বিটোফেনের চুল এবং ভ্যালান্ডিগামের মৃত্যু

(১)

বিটোফেনের (Ludwig van Beethoven) নাম শুনেননি এরকম সঙ্গীতবোদ্ধা মানুষ খুঁজে পাওয়া খুব দুরূহ ব্যাপার। জার্মানীর এই বিশ্বখ্যাত মিউজিক কম্পোজার আমাদেরকে বিমোহিত করে রেখেছেন তাঁর নাইনথ সিম্ফনী (9th Symphony)দিয়ে, যা এখনো বিশ্বের বড়ো কোনো ইভেন্টে বাজানো হয়ে থাকে, যেমন বাজানো হয়েছিলো বার্লিন দেওয়াল পতনের দিন। মজার ব্যাপার হচ্ছে নাইনথ সিম্ফনী কম্পোজ করার সময় বিটোফেন কানে খুব কম শুনতেন। এই প্রসঙ্গে একটা গল্প আছে, নাইনথ সিম্ফনীর প্রিমিয়ার শেষে শ্রোতাদের তুমুল করতালি শোনার আশায় বিটোফেন চারপাশে তাকালেন, সবার করতালি দেখতে পেলেন কিন্তু কিছুই শুনতে পেলেন না। তিনি কাঁদতে থাকলেন। এর কিছুকাল পর, ১৮১১ সালের দিকে বিটোফেন তাঁর নিজের পিয়ানো কনসার্টে (Piano Concerto No. 5-the “Emperor”) কানে না শোনার জন্য একদমই পারফর্ম করতে পারেননি, সেটাই ছিল তাঁর শেষ কনসার্ট।

Joseph Karl Stieler কর্তৃক ১৮২০ সা্লে আঁকা বিটোফেনের প্রোর্ট্রেট
Joseph Karl Stieler কর্তৃক ১৮২০ সা্লে আঁকা বিটোফেনের প্রোর্ট্রেট

কানে কম শোনার সমস্যা বিটোফেনের ১৭৯৬ সালের গোড়ার দিকেই শুরু হয়। একই সাথে দেখা দেয় পেটের প্রচন্ড ব্যাথাসহ অন্যান্য সম্পৃক্ত উপসর্গ। ১৮০১ সালে ডাক্তারের পরামর্শমতো হাওয়া বদল করতে অস্ট্রিয়ার শহর হেলিগেন্সট্যাডে (Heiligenstadt)গেলে সেখান থেকে ১৮০২ সালে তাঁর দুই ভাই জোহান এবং কার্লের কাছে একটি চিঠি লিখেন (জায়গার নামানুসারে চিঠিটি বর্তমানে Heiligenstadt Testament নামে পরিচিত), যা ১৮২৭ সালে বিটোফেনের মৃত্যুর পর তাঁর ডেস্কেই পাওয়া যায়। তারমানে চিঠিটা কখনোই পোস্ট করা হয় নি।

Heiligenstadt Testament-এ বিটোফেনের তখনকার মানসিক অবস্থার একটি চিত্র পাওয়া যায়। চিঠির প্রতিটি পরতে পরতে কানের সমস্যার জন্য তাঁর আত্মহত্যা করার সুতীব্র বাসনা ফুটে উঠে, শেষে তাঁর দুই ভাইকে অনুরোধ করেন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর এই শারীরিক সমস্যার কারণ খতিয়ে দেখতে। তাঁর অনুরোধের প্রায় দুইশত বছর পর এই সমস্যার কারণ জানা গেছে, সম্পূর্ণ অদ্ভুত এক উৎস থেকে, আর তা হলো বিটোফেনের নিজের মাথার চুল!

বিটোফেনের চুলের গোছা
বিটোফেনের চুলের গোছা

বিটোফেনের মৃত্যুর সাথে সাথে অনেক লোক এই অসম্ভব প্রতিভাবান কিন্তু খেয়ালী কম্পোজারের মাথার চুল কেটে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে নিজেদের কাছে রেখে দেয়। ১৫ বছরের টিন এজ যুবক ফার্ডিনান্দ হিলার (Ferdinand Hiller)-ও এক গোছা চুল কাটেন যা বিস্ময়করভাবে বর্তমান সময় পর্যন্ত রক্ষিত থাকে।

ফার্দিনান্দ হিলার
ফার্দিনান্দ হিলার

হিলার, যিনি পরবর্তীতে একজন মিউজিক কম্পোজার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন, চুলের গোছাটিকে তার লকেটের মধ্যে রাখেন এবং মৃত্যুর পূর্বে ছেলে পল-কে দিয়ে যান। পল লকেটের গায়ে এর ভিতরের মূল্যবান বস্তু সম্পর্কে লিখে রাখেন। কীভাবে লকেটটা অস্ট্রিয়া থেকে আমেরিকা পর্যন্ত যায়, সেটা আরেক বিস্ময়কর কাহিনী। ১৯৯৪ সালে এই মহামূল্যবান লকেটটি নিলামে ৭,৩০০ মার্কিন ডলারে কিনে নেয় সান জোসে স্টেট ইউনিভার্সিটির বিটোফেন সেন্টার। তারাই পরে বিটোফেনের চুলের গোছা থেকে ৮টি চুল ডিএনএ এনালাইসিসের (DNA analysis) জন্য জমা দেয়।

কয়েক বছর সতর্ক গবেষনার পর, বিজ্ঞানীরা বিটোফেনের চুলে স্বাভাবিকের তুলনায় ১০০ গুণ বেশী সীসা (Lead) সন্ধান পেলেন। ধারণা করা হলো, বিটোফেন প্লাম্বিসমে (Plumbism- সীসা একটি শক্তিশালী বিষাক্ত পদার্থ। যখন কেউ সীসাযুক্ত কোনো খাবার ভুলে খেয়ে ফেলে বা সীসাযুক্ত ধুলোবালি নিশ্বাসের সাথে গ্রহন করে, তখন সীসার কিছু অংশ শরীরে থেকে যায়, এবং সেটাই শরীরের অনেক শারীরিক সমস্যা করে, যেমন-পেটে ব্যাথা, মাথা ব্যাথা, কানে কম শোনা, ব্যবহারের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, মানসিক অস্থিরতা, অবসাদগ্রস্ততা ইত্যাদি ইত্যাদি) আক্রান্ত ছিলেন। যার ফলে পেটের প্রচন্ড ব্যাথা এবং মানসিক অবসাদগ্রস্ততা তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

প্রশ্ন থেকে যায়, প্লাম্বিসমে কানে কম শুনলেও, তা কী একেবারে বধির করে ফেলে? আমার কাছে তা মনে হয় না, তবে আশা করা যায় বিটোফেনের চুলের আরো গবেষনা করে কোনো একদিন এই রহস্যেরও সমাধান ঘটবে।

(২)

প্লাম্বিসমে বিটোফেনের মৃত্যুর কথা লিখতে গিয়ে আরেকটি অদ্ভুত মৃত্যুর কথা মনে পড়লো।

বিটোফেনের তুলনায় কম পরিচিত ছিলেন ভ্যালান্ডিগাম (Clement Laird Vallandigham), যিনি ১৮৫৮ সাল থেকে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত ওহাইয়ো থেকে আমেরিকার হাউস অব রিপ্রেসেন্টেটিভের মেম্বার ছিলেন। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন যুদ্ধ-বিরোধী ডেমোক্রেট সদস্য। যুদ্ধ-বিরোধী প্রচারনার জন্য প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন ভ্যালান্ডিগামকে দুই বছরের কারাদন্ড দেন। যুদ্ধের পর তিনি একজন সফল আইনজীবি হিসেবে পরিচিতি পান, যিনি খুব কম মামলাতেই হেরেছেন।

ক্লেমেন্ট ভ্যালান্ডিগাম
ক্লেমেন্ট ভ্যালান্ডিগাম

১৮৭১ সালে টমাস ম্যাকগেহান নামের এক ব্যক্তির পিস্তলের গুলিতে বারে ঝগড়া করার সময় টম মেয়ার নামক আরেকজন মারা যান। ভ্যালান্ডিগাম ছিলেন ম্যাকগেহানের আইনজীবি, তিনি বলতে চাইলেন, ম্যাকগেহানের গুলিতে মেয়ার মারা যান নি, বরঞ্চ ঝগড়ার এক পর্যায়ে মেয়ারই হাঁটু গেড়ে কোমরের কাছে রাখা হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত নিজের পিস্তলের গুলিতেই মারা যান। ভ্যালান্ডিগাম এই ব্যাপারটি তাঁর জুনিয়রকে হোটেল রুমে বর্ণনা করতে লাগলেন। একপর্যায়ে প্রাকটিক্যালি দেখানোর জন্য রুমের টেবিলের উপর রাখা পিস্তলটি তুলে নিয়ে হোলস্টারে রাখলেন এবং দেখাতে লাগলেন কিভাবে মেয়ার মারা গিয়েছেন। ভ্যালান্ডিগাম ভেবেছিলেন পিস্তলে কোনো গুলি নেই, কিন্তু বাস্তবে পিস্তলটি ফুল লোডেড (Full loaded)ছিলো, ফলে হোটেল রুমেই দুঃখজনকভাবে ভ্যালন্ডিগাম মারা যান।

নিজের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে ভ্যালান্ডিগাম তাঁর মক্কেল ম্যাকগেহানকে নির্দোষ প্রমানিত করলেন এবং ম্যাকগেহান জেল থেকে মুক্তি পেলেন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s