নন্দিতা, এই লেখা তোমার জন্য……

নন্দিতার সাথে আমার পরিচয়টা হয়েছিলো খুব সাধারণভাবে। আমি ঢাকা থেকে বাসে করে সিরাজগঞ্জে আসছিলাম, আমার পাশের সিটটাতেই বসেছিলো নন্দিতা। বয়স আঠারো-উনিশের মতো হবে (মেয়েদের বয়স বলার ক্ষেত্রে বেশীরভাগ সময়ই আমার ধারণা ভুল হয়ে থাকে), একটু লম্বাই হবে, ধরুন পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি, দেখতে শিল্পা শেঠীর মতো-হ্যাঁ, ঠিক এই নামটাই আমার মনে হলো। বাস ছাড়ার পাঁচ মিনিট আগে সে বাসে উঠলো, বিদায় দিতে সাথে এসেছিলো গুরুগম্ভীর স্বভাবের একজন বয়স্ক ব্যক্তি, কথা শুনে মনে হলো মামা সম্পর্কীয়।

দূরপাল্লার যাত্রাগুলোতে বাসে পাশের সিটে কোনো সুন্দরী থাকলে সময়টা খুব খারাপ কাটে না, কথা বলা হোক বা না হোক, আড়চোখে তাকাতে তাকাতে আর মেয়েটিকে নিয়ে নানা চিন্তা করতে করতে কখন যেনো গন্তব্যস্থল এসে যায়। সেবার অবশ্য এরকম কিছু হয়নি, হয়নি নন্দিতার জন্য। বাস ছেড়েছে দশ মিনিটও হয়নি, নন্দিতা আমার দিকে ফিরে সুন্দর একটি হাসি দিয়ে রিনরিনে কন্ঠে বলল, ‘আমি নন্দিতা, থাকি সিরাজগঞ্জে, এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকাতে মামার কাছে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আপনি?’ আমি নন্দিতার সাবলীল কথা বলার দক্ষতায় প্রচন্ড বিমোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ডাক্তার, এটা শোনার পর বাচ্চা মানুষের মতো বায়না ধরলো বিভিন্ন অপারেশনের গল্প শুনবে। কথায় কথায় এক সময় জানিয়ে দিলো ছোটবেলায় তার খুব ডাক্তার হবার ইচ্ছে ছিলো, বন্ধুরা যখন ডাক্তার-রোগী খেলতো, সবসময় সে ডাক্তারই হতো। কমার্সের ছাত্রী হওয়াতে সেই স্বপ্নটা একটা বড় ধাক্কা খেলো। কোথা থেকে যে সময় পেরিয়ে গেলো, আমরা বুঝতেই পারলাম না। যমুনা সেতু পার হয়ে বাস সয়দাবাদে আসলে আমি নেমে গেলাম। নন্দিতা জানালার পাশে বসে হাত নাড়িয়ে হাসিমুখে বিদায় নিলো। আর আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমার হাসপাতালের দিকে রওয়ানা দিলাম।

সেই ঘটনার প্রায় চার মাস পর। বিভিন্ন রকম ব্যস্ততায় নন্দিতাকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। একদিন হঠাৎ করে লাল সালোয়ার কামিজ পরে মোহনীয় রুপে হাসপাতালে এসে আমার সামনে হাজির। প্রথমে চিনতেই পারি নি, ‘আমি নন্দিতা’ বলার পর একটু লজ্জাই পেলাম। মিষ্টি হেসে আমার হাতে একটি কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বললো, ‘ভাইয়া, অবশ্যই আসবেন কিন্তু।’ কার্ডটা খুলে দেখি নন্দিতার বিয়ের কার্ড, ওর দিকে তাকাতেই দেখি লজ্জায় ওর ফর্সা গালটা রক্তিম হয়ে উঠেছে। জানালো বিয়ের পর ঢাকাতেই থাকবে, ওর স্বামী ঢাকাতে একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে ভালো বেতনের চাকরি করে। এই অল্প বয়সে ওকে বিয়ে দেবার রহস্যটা এবার বুঝতে পারলাম।

বিয়েতে আমি যেতে পারি নি, ঐ সময়ে ব্যক্তিগত ব্যস্ততার জন্য ঢাকাতে থাকায়। এরপর অনেকদিন আর দেখা হলো না নন্দিতার সাথে, অবশ্য দেখা হবার কথাও না।

প্রায় এক বছর পর। একদিন ছুটিতে ঢাকায় গেলে আমার এক বন্ধু বিকেল বেলায় আমাকে নিয়ে তার এক বন্ধুর বাসায় এলো একটি জরূরী কাজের কথা বলে, আমাকে অনেকটা জোর করেই নিয়ে আসলো। নন্দিতা! এবার আর চিনতে কষ্ট হয় নি। বুঝতে পারলাম আমাকে ষড়যন্ত্র করেই আনা হয়েছে চমকে দেবার জন্য, আমিও চমকিত হলাম। আমার বন্ধুবরের বন্ধুর স্ত্রী নন্দিতা। কোনো একদিন কথা প্রসঙ্গে আমার বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পেরেছে আমার কথা, অতএব আমাকে না জানতে দিয়ে আমাকে এখানে নিয়ে আসা। নন্দিতার স্বামী ভদ্রলোকটিকে আমার ভালোই লাগলো। চমৎকার করে কথা বলেন, প্রাণখোলা ধরনের। হাসি, ঠাট্টায়, গল্পে রাতের খাবারের সময় হলে নন্দিতা না খাইয়ে ছাড়তে চাইলো না। আমার বন্ধুর আবার ভোজন রসিক হিসেবে খুব নাম ডাক, তাই অনুরোধটা এড়ানো গেলো না।

নন্দিতা যখন খাবারের ব্যবস্থা করতে গেলো, তখন ওর স্বামী বললো নন্দিতার ব্রেইন টিউমার হয়েছে, আগামী সপ্তাহে ঢাকার একটা বড় হাসপাতালে অপারেশন হবে। আমি চমকে গেলাম। কিছুক্ষন কোনো কথাই বলতে পারলাম না। রাতে খাবারের টেবিলে নন্দিতা অনেক মজার মজার কথা বললো, খাবারটাও দারুন হলো। কিন্তু কোনো কথাই আমি আর মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারলাম না, খাবারটাও গলা দিয়ে ঢুকতে পারলো না। বাকীটা সময় ফ্যাল ফ্যাল করেই তাকিয়ে রইলাম।

দুই সপ্তাহ আগে নন্দিতার অপারেশন হলো, আমি গত সপ্তাহে ঢাকায় গেলে ওকে দেখতে হাসপাতালে গেলাম। ওকে কেবিনে নিয়ে আসা হয়েছে। সেই আগের মতোই চঞ্চল, ছটফটেই আছে। আমি যাবার পর বলল, ‘ভাইয়া, আমার হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্টে জিবিএম, গ্রেড-ফোর এসেছে। আমার স্বামী আমাকে জানতেই দেই নি। আমি নিজে ফাইলে রিপোর্ট দেখলাম। এরপর মোবাইলে ইন্টারনেটে দেখলাম খুব বেশী হলে দেড়-থেকে দুই বছর বাঁচবো। দেখুন তো ভাইয়া, রাব্বি (নন্দিতার স্বামী) সারাক্ষন মনমরা হয়ে থাকে। আমি ওকে বললাম, এই দুইটা বছর আনন্দে বেড়াই, আর ও বলছে কি রেডিও না কেমোর জন্য সিঙ্গাপুর নিয়ে যাবে। আমার চিন্তায় সারাক্ষন অস্থির হয়ে থাকে। আপনি একটু ওকে বোঝান তো।’ আমি আবারও ফ্যাল ফ্যাল হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এক সময় নন্দিতা বললো, ‘ভাইয়া, বিয়ে করেছেন পাঁচ বছর হলো, এখনো কোনো বাবু নেন নাই! তাড়াতাড়ি নিয়ে নেন, আমি দেখে যাই। আর মেয়ে হলে নাম রাখবেন নন্দিতা, কি রাজী আছেন তো?’ ওর পাশে বেশীক্ষন থাকাটা খুব কষ্টকর হয়ে উঠলো। আমি ব্যস্ততার কথা বলে চলে আসলাম। কেবিনের দরজায় এসে পিছনে তাকিয়ে দেখি, রাব্বি গভীর মমতায় নন্দিতার বিছানার পাশে বসে ওর হাত ধরে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রাস্তায় আসলাম। এমন সময় মুষলধারে বৃষ্টি নামলো। আমি আশে পাশে কোথাও ঠাঁই খুঁজলাম না। বৃষ্টিতে ভিজে হাঁটতে থাকলাম। এক সময় লক্ষ্য করলাম বৃষ্টির পানির সাথে আমার চোখের পানিও মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

Advertisements

10 thoughts on “নন্দিতা, এই লেখা তোমার জন্য……

  1. নন্দিতার জন্য অফুরন্ত শুভ কামনা !

    গল্পই হোক আর xperience ই হোক,হৃদয় দোলা দিয়ে যাবার জন্যে যথেস্ট !

  2. হ্যা,আপনার সাইটটি খুব ভাল লেগেছে। আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল পোষ্ট সকলেরই ভাল লাগবে।অনেক তথ্যপূন্য এই সাইটটি আমার অসংখ্য ভাল লেগেছে।ভবিষ্যতে আরো ভাল ও আরো উন্নত তথ্য সমৃদ্ধ পোষ্ট চাই।

  3. জানি না এটা গল্প নাকি সত্যি ঘটনা।
    তবে পড়ে আসলেই দোলা লাগলো মনে। মন্তব্য করলাম কেবল জানাবার জন্য লেখা ভালো লেগেছে।

    হঠাৎ হঠাৎ এমন ঘটনার সামনাসামনি হলে মনে হয় আমাদের জীবন কতো ক্ষুদ্র কতো ছোট। আর আমরা শুধু অলিক মোহে সামনে ছুটতে থাকে একটু স্থির হয়ে আশেপাশের সৌন্দর্য্য দেখি না একদিন হঠাৎ করে আমাদের সময় ফুরিয়ে যায়।

    আশা করি নন্দিতা যতোদিন বাঁচবে আনন্দের মাঝ দিয়ে দিনগুলো কাটাবে আর তার সব সম্ভাব্য সখ আশা আকাঙ্খা পূরণ করবে।

    • অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে আশাবাদী। আপনার আশাবাদীর দিনপঞ্জিকাও অসম্ভব ভালো লেগেছে।

      গল্প, গল্পই, তার সাথে বাস্তবতার মিল থাকতে পারে, আবার নাও পারে, তাই মিল খুজতে না যাওয়াটাই ভালো।

      খুব ভালো থাকুন, খুব।

  4. নিয়াজ, ভালো লিখো………কিন্তু নন্দিতার জন্য কষ্টটা বেশী লাগছে………..best of luck Nondita…….and her rest life remained in this earth with the utmost happiness…..

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s