ঠিকানা পরিবর্তন!!!

অনেকদিন ধরে ভেবেছি নিজের একটি ডোমেইন থাকবে, হোস্টিং থাকবে, থাকবে একটি ওয়েবসাইট। তখনো লেখালেখির জগতে আমি আসিনি। ডাক্তারি করছি ধুমিয়ে। আমার ইচ্ছার কথা শুনে বন্ধু হিরক এগিয়ে এলো। ওর BNH Production- এর সহায়তায় আমার একটি প্রফেশনাল ওয়েবসাইট হলো, ডাঃ নিয়াজ হিসেবে, ডাক্তারের রোজনামচা হিসেবে নয়। সেটি ছিলো www.drniaz.com

তারপর এলাম ব্লগিং-এর জগতে। কমিউনিটি ব্লগগুলোতে লিখতে লিখতে নিজের একটি সাহিত্য ব্লগ বানাতে ইচ্ছে করলো। ব্যবহার করলাম wordpress.com- কে। বানালাম এই ব্লগটি। এই ব্লগটিই পেলো এই ২০১২ সালের ডয়েচে ভেলের শ্রেষ্ঠ ব্লগ বাংলা হিসেবে ইউজার উইনার। মায়া জন্মালো খুব। কিন্তু আবারো নিজস্ব ডোমেইন আর হোস্টিং- এ একটি সাহিত্য ব্লগ রাখার ইচ্ছে প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। আবারো এগিয়ে এলো হিরক। এবার তৈরী করলাম self hosted wordpress.org blog. নাম সেই- সুড়ঙ্গঃ নিয়াজের ভুবন, আর ঠিকানা হলো www.niazmowla.com. সবাইকে আমার নতুন ব্লগ দেখার আমন্ত্রণ রইলো। এখন থেকে আমি নতুন ব্লগেই লিখবো, পাশাপাশি এই ব্লগে আগামী দুই মাস লেখা চালিয়ে যাবো, তারপর এটার ছুটি! কিন্তু Deactivate করবো না, রেখে দিবো প্রথম ভালোবাসা হিসেবে।

সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। 

গ্রীক মিথলজি ১২ (আফ্রোদিতির গল্পকথা- অ্যাডোনিসের সাথে অমর প্রেমকাহিনী)

অনেক অনেক দিন আগে গ্রীস দেশের পাফোস নগরীতে এক রাজা ছিলেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি ছিলেন সিনাইরাস, আবার কেউ কেউ বলেন তিনি ছিলেন থিয়াস। এখানে আমরা সিনাইরাসই বলবো। সময়টা তখন ট্রোজান যুদ্ধের আশেপাশে। রাজা সিনাইরাস প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যুদ্ধে পঞ্চাশটি যুদ্ধ জাহাজ পাঠাবেন, কিন্তু প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে পাঠালেন মাত্র একটি। সে যাই হোক, স্মার্না নামে তার একজন খুব সুন্দরী কন্যা ছিলেন। এতোই সুন্দরী ছিলেন যে, আশে পাশে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিলো। স্মার্নার মা, সেই দেশের রানী, একদিন গর্ব করে বলেই ফেললেন, “আমার মেয়ে স্মার্না দেবী আফ্রোদিতির চেয়েও সুন্দর!” আফ্রোদিতি এই কথা শুনলেন, এবং স্বাভাবিকভাবে মোটেই খুশি হলেন না। নিজেকে অপমানিত বোধ করলেন। ঠিক করলেন এই কথার প্রতিশোধ নিবেন।

প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আফ্রোদিতি এক অদ্ভুত উপায় বের করলেন। স্মার্না নিজের বাবা রাজা সিনাইরাসের প্রেমে পড়লেন এবং অপরাধবোধে বিদ্ধ হতে লাগলেন। একসময় এই মানসিক টানাপোড়ন সহ্য করতে না পেরে স্মার্না আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিলেন। দেবী দিমিতারের শস্য উৎসবে যখন সবাই ব্যস্ত ছিলেন, সেই সময়ে স্মার্না আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই রাজা সিনাইরাসের এক সেবিকা হিপ্পোলিটা এসে পড়ায় আর আত্মহত্যা করতে পারলেন না। হিপ্পোলিটা মমতা মাখানো কন্ঠে বললেন, “কি তোমার কষ্ট? আমায় বলো। আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, তোমায় আমি সাহায্য করবো”।

হিপ্পোলিটার কাছে হুড়মুড় করে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লেন স্মার্না। গড় গড় করে বলে দিলেন নিজ পিতার প্রতি নিষিদ্ধ আসক্তির কথা। আর বললেন সেই অমর উক্তি- “মানব সভ্যতা বিদ্বেষপূর্ণ বিধান রচনা করেছে। প্রকৃতি যা অনুমোদন করে, ঈর্ষান্বিত বিধান তা নিষেধ করে”। হিপ্পোলিটা স্মার্নার কথা শুনে চমকে উঠলেন। কিন্তু তিনি যেহেতু প্রতিজ্ঞা করেছেন, তাই স্মার্নাকে বললেন, “চিন্তা করো না। একটা ব্যবস্থা করছি”।

একদিন রাতে রাজা সিনাইরাস মাতাল হয়ে আছেন। হিপ্পোলিটা বললেন, “প্রভু, আপনার জন্য একজন দাসী আকুল হয়ে আছেন। তিনি আপনার জন্য আপনার বিছানাতে অপেক্ষা করে আছেন”। সিনাইরাস আমোদিত হয়ে উত্তেজিত ভঙ্গিতে বিছানার দিকে এগিয়ে গেলেন। আধো অন্ধকারে নিজের মেয়ের সাথে মিলিত হলেন, অথচ চিনতে পারলেন না।

Smarna and Cinairus

সিনাইরাসের বিছানাতে স্মার্নাকে নিয়ে যাচ্ছে হিপ্পোলিটা (শিল্পী- ভার্জিল সোলিস)

 

এভাবে বারো রাত পেরিয়ে যাবার পর সিনাইরাসের একবার ইচ্ছে হলো- যার সাথে তিনি বিছানাতে ঘুমাচ্ছেন তাকে দেখার। সেই রাতে সিনাইরাস বিছানাতে এসে স্মার্নাকে বুঝতে না দিয়েই কুপিতে আগুন জ্বালালেন এবং দেখতে পেলেন স্মার্নাকে- নিজেরই কন্যা সন্তান! রাগে, ক্ষোভে, অপমানে তিনি স্মার্নাকে তরবারী হাতে ধাওয়া করলেন। স্মার্নাও পালিয়ে গেলেন বনের দিকে। পালাতে পালাতে দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করলেন এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে। দেবতারা দয়াপরবশ হলেন স্মার্নার উপর। বর্তমান যুগের সিরিয়া- লেবাননের কোথাও দেবতারা স্মার্নাকে একটি গাছে পরিণত করেন, সেই গাছটির নামও হয় স্মার্না গাছ।

 

স্মার্নার তার পিতার নিকট হতে পালিয়ে বনে বাদাড়ে দৌড়ানোর সম্ভাব্য পথপরিক্রমা

স্মার্নার তার পিতার নিকট হতে পালিয়ে বনে বাদাড়ে দৌড়ানোর সম্ভাব্য পথপরিক্রমা

 

(ঐতিহাসিকভাবে এটি যে সময়ের ঘটনা, দেখা যায়, সেই সময়ে রাজারা কোনো পুত্র সন্তান না থাকলে, রাজদন্ড নিজের রক্তের মধ্যে রাখার জন্য নিজের কন্যা সন্তানকেই বিয়ে করেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন, রাজা সিনাইরাসের ক্ষেত্রেও এই রকম ঘটনা ঘটেছিলো। তিনি নিজেই স্বেচ্ছায় মন্দিরের সবচেয়ে কমবয়সী পুরোহিতানীকে, যিনি কি না তারই কন্যা ছিলেন, বিয়ে করেন।)

Smarna in Hell

নরকে স্মার্না (শিল্পী- গুস্তাভ ডোরে, ১৮৮৩ সাল)

 

স্মার্না যখন গাছে পরিণত হোন, ততদিনে তিনি গর্ভবতী, তার গর্ভে ছিলো তখন তারই পিতা সিনাইরাসের সন্তান। তাই গাছে পরিণত হওয়ার নয় মাস পর, স্মার্না গাছটি একদিন ফেটে যায় এবং সেখান থেকে বের হয় এক অনিন্দ্য সুন্দর শিশু- পরবর্তীতে এই শিশুটিই পরিচিত হোন অ্যাডোনিস নামে। তখন সেই পথ দিয়েই কোথাও যাচ্ছিলেন প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি। তিনি শিশুটিকে দেখলেন, কি হলো তার আমরা কেউ জানি না, আফ্রোদিতি একটি সিন্দুকের ভিতরে শিশুটিকে লুকিয়ে রাখলেন এবং সেই সিন্দুকটি রাখতে দিলেন পাতালপুরীর রানী পার্সিফোনের কাছে।

Birth of Adonis

অ্যাডোনিসের জন্ম (শিল্পী- মারকান্টোনিও ফ্রাঞ্চেসচিনি, ১৬৮৫ থেকে ১৬৯০ সালের ভিতরে অঙ্কিত)

 

Birth of Adonis

বার্নার্ড পিকার্টের তুলিতে অ্যাডোনিসের জন্ম

 

পার্সিফোন অদম্য কৌতুহল নিয়ে সিন্দুকটি খুলে দেখেন এবং অসম্ভব সুন্দর শিশুটিকে দেখে তাকে লালন পালন করতে থাকেন। অ্যাডোনিস যখন যুবকে পরিণত হোন, সুন্দরের সংজ্ঞাই যেনো তখন অ্যাডোনিস। অ্যাডোনিসকে দেখে দেবী আফ্রোদিতি নিশ্চল হয়ে গেলেন, বললেন, “এতো আমারই!” পার্সিফোনের কাছে দাবী করলেন অ্যাডোনিসকে ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু ততদিনে পার্সিফোনও অ্যাডোনিসে মুগ্ধ, তিনি অ্যাডোনিসকে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করলেন।

Adonis

শিল্পীর তুলিতে অ্যাডোনিস

 

ব্যাপারটি জিউসের কাছে পর্যন্ত চলে গেলো। জিউস সমস্যাটির সমাধানের জন্য মিউজ ক্যাললিওপিকে দায়িত্ব দিলেন। ক্যাললিওপি তখন বছরের অর্ধেক সময় পার্সিফোনের কাছে এবং বাকী অর্ধেক সময় আফ্রোদিতির কাছে অ্যাডোনিসকে থাকার আদেশ দিলেন, ঠিক যেভাবে পার্সিফোন নিজেই বছরের ছয় মাস থাকতেন পাতালপুরীতে হেডিসের সাথে, বাকী ছয়মাস থাকতেন পৃথিবীতে মা দিমিতারের সাথে। কিন্তু এই রায়ের ফলে আফ্রোদিতি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গেলেন। ক্যাললিওপির পুত্র অর্ফিউস তখন ছিলেন থ্রাসে। থ্রাসের নারীদের প্রতি আবার আফ্রোদিতির ছিলো দারুণ প্রভাব। আফ্রোদিতির প্রভাবের কারণেই থ্রাসের নারীরা সবাই অর্ফিউসের প্রেমে পড়ে গেলেন এবং ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার মতো অর্ফিউসের অঙ্গ প্রত্যঙ্গও ছিন্নভিন্ন করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলেন। এভাবেই যেনো আফ্রোদিতি ক্যাললিওপিকে বুঝিয়ে দিলেন ভালোবাসার মানুষকে কখনই কারো সাথে সমান অংশীদার করা যায় না! কিন্তু এতেও পরিস্থিতির খুব একটা বদল হলো না। জিউস নিজেই বিচারের দায়িত্ব নিলেন এবং এবার বছরকে সমান তিন ভাগে ভাগ করে দিলেন। একভাগ পার্সিফোনের, একভাগ আফ্রোদিতির এবং একভাগ অ্যাডোনিসের নিজের। আফ্রোদিতি জিউসের সিদ্ধান্ত অমান্য করতে পারলেন না, কিন্তু কীভাবে যেনো অ্যাডোনিসের নিজের সময়টা আফ্রোদিতি পেয়ে গেলেন! প্রকৃতপক্ষে অ্যাডোনিসেরও আফ্রোদিতির সাথে সময় কাটাতেই যেনো ভালো লাগতো।

 

Aphrodite and Adonis

আফ্রোদিতি এবং অ্যাডোনিস ভালোবাসায় মত্ত (শিল্পী-টিজিয়ানো ভেসেল্লিও, পঞ্চদশ শতকের দিকে)

 

Aphrodite and Adonis

শিল্পীর তুলিতে আফ্রোদিতি এবং অ্যাডোনিস ভালোবাসায় মত্ত

 

বহু বছর আফ্রোদিতি এবং অ্যাডোনিস একসাথে স্বামী –স্ত্রীর মতোই সময় কাটালেন। তারা একসাথে শিকারে যেতেন, গল্প করতেন- কত কী! কিন্তু সুখতো চিরস্থায়ী নয়! একদিন এলো সেই ভয়ংকর দিন। আফ্রোদিতি কোনো একটি কাজে দূরে কোথাও গিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে অ্যাডোনিসকে বন্য হিংস্র জন্তু শিকার করতে নিষেধ করে গিয়েছিলেন। কিছু একটা তিনি সন্দেহ করেছিলেন বটে! ঘটনার এই পর্যায়ে আবার পার্সিফোনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাডোনিস তার নিজের সময় আফ্রোদিতিকে দিয়েছিলেন, ব্যাপারটি কখনই পার্সিফোন মেনে নিতে পারেননি। তিনি আফ্রোদিতির আরেক প্রেমিক যুদ্ধবাজ দেবতা অ্যারিসকে বললেন, “অ্যারিস, তোমার আফ্রোদিতি আর তোমার নেই! সে এখন এক মরণশীলের কব্জায়”। রাগে, ক্ষোভে, ঈর্ষায় অ্যারিস এক ভয়ংকর সুন্দর বন্য শুকরের ছদ্মবেশে অ্যাডোনিসের সামনে এলেন। এই ভয়ংকর সুন্দর বন্য শুকরটিকে দেখে অ্যাডোনিস আফ্রোদিতির নিষেধ বাণী ভুলে গেলেন। তিনি বন্য শুকরটি শিকারে মত্ত হয়ে গেলেন। 

অ্যাডোনিস তার সাথে থাকা শিকারী কুকুরদের সহায়তায় কোনঠাসা করে ফেললেন সেই অ্যারিসরুপী বন্য শুকরটিকে। ছুড়ে মারলেন তার বর্শা, কিন্তু খুব সামান্যই আহত হলো শুকরটি। এবার পাল্টা আক্রমন করলো শুকরটি, তেড়ে এলো অ্যাডোনিসের দিকে এবং ধারালো দাঁত দিয়ে ক্ষত বিক্ষত করে ফেললো অ্যাডোনিসকে। অ্যাডোনিস আর্তনাদ করে উঠলেন। সেই সময়ে আকাশপথে আফ্রোদিতি তার কাজ শেষ করে অ্যাডোনিসের দিকেই আসছিলেন। তিনি দূর থেকেই শুনলেন অ্যাডোনিসের করুণ আর্তনাদ, আফ্রোদিতি ঝড়ের গতিতে এলেন অ্যাডোনিসের কাছে।

অ্যাডোনিসের তখন শেষ সময়, তার শরীর থেকে তখন প্রবল ধারায় লাল রক্ত ঝরছে, চোখ দুটি হয়ে উঠেছে ভারী এবং অন্ধকার। দেবী চুমু দিলেন অ্যাডোনিসের তুষার শুভ্র কপালে, চুমু দিলেন ঠোঁটে, কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী অ্যাডোনিস তা বুঝতেও পারলেন না। আফ্রোদিতিও যেনো দুমড়ে মুচড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি অ্যাডোনিসের কানে কানে বলতে লাগলেন, “তুমি চলে যাচ্ছো, হে প্রিয়তমা! আর আমার স্বপ্নও যেনো সুদূরে হারিয়ে যাচ্ছে। আমার ভালোবাসাও চলে যাচ্ছে তোমার সাথে, কিন্তু আমি বেঁচে থাকবো অনন্তকাল তোমার ভালোবাসা নিয়ে, আমি যে দেবী! আমি যে অমর! আমি তোমাকে আরেকবার চুমু দিতে চাই, দীর্ঘ চুমু, যাতে তোমার সমস্ত ভালোবাসা পান করতে পারি এই ঠোঁটে”।

Adonis, going to die

অ্যাডোনিস মারা যাচ্ছেন, আফ্রোদিতি কানে কানে ভালোবাসার কথা ফিস ফিস করে বলছেন

 

Aphrodite and Adonis

অ্যাডোনিসের মৃত্যুতে বিধ্বস্ত আফ্রোদিতি (শিল্পী- জোসে দ্য রিবেরা, ১৬৩৭ সাল)

 

(অ্যাডোনিসের কাহিনী গ্রীক মিথের অংশ হলেও এর উদ্ভব সিরিয়া-লেবাননের দিকে। অ্যাডোনিসকে সাধারণত তুলনা করা হয়ে থাকে সিরিয়ান ডেমি-গড তামুজের সাথে। তামুজও অ্যাডোনিসের মতোই বন্য শুকরের আক্রমনে মারা যান। অনেকেই বলে থাকেন, অ্যারিস নয়, অ্যাডোনিসের মৃত্যুর জন্য দেবী আর্টেমিস দায়ী, যার দায়িত্ব ছিলো বন্য পশু-পাখীদেরকে রক্ষা করা। )

আফ্রোদিতি এবং অ্যাডোনিসের মিলনে এক কন্যা সন্তান জন্মগ্রহন করেছিলেন, নাম ছিলো বিরৌ। এই বিরৌর নামেই লেবাননের বর্তমান রাজধানী বৈরুতের নামকরণ করা হয়। সমুদ্র রাজ পসাইডন এবং দেবতা ডায়ানিসাস বিরৌর প্রেমে পড়েছিলেন। তাদের আরেকটি পুত্র সন্তানও জন্মগ্রহন করে- গলগোস। গলগোস ছিলেন সাইপ্রিয়ান নগরী গলগির প্রতিষ্ঠাতা।

বুটেস নামের এক মরণশীল জেসনের সাথে স্বর্ণ মেষের চামড়া উদ্ধারের অভিযানে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা যখন সাইরেনদের অতিক্রম করছিলেন (জেসন এবং আর্গোনটদের সোনালী মেষের চামড়া উদ্ধারের অভিযানে বিস্তারিত থাকবে), তখন সাইরেনদের বাজনা এবং এর জবাবে অর্ফিয়ুসের বাজনা শুনে সহ্য করতে না পেরে বুটেস পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে আফ্রোদিতি কোনো কারণে অ্যাডোনিসের হৃদয়ে ঈর্ষা জাগ্রত করতে চাচ্ছিলেন। তাই তিনি তখন বুটেসকে উদ্ধার করে সিসিলির নিকটে লিলাইবিয়ামে নিয়ে যান এবং কয়েকরাত বুটেসের সাথে কাটান। কেউ কেউ বলেন, তাদের মিলনের ফলে এরিক্স নামে এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহন করেন, তিনি (এরিক্স) পরে সিসিলির রাজা হোন, কিন্তু হারকিউলিসের সাথে এক মল্লযুদ্ধে নিহত হোন।

প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি অ্যাডোনিসের মৃত্যুতে যতই কষ্ট পান না কেনো, তিনি তো প্রেমের দেবী, ভালোবাসার দেবী! তাই আফ্রোদিতির ভালোবাসা যেন অফুরন্ত। সেই ভালোবাসার ভাগীদার হলেন এবার এনকেসিস, ট্রয় নগরীর নিকটে অবস্থিত দার্দানিয়ার রাজকুমার। পরবর্তী পর্বে আসছি এনকেসিসের সাথে আফ্রোদিতির দুরন্ত প্রেমকাহিনী নিয়ে।

গ্রীক মিথলজি ১১ (আফ্রোদিতির গল্পকথা- আফ্রোদিতি, হেফাস্টাস ও অ্যারিসের ত্রিমুখী প্রেম

গ্রীক মিথলজিতে জিউসের পর সবচেয়ে বর্নিল অলিম্পিয়ান হচ্ছেন আফ্রোদিতি। দেবতা থেকে শুরু করে মানুষ- সবাইকেই তিনি বিমোহিত করেছেন তার রহস্যময় চরিত্র দিয়ে। ভালোবাসার দেবী নিজেও অনেককে ভালোবেসেছেন, অনেকের ভালোবাসাও পেয়েছেন। আবার কখনো হয়েছেন ছলনাময়ী, প্রতিশোধপরায়না।

আফ্রোদিতির জন্মঃ

আফ্রোদিতির জন্ম নিয়ে বেশকিছু মিথ প্রচলিত। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মিথটি বলেছেন হেসিয়ড, তার থিওগোনীতে। সৃষ্টির প্রথম দিকে গায়ার প্ররোচনায় যখন ক্রোনাস অনমনীয় কাস্তে দিয়ে ইউরেনাসকে নপুংসক করেন, তখন ইউরেনাসের অন্ডকোষসহ জননাঙ্গটি সমুদ্রের যেখানে ফেলা হয়েছিলো, সেখানের ফেনা থেকে উত্থিত হয়েছিলেন দেবী আফ্রোদিতি, এজন্য আফ্রোদিতিকে বলা হয়ে থাকে “ফেনা থেকে উদ্ভূত”। এই সমুদ্র জন্মটি ঘটেছিলো সিথেরার অদূরে, সেখান থেকে ঝিনুকে করে আফ্রোদিতিকে ভাসিয়ে নেওয়া হয় সাইপ্রাসে। হেসিয়ডের এই বর্ণনা অনুযায়ী আফ্রোদিতি হচ্ছেন সবচেয়ে পুরানো অলিম্পিয়ান।

Birth of Aphrodite

আফ্রোদিতির জন্ম (শিল্পী- সান্দ্রো বোট্টিচেলি)

 

হোমার অবশ্য অন্য কথা বলেছেন। তিনি তার ইলিয়াডে লিখেছেন, আফ্রোদিতি হচ্ছেন জিউস এবং ডিয়নের সন্তান। ডিয়নে কে ছিলেন সেটা অবশ্য পরিষ্কার নয়। এপোলোডোরাস এক জায়গায় বলেছেন, ডিয়নে হচ্ছেন ইউরেনাস এবং গায়ার সন্তান। আবার অন্য জায়গায় বলেছেন ডিয়নে হচ্ছেন একজন নেরেইড (সমুদ্র দেবতা নেরেউস এবং ওসেনিড ডরিসের সন্তানদের নেরেইড বলা হয়)। হেসিয়ড ডিয়নে-কে একজন ওসেনিড (টাইটান ওসেনাস এবং টেথিসের তিন হাজার সমুদ্র নিম্ফ) হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।

Birth of Aphrodite

আফ্রোদিতির জন্ম (শিল্পী- উইলিয়াম এডলফে বোগিউরিউ, ১৮৭৯ সাল)

 

সিরিয়ান মিথেও আফ্রোদিতের জন্মকাহিনী আছে। সেখানে অবশ্য আফ্রোদিতির জন্ম হয়েছে ডিম থেকে। ডিমটি ছিলো ইউফ্রেটিস নদীতে, মাছ সেটিকে তীরে নিয়ে আসে এবং পেঁচা সেই ডিমের উপর বসে গরম করলে সেখান থেকেই আফ্রোদিতির জন্ম হয়।

আফ্রোদিতি, অ্যারিস এবং হেফাস্টাসের ত্রিমুখী প্রেমঃ

এরোস- ভালোবাসার আদি দেবতা। অনেকেই এই এরোসের সাথে আফ্রোদিতির ছেলে এরোস বা কিউপিডকে মিশিয়ে ফেলেন। আবার অনেকেই বলেন দুই এরোসই একই ব্যক্তি, হয়তোবা আদি দেবতা, নতুবা আফ্রোদিতির ছেলে। সে যাই হোক, এই মিথ অনুযায়ী এরোস হচ্ছেন আদি দেবতা। আর অ্যারিস হচ্ছেন যুদ্ধ দেবতা- জিউস এবং হেরার সন্তান। হোমার লিখেছেন, পিতা-মাতা উভয়ই অ্যারিসকে ঘৃণা করতেন। অ্যারিস ছিলেন খুনী, রক্তপিপাসু এবং মানুষের জন্য অভিশাপ, ছিলেন অনেকটা কাপুরুষ চরিত্রের। সেই তিনি একদিন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এসে ভালোবাসার আদি দেবতা এরোসের যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে উপহাস করতে লাগলেন। এরোস মনে মনে অন্য চিন্তা করে অ্যারিসের দিকে একটি জ্যাভলিন এগিয়ে ধরলেন। বললেন, “এটি খুব ভারী। চেষ্টা করো এটিকে ধরে রাখতে পারো কি না!” সেখানে ছিলেন আফ্রোদিতি, মুচকি হাসলেন তিনি। অ্যারিস জ্যাভলিন ধরতে গিয়ে বুঝতে পারলেন এটি কতো ভারী! তিনি অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন, “আহ! খুবই ভারী!” এরোস বললেন, “এটি রাখো, তোমার নিজের কাছে,” এবং সেই সময়েই আফ্রোদিতি এবং অ্যারিসকে পরস্পরের প্রেমাস্পদ করে দিলেন, একই সাথে ব্যবস্থা করলেন এমন এক ঘটনার যার জন্য একদিন সব দেবতাদের সামনে অ্যারিস উপহাসের পাত্র হবেন।

জিউস যখন নিজে নিজে এথেনাকে জন্ম দেন, সেটা দেখে ঈর্ষাকাতর হেরারও ইচ্ছা হয় কোনো পুরুষ দেবতা ছাড়া সন্তান জন্ম দেবার। তিনি এভাবে জন্ম দিলেন হেফাস্টাসের। কিন্তু সকল দেবতাদের মধ্যে একমাত্র তিনিই ছিলেন বিকলাঙ্গ এবং কুৎসিত, ছিলেন এক পা খোঁড়া। হেরা হেফাস্টাসের এই বিদ্ঘুটে রুপ দেখে অপমানে হতাশায় হেফাস্টাসকে স্বর্গ থেকে ছুড়ে ফেলে দিলেন। কেউ কেউ বলেন, হেরা নয়, জিউসই ছুড়ে ফেলেছিলেন। বীর একিলিসের মা থেটিস এবং ইউরিনোমে (থেটিসের আরেক বোন, যিনি কিনা জিউসের তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন) হেফাস্টাসকে উদ্ধার করে ওকেনোস নদীর তীরে লেমনস দ্বীপের এক গুহাতে লালন-পালন করেন, সেখানে হেফাস্টাস কাজ শিখতে শিখতে হোন দক্ষ কামার, দেবতাকুলের একমাত্র কামার। মা হেরার আচরনে ক্ষুদ্ধ হেফাস্টাস অলিম্পিয়ানদের জন্য বিভিন্ন উপহার পাঠান, যেগুলোর মধ্যে ছিলো হেরার জন্য একটি সোনার সিংহাসন। সেই সিংহাসনে বসা মাত্রই হেরা একেবারে লেগে গেলেন, আর উঠতে পারছিলেন না। তখন জিউস হেরাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তিনি হেফাস্টাসকে বললেন, আফ্রোদিতির সাথে হেফাস্টাসের বিয়ে দিবেন, যাতে করে হেফাস্টাস আবার স্বর্গে আসতে পারেন। আফ্রোদিতি এই বিয়েতে প্রথমে রাজী হলেন না, বরঞ্চ তার প্রেমিক অ্যারিসকে বললেন যুদ্ধে হেফাস্টাসকে পরাজিত করে হেরাকে মন্ত্র পড়া সিংহাসন থেকে উদ্ধার করতে।

অ্যারিস ঝড়ের বেগে হেফাস্টাসের কাছে ছুটে গেলেন, কিন্তু জ্বলন্ত ধাতুর আঘাত সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে গেলেন। দেবতা ডিওনিসুস তখন হেফাস্টাসের কাছে গিয়ে পরামর্শ দিলেন, হেফাস্টাস তখনই আফ্রোদিতিকে দাবি করতে পারবেন, যখন তিনি স্বেচ্ছায় হেরাকে সিংহাসন থেকে মুক্ত করবেন। হেফাস্টাস খুশি হয়ে ডিওনিসুসের পরামর্শ গ্রহন করলেন, তার সাথে স্বর্গে এলেন, হেরাকে সিংহাসন থেকে মুক্ত করলেন এবং অনিচ্ছুক ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতিকে বিয়ে করলেন। সুন্দরের সাথে অসুন্দরের মিলন ঘটলো এভাবেই।

কিন্তু ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি নিজেই বোধহয় বিয়ের শপথ ঠিকমতো উচ্চারণ করেননি! তাই হেফাস্টাসের সাথে তার বিয়ে সুখের হলো না। বিয়ের পরও তিনি অ্যারিসের সাথে গোপনে সম্পর্ক বজায় রাখলেন। একদিন আফ্রোদিতি গোপন অভিসারে অ্যারিসের প্রাসাদে গেলেন। প্রেমে মশগুল আফ্রোদিতি খেয়ালই করেননি কখন যে রাত শেষ হয়ে ভোর হতে শুরু করেছে! সূর্য দেবতা হেলিওস ততক্ষনে তার চ্যারিয়টে করে প্রতিদিনের প্রাতভ্রমনে বের হয়েছেন। তিনি যখন আকাশে উঠলেন, দেখতে পেলেন দুই প্রেমিক-প্রেমিকাকে ভালোবাসায় মত্ত। অলিম্পাসের সবাই জানতো আফ্রোদিতি খুবই স্বামী অনুগতা। হেলিওস তাই খুব অবাকই হলেন, কিন্তু কালবিলম্ব না করে তিনি হেফাস্টাসের কাছে ছুটে গেলেন এবং যা যা দেখেছেন সবকিছু খুলে বললেন।

Aphrodite and Aris

শিল্পীর তুলিতে আফ্রোদিতি এবং অ্যারিস

 

সবকিছু শুনে হেফাস্টাস প্রথমে খুব ব্যথিত হলেন। এরপর ক্ষুদ্ধ হয়ে তিনি একটি ব্রোঞ্জের জাল তৈরী করলেন এবং সেটিকে তাদের (হেফাস্টাস এবং আফ্রোদিতি) বাসর রাতের বিছানাতে গোপনে স্থাপন করলেন।

আফ্রোদিতি অ্যারিসের নিকট হতে এসে হেফাস্টাসকে বললেন তিনি অন্য একটা কাজে দূরে গিয়েছিলেন। আফ্রোদিতির কথা বিশ্বাস করলেন, এমন ভাব করে হেফাস্টাস বললেন, তিনিও অন্য একটি কাজে বেশ কিছুদিনের জন্য দূরে কোথাও যাবেন। হেফাস্টাস যখনই চলে গেলেন, তখনই আফ্রোদিতি অ্যারিসের কাছে খবর পাঠালেন। অ্যারিস সঙ্গে সঙ্গে এসে সেদিনের সন্ধ্যাটাকে রঙ্গীন করে তুলতে লাগলেন। তারা দুইজনই সুখীভাবে বিছানাতে গেলেন। কিন্তু হায়! সহসাই তারা আবিষ্কার করলেন, তারা ব্রোঞ্জের জালে আটকা পড়েছেন, কিছুতেই সেখান থেকে মুক্ত হতে পারছেন না। ঠিক এমন সময়ই হেফাস্টাস এলেন এবং দেখলেন তার পাতা ফাঁদে আটকা পড়েছেন আফ্রোদিতি এবং অ্যারিস- সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়।

Cartoon- Aphrodite and Aris

কার্টুন- হেফাস্টাসের জালে বন্দী আফ্রোদিতি এবং অ্যারিস

 

এই প্রেমিক যুগলকে আরো অপমান, অপদস্ত করার জন্য হেফাস্টাস অন্যান্য দেবতাদের ডেকে আনলেন এবং সবাইকে দেখাতে লাগলেন নিষিদ্ধ প্রেমের দৃশ্য। সমস্ত দেবতারা তাড়িয়ে তাড়িয়ে আফ্রোদিতিকে দেখতে লাগলেন (এভাবেই আদি দেবতা এরোসের যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে করা উপহাসের জবাব পেলেন অ্যারিস)। দেবতা এপোলো হার্মিসকে একান্তে বলতে লাগলেন, “আমি বাজি ধরতে পারি, তুমি যদি অ্যারিসের জায়গায় হতে, খুব একটা কিছু মনে করতে না!” হার্মিস মুচকি হেসে জবাব দিলেন, “বার বার যদি আফ্রোদিতির সাথে আমি এইভাবেই জালে আটকা পড়ি, আর সব দেবতা যদি দেখতেও থাকে, আমি কখনই কিছু মনে করবো না!” কিন্তু এই পুরো ব্যাপারটিতেই দেবরাজ জিউস কিছুটা বিরক্ত হলেন।

ব্রোঞ্জের জালে বন্দী আফ্রোদিতি এবং অ্যারিস, দেবতারা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন!

ব্রোঞ্জের জালে বন্দী আফ্রোদিতি এবং অ্যারিস, দেবতারা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন!

 

হেফাস্টাস বলতে লাগলেন যতক্ষণ না পর্যন্ত জিউস আফ্রোদিতিকে হেফাস্টাস বিয়ে উপলক্ষে যেসব উপহার দিয়েছিলেন, সেগুলো ফেরত না দিবেন, ততক্ষন পর্যন্ত জাল থেকে এই প্রেমিক যুগলকে মুক্ত করবেন না। প্রবীন এবং প্রাজ্ঞ জিউস এই পারিবারিক কোন্দলে নিজেকে জড়াতে চাইলেন না, কিন্তু একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারকে সবার সামনে এইভাবে উন্মুক্ত করার জন্য হেফাস্টাসকে তিরস্কার করলেন।
সমুদ্র অধিপতি পসাইডন ততক্ষনে আফ্রোদিতির অপার সৌন্দর্যে সম্পূর্ণরুপে বিমোহিত। তিনি চিন্তা করলেন আফ্রোদিতির দৃষ্টি আকর্ষনের এই সুযোগ। হেফাস্টাসের পক্ষ নেবার ভান করে পসাইডন বললেন, “জিউস কেনো উপহারগুলো ফেরত দিবে? বরঞ্চ এই ন্যাক্কারজনক কাজের জন্য দায়ী অ্যারিসকেই উপহারগুলো ফেরত দিতে হবে”।

হেফাস্টাস শর্তাধীনে রাজি হলেন। তিনি বললেন, “যদি অ্যারিস উপহারগুলো ফেরত না দেয়, তাহলে পসাইডনকেই জালে বন্দী হয়ে থাকতে হবে”। তাড়াহুড়ো না করে ধীরে সুস্থে পসাইডন বললেন, “আমি বিশ্বাস করি, অ্যারিস সেরকম করবে না। কিন্তু যদি সামান্যতম সম্ভাবনাও থাকে, তাহলে আমি পসাইডন, সমুদ্র রাজ, প্রতিজ্ঞা করছি, আমিই আফ্রোদিতিকে বিয়ে করে উপহারগুলো হেফাস্টাসকে ফেরত দিবো”। পসাইডনের এই কথা শুনে এপোলো আর হার্মিস হো হো করে হেসে উঠলেন, তাদের আর পসাইডনের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে বাকী রইলো না!

অ্যারিসকে মুক্তি দেওয়া হলো। আফ্রোদিতি পাফোস নামক এক জায়গায় গেলেন কিছু সামুদ্রিক রীতির মাধ্যমে নিজের সতীত্ব পুনরুদ্ধার করতে! কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর অ্যারিস উপহারগুলো দিতে অস্বীকার করলেন। এক পর্যায়ে হেফাস্টাস নিজেও সবকিছু ভুলে গেলেন, আফ্রোদিতিকে ক্ষমা করে দিলেন। কারণ, এই কুৎসিত অসুন্দর কিন্তু কর্মঠ কামার দেবতা সত্যিকার অর্থেই আফ্রোদিতিকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা হলো না!

হেফাস্টাসের সাথে আফ্রোদিতির বিচ্ছেদ হয়। সেই সময়েই হেফাস্টাস এক পর্যায়ে এথেনাকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেছিলেন। হার্মিস আফ্রোদিতির অপার সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছিলেন বলে আফ্রোদিতি একরাত হার্মিসের সাথে কাটিয়েছিলেন। তাদের মিলনের ফলে জন্ম নিয়েছিলেন হার্মাফ্রোডাইটাস- অর্ধেক নারী, অর্ধেক পুরুষ (পৃথিবীর প্রথম হিজড়া?)। পসাইডনকেও বিমুখ করেননি আফ্রোদিতি। জালের বন্দীত্ব থেকে মুক্ত করার কৃতজ্ঞতাস্বরুপ আফ্রোদিতি পসাইডনের সাথেও একরাত থাকলেন। তাদের মিলনের ফলে জন্ম নিলেন দুইজন পুত্র সন্তান –রোডাস এবং হিরোফিলাস। মিথে দেখা যায়, ট্রয়ের যুদ্ধের সময় আফ্রোদিতি অ্যারিসের স্ত্রী ছিলেন। তাদের কয়েকজন সন্তানেরও জন্ম হয়, এদের মধ্যে একজন ছিলেন হারমোনিয়া। এই হারমোনিয়ার উপরেই হেফাস্টাস তার প্রতি আফ্রোদিতির অকৃতজ্ঞতার প্রতিশোধ নেন (হারমোনিয়ার কাহিনী বিস্তারিতভাবে পরে আছে)। তাদের আরেক সন্তান ছিলেন এরোস (অনেকে একে ভালোবাসার আদি দেবতা বলেন, কিন্তু রোমানরা বলেন কিউপিড, এরোসের কাহিনীও কিউপিড এবং সাইকী পর্বে বিস্তারিত থাকবে)।

এত ঘটনার পরও আফ্রোদিতি আবার একদিন এক গভীর প্রেমে পড়লেন, এবার এক অসম্ভব সুদর্শন মানবের- অ্যাডোনিস।

গ্রীক মিথলজি ১০ (এথেনার গল্পকথা- দ্বিতীয়/শেষ পর্ব)

মেডুসা – গ্রীক মিথলজির এক আকর্ষন। গ্রীক মিথলজির কোনো আলোচনাই মেডুসা ছাড়া শেষ করা সম্ভব নয়।  টাইফোয়িয়াসের কথা মনে আছে? যার সাথে দেবতাদের বিশাল এক যুদ্ধ হয়েছিলো? সেই বিশাল দানব টাইফোয়িয়াস বিয়ে করেছিলেন অর্ধেক সাপ, অর্ধেক মানবী এচিডনে-কে। তাদের তিন মেয়ে ছিলো, যারা গর্গন নামে পরিচিত ছিলেন, এদের মধ্যে একজন ছিলেন মরণশীল, তিনিই হচ্ছেন মেডুসা। কেউ কেউ বলে থাকেন, মেডুসা প্রথমে গর্গন ছিলেন না, তিনি খুব সুন্দরী ছিলেন, তার বাবা মা ছিলেন ফোরকিস এবং কিটো।

এক মিথে দেখা যায়, মেডুসা অনেক অনেক উত্তরে বসবাস করতেন এবং কখনো সূর্যের আলো দেখেন নি। তিনি এথেনার কাছে অনুমতি চাইলেন দক্ষিণে আসতে। কিন্তু এথেনা অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালে মেডুসা রাগান্বিত হয়ে বলেন, “এথেনা আমাকে দক্ষিণে আসতে দিতে চায় না, কারণ আমি তার চেয়ে অনেক সুন্দরী!” ক্ষুদ্ধ এথেনা মেডুসার সৌন্দর্য্যই শুধু দূর করলেন না, তাকে এতো কুৎসিতে রুপান্তরিত করলেন যে, যে কোন মানব বা প্রানী তার দিকে তাকালেই পাথরে পরিণত হয়ে যেতো।

Medusa

শিল্পীর তুলিতে মেডুসা

অন্য এক মিথে আছে, মেডুসার সৌন্দর্য্য এতো বেশী ছিলো যে, অনেক পুরুষ তাকে কামনা করতো। কিন্তু তিনি এথেনার মন্দিরে পুরোহিতানীর কাজ করতেন। তার দীঘল সোনালী চুল এবং সৌন্দর্য্য সমুদ্র দেবতা পসাইডনের মনে কাম-বাসনা জাগ্রত করে। শেষ পর্যন্ত মেডুসা এবং পসাইডন এথেনার মন্দিরেই সঙ্গমে লিপ্ত হোন (মন্দিরের ভিতরে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়াটা দেবতারা খুবই অপছন্দ করতেন, এটা ছিলো অপরাধের শামিল, অথচ পসাইডন নিজে ছিলেন একজন প্রধান দেবতা!)। এটা ঠিক জানা যায়নি, পসাইডন মেডুসার শ্লীলতাহানি করেন, না কি, মেডুসাই প্রথমে পসাইডনকে প্রলুদ্ধ করেন। সে যাই হোক, মেডুসা গর্ভবতী হোন এবং এথেনা যখন এই কাহিনী জানতে পারেন, তিনি খুবই ক্ষুদ্ধ হোন। মেডুসার চুলকে পরিণত করেন সাপে, শরীরকে ড্রাগনে এবং যেই মেডুসার মুখ দেখবে তাকেই  পরিণত করেন পাথরে। পরবর্তীতে মেডুসাকে হত্যা করেন গ্রীক বীর পারসিউস, সেটাও দেবী এথেনার সাহায্যেই।

অনেক অনেক আগে গ্রীসের আর্গসে এক্রিসিয়ুস নামে এক রাজা ছিলেন। এক্রিসিয়ুসের কোনো পুত্র সন্তান ছিলো না, ছিলো এক কন্যা সন্তান ড্যানি। এক্রিসিয়ুসের আর কোন পুত্র সন্তান না হওয়াতে তিনি ডেলফিতে যান ভবিষ্যত জানার জন্য। সেখানে গিয়ে এক্রিসিয়ুস জানতে পারেন, তার কোনো পুত্র সন্তান জন্মাবে না। উপরন্তু তার কন্যা সন্তান ড্যানি এমন এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিবেন, যিনি তাকে (এক্রিসিয়ুস) হত্যা করবেন। তাই এক্রিসিয়ুস ড্যানিকে বন্দী করে রাখলেন। কিন্তু নিয়তির বিধান কে খন্ডাবে? শেষ পর্যন্ত জিউসের ঔরসে ড্যানির গর্ভে এক পুত্র সন্তান জন্ম নেয়- তিনিই হচ্ছেন পারসিউস। (পারসিউসের জন্ম কাহিনী বিস্তারিতভাবে পারসিউস পর্বে থাকবে।)

রাজা এক্রিসিয়ুস ড্যানি এবং পারসিউসকে এক বিরাট কাঠের সিন্দুকে বন্দী করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিলেন। তারা গিয়ে পৌঁছালেন সেরিফোস নামের এক দ্বীপে। অনেক বছর পর সেই দ্বীপেরই রাজা পলিডিকটিস যুবক পারসিউসকে বললেন মেডুসার মাথা এনে দিতে। এই অভিযানে এথেনা বিভিন্নভাবে পারসিউসকে সাহায্য করেন (বিস্তারিত পারসিউস পর্বে থাকবে)। বহু কষ্ট করে পারসিউস যখন তিন গর্গন বোনের কাছে যান, তখন এথেনা চিনিয়ে দিলেন এদের মধ্যে কে মেডুসা। এরপর এথেনা এই পর্যায়ে পারসিউসকে তার বক্ষাবরনী হিসেবে ব্যবহৃত ব্রোঞ্জের পাতটি দিলেন, এবং বললেন, “যখন তুমি মেডুসাকে আক্রমন করবে তখন এই স্বচ্ছ পাতের দিকে তাকাবে। তুমি তাকে এর মাঝে দেখতে পাবে, যেমনটি দেখা যায় আয়নার মধ্যে। এবং এভাবেই তুমি এর ভয়ংকর ক্ষমতাটি- পাথরে পরিণত হওয়া, এড়িয়ে যেতে পারবে”। বলা হয়ে থাকে, মেডুসার কাটা মাথাটা পরবর্তীতে এথেনার ঢালে লাগানো হয়েছিলো।

Medusa slayed by Persius

পারসিউস মেডুসার মাথা কেটে ফেলেছেন

মেডুসাকে যখন পারসিউস হত্যা করছিলেন, সেই সময়ে মেডুসা পসাইডনের সন্তান গর্ভে ধারন করছিলেন। তাই পারসিউসের ফেরার পথে মেডুসার মাথার এক ফোঁটা রক্ত ওয়ালেট (যেটাতে করে মাথাটি পারসিউস নিয়ে আসছিলেন) থেকে যখন সাগরে পড়ে, সেখান থেকে তখন জন্ম হয় পেগাসাসের- ডানা যুক্ত ঘোড়া।

বেলেরোফোন ছিলেন করিন্থের রাজা গ্লকাসের পুত্র, ছিলেন সুদর্শন এবং সাহসী। লোকে বলতো, বেলেরোফোনের আসল বাবা ছিলেন পসাইডন (জিউসের চেয়ে কম ছিলেন না পসাইডন!), এবং মা ছিলেন ইউরিনমি। ইউরিনমি যদিও মরণশীল ছিলেন, তবুও দেবী এথেনা তাকে এমন সুশিক্ষা দিয়েছিলেন যেতিনি জ্ঞানে এবং বুদ্ধিমত্তায় হয়ে উঠেছিলেন দেবতাদের সমকক্ষ। তারই সন্তান ছিলেন বেলেরোফোন।

বেলেরোফোন চেয়েছিলেন এক অত্যাশ্চর্য ঘোড়ার মালিক হতে, আর সেই ঘোড়াটিই হচ্ছে পেগাসাস, মেডুসার রক্ত থেকে যার জন্ম। সেই পেগাসাসকে পোষ মানানোর জন্য বেলেরোফোন ছুটে গেলেন করিন্থের বৃদ্ধ তপস্বী পলিইডাসের কাছে। পলিইডাস তাকে বললেন, “দেবী এথেনার মন্দিরে যাও, সেখানে গিয়ে রাতে ঘুমাও। দেবতারা অনেক সময় স্বপ্নে মানুষের সাথে কথা বলেন”। বেলেরোফোন এথেনার মন্দিরে এসে রাতে ঘুমালেন। যখন গভীর ঘুমে মগ্ন তখন দেবী এথেনা স্বপ্নে এলেন, তার হাতে ছিলো সোনালী একটি জিনিস। তিনি বেলেরোফোনকে বললেন, “উঠ যুবক, আমার হাতের জিনিসটি নাও, এটি পেগাসাসকে পোষ মানাতে সাহায্য করবে”। ঘুম ভেঙ্গে গেলো বেলেরোফোনের। কিন্তু কোনো দেবীকে দেখতে পেলেন না, বরঞ্চ সামনে পড়ে থাকতে দেখলেন একটি সোনালী লাগাম। এভাবে এথেনা বেলেরোফোনকে সাহায্য করলেন পেগাসাসকে পোষ মানাতে। (বেলেরোফোনের বিস্তারিত কাহিনী পরবর্তীতে বেলেরোফোন পর্বে থাকবে।) 

Pegasus with Belerophon

বেলেরোফোন পেগাসাসকে পোষ মানাচ্ছেন

গ্রীক বীর হারকিউলিসের চাচাতো ভাই ছিলেন রাজা ইউরিস্থিয়াস। এক পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য হারকিউলিসকে বারোটি শ্রম করতে বলেন ইউরিস্থিয়াস। ইউরিস্থিয়াস সিদ্ধান্ত নিলেন হারকিউলিসের প্রথম শ্রম হবে এক অবোধ্য সিংহ, যেটা নিমিয়ার (গ্রীসের দক্ষিন-পূর্ব দিকের উপত্যকা) আশেপাশের অঞ্চলে ত্রাসের সৃষ্টি করেছে সেটাকে খুন করা। তিনি নিমিয়াতে গিয়ে সিংহকে খুঁজে বের করে খালি হাতে সিংহের শক্তিশালী থাবা উপেক্ষা করে সিংহের শ্বাসনালী শক্ত করে চেপে ধরলেন, যতক্ষন না পর্যন্ত সিংহটি শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়।

Hercules and Nimean Lion

হারকিউলিস নিমিয়ান সিংহকে হত্যা করছেন

সিংহটিকে মারার পর এর চামড়া ছাড়াতে গিয়ে প্রচন্ড বিপদে পড়েন হারকিউলিস। তিনি বার বার চেষ্টা করতে লাগলেন, কিন্তু প্রত্যেকবারই ব্যর্থ হলেন। এক পর্যায়ে যখন হতাশ হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন দেবী এথেনা এক বৃদ্ধা মহিলার ছদ্মবেশে এসে হারকিউলিসকে বললেন, “সিংহের চামড়া ছাড়াবার জন্য এর ধারাল নখর ব্যবহার করো”। হারকিউলিস বৃদ্ধা মহিলারুপী দেবী এথেনার উপদেশ মতো খুব সহজেই সিংহের চামড়া ছাড়িয়ে নেন এবং এই চামড়া গায়ের উপর পরে নেন।

এথেনা আবার হারকিউলিসকে সাহায্য করেন ষষ্ঠ শ্রমের সময়। এই বার হারকিউলিস স্টিমফালাস নামের এক দেশে যান, যেখানকার মানুষেরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো এক ধরণের পাখির আক্রমনে। ঝাঁকে ঝাঁকে লাখে লাখে সেই পাখি বিরান করে তুলছিলো পুরো জনপদ এবং শস্যক্ষেত্র। হারকিউলিস প্রথমবার এই পাখিদেরকে হত্যা করতে ব্যর্থ হলেন। তখন সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন দেবী এথেনা। তিনি তামা নির্মিত অসংখ্য ঝুনঝুনি দিয়ে শব্দ করতে লাগলেন, যাতে ভয় পেয়ে পাখিগুলো আকাশে বের হয়ে আসছিলো, সেই সুযোগে হারকিউলিস তীর ধনুক দিয়ে প্রতিটি পাখিকে হত্যা করছিলো। এভাবেই এথেনা দুই দুইবার হারকিউলিসকে সাহায্য করেছিলেন। 

Hercules and the Stymphalian Birds

হারকিউলিস স্টিমফালাস পাখিদের হত্যা করছেন, পাশে দাঁড়ানো দেবী এথেনা

টিরেসিয়াস ছিলেন থিবসের ত্রিকালদর্শী ভবিষ্যতবক্তা। কিন্তু তার এই ভবিষ্যত বলার ক্ষমতা এমনি এমনি আসেনি, এসেছে এক হৃদয় বিদারক ঘটনার মাধ্যমে।

টিরেসিয়াসের বাবা ছিলেন রাখাল এভেরেস এবং মা ছিলেন নিম্ফ ক্যারিক্লো। নিম্ফ ক্যারিক্লো একদিন দেবী এথেনার সাথে গোসল করছিলেন। সেই সময়ে কোনো এক কাজে হঠাৎ করে টিরেসিয়াস সেই জায়গায় এসে পড়েন। তিনি এথেনাকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় দেখে ফেলেন। এথেনাকে নগ্ন অবস্থায় দেখে টিরেসিয়াসের কি অনুভূতি হয়েছিলো সেটা জানা না গেলেও, এতে প্রচন্ড ক্ষুদ্ধ হয়ে এথেনা  তাকে অন্ধ করে দেন, যাতে তিনি আর কখনই কিছু দেখতে না পান। মা ক্যারিক্লো ছেলের এই পরিণতি সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি এথেনার কাছে দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দেবার জন্য অনেক কাকুতি-মিনতি করতে লাগলেন। অবশেষে এথেনার মন কিছুটা নরম হলে তিনি বলেন, “আমি যে শাস্তি দিয়েছি, তা ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তবে আমি টিরেসিয়াসকে ভবিষ্যত বলার অসাধারণ ক্ষমতা দিচ্ছি”। এই ভাবে এথেনা টিরেসিয়াসের দৃষ্টি শক্তি নষ্ট করে ফেলার ক্ষতিপূরণ করলেন!

টিরেসিয়াসের অন্ধ হওয়া নিয়ে আরেকটি দুর্দান্ত মিথ আছে, যদিও এটি এথেনার সাথে সম্পর্কিত নয়। মিথটি দেবী হেরার সাথে সম্পর্কিত। একদিন পেলোপোননেসের কাইল্লেনে পাহাড়ে টিরেসিয়াস হাঁটছিলেন। তিনি হঠাৎ দেখতে পেলেন একজোড়া সাপ সঙ্গমের নিমিত্তে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। টিরেসিয়াস তার হাতের লাঠি দিয়ে সাপ জোড়াকে আঘাত করে সঙ্গমে ব্যাঘাত ঘটালেন। স্বর্গে বসে দেবী হেরা পুরো ঘটনাটি দেখলেন। তিনি ঘটনাটি দেখে খুশি হতে পারলেন না। টিরেসিয়াসকে এমন অদ্ভুত এক শাস্তি দিলেন, যেটা অকল্পনীয়। তিনি টিরেসিয়াসকে মননে এবং শরীরে এক নারীতে রুপান্তরিত করে দিলেন। সাত বছর পর টিরেসিয়াস আবার এক জোড়া সাপকে মিলনরত অবস্থায় দেখলে, এবার আর আঘাত করলেন না। হেরা তখন খুশি হয়ে তাকে আবার পুরুষে পরিণত করেন।

Tiresius

টিরেসিয়াস একজোড়া সঙ্গমরত সাপকে লাঠি দিয়ে আঘাত করছেন

এই পর্যন্ত সবকিছুই ঠিক ছিলো। বেঠিকটা করলেন দেব্রাজ জিউস। একদিন জিউসের সাথে হেরার তর্ক শুরু হলো – পুরুষ ও নারীর মধ্যে কে সবচেয়ে বেশী যৌন আনন্দ পায়? বুদ্ধিমতী হেরা জিউসকে বুঝালেন এই ক্ষেত্রে পুরুষই শ্রেষ্ঠ। কিন্তু জিউসের আগ্রহে সিদ্ধান্ত হলো এই ব্যাপারে টিরেসিয়াসকে জিজ্ঞেস করার, কারণ একমাত্র সেই দুই ভূমিকাতেই ছিলো। টিরেসিয়াস হেরার নিষেধের ইঙ্গিত সত্ত্বেও বলে ফেললেন, “পুরুষ আর নারীর দুইজনের যদি শরীরের দশটি অংশ থাকে, যার মাধ্যমে তারা যৌন আনন্দ পেয়ে থাকে, তাহলে তার মধ্যে নয়টি অংশ নারীর এবং একটি অংশ পুরুষের!” নারীর গোপন তথ্য ফাঁস করে দেওয়াতে হেরা টিরেসিয়াসের উপর এতো ক্ষুদ্ধ হলেন যে, তাৎক্ষনিকভাবে টিরেসিয়াসকে আঘাত করে অন্ধ করেন। ব্যাপারটি এতো দ্রুত ঘটে গিয়েছিলো, জিউসের কিছুই করার ছিলো না। তাই জিউস ক্ষতিপূরণ হিসেবে টিরেসিয়াসকে ভবিষ্যত বলার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। 

এথেনার গল্পকাহিনী পর্বটি শেষ করতে যাচ্ছি তিনটি ছোট ছোট কাহিনী দিয়ে। লেসবস নামে এক জায়গা ছিলো। অনেক অনেক বছর আগে সেই লেসবসের রাজা ছিলেন ইপোপিয়াস। ইপোপিয়াসের এক কন্যা ছিলেন, নিকটেমেনে। নিকটেমেনে ছিলেন অসম্ভব সুন্দরী এক মেয়ে। আশে পাশের সব জায়গায় নিকটেমেনের সৌন্দর্য্যের কাহিনী ছড়িয়ে পড়ে।

নিকটেমেনের জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে আনে তার এই অসাধারণ রুপ। একদিন নিকটেমেনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার বাবা ইপোপিয়াসের কী যেনো কী হয়ে গেলো। প্রচন্ড কাম-বাসনায় নিজের মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন ইপোপিয়াস। এক পর্যায়ে ইপোপিয়াস নিজের মেয়ে নিকটেমেনের সাথে সঙ্গমও করলেন। লজ্জায়, ঘৃনায় নিকটেমেনে বনে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। নিকটেমেনেকে দেখে দেবী এথেনার মন আদ্র হয়ে উঠে। তিনি নিকটেমেনেকে পেঁচায় পরিণত করেন। সেই থেকে পেঁচা দিনের আলোয় কখনো সামনে আসে না (তারমানে এখনো পেঁচারুপী নিকটেমেনে তার বাবার কাজের জন্য লজ্জা পেয়ে যাচ্ছে!) 

ডিডেলাস ছিলেন এথেন্সের খুব নামকরা স্থপতি। তার নাম এবং যশ-দুইই ছড়িয়ে পড়েছিলো দূর থেকে দূরে। বলা হয়ে থাকে, ডিডেলাস সম্ভবত এই স্থাপত্যবিদ্যা শিখেছিলেন স্বয়ং দেবী এথেনার নিকট হতে। ডিডেলাসের এক ভাগ্নে ছিলো, নাম ছিলো তার পারডিক্স (কেউ কেউ অবশ্য বলে থাকেন টালোস)। পারডিক্সের বয়স যখন বার বছর, তখন পারডিক্সের মা পারডিক্সকে কাজ শেখার জন্য ডিডেলাসের কাছে পাঠালেন। পারডিক্স ছিলেন প্রচন্ড প্রতিভাধর, ধারণা করা হচ্ছিল এই বিদ্যায় তিনি ডিডেলাসকেও ছাড়িয়ে যাবেন, আবিষ্কার করলেন সুঁই। মানুষের মন বোধহয় কখনই তার চেয়ে বড় কাউকে দেখতে চায় না। ডিডেলাসও সেই একই স্বভাবের মানুষ ছিলেন। পারডিক্সের প্রতিভায় ঈর্ষান্বিত হয়ে একদিন এক্রোপলিশ ভ্রমন করার সময় এর প্রান্ত থেকে ঢাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেন। কিন্তু মাটিতে পড়ার আগেই দেবী এথেনা পারডিক্সকে পাখিতে রুপান্তরিত করে দেন। (ইকারুস এবং ডিডেলাসের কাহিনী পরে বিস্তারিত বলা হবে।) 

এথেনার গল্পকথা শুরু হয়েছিলো পালাসকে দিয়ে যাকে হঠাৎ রাগের মাথায় দুর্ঘটনাবশত এথেনা হত্যা করেছিলেন, পরে ভীষন অনুতপ্ত হয়েছিলেন। এথেনার গল্পকথা শেষও করছি এথেনা কর্তৃক আরেকটি দুর্ঘটনাজনিত হত্যা দিয়ে।

আয়োডামা ছিলেন এথেনার মন্দিরের পুরোহিতানী। একদিন গভীর রাতে আয়োডামা মন্দিরের চত্বরে এক কাজে বেরিয়ে ছিলেন, ঠিক সেই সময়ে সেখানে দেবী এথেনাও ছিলেন এবং তার ঢালে ছিলো মেডুসার কাটা মাথা। আয়োডামা কিছু বুঝে উঠার আগেই ঢালের দিকে তাকিয়েছিলেন, এবং সঙ্গে সঙ্গে পাথরে পরিণত হলেন।

(ট্রোজান যুদ্ধে দেবী এথেনার বিশাল ভুমিকা নিয়ে ট্রোজান যুদ্ধের পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।) 

 

গ্রীক মিথলজি ৯ (এথেনার গল্পকথা- প্রথম পর্ব)

(১)

মিথ অনুযায়ী এথেনার জন্ম হয় ট্রিটন নদীর তীরে। এই ট্রিটন একজন নদী দেবতা। তারো এক মেয়ে ছিলো, নাম পালাস। পালাস এবং এথেনা একসাথেই খেলাধূলা করতেন, বিশেষ করে যুদ্ধের বিভিন্ন কলা- কৌশল রপ্ত করতেন। একদিন এক বিষয় নিয়ে দুই বান্ধবীর মধ্যে ঝগড়া শুরু হয় এবং পালাস এথেনাকে আক্রমন করতে উদ্যত হয়। জিউস সবকিছু দেখছিলেন। তার প্রিয় সন্তানের এই অবস্থায় তিনি তার দুর্ভেদ্য ঢাল দিয়ে এথেনাকে রক্ষা করেন। ঘটনার আকস্মিতায় পালাস চমকে উঠে। এই সুযোগে এথেনা পালাসকে আঘাত করেন এবং আহত করে হত্যা করেন। যখন পালাস মারা যায়, এথেনা বুঝতে পারেন কী সর্বনাশা কাজ তিনি করেছেন। প্রচন্ড রকম অনুতপ্ত হোন। পালাসের একটি কাঠের মূর্তি বানিয়ে সেটিকে তিনি নিজের ঢালে প্রতিস্থাপন করেন। জিউস তখন সেটিকে পৃথিবীর দিকে নিক্ষেপ করলে, ঢালটি ট্রয়ের কোনো এক অংশে পতিত হয়, তখন থেকেই এথেনা জিউসের ঢাল ব্যবহার করতেন। একমাত্র এথেনারই এই অধিকার ছিলো। পালাসকে স্মরণ করার জন্য এথেনা নিজের নামের আগে পালাস শব্দ ব্যবহার করলে, এথেনার পুরো নাম হয় পালাস এথেনা।

(২)

বলা হয়ে থাকে এথেনা বাঁশি, ভেঁপু, পোড়ামাটির বাসনপত্র, লাঙ্গল, মই, ষাঁড়ের জোয়াল, ঘোড়ার লাগাম, রথ, জলযান- এই জিনিসগুলি আবিষ্কার করেছেন। আরো বলা হয়ে থাকে মেয়েদের বিভিন্ন কলা –কৌশল, যেমন রান্না করা, বয়ন করা, চরকা কাটা ইত্যাদি জিনিস এথেনাই শিখিয়েছেন।

উত্তর গ্রীসের ছোট্ট একটি শহর লিডিয়া। সেখানে বাস করতেন এক সুন্দরী মানবী, এরাকনি। এরাকনি নাম সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিলো তার সৌন্দর্য্যের জন্য নয়, তার বয়ন এবং তাঁতের কাজের জন্য। সে এতো সুন্দর করে কাপড় বুনতো এবং সেলাইয়ের কাজ করতো, সেটা দেখার জন্য নিম্ফরা পর্যন্ত তাদের ঝর্না ছেড়ে এরাকনির বাড়িতে বসে থাকতো।

Erachni

শিল্পীর তুলিতে এরাকনি বয়ন করছেন

 

তারা দেখতো, এরাকনি পশম সংগ্রহ করছেন এর কঠিন অবস্থা থেকে, এবং সেখান থেকে রোলে পরিণত করতেন। এরপর তার নখ দিয়ে একে যতক্ষন না পর্যন্ত মেঘের মতো নরম এবং হালকা হচ্ছে, ততক্ষন পর্যন্ত পেজঁ করতেন। সুতাকাটার টাকুকে পাকাতেন দক্ষ হাতে অথবা নকশা বুনতেন এবং নকশা বোনার পর সুচ-সুতা দিয়ে আরো সুশোভিত করতেন। নিম্ফের মধ্যে একজন বলে উঠলেন, “এরাকনি নিশ্চয়ই এই কাজ দেবী এথেনার কাছ থেকেই শিখেছেন!”

এরাকনি কথাটা শুনলেন, কিন্তু ইতোমধ্যে অহংকারী হয়ে উঠা এরাকনি নিম্ফের কথাটা অস্বীকার করলেন। উদ্ধত কন্ঠে বলে উঠলেন, “এথেনা পারলে আমার মতো কাজ করে দেখাক। যদি সে আমাকে পরাজিত করে, তাহলে আমি যে কোন শাস্তি মাথা পেতে নিবো”।

এথেনা এই কথা শুনলেন। তিনি খুব হতাশ হলেন। এক বৃদ্ধা মহিলার ছদ্মবেশে এরাকনির বাড়িতে এসে তাকে বললেন, “আমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং আশা করি তুমি আমার উপদেশ শুনবে। তুমি তোমার কাজ নিয়ে পৃথিবীর যে কোনো মানবীর সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারো, কিন্তু কখনো একজন দেবীর সাথে করো না। বরঞ্চ, তুমি এথেনার কাছে তোমার কথার জন্য ক্ষমা চাও, তিনি অতি দয়ালু, নিশ্চয়ই তোমাকে ক্ষমা করবেন”।

এরাকনি তখন বয়ন করছিলেন। তিনি বয়ন করা থামিয়ে দিয়ে খুব রাগান্বিত হয়ে বৃদ্ধা মহিলার দিকে তাকালেন, “তোমার উপদেশ তোমার কাছেই রাখো, খুব বেশি হলে তোমার মেয়েদেরকে দিও। আমাকে কোনো উপদেশ দেবার দরকার নেই। আমি যা বলি, তার জন্য লড়তে প্রস্তুত আছি। এমনকি এর জন্য আমি এথেনাকেও ভয় পাই না। সে যদি খুব বড় বয়নকারীই হয়, তাহলে তাকে আমার সাথে প্রতিযোগিতা করতে বলো!”

“তিনি এসে গেছেন”, এই কথা বলেই এথেনা তার ছদ্মবেশ খুলে ফেললেন। সেখানে উপস্থিত সকল নিম্ফরা সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু গেড়ে বসে সম্মান জানালেন এবং অন্যান্য মানব-মানবীরাও যথাযথভাবে এথেনাকে সম্মান দিলেন, একমাত্র এরাকনিই ভয়হীনভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি অবশ্য এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় লজ্জায় পড়ে গেলেন, কিন্তু তার কথা থেকে একচুলও নড়লেন না! এথেনা আর দেরীও করলেন না, কোনো উপদেশও দিলেন না। তারা দুইজনই প্রতিযোগিতার জন্য তৈরী হতে লাগলেন।

তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গায় অবস্থান নিলেন এবং কড়িকাঠের সাথে বয়ন করার সুতা সংযুক্ত করলেন। এরপর তারা কাপড় বোনার লিকলিকে মাকুকে সুতার বাইরে এবং ভিতর দিয়ে আনা-নেওয়া করতে লাগলেন। প্রত্যেকেই খুব দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে কাজ করতে লাগলেন। এরাকনি তার বোনার মধ্যে জিউসের সাথে লেডা, আর ইউরোপার পরকীয়া ফুটিয়ে তুলতে লাগলেন, আরো ফুটিয়ে তুললেন অন্যান্য দেবতাদের মরণশীলদের সাথে পরকীয়ার কাহিনী। অন্যদিকে, এথেনা দেবতাদের প্রশস্তিগাঁথা বানাতে লাগলেন, ফুটিয়ে তুললেন পসাইডনের সাথে এটিকা নিয়ে যুদ্ধের কাহিনী।

সবাই যখন এরাকনির কাজ দেখলো, মুগ্ধ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। এতো সুন্দর! এতো অদ্ভুত! তারা ভাবলো, এমনকি দেবী এথেনাও এতো সুন্দর নকশা বানাতে পারবেন না। কিন্তু তারা যখন এথেনার কাজের দিকে তাকালেন, তাদের আর কিছুই বলার ছিলো না। এতো সুন্দর কাজ পৃথিবীর কারো পক্ষে কখনো সম্ভব নয় বলে একবাক্যে সবাই রায় দিলেন। কিন্তু এই পরাজয় এরাকনি মানতে পারলেন না। অন্যদিকে এরাকনির কাজে দেবতা জিউসকে অপমান করা হয়েছে, এই চিন্তা করে এথেনা রাগান্বিত হয়ে এরাকনিকে আঘাত করলেন, তার বুনন যন্ত্র, তাঁত সবকিছুই ধ্বংস করে দিলেন এবং সবশেষে এরাকনিকে মাকড়সায় পরিণত করলেন এবং সেই থেকে মাকড়সা শুধুই জাল বুনে যাচ্ছে এবং সবাইকে এরাকনির নির্বুদ্ধিতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ বলে থাকেন, এরাকনি হতাশায় আত্মহত্যা করেছিলেন। তখন এথেনা তাকে জীবিত করে মাকড়সায় পরিণত করেছিলেন।

Athena attacked Erachni

রেনে এন্তনিয়োও ১৭০৬ সালে আঁকা ‘এথেনা এরাকনিকে আঘাত করছে’

Athena turns Erachni into spider

এথেনা এরাকনিকে মাকড়সাতে পরিণত করলেন

 

(৩)

গ্রীসে তখন সবে মাত্র এথেন্স নগরীর পত্তন হলো। নগরীর নামও তখন এথেন্স নয়। এর প্রথম রাজা হলেন সেক্রোপস। সেক্রোপস ছিলেন অদ্ভুত ধরনের রাজা, কারণ তিনি অর্ধেক ছিলেন মানব এবং অর্ধেক ছিলেন সাপ। তিনি তার শহরের সুরক্ষার জন্য একজন পৃষ্ঠপোষক দেবতা চাইলেন। শহরটির পৃষ্ঠপোষক হবার জন্য সমুদ্র দেব পসাইডন এবং এথেনা – দুইজনই খুব আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তারা দুইজনই এতোটা উদগ্রীব ছিলেন যে, মনে হচ্ছিলো এখনই দুইজনের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যাবে। অবশেষে সেক্রোপস অনুরোধ করলেন, দুইজনকে শহরের অধিবাসীদের উপহার দিতে। যার উপহার শহরের জন্য বেশী কাজে লাগবে, তারই উপাসনা করবে শহরবাসী, তাকেই বানাবে শহরের পৃষ্ঠপোষক।

লোকারন্য অবস্থায় পসাইডন এবং এথেনা গেলেন এক্রোপলিসে। প্রথমে পসাইডন এগিয়ে এলেন। তিনি তার হাতের ত্রিশূল দিয়ে সজোরে ভূমিতে আঘাত করলেন। সেখান থেকে তৈরী হলো এক ঝর্না। শহরের অধিবাসীরা সবাই খুব চমকে উঠলো। তারা খুব খুশিও হলো। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। তারা ঝর্নার পানির স্বাদ পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখে তা লবণাক্ত, পানের অযোগ্য।

Athena and Poseidon

শিল্পীর তুলিতে- এথেনা এবং পসাইডন এথেন্স শহরের পৃষ্ঠপোষক হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন

 

এরপর এগিয়ে এলেন এথেনা। তার কাজটা অতোটা নাটকীয় হলো না! তিনি হাঁটু গেড়ে বসে জমিতে কি যেনো বপন করলেন এবং সেখান থেকে উৎপন্ন হলো অলিভ গাছ। এই গাছ থেকে ল্যাম্প জ্বালানোর তেলের উৎস পেলো তারা, পেলো রান্না করার জিনিস, এমনকি এই গাছের কাঠ দিয়ে তারা বাড়ি বানাতে পারলো। তাই শহরবাসী এথেনার উপহারেই খুশি হলো এবং সেক্রোপস এথেনাকেই তাদের পৃষ্ঠপোষক বানালেন এবং শহরের নাম রাখলেন দেবীর নাম অনুযায়ী এথেন্স। সেই থেকে এথেনা এথেন্সকে বিভিন্নভাবে রক্ষা করে আসছেন, এই কারণেই এথেনা ট্রোজান যুদ্ধে এথেন্সকে সাহায্য করেছিলেন।

পসাইডন অবশ্য এই পরাজয় সহজে মেনে নিতে পারেন নি। তিনি এথেন্সবাসীকে অভিশাপ দিলেন, এথেন্সে পানি সহজে পাওয়া যাবে না। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এথেন্সে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির অভাব দেখা যায়।

(৪)

হেফাস্টাস ছিলেন কামার দেবতা। তার স্ত্রী ছিলেন সুন্দরের দেবী আফ্রোদিতি। একবার কোনো এক কারণে আফ্রোদিতির সাথে ঝগড়া করে হেফাস্টাস আলাদাভাবে বসবাস করতে লাগলেন। ঠিক সেই সময়ে এক সুন্দর সকালে এথেনা এলেন হেফাস্টাসের কাছে- কিছু অস্ত্র বানাবার জন্য।

যখনই এথেনা হেফাস্টাসের কারখানায় প্রবেশ করলেন, তখন থেকেই এথেনার প্রতি হেফাস্টাস এক প্রবল আসক্তি অনুভব করলেন। হেফাস্টাস আশা করলেন অস্ত্র তৈরী করে দেওয়ার কৃতজ্ঞতা স্বরুপ এথেনা তাকে ভালোবাসা দিবেন। কিন্তু এথেনা ছিলেন কুমারী এবং তিনি কুমারী থাকারই সিদ্ধান্ত নিয়েছলেন। তাই তিনি হেফাস্টাসের আহবানে সাড়া দিলেন না। হেফাস্টাস কোনো করুণা দেখাতে চাইলেন না, তিনি জোর করে এথেনার শ্লীলতাহানি করতে চাইলেন। ধস্তাধস্তির জন্য সেটা সম্ভব হলো না, কিন্তু হেফাস্টাসের বীর্য স্খলন হয়ে এথেনার ঊরুতে পরে গেলো।

Athena and Hephastus

হেফাস্টাস এথেনার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করছেন

 

লজ্জায় এবং ঘৃনায় এক টুকরো পশম দিয়ে এথেনা সেই বীর্যটিকে দূরে নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু উর্বর গায়া এই বীর্য গ্রহন করে অর্ধেক সাপ এবং অর্ধেক মানুষের মতো এক অদ্ভুত বাচ্চার জন্ম দিলেন। বাচ্চার নাম দেওয়া হয়েছিলো এরিকথোনিয়াস।

Ericthonius

শিল্পীর তুলিতে এরিকথোনিয়াস

 

এথেনা তখন এরিকথোনিয়াসকে একটা ঝুড়ির মধ্যে লুকিয়ে রাখলেন এবং দুইটি সাপকে পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত করলেন। তিনি ঝুড়িটিকে পাঠিয়ে দিলেন এথেন্সে, রাজা সেক্রোপসের তিন মেয়ে হেরসে, প্যান্ড্রোসাস এবং এগলাওলাসের কাছে এবং তাদেরকে ঝুড়িটির ঢাকনা খুলতে নিষেধ করলেন।

একদিন তিনি এথেন্সের এক্রোপলিসকে সাজানোর জন্য একটা পাহাড় আনতে অন্য জায়গায় গিয়েছিলেন, তখন সেই তিন বোন নিষেধ অমান্য করে ঝুড়িটির ঢাকনা খুলে ফেলেন। তারা ঢাকনা খুলে এই অদ্ভুত বাচ্চা (যদিও তাদের বাবা সেক্রোপসও অর্ধেক মানব, অর্ধেক সাপ) দেখে ভয় পেয়ে এক্রোপলিসের দিকে দৌড়ে যান এবং এক্রোপলিসের প্রান্ত থেকে নিচে পড়ে গিয়ে তিন বোনই মারা যান।

তিন বোন ঝুড়িটির ঢাকনা খুলে এরিকথোনিয়াসকে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন

তিন বোন ঝুড়িটির ঢাকনা খুলে এরিকথোনিয়াসকে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন

 

একটি সাদা র‍্যাভেন পাখি সংবাদটি যখন এথেনাকে জানায়, হতাশায় ক্ষুদ্ধ হয়ে এথেনা সাদা পাখিটিকে কালো করে দেন এবং যে পাহাড়টি এক্রোপলিসের জন্য বয়ে আনছিলেন, সেটা নিচের দিকে ছুড়ে মারেন এবং তা এথেন্সের মধ্যখানে গিয়ে পড়ে। এটাই হচ্ছে বর্তমানের খুব সুন্দর মনোরম পাহাড় লাইকাবেট্টাস, যা এথেন্স শহরের মধ্যখানে অবস্থিত।

এথেন্সের লাইকাবেট্টাস পাহাড়

এথেন্সের লাইকাবেট্টাস পাহাড়

 

কোনো কোনো মিথে আছে তিন বোনের মধ্যে প্যান্ড্রোসাস ঢাকনা খোলার সময় ছিলেন না এবং বাকী দুই বোন মারা যান। র‍্যাভেন পাখির জায়গায় কেউ কেউ কাকের কথা বলেন।

পরবর্তীতে এথেনার সাহায্যে এরিকথোনিয়াস এথেন্সের রাজা হোন। তিনি জনগনের ভালোর জন্যই কাজ করতেন। মিথ থেকে জানা যায়, তিনিই প্রথম ঘোড়ার সাথে চ্যারিয়ট সংযুক্ত করেছিলেন, লাঙ্গলের সাহায্যে ভূমি কর্ষন করেছেন এবং তিনিই প্রথম মানুষকে রুপার ব্যবহার শিখিয়েছেন, যখন সোনার চেয়ে রুপা ছিলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। (টেকনিক্যালি, এরিকথোনিয়াসকে বলা হয়ে থাকে হেফাস্টাস এবং গায়ার সন্তান।)

গ্রীক মিথলজি ৮ (জিউস, মেটিস এবং এথেনার জন্ম)

মেটিসের কথা মনে আছে? মেটিস হচ্ছেন সেই তিনি, যিনি জিউসকে বমিকারক বস্তুটি দিয়েছিলেন এবং জিউস সেই বস্তুটি ক্রোনাসকে খাইয়ে বমি করতে বাধ্য করেছিলেন, এর ফলেই জিউসের বাকী পাঁচ ভাই-বোন ক্রোনাসের উদর থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলো। প্রকৃত পক্ষে, মেটিস ছিলেন টাইটান ওসেনাস এবং টাইটানেস টেথিসের তিন হাজার সমুদ্র কন্যার মধ্যে একজন, যাদেরকে সাধারণভাবে ওসেনিড বলা হয়। মেটিসকে অবশ্য একই সাথে দ্বিতীয় যুগের টাইটান হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সেই হিসেবে মেটিস হচ্ছেন জিউসের খালাতো/মামাতো/চাচাতো/ফুফাতো বোন (প্রতিটি ক্ষেত্রেই সঠিক!)। অবশ্য মেটিসের জন্ম হয়েছিলো জিউসের অনেক আগে।

মেটিস হচ্ছেন গভীর চিন্তা এবং জ্ঞানের দেবী। তার এই জ্ঞান বা চিন্তাশীল মননটি আবার বেশী ব্যবহার হতো ধূর্ত কাজে। তাই তিনি জিউসকে বুদ্ধি দিতে পেরেছিলেন কীভাবে তার পাঁচ ভাই-বোনকে উদ্ধার করবেন, দিয়েছিলেন বমিকারক উপাদান। অথচ, জিউস এর বিনিময়ে এক অদ্ভুত ব্যবহার করলেন মেটিসের সাথে। তিনি মেটিসের প্রেমে পড়ে গেলেন! জিউসের প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসা!

মেটিস খুব জ্ঞানী ছিলেন, তিনি হয়তোবা বুঝতে পেরেছিলেন, জিউসের ভালোবাসার এই শুরু, শেষ আর নেই, তাই জিউসের আহবানে সাড়া দিতে চাইলেন না। কিন্তু জিউসও ছিলেন নাছোড়বান্দা। জিউসের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য মেটিস বিভিন্ন রুপ নিতে থাকলেন- কখনো কোনো পশু, আবার কখনো কোনো পাখির। ধুরন্ধর জিউসও সেই হিসেবে নিজেকে রুপান্তর করে ফেলতেন। এক সময় হতাশ হয়ে মেটিস জিউসের কাছে নিজেকে সমর্পন করেন।

এইবার আবার গায়ার ভবিষ্যত বাণীর সময় হলো। গায়া, সাথে ইউরেনাস, ভবিষ্যত বাণী করলেন, জিউস এবং মেটিসের প্রথম সন্তান একজন কন্যা হবে এবং সেই সন্তান হবে জ্ঞানে ও শক্তিতে জিউসের সমান। আর দ্বিতীয় সন্তান যদি জন্ম নেয়, তাহলে পুত্র হবে। এই পুত্র সন্তান তার বাবা জিউসের চেয়েও শক্তিশালী হবে এবং জিউসকে ক্ষমতাচ্যুত করবে।

যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবন। ক্ষমতার স্বাদ পেলে, সেটা ছাড়তে খুব কষ্ট হয়! যে কারণে ইউরেনাস হেকাটনখিরাস এবং সাইক্লোপসদের গায়ার ভিতরে বন্দী করে রেখেছিলেন, সেই একই কারণে ক্রোনাস তার সন্তানদের গলাধঃকরণ করেছিলেন, আবার সেই কারণেই জিউস এক সিদ্ধান্ত নিলেন। যে মেটিসকে পাবার জন্য এতো কষ্ট করেছিলেন, সেই মেটিসকেই বিসর্জন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে এক মূহুর্ত দেরী করলেন না! ক্ষমতায় থাকার এমনই মহিমা! জিউস ঠিক করলেন, তিনি মেটিসকে, তার বাবা ক্রোনাস যেমন তার ভাই-বোনদেরকে গিলে ফেলেছিলেন, সেইভাবেই গিলে ফেলবেন।

দূর থেকে জিউস মেটিসকে দেখলেন কী যেনো বানাচ্ছেন। কাছে গিয়ে দেখলেন মেটিস একটি হেলমেট বানাচ্ছেন এবং সুতো দিয়ে একটি সুন্দর যুদ্ধের পোশাক বুনছেন। জিউস বুঝতে পারলেন না কেনো এগুলো তৈরী করছিলেন মেটিস। জিউসকে দেখে মেটিস কাজ থামিয়ে দেন, কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেন। জিউসকে সম্ভ্রম দেখানোর জন্য, না কি ভয়ে- সেটা বোঝা গেলো না। জিউস কিন্তু নরম সুরে মেটিসের সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে লাগলেন। এক সময় মেটিসের জড়তা কেটে গেলো এবং তিনিও জিউসের সাথে সহজ হতে লাগলেন।

জিউস জিজ্ঞেস করলেন, হেলমেট এবং যুদ্ধের পোশাক মেটিস কার জন্য বানাচ্ছেন। মেটিস যেনো হঠাৎ করেই লজ্জা পেলেন, একটু সময় নিয়ে স্মিত হেসে যখন বলতে যাবেন- তখনই এক ঘটনা ঘটে গেলো। উত্তরটি দিতে গিয়ে মেটিস হয়তো লজ্জায় একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন, জিউস এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মেটিসকে গিলে ফেললেন। মেটিসও নাই, তাহলে মেটিসের সন্তানও নাই! অতএব, জিউস এখন নিরাপদ!

কিন্তু জিউস জানতেন না, ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। মেটিস ইতোমধ্যে গর্ভবতী হয়ে পড়েছিলেন। এবং তিনি তার গর্ভের সন্তানের জন্যই হেলমেট এবং পোশাক বানাচ্ছিলেন। আর তাই মেটিসকে গিলে ফেলার পরও জিউসের উদরে মেটিসের হেলমেট এবং পোশাক বানানো বন্ধ হলো না! হেলমেট বানাতে গিয়ে যে শব্দের সৃষ্টি হতো, সেই শব্দে খুব সহসাই জিউসের মাথা ব্যাথা শুরু হলো।

Ethena

দেবী এথেনা

 

একদিন জিউস লিবিয়ার ট্রিটন নদীর তীরে বেড়াচ্ছিলেন। এই সময়ে তার এই প্রচন্ড মাথা ব্যথা শুরু হলো। তিনি ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছিলেন। দেবরাজের এই গোঙ্গানি শুনতে পেলেন হার্মিস। তিনি সঙ্গে সঙ্গে চলে এলেন জিউসের কাছে। জিউস হার্মিসকে আদেশ দিয়েছিলেন কামার দেবতা হেফাস্টাসকে ডেকে নিয়ে আসতে। হেফাস্টাস এসে জিউসের অবস্থা বেগতিক দেখলেন। তিনি কাল বিলম্ব না করে ধারালো কুড়াল দিয়ে জিউসের মাথায় আঘাত করে খুললেন। ম্যাজিকের মতো সেখান দিয়ে মাথায় হেলমেট পরিহিত, যুদ্ধের পোশাক পরা, হাতে অস্ত্রসহ সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক হয়েই বের হয়ে এলেন এক অপ্সরী। অপ্সরীই বটে! জিউসের মাথা থেকে বের হয়ে বিজয়ের তূর্য নিনাদ বাজিয়ে ঋজু ভঙ্গিতে জিউসের সামনে এসেই দাঁড়ালেন। জিউস বুঝতে পারলেন, এ হচ্ছে মেটিস এবং তার প্রথম সন্তান- এথেনা! অন্যান্য দেব-দেবীরা সম্ভ্রমের সাথে দেখতে লাগলেন এথেনাকে, এভাবে যে পূর্বে কেউ জন্মগ্রহন করেন নি! (জিউসের মাথা থেকে জন্মগ্রহনের মাধ্যমে গায়ার ভবিষ্যতবানীর প্রথম অংশটিও নষ্ট হয়, কারণ জিউস থেকে জন্ম নিয়ে জিউসের সমান জ্ঞান বা শক্তি থাকার কথা নয়!)

The dramtic birth of Athena

এথেনার নাটকীয় জন্ম (ব্রুননেন ভন কার্ল ডনডর্ফ, ১৯১১ সাল)

 

কেউ কেউ বলেন, এথেনার জন্মের সময় হেফাস্টাস নয়, টাইটান প্রমিথিউস সাহায্য করেছিলেন। সে যাই হোক, মা-ও যেহেতু ছিলেন জ্ঞানের দেবী, তাই এথেনাও হলেন জ্ঞানের দেবী। তিনি ছিলেন সাহসীদের শক্তির উৎস। গ্রীক মিথলজিতে দেবী এথেনা এক বিশাল জায়গা জুড়ে আছেন। জিউস যদিও এথেনার জন্ম চাননি, তবুও পরবর্তীতে এথেনাই পরিণত হয়েছিলেন তার খুব প্রিয় সন্তানে।

এথেনা জন্ম থেকেই মাতৃ বঞ্চিত একমাত্র অলিম্পিয়ান, মায়ের স্নেহ কখনো পান নি। তাই তার মধ্যে পুরুষালী স্বভাবটা ছিলো একটু বেশি, সাহায্যও করতেন পুরুষদের বেশি। অরেস্টেস যখন তার বাবা আগামেমননকে হত্যা করার জন্য প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তার মা ক্লাইটেমনেস্ট্রাকে খুন করেন, এথেনা যেনো অরেস্টেসের অপরাধকে ক্লাইটেমনেস্ট্রার চেয়ে কমই গণ্য করেছেন। তিনি নিজেই বলেন,

“কোনো মা-ই আমাকে জন্ম দেন নি; এবং শুধুমাত্র বিয়ের কারণ ছাড়া আমি পুরোপুরি একজন পুরুষ এবং সম্পূর্ণভাবেই থাকি বাবার পক্ষে। আর সেইজন্যই আমি এমন কোনো মহিলাকে এতো বেশী সম্মান দিবো না, যে কিনা তার স্বামীকে খুন করে, যিনি হচ্ছেন তার গৃহের প্রভু!” (ইস্কাইলাস, ইউমেনিডেস)

আর এথেনা সম্পর্কে অন্য দেবতাদের ধারণা জানা যায় জিউসকে বলা যুদ্ধ দেবতা এরেসের কথায়,

 

“তুমি জন্ম দিয়েছ এমন এক চঞ্চল এবং বোকা মেয়ের যে একমাত্র অন্যায় কাজেই আনন্দিত হয়! অলিম্পাসের বাকী সমস্ত দেব-দেবী যেখানে তোমাকে মান্য করে এবং তোমার ইচ্ছাকেই তাদের কর্মে পরিণত করে, সেখানে একমাত্র সে-ই (এথেনা) তোমার কোনো কথা বা কাজকে প্রতিবন্ধকতাই মনে করেনা, সে চলে তার নিজের ইচ্ছে মতো!”
Birth of Athena
শিল্পীর তুলিতে জিউসের মাথা থেকে এথেনার জন্ম

(প্রথম সাতটি পর্বে গ্রীক মিথলজি অনুযায়ী সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে ডিওক্যালিয়নের প্লাবন পর্যন্ত ঘটনাপঞ্জী ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছিলো। গ্রীক মিথলজির এই লেখাকে আমি কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছি। সৃষ্টিতত্ত্ব ছিলো প্রথম ভাগ। দ্বিতীয় ভাগে থাকবে বিভিন্ন দেবতাদের গল্প- যা অষ্টম পর্ব থেকেই শুরু হচ্ছে। তৃতীয় ভাগে থাকবে বিভিন্ন ডেমিগডদের গল্প, চতুর্থ ভাগে বিভিন্ন বীর এবং অভিযানের কাহিনীসমূহ এবং পঞ্চম ভাগে থাকবে ট্রয়ের যুদ্ধ থেকে রোম নগরীর প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত। এই কাজে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, আমার জন্য এই সিরিজটা ধৈর্য সহকারে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া আর পাঠকদের জন্য হচ্ছে শেষ পর্যন্ত আগ্রহ ধরে রাখা। দেখা যাক, এই রাস্তার কোথায় শেষ হবে এবং শেষে কি আছে!)

দিপুর গল্প

দিপু যেনো বিশ্বাসই করতে পারছিলো না! আজ এই পরিস্থিতিতে সে সন্ধ্যাকে দেখবে কখনো চিন্তাই করেনি। সন্ধ্যাও দিপুকে দেখে চমকে উঠলো। মুহূর্তটা ফ্রিজ হয়ে থাকলো কিছুক্ষন। দিপুই প্রথম প্রকৃতিস্থ হলো। সন্ধ্যাকে এড়িয়ে ইমার্জেন্সী মেডিকেল অফিসারকে জিজ্ঞেস করলো রোগীর আত্নীয় স্বজন কেউ আছে কি না।

“আমিই রোগীর স্ত্রী,” সামনে এগিয়ে এসে স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো সন্ধ্যা। দিপুর কাছে মনে হলো কন্ঠটা কী একটু কেঁপে উঠলো! সেই পরিচিত কন্ঠস্বর! বহুদিনের পরিচিত! “প্রায় দুই ঘন্টা আগে কথা কথা বলতে বলতেই হঠাৎ করে খিচুনী শুরু হয়। এক দুই মিনিটের মতো ছিলো, এরপর বমি করলো,” জানালো সন্ধ্যা।

দিপু রোগীর দিকে তাকালো। বয়সে ওর থেকে কিছুটা বড়ই হবে। দেখতেও সুদর্শন, মায়া মায়া লাগে। পুরুষদের চেহারায় মায়া মায়া ভাবটা মনে হয় থাকা উচিত নয়, সেখানে থাকবে কিছুটা রুক্ষতা! দিপু সেটাই ভাবে। দ্রুত শারীরিক পরীক্ষা করে দেখলো, শরীরের বাম দিক কিছুটা দুর্বল, কথা অবশ্য পরিষ্কার। এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ সজ্ঞানও বটে। দিপু ওর প্রফেসরের সাথে ফোনে কথা বলে এমআরআই ব্রেন করার উপদেশ দিলো।

জায়েদ, সন্ধ্যার স্বামীকে কিছুক্ষনের মধ্যেই এমআরআই রুমে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। কম্পিউটার স্ক্রীনের সামনে বসে রইলো দিপু। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সন্ধ্যাকে নিয়ে তখন দিপুর ভিতরে উথাল পাথাল অবস্থা! ফিরে গেলো যেনো দশ বছর আগের দিনে।

মেডিকেলের প্রথম দিনেই ওদের পরিচয়। প্রতিদিন আড্ডা। তারপর একদিন সন্ধ্যাই ওকে বলেছিলো। এক বিকেলে ফোন করে সন্ধ্যা বললো, “আজ আমি একটা কথা বলবো। বলা শেষ হলেই ফোন রেখে দিবো। তোমাকে কিছু বলতে হবে না! তুমি সেদিন হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম বইটি পড়েছ। সেখানে একটা থিওরী আছে। একজন মানুষের হাতে পাঁচটি নীল পদ্ম থাকে। কেউ যদি এই পাঁচটি নীল পদ্ম একবারেই কাউকে দিয়ে দেয়, তাহলে সে কখনোই তাকে ভুলতে পারে না! আমার হাতে এখন একটিও নীল পদ্ম নেই, সব একসাথে দিয়ে দিয়েছি!” এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলেই সন্ধ্যা ওপাশ থেকে লাইন কেটে দিলো। দিপু হতভম্বের মতো চিন্তা করতে লাগলো সন্ধ্যাতো আগে কখনো ওকে তুমি করে বলতো না!

পরের দিন যখন ক্লাসরুমে দেখা, এক ফাঁকে সন্ধ্যা বিব্রতবোধ করে জানতে চাইলো দিপু কী চিন্তা করছে। দিপু হেসে বলেছিলো, “তুই যে নীল পদ্মগুলো আমাকেই দিয়েছিস, সেটা কিন্তু বলিস নি! কিন্তু আমি নিয়ে নিলাম। আর একটা ব্যাপার, আমি কখনই তোকে তুমি বলতে পারবো না”। সেই থেকে শুরু দুজনার একসাথে পথ চলা।

কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে নিরবতা ভাঙ্গলো দিপুই, “কেমন আছো তুমি?”  সন্ধ্যাও তাকিয়ে আছে স্ক্রীনের দিকে, সেখানে ধীরে ধীরে জায়েদের ব্রেনের ভিতরের ছবি ভেসে উঠছে। সেদিকে তাকিয়েই উৎকন্ঠিত স্বরে সন্ধ্যা জানালো, “ভালো। তুমি কিন্তু আমায় আজ তুমি বললে!” হেসে উঠতে গিয়েও থেমে গেলো দিপু। দৃষ্টি তখন স্ক্রীনে আটকে গেছে। সন্ধ্যাও ডাক্তার, ব্রেনের একটি অংশ দেখিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইলো, “এটা কি?”

দিপুর সময় যেনো থমকে গেছে। কোনো উত্তর দিতে পারছে না! মনে হলো বহুকাল পর যেনো বলে উঠলো, “মনে হচ্ছে কোনো বস্তু সেখানে দলা পেকে আছে!” টেকনিশিয়ানকে রঞ্জক পদার্থ দিয়ে প্রতিতুলনা করতে বললো দিপু। সন্ধ্যার বুঝতে আর বাকী রইলো না!

***********

দিপু অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তারদের জন্য বিশ্রাম কক্ষে চুপচাপ বসে আছে। শূন্য দৃষ্টিতে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে। টিক টিক করে সময় বয়ে যাচ্ছে, দিপুর যেনো কোনো সময় যাচ্ছে না। দিপু সন্ধ্যাকে খুব ভালোবাসতো। ওর এখনো স্পষ্ট মনে আছে,  মধুমিতা সিনেমা হলে যখন সন্ধ্যার সাথে টাইটানিক দেখছিলো, ওদের দুটো হাত পরস্পরের সাথে লেগে ছিলো। মনে হচ্ছিলো এ বাঁধন কখনো ছিন্ন হবে না। দিপুর প্রতি সন্ধ্যার ভালোবাসার প্রকাশটা ছিলো উচ্ছ্বল, দিপু সেভাবে প্রকাশ করতে পারতো না। এই প্রকাশ না করাটাই যেনো কাল হলো! একদিন পড়ন্ত বিকেলে রমনা উদ্যানের এক প্রান্তে বসে সন্ধ্যা হঠাৎ করে বলে উঠলো, “তুমি বোধহয় আমাকে খুব একটা ভালোবাসো না”। সেদিন কিছু বলতে পারে নি দিপু। ওর কাছে মনে হয়েছে ভালোবাসাটা দেখানোর কোনো বিষয় নয়, এটা একান্ত মনের ব্যাপার। সেইদিন থেকে যে কী হলো! মেডিকেলের চৌহদ্দি পেরোনোর আগেই দিপু আবিষ্কার করলো, ওদের মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা সেই আগের মতো নেই। অথচ কোনো মনোমালিন্য, কোনো সমস্যা কোনোকিছুই ছিলো না। তারপর একদিন দিপু দেখলো সন্ধ্যা আর সন্ধ্যা তারা হয়ে ও জীবনের আকাশে উঠবে না।

জায়েদের ব্রেন টিউমার হয়েছিলো। ডায়াগনোসিস চূড়ান্ত করার জন্য ওরা অপারেশন করতে চাইলো, যদিও এমআরআই দেখেই মনে হয়েছিলো খুব খারাপ ধরনের টিউমার। দিপুই সন্ধ্যাকে বলেছিলো অপারেশনের আগে যদি জায়েদের কোন কাজ থেকে থাকে, যেসব জায়গায় ওর স্বাক্ষর লাগতে পারে, সেগুলো যাতে করে ফেলে। এবারো দিপুর কথা সন্ধ্যার বুঝতে কষ্ট হয় নি! ওদের একটা ছোট মেয়ে আছে, তিন বছর বয়স হবে। জায়েদকে যখন অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে আসছিলো, দিপু তাকিয়ে ছিলো মেয়েটির চোখের দিকে- কী অদ্ভুত মায়াবী চোখ! মেয়েটি মায়ের চোখ পেয়েছে।

অপারেশনটা খুব জটিল ছিলো। ব্রেনের এমন জায়গায় টিউমারটা ছিলো- জায়গাটা ছিলো রক্তনালীতে পরিপূর্ণ। ওদের উদ্দেশ্যই ছিলো বায়োপসির জন্য যতটুকু দরকার, ঠিক ততটুকুই নিয়ে আসা। একবার ওর প্রফেসর দিপুকে বলেছিলো, ওর কোনো সমস্যা হলে না আসতে। দিপু রাজী হয় নি। অকম্পিত হস্তে মাথার খুলি কেটে যখন ব্রেনে প্রবেশ করলো, অবস্থা ধারণার চেয়েও খারাপ দেখলো । তারপর হঠাৎ করেই এক রক্তনালী কেটে রক্তপাত শুরু হলো……।

পারে নি, দিপু পারে নি জায়েদকে বাঁচাতে। ওর পাঁচ বছরের নিউরোসার্জারীর ক্যারিয়ারে এই প্রথম কোনো রোগী অপারেশনের টেবিলেই মারা গেলো, তাও আবার জায়েদ, সন্ধ্যার স্বামী। ওর প্রফেসর মাথাটা সেলাই করছে এখন, দিপু ওটি থেকে অফ হয়ে এসে একাকী বসে আছে বিশ্রাম কক্ষে। ওর প্রফেসর বললো, দিপু সন্ধ্যাকে জানে, তাই দিপুই খবরটা সন্ধ্যাকে জানাক।

*********

অপারেশন থিয়েটারের বাইরে  সন্ধ্যা আর ওর মেয়েটা অপেক্ষা করছে। দিপু সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়ালো। বাচ্চা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখলো আনমনে হাসপাতালের রেলিং ধরে খেলা করছে। সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে দেখলো, সেই চোখে একসাথে খেলা করছে আশা আর উদ্বিগ্নতা। সন্ধ্যার চোখের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে দিপু কথা বলা শুরু করলো………………।

দিপুকে নিয়ে লেখা আগের গল্পগুলোঃ

ক্যাডাভার

জীবন যেখানে যেমন

গ্রীক মিথলজি ৭ (ডিওক্যালিয়নের বন্যা)

জিউস যখন স্বর্গের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে, সব দেবতাদের রাজা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন, সেই সময়ে পৃথিবীতে একজন মানুষ বাস করতেন, যার নাম ছিলো ডিওক্যালিয়ন। ডিওক্যালিয়ন ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু তার বাবা ছিলেন অসাধারণ একজন!

তিনি ছিলেন মানববন্ধু টাইটান প্রমিথিউস। ডিওক্যালিয়নের মা-ও ছিলেন একজন ওসেনিড, প্রোনোয়া। কিন্তু ডিওক্যালিয়ন কোনো টাইটান ছিলেন না! তিনি ছিলেন শুধুই একজন সাধারণ মানুষ, কিন্তু আচার-নিষ্ঠায়, ব্যবহারে সবদিকে অসাধারণ। ডিওক্যালিয়ন খুব ধার্মিকও ছিলেন।

ডিওক্যালিয়ন বিয়ে করেছিলেন পীরাকে। পান্ডোরার কথা মনে আছে? বিশ্বের প্রথম মানবী? পীরা ছিলেন সেই পান্ডোরা এবং টাইটান এপিমেথিয়াসের কন্যা। পীরাও ডিওক্যালিয়নের মতো যেমন ধার্মিক ছিলেন,তেমনি ছিলেন মা পান্ডোরার মতো খুব সুন্দরীও।

ককেশাস পাহাড়ে প্রমিথিউসকে বন্দী করে রাখার সময়ে, পান্ডোরার জারের মাধ্যমে জিউস যখন সব রোগ এবং খারাপ জিনিস পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন, তখন মানুষ খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। তারা শান্তিতে বসবাস না করে, একে অপরের সাথে হানাহানি আর যুদ্ধ করতে লাগলো। ছিলো না কোনো আইনের শাসন। জিউস মানবজাতিকে যেভাবে শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন, সেভাবেই যেনো সবকিছু ঘটছিলো।

সেই সময়ে গ্রীসের আর্কাডিয়ার রাজা ছিলেন লাইকায়ন। তার ছিলো পঞ্চাশ জন পুত্র সন্তান (কারো মতে, বাইশ জন)। বলা হয়ে থাকে এযাবতকালে লাইকায়ন ও তার পঞ্চাশ জন পুত্রের মতো কোনো অহংকারী এবং অধার্মিক মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেয়নি। জিউসও এটি জানতেন। তবুও তিনি নিজ চোখে দেখার জন্য মানুষের ছদ্মবেশে আর্কাডিয়ায় এলেন। আর্কাডিয়ায় আসার আগে অবশ্য তিনি আর্কাডিয়ার অধিবাসীদের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তিনি আসবেন। তাই অনেক মানুষ হঠাৎ করেই খারাপ কাজ ছেড়ে দিয়ে জিউসের উপাসনা শুরু করলো।

কিন্তু লাইকায়ন তাদের উপাসনাকে উপহাস করে বললো, “আমি খুব দ্রুতই বের করবো, সে কি দেবতা, না কি মরণশীল কোনো মানুষ?”
জিউস ছদ্মবেশে এসে রাতে তার প্রাসাদে অবস্থান করছিলেন। রাতের খাবারের সময় লাইকায়ন ও তার পুত্ররা এক বালককে হত্যা করে, সেই বালকের মাংস রান্না করে জিউসের সামনে দিলেন। রাগে ক্ষুদ্ধ হয়ে জিউস সঙ্গে সঙ্গে লাইকায়নকে নেকড়ে মানবে পরিণত করেন, এবং বজ্র বিদ্যুৎ দিয়ে তার প্রাসাদ গুড়িয়ে দেন, একই সাথে লাইকায়নের সব সন্তানেরই একই পরিণতি করেন, শুধুমাত্র নিকটিমোস ছাড়া।

লাইকায়ন নেকড়ে মানবে পরিণত হলো (শিল্পী- গোল্টজিয়াস, ১৫৮৯ সাল)

লাইকায়ন নেকড়ে মানবে পরিণত হলো (শিল্পী- গোল্টজিয়াস, ১৫৮৯ সাল)

 

কেউ কেউ বলেন, নিকটিমোস গায়ার কারণে রক্ষা পেয়েছিলেন, আবার কেউ কেউ বলেন নিকটিমোসকে হত্যা করে তার মাংস জিউসের সামনে খাওয়ার জন্য আনা হয়েছিলো। পরে জিউস নিকটিমোসকে পুনর্জীবিত করেন। ঘটনা যেটাই হোক, লাইকায়নের পঞ্চাশ পুত্রের মধ্যে শুধু নিকটিমোস জীবিত ছিল এবং লাইকায়নের পর আর্কাডিয়ার রাজা হোন।

Zeus destroys the house of Lycaon 2 as the latter turns into a wolf

জিউস বজ্র দিয়ে লাইকায়নের প্রাসাদ গুড়িয়ে দিচ্ছে, সাথে তার সন্তানদেরও

 

লাইকায়ন এবং তার ছেলেদের শাস্তি দিয়েও জিউস শান্ত হলেন না। তিনি অন্য দেবতাদের বললেন, “এই মানুষেরা আমাদের জন্য সমস্যা ছাড়া কিছুই না! যখন তারা সুখে, শান্তিতে থাকতো, আমরা ভয় পেয়েছিলাম তারা আমাদের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে, আর এখন তারা এতোটাই খারপ এবং নৃশংস হয়েছে, সেটাও আমাদের জন্য বিপদজনক। তাদেরকে নিয়ে একটিমাত্র কাজ করা যায়, আর সেটি হচ্ছে তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলা। আর তাছাড়া, আমি মাত্র একটি বাড়ি ধ্বংস করেছি, তাহলে বাকীগুলো নয় কেনো?”

জিউস তখন সৃষ্টি করলেন মহা-প্লাবন। তিনি তাকে সাহায্য করার জন্য ডেকে পাঠালেন সমুদ্র দেবতা পসাইডনকে। তারা দু’জনে স্বর্গ থেকে মুষলধারে বৃষ্টি ঝরিয়ে এবং নদীগুলোর দুকূল ছাপিয়ে জলে ডুবিয়ে দিলেন পৃথিবীকে। পশু, মানব সব ডুবে গেলো সেই প্লাবনে। সমগ্র পৃথিবী পরিণত হলো এক মহাসাগরে, যেখানে তীরের কোনো দেখা নেই।

এদিকে, ডিওক্যালিয়ন কখনই কোনো খারাপ কাজে জড়িত ছিলেন না, এবং মানুষদেরকে বলতেন, “তোমরা যে অধর্মের কাজ করছ, এতে দেবতারা রুষ্ট হচ্ছেন। সেদিন আর বেশি দূরে নেই, যেদিন তোমরা এর জন্য প্রায়শ্চিত্ত করবে”। ডিওক্যালিয়ন প্রতিবছর ককেশাস পাহাড়ে যেতেন, তার বন্দী বাবা প্রমিথিউসের সাথে দেখা করার জন্য। প্রমিথিউস আগেই বলে দিয়েছিলেন, “সময় এসে গেছে সেই মহা প্লাবনের। প্রস্তুতি নাও বেঁচে থাকার জন্য”।

ডিওক্যালিয়ন এই পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই একটি নৌকা তৈরী করে রেখেছিলেন। বন্যার পানি যখন বাড়তে শুরু করেছিলো, তখনই তিনি এবং তার স্ত্রী পীরা নৌকাতে উঠে আশ্রয় নেন। নয় দিন, নয় রাত ভাসতে ভাসতে অবশেষে এসে পৌঁছান পারন্যাসাস পাহাড়ের চূড়ায় এবং তারা যখন নৌকা থেকে বেরিয়ে এলেন, কোথাও কোনো প্রাণের চিহ্ন দেখতে পেলেন না, চারদিকে শুধু পানি আর পানি! কিন্তু তারা দুইজনই ধার্মিক ছিলেন, তাই জিউস তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেন এবং প্লাবনের পানি নামিয়ে দিলেন। পানি নেমে গেলে ধীরে ধীরে পৃথিবীও শুকনো হলো।

পীরা এবং ডিওক্যালিয়ন পারন্যাসাস পাহাড় থেকে নেমে এলেন, এবং দেখলেন এই মৃত পৃথিবীতে তারা দুইজনই মাত্র জীবিত প্রাণী। তারা দেখতে পেলেন একটি পিচ্ছিল এবং শৈবালময় মন্দির, সেটি ছিলো টাইটান দেবী থেমিসের মন্দির। সেটি তখনও পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় নি। তারা সেখানে গেলেন, উদ্ধারের জন্য দেবতাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন এবং একাকীত্ব ঘোচানোর জন্য থেমিস এবং জিউসের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। ঠিক তখন তারা তাদের পিছনে এক কন্ঠস্বর শুনলেন। তারা পিছনে ঘুরে দেখলেন, একটি পাথরের উপর রাজকুমারের মতো দেখতে একজন দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ছিলেন অনেক লম্বা, তার চোখ ছিল নীল এবং চুলগুলো হলুদ। তার পাদুকায় এবং টুপিতে ছিল ডানা লাগানো, তিনি হাতে এমন একটি জিনিস পরিধান করেছিলেন যাতে সোনালী সাপ পেচিয়ে আছে। ডিওক্যালিয়ন বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি হচ্ছেন দেবরাজ জিউসের বার্তাবাহক। তারা অপেক্ষা করতে লাগলেন, হার্মিস কি বলে শোনার জন্য। (অনেকেই বলে থাকেন, হার্মিস নয়, দেবী থেমিস তাদের কাছে এসেছিলেন।)

“তোমরা কি কিছু প্রার্থনা করছ?”, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা যা চাও, সেটাই পাবে। বল, কি চাও?”
“আমরা মানুষ চাই। প্রতিবেশী, বন্ধু ছাড়া এই বিশাল পৃথিবীতে একা বেঁচে থাকা অসম্ভব ব্যাপার”, ডিওক্যালিয়ন জবাব দিলেন। 
“তোমাদের মাথা অবগুন্ঠিত করো, এবং তোমাদের পিছনে নিক্ষেপ করো তোমাদের মায়ের অস্থিসমূহকে,” এই কথা বলেই বাতাসে মিলিয়ে গেলেন হার্মিস। 
“এ কথা দ্বারা তিনি কি বুঝাতে চাইলেন?” জিজ্ঞাসা করলেন পীরা। 
“অবশ্যই আমি বুঝতে পারিনি,” জবাব দিলেন ডিওক্যালিয়ন, “কারণ, আমাদের দুইজনের মা ভিন্ন ভিন্ন দুইজন, এবং তারা দুইজনই মারা গেছেন! তবে আমাকে একটু চিন্তা করতে দাও। কে হোন আমাদের সকলের মা? গায়া মানে পৃথিবী হলো সবকিছুর মা, অর্থাৎ আমাদেরও মা। কিন্তু মায়ের অস্থিসমূহ বলতে কি বোঝাচ্ছে?”
“সম্ভবত নদীর ধারের পাথরগুলোকেই মায়ের অস্থি বলা হয়েছে,” বললেন পীরা, “চলো, আমরা পাথরগুলোকে জিউসের নাম নিয়ে পিছন দিকে নিক্ষেপ করতে থাকি”। কেউ কেউ বলেন, তারা থেমিসের নাম নিয়েছিলেন।

যখন একেকটি পাথর মাটিতে পড়তে লাগলো, তখন সেগুলো থেকে নতুন মানুষের সৃষ্টি হতে লাগলো। ডিওক্যালিয়ন যে পাথরগুলো ছুড়ে মেরেছিলেন, সেগুলো থেকে মানব, এবং পীরা যে পাথরগুলো ছুড়ে পেরেছিলেন সেগুলো থেকে মানবীর সৃষ্টি হলো। তাদেরকে বলা হতো ‘পাথর মানব’, এবং তারা ছিলো এক সুদৃঢ় ও দীর্ঘস্থায়ী প্রজন্ম, প্লাবনের পর নির্জীব হয়ে পড়া পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য যেমন প্রজাতির দরকার ছিলো, ঠিক তেমনই।

Deucalion and Pyrrha  create a new generation by throwing stones.

ডিওক্যালিয়ন এবং পীরা পাথর ছুড়ে মানব-মানবীর সৃষ্টি করছেন

 

এরপর অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীরা নিজে থেকেই সৃষ্টি হতে শুরু করলো। সূর্য যখন উদয় হওয়া শুরু করলো, তখন এসব প্রাণী সৃষ্টি হতে লাগলো, কিছুটা আগের রুপে, কিছুটা নতুন রুপে। এভাবেই নতুন প্রজাতির প্রাণীর উদ্ভব হলো এই পৃথিবীতে।

ডিওক্যালিয়ন এবং পীরাই শুধুমাত্র এই বন্যায় একমাত্র মানব-মানবী ছিলেন না, যারা বেঁচে গিয়েছিলেন। তারা ছাড়াও মেগারাস, জিউসের এক সন্তান, সারস পাখির শব্দে ঘুম থেকে জেগে উঠে জেরানিয়া পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নিয়ে বেঁচে যান, জেরানিয়া পাহাড়টিও বন্যায় ডুবে যায় নি। এছাড়া পেলিয়নের কেরাম্বাস এক নিম্ফের সাহায্যে ডানা পেয়ে উড়ে গিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থান করে জীবন রক্ষা করেন। 
একইভাবে পারন্যাসাস পাহাড়ের অধিবাসীরা (যে শহরটির গোড়া পত্তন করেন পারন্যাসাস- সমুদ্র দেব পসাইডনের পুত্র) নেকড়ের আওয়াজ শুনে ঘুম থেকে উঠে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আশ্রয় লাভ করেছিলো।

ডিওক্যালিয়ন এবং পীরা থেকেও সন্তানের জন্ম হয়, তাদের মধ্যে হেলেন ছিলেন পুরো হেলেনিস্টিক সভ্যতার প্রথম পুরুষ।

(কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্যণীয়-

- ডিওক্যালিয়নের প্লাবনের অনেক ঘটনার সাথে নুহের প্লাবন বা সুমেরীয় মিথে প্লাবনের প্রচুর মিল পাওয়া যায়!
- দেবতারা বা ইশ্বর মানবজাতির উপর রাগান্বিত হয়ে প্লাবন দিচ্ছেন, এই রাগান্বিত হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে ইশ্বরে বা দেবতায় অবিশ্বাস এবং তাদের প্রতি আনুগত্যশীল না থাকা। এটি প্রায় এই সংক্রান্ত সব মিথেই দেখা যায়।
- এক যুগের মানুষের সাথে অন্য যুগের মানুষের অনেক পার্থক্য দেখা যায়, নতুনভাবে সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যাখ্যা দেওয়ার একটা চেষ্টা আছে!
- নতুন মানুষ তৈরী করার জন্য ডিওক্যালিয়ন এবং পীরাকে চোখ বন্ধ করে পিছন দিকে পাথর ছুড়তে হয়েছে, যাতে তারা মানুষ সৃষ্টির পদ্ধতি না দেখতে পারে! প্রায় একই ভাবে সমকামীতার জন্য যখন সোডম এবং গোমরাহকে ধ্বংস করা হয়, তখনও পিছন দিকে তাকাতে নিষেধ করা হয়েছিলো, কারণ কি মানব জাতির ধ্বংস প্রক্রিয়া না দেখানো?
- সব মিথেই শেষে দেখা যায়, শুধুমাত্র সম্পূর্ণ আনুগত্যশীল মানুষই বন্যার সময় বেঁচে থাকতে পেরেছেন। )

গ্রীক মিথলজি ৬ (আবার যুদ্ধ- জায়ান্ট এবং টাইফোয়িয়াস)

মায়ের মন বড়ই অদ্ভুত, সে মা যদি গায়া হয়। টাইটান যুদ্ধে জিউস জয়ী হবার পর ক্রোনাসসহ অন্যান্য টাইটানদের টারটারাসে বিভিন্ন রকম শাস্তি দেন। গায়া চেয়েছিলেন তাঁর সন্তান সাইক্লোপস এবং হেকাটনখিরাসদের মুক্তি, তাই জিউসকে ক্রোনাসের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছিলেন, কিন্তু তিনি চাননি জিউস আবার টাইটানদের শাস্তি দিক! কারণ টাইটানরাও তো গায়ার সন্তান! তাই টাইটানদের শাস্তিতে ক্ষুদ্ধ গায়া তাঁর আরেক প্রজাতির সন্তান জায়ান্টদের আহবান করলেন। যীশুর জন্মের প্রায় চল্লিশ বছর আগে ওভিদ নামে এক রোমান কবি ছিলেন, তিনি লিখেছেন, গায়া তাঁর জায়ান্ট সন্তানদের আহবান করেছিলেন , “দেবতাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করো”।

জায়ান্টদের কথা মনে আছে? সেই যে ক্রোনাস যখন ইউরেনাসকে অনমনীয় কাস্তে দিয়ে নপুংসক করছিলেন, তখন ইউরেনাসের যে রক্ত ঝরেছিলো, সেগুলো গায়া রেখে দেন। কিছু রক্ত গায়া রেখে দিয়েছিলেন পাল্লেনে নামের জায়গায়, পরের মৌসুমে সেই রক্ত থেকেই জন্ম নিয়েছিলো জায়ান্টরা। এরা শুধু দেখতেই বিশাল ছিলো না, এদের ছিলো শত হাত এবং সাপের মতো পা। বিশাল লম্বা চুল মাথা এবং চিবুক থেকে নিচের দিকে ঝুঁকে থাকতো। এরা ছিলো লম্বায় ষোল ফুটের মতো। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, এদের পা সাপের মতো ছিলো না, ছিলো স্বাভাবিক।

জিউস টাইটান যুদ্ধে জয়ের পর দেবতাদের মধ্যে শৃংখলা, সম্মান, নিষ্ঠা, শ্রদ্ধা, মহত্ত্ব, শ্লীলতা এবং ভয় – সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়। তখনো জিউস এসবের কোনো কিছুই প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নি। এই সুযোগে এবং গায়ার প্ররোচনায় জায়ান্টরা অলিম্পিয়ানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ততদিনে অবশ্য সময় অনেক দূর গড়িয়ে গেছে, পৃথিবীতে তখন মানবজাতির বসতি, হারকিউলিসও তখন জীবিত!

পিন্ডার নামে এক বিখ্যাত মিথ লেখকের মতে, সূর্য দেবতা হেলিয়সের গবাদি পশু চুরির মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। আবার অন্য এক মিথে আছে, জায়ান্টদের অন্যতম নেতা ইউরাইমেডন (বা পরফাইরিয়ন) জিউসের স্ত্রী হেরার শ্লীলতাহানি করলে জায়ান্টদের সাথে অলিম্পিয়ানদের যুদ্ধ শুরু হয়।

জায়ান্ট ওটাস এবং ইপহিয়ালটেস আশা করেছিলো থেসালী, পেলিয়ন ও ওসার পাহাড়গুলোকে একটার উপরে আরেকটা জমা করে অলিম্পাস পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে পারবে। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিলো পরফাইরিয়ন এবং আলকাইয়োনিয়াস। এই যুদ্ধ এতো ভয়ংকর ছিলো যে, কথিত আছে কামার দেবতা হেফাস্টাস অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, পরে সূর্য দেবতা হেলিয়স তার রথে চড়িয়ে হেফাস্টাসকে বাঁচিয়ে স্বর্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। দেবতারা একটি ভবিষ্যতবানী জানতেন, এই যুদ্ধে জায়ান্টদের তারা পরাজিত করতে পারবেন না, যতক্ষণ না পর্যন্ত এক মরণশীল বীর এসে তাদের সাহায্য করবেন। কেউ কেউ বলেন, এই ভবিষ্যতবানী করেছিলেন হেরা। যাহোক, গায়াও এই ভবিষ্যতবানীর কথা জানতেন। তাই তিনি একটি ভেষজ ওষুধ খুঁজছিলেন, যেটা হলে জায়ান্টরা সেই মরণশীলের আঘাতে মারা যাবে না। কিন্তু জিউস আগে থেকেই ভোরের দেবতা এওস, চন্দ্রদেবী সেলেনে এবং সূর্য দেব হেলিয়সকে উদিত হতে নিষেধ করেন এবং এই অন্ধকারের সুযোগে নিজেই সেই ভেষধ ওষুধটা কব্জা করেন। এরপর দেবী এথেনাকে বলেন হারকিউলিসের কাছে গিয়ে তাঁকে এই যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে।

Gigantomachy

জায়ান্টরা অলিম্পাস পাহাড় আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে (শিল্পী- বার্নার্ড পিকার্ট)

 

হারকিউলিস এথেনার অনুরোধ শুনে যুদ্ধে এসে তাঁর ভয়ঙ্কর হাইড্রার বিষ মাখানো তীর দিয়ে জায়ান্ট আলকাইয়োনিয়াসকে আঘাত করেন, কিন্তু মাটিতে পরা মাত্রই আলকাইয়োনিয়াস আবার শক্তি প্রাপ্ত হোন। তখন এথেনা জানান, আলকাইয়োনিয়াস যতক্ষন পর্যন্ত তার জন্মস্থান পাল্লেনে-তে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে অমর। হারকিউলিস তখন আলকাইয়োনিয়াসকে টেনে হেঁচড়ে পাল্লেনের বাইরে নিয়ে যান এবং মৃত্য না হওয়া পর্যন্ত প্রহার করতে থাকেন। হারকিউলিস শুধু আলকাইয়োনিয়াসকেই হত্যা করেন নি, যেসব জায়ান্ট অলিম্পিয়ান দেবতাদের আঘাতে আহত হয়েছিলো, তাদেরকেও হত্যা করেন। তিনি আরো যাদেরকে হত্যা করেছিলেন, সেইসব জায়ান্ট হচ্ছে ইপহিয়ালটেস, লিওন, পেলোরিয়াস, থেওডামাস এবং পরফাইরিয়ন।

Gigantomachy

জায়ান্টদের সাথে অলিম্পিয়ানদের যুদ্ধ (শিল্পী- ফ্রান্সিসকো বেইয়েও সুবিয়াস, ১৭৬৪ সাল)

 

জায়ান্ট পরফাইরিয়ন যখন হারকিউলিসকে আক্রমন করছিলো, তখন জিউস পরফাইরিয়নের মনে হেরার প্রতি কাম-বাসনা জাগ্রত করে পরফাইরিয়নকে বিভ্রান্ত করে। পরফাইরিয়ন যখন হেরাকে শ্লীলতাহানি করতে উদ্যত হয়, হেরার বস্ত্র ছিঁড়ে ফেলে, তখন হেরা সাহায্যের জন্য কাঁদতে থাকলে জিউস তার বজ্র দিয়ে পরফাইরিয়নকে আহত করেন এবং হারকিউলিস সঙ্গে সঙ্গে তীর দিয়ে তাকে হত্যা করেন। যদিও কেউ কেউ বলেন, এপোলো জায়ান্ট ইপহিয়ালটেসের সাথে পরফাইরিয়নকেও হত্যা করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, এপোলো ইপহিয়ালটেসের বাম চোখ নষ্ট করেছিলেন আর হারকিউলিস নষ্ট করেছিলেন ডান চোখ।

Gigantomachy

শিল্পীর তুলিতে – জায়ান্টদের সাথে অলিম্পিয়ানদের যুদ্ধ

 

ডায়োনিসাস, অলিম্পাসে প্রবেশকারী সর্বশেষ দেবতা, যার মা ছিলেন মরণশীল, তিনিও এই যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। তিনি থিরসাস নামক এক অস্ত্র দিয়ে জায়ান্ট ইউরাইটাসকে হত্যা করেন, দেবী হেকাটে টর্চ দিয়ে জায়ান্ট ক্লাইটিয়াসকে অন্যদিকে সজোরে ঘুরিয়ে দেন আর জায়ান্ট মিমাসকে হত্যা করেন হেফাস্টাস তার অগ্নি-বর্ণ ধাতুর তৈরী ক্ষেপনাস্ত্র দিয়ে। দেবী এথেনা জায়ান্ট এনকেলাডাসের দিকে চ্যারিয়ট চালনা করলে, সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুরো সিসিলি দ্বীপটিকেই এনকেলাডাসের দিকে ছুড়ে মারেন এবং আরেক জায়ান্ট পাল্লাসের শরীরের চামড়া ছালিয়ে নেন, সেই চামড়া দিয়ে যুদ্ধের সময়ে এথেনা নিজেকে রক্ষা করেন। ইতোমধ্যে সমুদ্রদেব পসাইডন জায়ান্ট পলিবোটেসকে সমুদ্র জুড়ে তাড়া করতে থাকেন এবং যখন তারা কজ দ্বীপে আসেন, পসাইডন কজ দ্বীপের একটি অংশ ভেঙ্গে পলিবোটেসের দিকে ছুড়ে দেন। যদিও অন্যরা বলে থাকেন, পলিবোটেস পুরো কজ দ্বীপের নিচেই চাপা পড়েছিলো। হার্মিস পাতালরাজ হেডসের অন্ধকারের হেলমেট পরিধান করে জায়ান্ট হিপ্পোলাইটাসকে, দেবী আর্টেমিস জায়ান্ট গ্রাটিয়নকে, এমনকি তিন নিয়তি বোনও (মোইরাই) এই যুদ্ধে জায়ান্ট এগ্রিয়াস ও জায়ান্ট থোয়াসকে হত্যা করেন। অনেকে বলেন, বাকি জায়ান্টদের হারকিউলিস ডেলোসের পূর্বদিকের এক ছোট দ্বীপ মাইকোনোসের নিচে প্রোথিত করেছিলেন।

Gigantomachy and Athena

এথেনা এক জোড়া জায়ান্টদের সাথে যুদ্ধ করছেন (ইস্তাম্বুল আর্কেওলজিকাল মিউজিয়াম, তুরস্ক)

 

এই যুদ্ধে অলিম্পিয়ান দেবতাদের পক্ষে আরো সাহায্য করেন সমুদ্রদেব পসাইডনের সন্তান ট্রাইটন। ট্রাইটন তার নিজের তৈরী ট্রাম্পেট এমনভাবে বাজান, জায়ান্টরা তা শুনে ভয় পেয়ে পালাতে থাকে। এমনকি দেবতা ডায়োনিসাসের সাথী ছাগল মুখো সাটাইরোস-রা যখন জিউসকে সাহায্য করতে আসে, তখন যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে ভয় পেয়ে তারা গাধার ডাক ডাকতে থাকে। এই অদ্ভুত শব্দ আগে কখনো জায়ান্টরা শোনেনি, তাই জায়ান্টরাও ভয় পেয়ে পালাতে থাকে। কথিত আছে জায়ান্টরা এথেনার দিকে একটি ড্রাগন ছুড়ে মারলে, এথেনা সেই ড্রাগনটি কেড়ে নিয়ে আকাশের দিকে নিক্ষেপ করেন, সেটি তখন আকাশের সর্প মন্ডলে পরিণত হয়।

সর্প মন্ডল

সর্প মন্ডল

 

জায়ান্টরা যুদ্ধে পরাজিত হলে, গায়া আরোও ক্ষুদ্ধ হোন। অলিম্পিয়ানদের সরিয়ে টাইটানদের বসানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি এক অদ্ভুত কাজ করেন। গায়া তখন তাঁর ভাই টারটারাসের সাথে মিলিত হোন। টারটারাসের সাথে মিলনের ফলে গায়া জন্ম দেন এক ভয়ংকর দানবের, টাইফোয়িয়াস বা টাইফুন।

টাইফোয়িয়াস- শিল্পীর তুলিতে

টাইফোয়িয়াস- শিল্পীর তুলিতে

 

টাইফোয়িয়াস এতো বিশাল দানব ছিলো যে, এর উপরের অংশ আকাশের তারা ছুঁয়েছিল, আর দুই হাত পৌঁছে গিয়েছিলো পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তে। একটি মানবীয় মাথার পরিবর্তে এর ঘাড় থেকে উৎপন্ন হয়েছিলো একশটি ড্রাগন মাথা। কেউ কেউ অবশ্য বলে থাকেন, টাইফোয়িয়াসের মাথা মানবীয়ই ছিলো, বরঞ্চ তার আঙ্গুলগুলো ছিলো ড্রাগন মাথার মতো। এর নিচের অংশটুকু দেখতে ছিলো দৈত্যাকৃতি সাপের মতো সর্পিলাকার, এবং যখন এটি ছড়িয়ে দিতো, তখন আকাশের তারা ছোঁয়া মাথাকেও পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারতো, আর সবসময় হিস হিস শব্দ করতো। টাইফোয়িয়াসের পুরো শরীরটাই ডানা দ্বারা আবৃত ছিলো, এর চোখে আগুনের ঝলক দেখা যেতো। সবকিছু মিলিয়ে অলিম্পিয়ান দেবতারাও টাইফোয়িয়াসকে খুব ভয় পেতেন।

এই টাইফোয়িয়াসকেই গায়া লেলিয়ে দিলেন অলিম্পিয়ানদের বিরুদ্ধে। টাইফোয়িয়াস প্রথমে প্রচন্ড তর্জন-গর্জনের সাথে শহরগুলোকে ধ্বংস করতে লাগলো, পাহাড়গুলোকে নিক্ষেপ করতে লাগলো বহুদূরে। টাইফোয়িয়াসের ভয়ে ভীত হয়ে দেবতারা প্রায় সবাই পালিয়ে মিশরের দিকে চলে গেলেন। সেখানে তারা বিভিন্ন পশুর আকৃতি ধারণ করে লুকিয়ে রইলেন। জিউস ধারণ করলেন ভেড়ার রুপ, হেরা হলেন গাভী, আফ্রোদিতি নিলেন মাছের রুপ, হেফাস্টাস নিজেকে পরিণত করলেন ষাড়ে। কেউ কেউ বলেন, হারকিউলিসও আইবিস পাখিতে নিজেকে রুপান্তরিত করেছিলেন। একমাত্র এথেনাই ছিলেন অলিম্পাস পাহাড়ে। তিনি জিউসকে তিরস্কার করতে লাগলেন তার ভীরুতার জন্য, বলতে লাগলেন কাপুরুষ, যতক্ষন না পর্যন্ত জিউস নিজের আসল রুপ ধারণ করে টাইফোয়িয়াসের মুখোমুখি হলেন।

জিউস বজ্র এবং বিদ্যুৎ দিয়ে সজ্জিত হয়ে একটি কাস্তে দিয়ে টাইফোয়িয়াসকে আঘাত করে ক্যাসিয়ন পাহাড় (যেখানে সিরিয়া অবস্থিত) পর্যন্ত ধাওয়া করেন। টাইফোয়িয়াসকে মারাত্মক আহত দেখে জিউস তার সাথে হাতাহাতি লড়াই শুরু করেন। কিন্তু লড়াইয়ের এক পর্যায়ে টাইফোয়িয়াস হঠাৎ করেই সর্পিলাকার নিচের অংশ দিয়ে জিউসকে পেচিয়ে ধরে, জিউসের হাত থেকে কাস্তেটি কেড়ে নেয়। খুব সহসা টাইফোইয়িয়াস জিউসকে দুর্বল করে ফেলে, যখন জিউসের হাত এবং পায়ের কন্ডরা (টেন্ডন) কেটে দেয়। এরপর পারনাসসাস পাহাড়ের ঢালে কোরিচিয়ান গুহাতে জিউসকে নিয়ে বন্দী করে রাখে এবং পাহারায় রাখে তার বোন ডেলফাইনে-কে, যে হচ্ছে ড্রাগন- অর্ধেক পশু, অর্ধেক মানবী।

টাইফোয়িয়াসের সাথে জিউস যুদ্ধ করছেন

টাইফোয়িয়াসের সাথে জিউস যুদ্ধ করছেন

 

যা হোক, জিউসের সন্তান হার্মিস এবং এজিপ্যান নামের ছাগল-পেয়ে এক দেবতা জিউসের কন্ডরাগুলো ঠিক করে দেন। সঙ্গে সঙ্গে জিউস তার সমস্ত শক্তি ফিরে পান, স্বর্গ থেকে হঠাৎ করে একটি ডানাওয়ালা ঘোড়া একটি চ্যারিয়ট নিয়ে নেমে আসে। বজ্র নিক্ষেপ করতে করতে জিউস টাইফোয়িয়াসকে তাড়া করতে থাকে, এক পর্যায়ে তারা সিসিলি দ্বীপে পৌঁছালে, জিউস প্রকান্ড এটনা পাহাড়কে টাইফোয়িয়াসের দিকে ছুড়ে মারেন এবং পাহাড়ের নিচে আটকিয়ে রাখেন। এভাবেই টাইফোয়িয়াসের সাথে জিউসের যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং টাইটানদের উপর অলিম্পিয়ানদের চূড়ান্ত জয়লাভ সাধিত হয়। জিউস পরিণত হোন একচ্ছত্র নেতায়, সব দেবতাদের রাজায়।

বঙ্গবন্ধু, আমার বঙ্গবন্ধু

সময়টা ১৯৯৬ সাল। আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ একুশ বছর পর আবার দেশ শাসনের জন্য শপথ গ্রহন করেছে। শপথ গ্রহন অনুষ্ঠান শেষেই বিটিভিতে দেখানো হলো একটি গান- “শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কন্ঠ, স্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে উঠে রনি”, কতদিন পর বিটিভিতে বঙ্গবন্ধুর নাম!

গানটি শুনতে শুনতে আমার বাবা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন, পাশে থাকা আমার চোখে তখন আষাঢ় মাসের বর্ষা। বাবাকে দেখে খুব ঈর্ষান্বিত হচ্ছিলাম, কীভাবে কাঁদছে! বাবাকে দেখে খুব ঈর্ষান্বিত হচ্ছিলাম, বঙ্গবন্ধু নামক মানুষটার সাথে তাঁর থাকা স্মৃতির কারণে। বাবাকে দেখে খুব ঈর্ষান্বিত হচ্ছিলাম, কতোটা আবেগ দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন দেখে।

আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখেনি, কিন্তু তাঁর কথা শুনেছি, পড়েছি। আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখেনি, কিন্তু সমস্ত বাংলায় তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করেছি। আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখেনি, কিন্তু বাংলাকে নিয়ে তাঁর স্বপ্নকে উপলদ্ধি করতে পেরেছি। কীভাবে তাঁকে ভালোবেসে না থাকা যায়!

ঈদের দিন আমারই এক কাজিনের সাথে কথা হচ্ছিলো, সে হঠাৎ করেই বলে উঠলো- “মুজিব কীভাবে জাতির জনক? মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান কি?” আমি এতোটাই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম, কিছুই বলতে পারি নি! এই ব্যর্থতা আমাদের না, এই ব্যর্থতা আমাদের পূর্বসুরীদের। তারাই ইতিহাসকে সময় মতো স্বার্থপরের মতো বিকৃত করেছে, আমাদেরকে জানতে দেয়নি প্রকৃত সত্য। আর আমরাও এতোটা আলসে হয়ে গেছি যে, ইতিহাসটাও খুলে দেখতে চাই না, অন্যের শোনা কথায় ইতিহাস মানি! এই ব্যর্থতা আওয়ামী লীগেরও। যে মানুষটার হওয়া উচিত ছিলো সবার, তাঁকে আওয়ামী লীগই বানিয়ে ফেলেছে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের বঙ্গবন্ধু।

আমরা নতুন প্রজন্ম একাত্তর দেখিনি, আমরা নতুন প্রজন্ম পচাত্তর দেখিনি। তাই যারা গোয়েবলসীয় প্রচার চালায়, তারা যখন আমাদেরকে বলে- “তোমরাতো দেখো নি মুজিব কী দস্যুগিরিই না করেছিলো,” আমরা তখন তাকিয়ে থাকি সেইসব মানুষদের দিকে, যারা সেই সময়ে ছিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, তাদের মধ্যে কিছু মানুষও হীন রাজনৈতিক স্বার্থে তখন সত্য প্রকাশে এগিয়ে আসেন না। মনে হয়, তাদের টুটি চেপে ধরি।

ভুল ত্রুটি নিয়েই মানুষ। কেউ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে যেভাবে সবার সহযোগিতা পাওয়ার কথা ছিলো, সেভাবে উনি পাননি। এরপরো তিন বছরের মধ্যে তিনি যা করেছেন, অন্য কোন দেশে এই রকম পরিস্থিতিতে কখনই তা হয় নি। আজ আমরা আওয়ামী লীগ, বিএনপিকে কমপক্ষে পাঁচ বছর দেশ শাসন করার সুযোগ দিই, এমনকি স্বৈরাচারী এরশাদ এবং মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকারী, স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসনকারী, রাজাকারকে মন্ত্রী বানানো জিয়াও দেশ শাসন করার জন্য বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বেশী সময় পেয়েছে। যুদ্ধ পরবর্তী ঐ সময়ে মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামল দিয়ে আমরা কিভাবে বঙ্গবন্ধুকে বলতে পারি- সে ভালো জননেতা, কিন্তু রাষ্ট্রনেতা নয়! আমরাতো তাঁকে সময়ই দেই নি।

আমি তাঁর শাসন আমলের ভালো দিক আর খারাপ দিকের আলোচনা করতে আসিনি, আজ তাঁকে হত্যা করা নিয়েও কিছু বলতে আসিনি। আজ তাঁর সাথে আরো মেহেদী রাঙ্গানো গৃহবধুদের হত্যাকান্ড নিয়েও কিছু বলতে আসিনি, বলতে আসিনি দশ বছরের অবুঝ রাসেল আর সুকান্ত বাবুর হত্যা নিয়েও। আজ আমি বলতে আসিনি বঙ্গমাতার হত্যা নিয়েও, এমনকি বলতে আসিনি দায়িত্ব পালন করতে আসা সামরিক অফিসারকে হত্যার কথাও। আমি শুধু বলতে এসেছি, “বঙ্গবন্ধু এক অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন,” শুধু বলতে এসেছি-

“আজ পনেরো আগস্ট, আজ বাঙালীর শোক।
অনার্য পতাকা হয়ে বাংলার আকাশটা আজ নত হোক।
আজ খাঁ খাঁ, আজ ধু-ধু, ছিন্ন ভিন্ন মানুষ অশোক রাঢ়ে বঙ্গে হরিকেলে সমতটে
বাঙালীর বজ্রবুকে আজ ঘোর বারিপাত হোক”। 

- (“পনোরই আগষ্ট”, কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা)

গ্রীক মিথলজি ৫ (প্রমিথিউসের শাস্তি এবং আইও)

পৃথিবীর সব স্বৈরাচারী শাসকেরা যুগে যুগে তাদের রক্ষাকারীর বিরুদ্ধেই সবসময় খড়্গহস্ত হয়েছে। বোধহয় ব্যাপারটি এসেছে দেবতাদের কাছ থেকেই। যে জিউসকে টাইটান যুদ্ধে জয়ের জন্য টাইটান হয়েও প্রমিথিউস সাহায্য করেছিলেন, আরেকবার দেবী এথেনার জন্মের সময়ও জিউসকে সাহায্য করেছিলেন (এই ঘটনা পরবর্তীতে বলা হবে), সেই জিউসের নিকট হতেই প্রমিথিউস পেলেন অদ্ভুত এবং কঠোর শাস্তি, তাও সেটা মানবজাতিকে সাহায্য করার অপরাধে। হেসিয়ড বোধহয় ধর্মভীরু ছিলেন, তাই প্রমিথিউসকে চিত্রিত করেছেন ছল চাতুরীপূর্ণ চরিত্র হিসেবে। কিন্তু হেসিয়ডের অনতিকাল পরের গ্রীক ট্রাজিক লেখক ইস্কাইলাস ছিলেন প্রমিথিউসের প্রতি সহানুভূতিশীল।

ইস্কাইলাস আমাদের জানিয়েছেন, পান্ডোরার জারের মাধ্যমে মানবজাতিকে শাস্তি দেওয়ার পর জিউস দৃষ্টি নিবন্ধ করেন প্রমিথিউসের উপর। ক্রাটোস এবং বিয়া নামে জিউসের দুই ভৃত্য প্রমিথিউসকে ধরে নিয়ে আসেন সাইথিয়ার রুক্ষ পাথুরে পর্বতমালার সুউচ্চ শিখরে। এদের সাথে সাথে এলেন দেবতাদের কামার হেফাস্টাস, তার কাজ ছিলো প্রমিথিউসকে পাথরখন্ডের সাথে শৃংখলবদ্ধ করা। কিন্তু পুরানো বন্ধু প্রমিথিউসকে শৃংখলবদ্ধ করতে হেফাস্টাস ইতস্তত করছিলেন। ক্রাটোস তখন মনে করিয়ে দিলেন, এই বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ডে জিউস-ই এখন সর্বসেবা এবং তার আদেশ অবশ্যই পালনীয়। ব্যথাতুর মন নিয়ে হেফাস্টাস প্রমিথিউসকে এক বিশাল পাথরের সাথে শক্ত ভাবে শিকল দিয়ে বাঁধলেন। হেফাস্টাসের কাজ শেষ হলে, হেফাস্টাস ক্রাটোস এবং বিয়ার সাথে  সেই নির্জন পর্বতে একাকী প্রমিথিউসকে রেখে চলে যান।

Prometheus and Hephastus

হেফাস্টাস প্রমিথিউসকে শিকল দিয়ে বাধছেন (শিল্পী- ড্রিক ভেন বাবুরেন, ১৬২৩ সাল)

 

সবাই চলে যাবার পর প্রমিথিউস প্রকৃতিকে ডাকেন এবং স্বাক্ষী হতে বলেন এক দেবতার হাতে অন্য দেবতার এই শাস্তির। তিনি হঠাৎ করেই কিছু কোলাহল শুনতে পেলেন। দেখলেন টাইটান ওসেনাস এবং টেথিসের কন্যারা ক্যারিস নামের দেবীদের ডানায় ভর করে তাঁকে দেখতে এসেছেন। তারা প্রমিথিউসকে সহানুভূতি জানালেন। তারা বললেন, বিশ্বের নতুন শাসক নিজের নিয়মেই চলেন। কাষ্ঠ হেসে প্রমিথিউস তাদেরকে জানালেন, একদিন জিউস চরম বিপদের সম্মুখীন হবেন এবং সেদিন জিউসকে রক্ষা পাবার জন্য প্রমিথিউসের কাছেই আসতে হবে।

প্রমিথিউস ওসেনিডদের বলতে লাগলেন, টাইটান যুদ্ধে তিনি কিভাবে জিউসকে সাহায্য করেছেন। তিনি আরো বলতে লাগলেন, মানুষের কথা, তাদের অসহায়ত্বের কথা, তাদের জন্য তাঁর মায়া-মমতার কথা। প্রমিথিউস তাঁর এই অবস্থার জন্য জিউসের স্বৈরাচারী মনোভাবকেই বার বার দায়ী করতে লাগলেন।

এমন সময় টাইটান ওসেনাস এক ডানাওয়ালা জীবের উপর সওয়ার হয়ে প্রমিথিউসের সামনে এলেন। তিনি প্রমিথিউসকে জিউসের বিরুদ্ধে বলতে বারণ করলেন। তিনি আরো জানালেন, তিনি এখন জিউসের কাছে যাবেন প্রমিথিউসের মুক্তির জন্য সুপারিশ করতে। প্রমিথিউস ওসেনাসকে জিউসের কাছে যেতে নিষেধ করলেন। প্রমিথিউসের বাধার মুখে একসময় ওসেনাসও চলে গেলেন তার আপন আলয়ে- সমুদ্রে। ওসেনাসের কন্যা ওসেনিডরা তখনো সেখানে ছিলেন। তারা জিউসের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করে প্রমিথিউসকে তিরস্কার করলেন মানবজাতিকে সাহায্য করার জন্য, কিন্তু একই সাথে তাদের বোনের সাথে প্রমিথিউসের সুখী বিয়েরও স্মৃতি রোমন্থন করতে লাগলেন।

এভাবে অনেক বছর পেরিয়ে গেলো। একাকী নির্জনে অসহনীয় যন্ত্রনায় সময় কাটতে লাগলো প্রমিথিউসের। তারপর একদিন সাদা রংয়ের এক বকনা বাছুর তাঁর সামনে এলো, প্রাণীটি ছিলো বিক্ষিপ্ত-বিহবল পলায়নপর। প্রাণীটি বন্ধুর এবং উঁচু খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠে এলো সেখানে, প্রমিথিউসের দৃষ্টি তাকে থামিয়ে দিলো ক্ষণিকের জন্য। প্রমিথিউস বাছুরটিকে চিনতে পারলেন, তিনি আদ্র কন্ঠে বললেন, “আমি তোমাকে চিনি, তুমি ইনাকাসের কন্যা আইও। তুমি ভালোবাসায় উষ্ণ করেছিলে দেবতার মন, কিন্তু বিনিময়ে পেলে হেরার ঘৃণা। হেরাই তোমাকে তাড়িত করে বেড়াচ্ছে এতোটাকাল!”

বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলো আইও। হত-বিহবল হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি কার সাথে কথা বলছি? কে তুমি, যে সব জানো, আবার নিজেও লাঞ্ছনা ভোগ করছো?”

“আমি প্রমিথিউস, যে মরণশীলদেরকে দিয়েছিলো আগুন”, প্রমিথিউস জবাব দিল। আইও-ও তাঁকে চিনতে পেরেছিলেন। বলে উঠলেন, “তুমি সেই জন, যিনি পরিত্রাণ দিলেন সমগ্র মানবজাতিকে? তুমি সেই দুঃসাহসী, অমর প্রমিথিউস?”

দুইজনে অনেক কথা বললেন। আইও শোনালেন তার প্রতি জিউসের অন্যায় আচরণের কথা। এক সময় তিনি ছিলেন এক রাজকন্যা এবং সুখী বালিকা। তার বাবা ছিলেন নদী দেবতা ইনাকাস। ভালোই সময় যাচ্ছিলো তার। এরপর একদিন জিউস তাকে দেখলেন, প্রেমে পড়লেন। প্রতি রাতে স্বপ্নে দেখা দিতে লাগলেন আইও-কে। জিউস প্ররোচিত করতে লাগলেন আইও-কে। কিন্তু সমস্যা হয়ে দেখা দিলো হেরার ঈর্ষাকাতরতা। হেরার ভয়ে জিউস পুরু কালো মেঘে পৃথিবীকে আচ্ছাদিত করে নিজেকে ও আইও-কে হেরার কাছ থেকে লুকাতে চাইলেন, যেনো মনে হয় হঠাৎ করেই রাত এসে গ্রাস করেছে দিনের আলোকে। কিন্তু হেরাও ছিলেন বুদ্ধিমতী। তিনি বুঝতে পারছিলেন প্রকৃতির এই হঠাৎ পরিবর্তন স্বাভাবিক নয়, তিনি সন্দেহ করলেন তার স্বামী জিউসকে। স্বর্গের কোথাও জিউসকে খুঁজে না পেয়ে হেরা নেমে এলেন পৃথিবীতে এবং মেঘমালাকে সরে যেতে বললেন। জিউসও কম যান না! হেরা যখন তাঁকে দেখতে পেলেন, তখন দেখলেন জিউস দাঁড়িয়ে আছেন একটি চমৎকার শ্বেতশুভ্র বকনা বাছুরের কাছে। বকনা বাছুরটি ছিলো আইও। তিনি হেরাকে প্রতিজ্ঞা করে বললেন, এই বকনা বাছুরটিকে আগে কখনো তিনি দেখেন নি। হেরা জিউসের কোনো কথাই বিশ্বাস করলেন না। তিনি বললেন, “এই বকনা বাছুরটি খুবই সুন্দর। তুমি কি এর থেকে কোনো অংশ আমাকে উপহার দিবে?”

জিউস নিজের ফাঁদে নিজেই পড়লেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি এই বাছুরটিকে হেরার হাতে তুলে দিলেন। হেরা বাছুরটিকে পাঠিয়ে দিলেন আর্গাস পানোপটেসের কাছে। আর্গাসের ছিলো একশত চোখ, এবং তার সবগুলো চোখ কখনই একসাথে ঘুমাতো না। কিছু চোখ ঘুমাতো, কিছু চোখ পাহারা দিতো।

জিউস আইও-এর দুর্দশা অনুধাবন করতে পারলেন। যে ছিলো এক রাজকন্যা, আজ জিউসের কারণেই সে পরিণত হলো এক জন্তুতে। অথচ জিউস কিছুই করতে পারলেন না!

শেষ পর্যন্ত জিউস শরণাপন্ন হলেন দেবতাদের বার্তা বাহক, সবচেয়ে সুচতুর দেবতা হার্মিসের। হার্মিসকে বললেন, যেভাবেই হোক আর্গাসকে হত্যা করে আইও-কে মুক্ত করতে। সুচতুর হার্মিস স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে এসে গ্রাম্য রাখালের বেশে বাঁশিতে সুমধুর সুর তুলে আর্গাসের দিকে এগিয়ে গেলেন। সেই সুর শুনে খুশি হয়ে আর্গাস হার্মিসকে আরো কাছে এসে বসতে বললেন। হার্মিস কাছে বসে একের পর এক সুর তুললেন, অনেক কথা বললেন। কিন্তু কিছুতেই আর্গাসের সবগুলো চোখ নিদ্রায় বন্ধ হলো না! অবশেষে হার্মিস যখন দেবতা প্যানের একটি কাহিনী বলা শুরু করলেন, যেটা আসলে খুব বিরক্তিকর নয়, কিন্তু সেটাই আর্গাসের কাছে বিরক্তিকর লাগলো। তার সবগুলো চোখ ঘুমিয়ে গেলো। এই সুযোগে হার্মিস তাকে হত্যা করলেন। হেরা আর্গাসের সবগুলো চোখ নিয়ে নিলেন এবং তার প্রিয় পাখি ময়ূরের লেজে বসিয়ে দিলেন। সেই থেকে ময়ূরের লেজ এতো চোখময়!

Io, Hermes and Argas

শিল্পী রুবেনসের তুলিতে হার্মিস, আর্গাস এবং আইও

 

এতো কিছুর পরেও আইও হেরার হাত থেকে নিস্তার পেলেন না। হেরা এবার ডাঁশ পোকা লেলিয়ে দিলেন আইও-এর পিছনে। ডাঁশ পোকাগুলো হুল ফুটিয়ে আইও-কে উন্মাদ করে দিতে লাগলো। তাকে তাড়িয়ে বেড়াতে লাগলো সমুদ্রের দীর্ঘ বেলাভূমি জুড়ে, পানাহার করা হয়ে গেলো সাধ্যের অতীত, এমনকি ঘুমানোও পর্যন্ত সম্ভব ছিলো না। প্রমিথিউস তাকে সান্তনা দিতে চাইলেন। তিনি বললেন, “তোমার এই ভয়ংকর পথ-পরিক্রমা এখনই শেষ হবে না! তবে নিশ্চিতভাবেই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে সোনালী ভবিষ্যত। তুমি প্রথমে সমুদ্রের যে অংশ পাড়ি দিয়েছিলে তা তোমার নামানুসারে ডাকা হবে আয়োনিয় এবং বসফরাস (ষাড়ের দূর্গ), যা তোমার চলে যাওয়ার স্মৃতি ধারণ করবে। এরপর তুমি একদিন পৌঁছাবে নীল নদের তীরে, যেখানে জিউস তোমাকে তোমার মানবীয় আকৃতি ফিরিয়ে দিবেনতুমি তার ঔরসে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিবে, যার নাম হবে ইপাফাস, যে হবে এক বিশাল সাম্রাজ্যের রাজা। আর এটি জেনে রাখো, তোমার বংশ থেকে জন্ম নেবে এক মহিমাময় এবং সাহসী তীরন্দাজ, যে এসে আমাকে মুক্ত করবে!”

আইও ডাঁশ পোকার হুল খেয়ে সেখান থেকে দৌড়াতে লাগলেন (আইও-এর বিস্তারিত কাহিনী আরো পরে আসবে)।  আইও-এর কষ্ট দেখে প্রমিথিউস চিৎকার করে বলে উঠলেন, “জিউসেরও একদিন পতন হবে, আর সেটা হবে তাঁর সন্তানের হাতেই। একমাত্র আমিই জানি সে হবে জিউসের কোন স্ত্রীর সন্তান!”

হার্মিস চলে এলেন প্রমিথিউসের কাছে। জানতে চাইলেন সেই গোপন তথ্যটি। কিন্তু প্রমিথিউস জানাতে অস্বীকৃতি জানালেন। ক্ষুদ্ধ জিউস বজ্রপাত নিক্ষেপ করে শৃংখলাবদ্ধ অবস্থায় প্রমিথিউসকে পাঠিয়ে দিলেন পাতালপুরী, টারটারাসে। (অন্য এক মিথে আছে, প্রমিথিউস জানিয়েছিলেন, নেরেইড থেটিসকে যিনি বিয়ে করবেন, তার যে সন্তান হবে, সে তার বাবার চেয়েও অনেক বড় হবেন। সেই সময়ে থেটিসকে বিয়ে করার জন্য জিউস এবং সমুদ্র দেব পসাইডন উভয়েই খুব আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু প্রমিথিউসের ভবিষ্যতবানী শোনার পর তাঁরা কেউ-ই থেটিসকে বিয়ে করেননি। থেটিসের বিয়ে হয় মরনশীল পেলেয়াসের সাথে, পেলায়াস এবং  থেটিসের সন্তান হলেন ট্রোজান বীর একিলিস, যিনি তার বাবার চেয়েও বড় বীর। থেটিসের গর্ভে যদি জিউসের সন্তান হতো, সে হতো জিউসের চেয়েও বড়, এবং একদিন জিউসকে সিংহাসনচ্যুত করতো। প্রমিথিউস বন্দী অবস্থাতেও আরো একবার জিউসকে বাঁচিয়ে দিলেন। তাই জিউস তখন নিজে প্রমিথিউসকে মুক্তি দেন।)

বহু বহু বছর পর প্রমিথিউস আবার উপরের জগতে এলেন, কীভাবে সেটা আর জানা যায় নি। এবার তাঁকে শৃংখলাবদ্ধ করা হলো ককেশাসের পাহাড়ে। শুরু হলো নতুন শাস্তি। এক রক্তে রঞ্জিত ঈগল এসে প্রতিদিন প্রমিথিউসের শরীরটিকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে, যকৃতটাকে খেতো। আবার রাতের ভিতরেই সেই যকৃত নতুন করে তৈরী হতো। এভাবে চললো আরো অনেক বছর।

Prometheus

ঈগল বন্দী প্রমিথিউসের যকৃত খাচ্ছে (শিল্পী- পিটার পল রুবেনস)

 

প্রমিথিউসকে বলা হয়েছিলো, যদি কোনো অমর দেবতা প্রমিথিউসের জন্য আত্মোৎসর্গ করে এবং কোনো মরণশীল বীর এসে ঈগলটিকে হত্যা করে, তাহলে সে মুক্তি পাবে।  সেন্ট্যুর চীরণের কথা মনে আছে? ক্রোনাস আর ফিলাইরার মিলনে জন্ম নেওয়া অর্ধেক মানব, আর অর্ধেক ঘোড়া। সেই চীরণ অমর হওয়া সত্ত্বেও প্রমিথিউসের জন্য নিজেকে আত্মোৎসর্গ করতে চাইলেন। (সে আরেক কাহিনী, সময়মতো এই কাহিনীও বলা হবে।)

তারপর একদিন সেই ককেশাসের পাহাড়ে এক মরণশীল বীর এলেন। সেটা প্রায় প্রমিথিউসের শৃংখলাবদ্ধ জীবনের ত্রিশ হাজার বছর হয়ে যাবার পরের কাহিনী। সেই মরণশীল বীর এসে ঈগলটিকে হত্যা করে প্রমিথিউসকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করলেন।

মুক্ত হয়ে প্রমিথিউস সেই বীরকে বলেন, “আমি জানতাম তুমি আসবে! তোমার তের প্রজন্ম আগে আমি আইও-কে বলেছিলাম, একদিন তুমি আসবে আমাকে মুক্ত করতে!”

সেই বীর প্রতুত্তরে বললেন, “এবং আইও হচ্ছেন সেই মানবী, যার বংশধর আমি, হারকিউলিস!”

Prometheus and Hercules

হারকিউলিস প্রমিথিউসকে মুক্ত করছেন (শিল্পী- ক্রিষ্টিয়ান গ্রীপেনকেরল)