেন নি তার দেশেরও কতটা পরিবর্তন প্রয়োজন ছিলো। এই ব্যাপারে তার অনমনীয়তাই ছিলো তার পতনের আরেকটি মূল কারণ।
নিকোলাস যেনো দেখতেই পেলেন না, রাশিয়ার সমাজ ব্যবস্থা কীভাবে ভেঙ্গে পড়ছিলো!

শেষ পর্যন্ত দুমাকে ভেঙ্গে দিলে সৈন্যরাও জনগনের সাথে বিদ্রোহে যোগ দেয়। সংঘটিত হয় ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারী বিপ্লব। ভেঙ্গে দেওয়া দুমার সদস্যরা সৈন্য এবং সাধারণ জনগনের সাথে মিলে গঠন করেন প্রভিশনাল সরকার। ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর উপদেষ্টারা এই সময় নিকোলাসকে সিংহাসন ছেড়ে দিতে বললো। অন্য কোনো উপায় আর নেই বুঝতে পেরে নিকোলাস ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে তার এবং অসুস্থ ছেলে অ্যালেক্সির পক্ষ থেকে সিংহাসনের দাবী ত্যাগ করেন, তার ছোট ভাই মাইকেলকে পরবর্তী জার হিসেবে সম্বোধন করে চিঠিও লিখেন। কিন্তু মাইকেলকে প্রত্যাখ্যান করে প্রভিশনাল সরকার জারতন্ত্রেরই মৃত্যু ঘোষনা করে। মাইকেল নিজেই ১৯১৮ সালের গ্রীষ্মে বলশেভিকদের হাতে নিহত হোন।

নিকোলাস ও তার পরিবার
নিকোলাস ও তার পরিবার

আর রাশিয়ার পরাক্রমশালী রোমানভ বংশের শেষ জার ‘নিকোলাই রোমানভ’কে পরিবারের সকল সদস্যসহ প্রভিশনাল সরকার প্রথমে আলেক্সজান্ডার প্রাসাদ এবং পরে তুবলস্কের (Tobolsk) গভর্ণর ম্যানসনে গৃহবন্দী করে রাখে। এই সময়টাতে নিকোলাসের সাথে ছিলেন তার স্ত্রী অ্যালেক্সজান্দ্রা, একমাত্র পুত্র অ্যালেক্সি, চার কন্যা ওলগা, তাতিয়ানা, মারিয়া আর আনাস্তাসিয়া, তাদের পারিবারিক ডাক্তার ইউজিন বটকিন, জারিনার Lady-in-waiting আনা দেমিদোভা, পরিবারের পাচক ইভান খারিতোনভ এবং এলেক্সি ট্রুপ।

একজন জারের মৃত্যুঃ

১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নভেম্বর মাস) অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে প্রভিশনাল সরকারকে হটিয়ে রাশিয়ার ক্ষমতায় আসলো Vladimir Illych Ulanov, বলশেভিক নেতা, যিনি তার শেষ নাম পরিবর্তন করে রাখেন লেলিন। লেলিন ক্ষমতায় এসেই নিকোলাসের পরিবারকে ইয়াকাটেরিনবার্গের (Yekaterinburg) ইপাটিভ হাউসে (Ipatiev House) গৃহবন্দী করে রাখেন। ততদিনে পাল্টা বিপ্লবের চেষ্টা শুরু হয়েছে। লেলিন ও তার সমর্থকদের বলা হতো ‘রেড আর্মি’, এবং জারের সমর্থক বাহিনীকে বলা হতো ‘হোয়াইট আর্মি’। ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেল রোড দখল করার উদ্দেশ্যে ১৯১৮ সালের জুলাইয়ের দিকে হোয়াইট আর্মি ইয়াকাটেরিনবার্গের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তারা জানতো না সেখানে রাজকীয় পরিবার বন্দী অবস্থায় আছে। লেলিন বুঝতে পেরেছিলো ইয়াকাটেরিনবার্গ হোয়াইটদের দখলে চলে যাবে, তিনি চাইলেন না রাজকীয় পরিবারকে হোয়াইটরা মুক্ত করে পুনরায় জার হিসেবে অভিষিক্ত করুক। তিনি নিকোলাসের পরিবারের সবাইকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন।

ইপাটিভ হাউস, যেখানে জারকে সপরিবারে খুন করা হয়
ইপাটিভ হাউস, যেখানে জারকে সপরিবারে খুন করা হয়

১৯১৮ সাল, ১৬ই জুলাই, রাত ২ টা। ইয়াকুভ ইউরোভস্কি (Yakov Yurovsky) ডাঃ ইউজিন বটকিনকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললেন, ‘শহরে গোলমাল হচ্ছে, তাই সবাইকে বেসমেন্টে যেতে হবে’। সবার পোশাক পরে তৈরী হতে প্রায় আধা ঘন্টার মতো সময় লাগে। নিকোলাস কোনো কিছুই তখন সন্দেহ করেন নি। অ্যালেক্সি তখন হাঁটতে পারতো না, নিকোলাস তাকে কোলে করে নিয়ে বেসমেন্টে গেলেন। যে রুমটাতে তারা গেলেন সেখানে কোনো আসবাবপত্র ছিলো না। অ্যালেক্সজান্দ্রা বসবার জন্য চেয়ার চাইলে সাথে সাথে তিনটি চেয়ার এনে দেওয়া হয়। নিকোলাস ভেবেছিলেন হয়তোবা তাদের গ্রুপ ছবি তোলা হবে। একটু পরেই সেই রুমে ইয়াকুভের নেতৃত্বে ঘাতক দল, যারা আগে থেকেই পাশের আরেকটা রুমে অপেক্ষা করছিলো, প্রবেশ করে জানালো, যেহেতু হোয়াইটরা ইয়াকাটেরিনবার্গ প্রায় দখল করে ফেলছে, তাই রাজকীয় পরিবারের সবাইকে হত্যার আদেশ দেওয়া হয়েছে, বিনা বিচারে তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে লেলিন এই আদেশ দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে নিকোলাস চেয়ার থেকে উঠে ঘাতকদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালেন আর জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, “What? What?” এরপরই ঘাতক দলের সবাই একসাথে গুলি করা শুরু করে।

এই সেই বেসমেন্ট, যেখানে খুন করা হয়
এই সেই বেসমেন্ট, যেখানে খুন করা হয়

সবার প্রথমেই মারা যান রাশিয়ার রোমানোভ বংশের শেষ জার নিকোলাস। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নিকোলাস অ্যালেক্সির সামনে ঢাল হয়ে তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। নিকোলাসের পরপরই রানী ভিক্টোরিয়ার নাতনী, ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাজা জর্জের আপন খালাতো বোন, রাশিয়ার শেষ জারিনা অ্যালেক্সজান্দ্রা ফিউডেরোভনা মারা যান। গুলিবর্ষনের প্রথম ধাপ শেষে দেখা যায় জারের চার কন্যা সন্তান এবং অ্যালেক্সি বেঁচে গেছে। মেয়েদেরকে নগ্ন করে দেখা যায়, তাদের কাপড়ের ভিতরে ডায়মন্ড এবং অলংকার ছিলো যেটা প্রটেকটরের কাজ করেছিলো। ইয়াকুভ এরপরে এদেরকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। সবার শেষে হত্যা করা হয় হিমোফিলিয়ার আক্রান্ত ১৩ বছরের অ্যালেক্সিকে।

শেষ কথাঃ

রাজকীয় রোমানোভ পরিবারকে বিনা বিচারে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিলো। কি অপরাধ করেছিলো জারের চার কন্যা আর একমাত্র ছেলে? কোনো অন্যায় করেনি। কোন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিলো জার নিকোলাসের বিরুদ্ধে? কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। জারের স্ত্রী? না, কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। জারের ডাক্তার? পাচক? লেডি-ইন- ওয়েটিং? না, তারাও কোনো অন্যায় করেনি।
হত্যাকান্ডের পর স্থানীয় পত্রিকার শিরোনামই সবকিছু পরিস্কার করে দেয়ঃ …Shot without bourgeois formalities…

এই নৃশংস হত্যাকান্ডের ৮০ বছর পর, রাশিয়ার জনগন তাদের জার ও জারিনার দেহাবশেষ ইয়াকাটেরিনবার্গ থেকে তুলে এনে সেন্ট পিটার্সবার্গে সমাহিত করেছে। রুশ অর্থোডক্স চার্চ অন্তোষ্টক্রিয়ার আয়োজন করেছে, যেখানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন ভাষনও দিয়েছেন। চার্চ নিকোলাসের পরিবারের প্রত্যেককেই সাধু হিসেবে স্বীকৃ্তি দিয়েছে। এভাবেই রুশ জাতি নিকোলাসের পরিবারের উপর করা ইতিহাসের জঘন্য আচরনের প্রায়শ্চিত্ত করেছে।

ইয়াকাটেরিনবার্গের 'চার্চ অন দি ব্লাড'-একদা এখানেই ইপাটিভ হাউস দাঁড়িয়ে ছিলো
ইয়াকাটেরিনবার্গের ‘চার্চ অন দি ব্লাড’-একদা এখানেই ইপাটিভ হাউস দাঁড়িয়ে ছিলো

ইতিহাসের বিচার হচ্ছে, শতাব্দীর শুরুর দিকে নৃশংসভাবে নিহত জারের দেহাবশেষ সম্মানের সাথে সেন্ট পিটার্সবার্গে সমাহিত করা হয়েছে, এবং যার আদেশে এই নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটানো হয়, সেই লেলিনের মরদেহ এখন সম্মানের জায়গা রেড স্কয়ার থেকে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।

Advertisements

3 thoughts on “একজন জারের মৃত্যু

  1. hsc ban_1st paper describe that Lelin was a great leader…bt actually he is a villain character…
    why our book gives us wrong information AND says that he is a “বিপ্লবি নেতা”????

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s