একটি সাধারণ গল্প

(১)

আমি আনিসুর রহমান। এটা আমার ছদ্ম নাম, কেনো আমি আসল নাম দিচ্ছি না, আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না। আমি ঢাকায় থাকি, একটি বহুজাতিক কোম্পানীতে কর্মরত আছি। বয়স ধরুন পয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের ভিতর। আমি বিবাহিত, আমার স্ত্রী মারুফা। সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে- মারুফাকে দেখলেই তা মনে হয়, আমার কাছে আমার দেখা সবচেয়ে রুপবতী এবং গুনবতী মহিলা। আমার দুইটি পরী আছে, একজনের বয়স পাঁচ বছর, নাম অর্পা। আরেকজনের বয়স তিন বছর, নাম পূর্বা। আমাদের এই চারজনের ছোট্ট সংসার খুব ভালোভাবেই চলছিল।

হঠাৎ একদিন একটি খবর এই সুখের সংসারের সবকিছু এলোমেলো করে দিলো। অনেকদিন ধরেই মারুফা একটি সমস্যার কথা বলছিল। অফিস থেকে সময় বের করতে পারি নি, আলসেমীও কম দায়ী নয়, বেশকিছু দিন পর ডাক্তার দেখানোর পর যা জানতে পারলাম, খুব ভালো লাগলো না। ডাক্তার বলছেন, মারুফার নাকি ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়েছে। আগে অপারেশন করতে হবে, তারপর অবস্থা বুঝে কেমো বা রেডিওথেরাপী।

আমিও হাইপারটেনশনের রোগী। মারুফার এই অবস্থায় একটু ঘাবড়েই গেলাম, কিন্তু মনোবল হারাইনি। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাহসের দিন ছিল মারুফাকে জানানো। ওকে বলার পর দেখলাম, কিছুক্ষন চুপ ছিলো, তারপর হাসিমুখে বললো, কবে অপারেশনের টেবিলের নিচে শুতে হবে। বুক থেকে সঙ্গো্পনে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

মেয়ে দু’টিকে নানা বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। এরপর এলো সেই দিন। ঢাকার একটি নামকরা হাসপাতালে অপারেশন করা হলো। ডাক্তার বললেন, অপারেশন সফল হয়েছে। চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে বায়োপসি রিপোর্টের উপর। পোস্ট-অপারেটিভ রুমে মারুফাকে দেখতে গেলাম। হাসিমুখে আমাকে পাশে বসে ওর হাতটা ধরে থাকতে বললো। আমি তাই করলাম।

(২)

আমি মারুফা রহমান। এটা আমার ছদ্ম নাম, কেনো আমি আসল নাম দিচ্ছি না, আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না। আমি একজন গৃহিনী, সংসার সামলানোই আমার কাজ। আমার পরিচিতজনেরা বলেন আমি নাকি এই কাজটা খুব সুন্দরভাবে করতে পারি। আমার স্বামী আমাকে খুব ভালোবাসেন, তারচেয়েও বেশী ভালোবাসেন আমাদের দুই পরী অর্পা আর পূর্বাকে।

গত কিছুদিন ধরে আমার ব্রেস্টে ব্যথা করছে। আমার স্বামীকে বলার পর একদিন আমরা ডাক্তার দেখাতে গেলাম। ডাক্তার কিছু পরীক্ষা করতে দিলেন। রিপোর্ট গুলো দেখে আমার স্বামীকে আলাদাভাবে কি যে বললেন, তারপর থেকেই তাকে খুব উদ্বিগ্ন দেখলাম। কিছু একটা আমাকে বলতে চাচ্ছে, কিন্তু পারছে না।

অবশেষে একদিন আমার কাছে এসে বললো একটা কথা বলবে। আমি ঠিক করেছি যত কঠিন কথাই হোক তা হাসিমুখে শুনবো। সে আমাকে বললো, আমার ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়েছে, অপারেশন করতে হবে। এরপর বায়োপসি রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে কেমো বা রেডিওথেরাপী দিবে। আমি অভয় দিলাম।

মেয়ে দু’টিকে নানা বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। এরপর এলো সেই দিন। ঢাকার একটি নামকরা হাসপাতালে অপারেশন করা হলো। ডাক্তার বললেন, অপারেশন সফল হয়েছে। কিছুক্ষন পর দেখলাম আমার স্বামী আমাকে দেখতে আসলো। কেনো জানি না হঠাৎ করে আমার মনে হলো আমি বোধহয় আর ভালো হবো না। আমার ছোট্ট দুইটা মেয়ের কথা মনে পড়লো। আমার স্বামীকে বললাম আমার হাত ধরে বসে থাকতে, সে তাই করলো। হঠাৎ আমার হাতের উপর তার চোখের পানি পরলো, শক্ত করে আমরা হাত ধরে থাকলাম।

(৩)

আজ এক সপ্তাহ হলো মারুফার রেডিও থেরাপী চলছে, সিরাজগঞ্জের কেওয়াইএএমসিএইচে। ওর বায়োপসি রিপোর্ট ভালো আসেনি, ক্যান্সারটা শেষ পর্যায়ে। আমরা অনেক দেরী করে ফেলেছি। মারুফার মাথার চুল সব পরে যাচ্ছে, চেহারা কেমন যেন শীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আমার খুব কষ্ট লাগছে, খুব।

আজ মারুফা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। ডাক্তাররা বলছেন, তারা চেষ্টা করছেন, কিন্তু ভরসা পাচ্ছেন না। আমার শরীরটাও খুব ভালো যাচ্ছে না। প্রেশারের ওষুধ ঠিকমতো খাওয়া হচ্ছে না, খুব দুর্বল লাগছে। একটু বিশ্রাম নেওয়া উচিৎ।

(৪)

গত দুই দিন ধরে আমার কিছুটা ভালো লাগছে। ডাক্তাররা বলেছিলেন, আমি নাকি প্রায় তিনদিন অজ্ঞান ছিলাম, যমে মানুষে টানাটানি। আমার স্বামী না কি খুব কষ্ট করেছে, এই ক’দিন। সারাক্ষন আমার পাশে ছিলো। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া, নাওয়া কিছুই হয়নি তার। ওর নিজেরও প্রেশারের সমস্যা। আমার জ্ঞান ফেরার পর ওর সাথে আমার দেখা হয়নি। আমার দেবর বললো, সে না কি অফিসের জরুরী কাজে ঢাকায় গেছে, আসতে কিছুদিন সময় লাগবে। মেয়েদেরকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।

(৫)

আমি নিয়াজ, একজন ডাক্তার, নিউরোসার্জন। পাঁচদিন আগে রাত দুইটার সময় ইমার্জেন্সীভাবে হাসপাতালে আসতে হয়েছিলো। একজন ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে ইমার্জেন্সীতে এসেছে। সিটি ব্রেন করে দেখা গেলো বিশাল বড় একটা হেমোরেজ, ব্রেন স্ট্রোক করেছে, অবস্থা খুব ভালো না। রোগীর সাথের লোকদের কাছ হতে শুনলাম, রোগীর স্ত্রী এই হাসপাতালেই ক্যান্সার বিভাগে ভর্তি আছে, রেডিও থেরাপী পাচ্ছে। গত দুই দিন ধরে সে অজ্ঞান হয়ে আছে, এই চিন্তায় তার স্বামী খুব অস্থির ছিলেন। প্রেশারের রোগী ছিলেন, ঠিকমতো ওষুধও খান নি।

আজ সকালে রোগীটি মারা গেছেন। আমরা অনেক চেষ্টা করেছিলাম, সম্ভব হয় নি। শুনতে পারলাম, তার স্ত্রীর না কি জ্ঞান ফিরেছে, স্বামী যে একই হাসপাতালে ভর্তি তা জানতেন না। তাকে তার স্বামীর মৃত্যুর খবরও দেওয়া হয়নি। তাদের ছোট ছোট দুইটি মেয়েও আছে। খুব খারাপ লাগছে আমার, খু-উ-ব।

(৬)

পাদটীকাঃ আনিসুর রহমান মারা যাবার এক সপ্তাহ পর তার স্ত্রী মারুফা রহমানও মারা যান। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মারুফা জানতেন তার স্বামী বেঁচে আছেন।

এটি একটি সাধারণ গল্প নয়, একটি সাধারণ সত্য কাহিনী।

Advertisements

3 thoughts on “একটি সাধারণ গল্প

  1. আপনার দুই তিনটি লেখা পড়েই আপনার লেখার ভক্ত হয়ে যাচ্ছি।
    লেখাটা ভালো লাগলো।

    ডাক্তার হিসেবে আপনি অনেককিছুই দেখেন, অনেক পরিবারের মুখে সস্থির হাসি আবার অন্য অনেক পরিবারের হৃদয়বিদারক কান্না। একেক সময় মনে হয় ডাক্তাররা কিভাবে এতো নিষ্পৃহ থাকে, দেখতে দেখতে কি তাদের অভ্যাস হয়ে যায়। একি অভ্যাসের বিষয়? আপনি লেখার মধ্য দিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি আপনার মনে জমে ওঠা বাষ্প ছাড়ছেন দেখে ভালো লাগছে। আরও লেখা পাবো আশা করছি

  2. Sorry Niaz.
    Tor lektha bhalo hoyece, kintu ami like korteci na.
    Karon ata akta bastob ghotona.
    Manush glopo sunte chai, bastob kahini noy.
    R lekok-ra bastob kahinir sathe kalponic onek kicui add kore.
    Jai hok ami akjon normal pathok je boroi hoyece Humayun r Zafar-iqbal der boi pore.
    Tai ami Sorry, ai jonno je ami lekar kicui buji na.
    Amra normal people, jara bastober duk-kho,kosto jatona bhular jonno halka,chotul lekha pori, comedy movie dekhi tader kotha kototuku grohon korbi, ata tor bepar.

  3. PROUD OF YOU !!
    I AM SPEECHLESS !!

    I know your style is unique but no harm to master on various styles of writing.

    However read more Bangla novels …N know how more you can express with less words.

    Epar Bangla writes – Akhtarujjaman/
    I will suggest West Bengal writers – Sanjib/ Nimay/ Gajani –

    Each of them r unique

    Don’t be influenced by Humayun/Zafar

    I am there for the POSITIVE CRITICISM !! তোর লেখাটা পড়ে কিছুক্ষন কাঁদলাম…….Thanks !

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s